Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১১.৪

১১.৪

দাদার সঙ্গে মনান্তর ঘটিয়ে সাতগাঁ ছেড়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে আসার সময় কুলদেবতার নামটি ছাড়া পাগলরাম আর কিছুই নেননি। নতুন ছাপাখানার নাম দিলেন আদিরাম প্রেস। ধর্মতলা বার্তা ইতিমধ্যেই বাংলায় জনপ্রিয় ছিল, কলকাতা থেকে আদিরাম প্রেস পঞ্জিকা নামে তার আত্মপ্রকাশ ঘটল। পঞ্জিকা ছাড়াও রাজমোহন চাটুজ্জ্যের নতুন নবেল ছাপতে লাগলেন পাগলরাম, এবং রাজমোহনের সহায়তায় হিন্দু কলেজের বিপরীতে অ্যালবার্ট হলের নীচে একটি দোকানঘর ভাড়া নিলেন। কিছুকালের মধ্যেই গোলদিঘির দক্ষিণে গলির ভেতরে একটি পুরোনো দোতলা কোঠাবাড়ি কিনলেন। তার ওপরতলায় বাস ও একতলায় ছাপাখানা, সেখানে আধুনিক ভ্যান্ডারকুক সিলিন্ডার প্রেস যন্ত্র বসলো। বিলিতি ডাক্তারিশাস্ত্রের বই আনিয়ে বিক্রি করতে লাগলেন।

পাগলরামের বৈষয়িক সমৃদ্ধি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার খবর বাতাসে ভেসে সাতগাঁয় এসে পৌঁছয়, ভিটে কামড়ে ক্ষয়িষ্ণু জীবনধারা আঁকড়ে পড়ে থাকা জ্ঞাতিকুলের হৃদয়ে জ্বালা ধরায়, কখনো ছিছিক্কারের ঢেউ ওঠে। বিষয়টা গুরুতর রূপ নিল যেদিন রামানুজের মৃত্যুর তের দিন পর নিয়মভঙ্গের জ্ঞাতি ভোজে ঘনশ্যাম ন্যায়চঞ্চুর নেতৃত্বে পাশ্চাত্য বৈদিক সমাজের কার্যকর্তারা পাগলরামের সঙ্গে এক পংক্তিতে বসে আহার করতে অস্বীকার করলেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে, তাকে অপাংক্তেয় ঘোষণা করলেন।

অভিযোগের তালিকাটি দীর্ঘ :

১ – বড়ো ভাইয়ের মৃত্যুর পর দশদিন অশৌচের কাল সাতগাঁয়ে না কাটিয়ে পাগলরাম কলকাতায় ফিরে গিয়েছে

২ – এই সময়কালে সে ফিরিঙ্গি-চালিত রেলের আগুনগাড়িতে চেপে দেহ অশুচি করেছে

৩ – কলকাতার ব্রাহ্ম কেরেস্তান সমাজের লোকজনের সঙ্গে তার নিয়মিত সংস্রব রয়েছে

৪ – ব্রাহ্মণের ব্রত ছেড়ে সে ছাপাকলের দাস হয়েছে, বৈশ্যের বৃত্তি অবলম্বন করেছে

৫ – কলকাতায় সে

ক – গোচর্মের ভিস্তিতে টানা জল পান করে

খ – বেকারির পাউরুটি ভক্ষণ করে

গ – বিলিতি চিনি ব্যবহার করে

৬ – তার বাটিতে মুসলমান বাবুর্চি রান্না করে

৭ – তার স্ত্রী ফিরিঙ্গি গৃহশিক্ষিকার কাছে লেখাপড়া করে।

রামানুজের দুই পুত্র রামশশাঙ্ক ও রামরামের অনেক অনুনয়েও গোষ্ঠীপতিরা নরম হলেন না। পাগলরাম পংক্তিভোজন ছেড়ে কলকাতায় ফিরে গেলেন। গঙ্গারাম কোনো পক্ষই নিলেন না। নীরবে গোটা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করলেন, এবং ভেতরে ভেতরে বিধ্বস্ত হলেন।

.

অভিযোগের তালিকাটি আংশিক সত্য। দিশি কিংবা বিলিতি, কোনো প্রকার চিনিই পাগলরাম ভক্ষণ করতেন না, কারণ ইতিমধ্যে তাঁর রক্তে শর্করার আধিক্য ধরা পড়েছে। বাড়িতে গোচর্মের ভিস্তিতে টানা জল পান করতেন এটাও সত্যি নয়। কিছুকাল আগেও কলকাতায় চাঁদপাল ঘাটে বাষ্পচালিত পাম্পের সাহায্যে হাইড্র্যান্ট মারফৎ লালদিঘি, গোলদিঘি ও বিভিন্ন কৃত্রিম পুকুরে সেই জল সঞ্চিত করে পান ও অন্যান্য প্রয়োজনে বিশেষ করে রাস্তা ধোয়ার কাজে ব্যবহার হতো ঠিকই, কিন্তু ততদিনে টালায় জলের ট্যাঙ্ক হয়েছে, সীসের নল বাহিত জল বাড়ি বাড়ি সরবরাহ হচ্ছে।

টালার পাম্পিং স্টেশনে কাজ করে নীচু জাতের শ্রমিকেরা। তাদের ছোঁয়া জল পান করলে জাত যাবার আশঙ্কায় শোরগোল করেছিল কলকাতার সনাতন ধর্ম রক্ষিণী সভা। কিন্তু ধোপে টেকেনি।

*

ভিস্তিতে টানা জল কিংবা বউয়ের জন্য বাড়িতে মেমসাহেব টিউটর রাখার থেকেও গুরুতর হলো বাড়িতে মুসলমান খানসামা রাখার অভিযোগ। এবং সেটিও আংশিক সত্য। রাজমোহন চাটুজ্জ্যের সঙ্গে সখ্যের সুবাদে কলকাতার বিদ্বৎসমাজে পাগলরামের যাতায়াত বেড়েছে, বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের সময় বিশেষ শৌখিন পদ রান্নার জন্য মেটিয়াবুরুজের এক পাচককে ডেকে পাঠানো হয়। বাড়ির নিত্যকার রান্না হিরণ্ময়ী নিজেই করেন, এক ব্রাহ্মণী তাঁকে সাহায্য করেন।

মেটিয়াবুরুজের খানসামা ফরিদ আয়াজ দস্তরখান লখনউয়ের নির্বাসিত নবাবের বাবুর্চিখানায় বহুদিন কাজ করেছেন। কিছুকাল আগে নবাবের ইন্তেকাল হতে মেটিয়াবুরুজে তাঁর সাধের ছোটা লখনউ খেলাঘরের মতো ভেঙে পড়ে। খানসামা থেকে শুরু করে গায়ক, বাজিকর, দর্জি ও বিভিন্ন দক্ষ শিল্পীরা পেটের টানে কলকাতার সম্ভ্রান্ত সমাজে বায়না বা ফুরনের ভিত্তিতে কাজ ধরে।

রাজমোহন চাটুজ্জ্যে ইংরেজ সরকারের কাছে রায়বাহাদুর খেতাব পাবার পর তাঁর সম্মানে ভোজের আয়োজন করলেন পাগলরাম, ফরিদকে আয়াজ দস্তরখানকে বাড়িতে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন

‘কী কী মোগলাই খানা বানাতে পারো মিয়াসাহেব?’

দুই কানের লতি স্পর্শ করে খয়ের রঞ্জিত জিভ কেটে মাথা নেড়েছিলেন ফরিদ আয়াজ।

‘ছি ছি ছিঃ! কী বলছেন হুজুর? মোগলাই খানা! মোগলদের আবার কোনো খানা আছে নাকি? চালচুলোহীন সুন্নির দল, ওরা তো এই সেদিন ঘোড়ার পিঠে হিন্দুস্থানে এল। রেগিস্তানের তাঁবুতে খিদে মেটাতে উটের গোবরের ঘুঁটে জ্বালিয়ে যেসব মামুলি চিজ বানাতো তাকেই আজকাল দেখি লোকে বলে মোগলাই খানা। ওরা কী জানে দস্তরখানের আদব? আমার বাপদাদারা আওয়াধেরন বাবদের আশপাজখানে রকবদার ছিলেন সেই বুরহান উল মুল্ক সাদাত আলি খানের আমল থেকে। তাঁরা ছিলেন ইরানের বিখ্যাত সৈয়দ বংশ, সেই কোনকালে আওয়াধে এসে শিয়াদের নবাবি পত্তন করেছেন। সেই রকবদারি খানদান চলে এসেছে আমার মালিকের সময় পর্যন্ত।’

ফরিদ আয়াজ দস্তরখানের রন্ধনপটুত্বের থেকে তাঁর বাকপটুত্ব যে কম নয় সেটা কিছুদিনের মধ্যেই টের পাওয়া গেল। এবং তাঁর হাতের কাবাব নিহারি বিরিয়ানির মতোই তাঁর মুখে মেটিয়াবুরুজে নবাবের আড়ম্বরপূর্ণ জীবন, শখ শৌখিনতা, গজল ঠুঙরির আসর, ঘুড়ির লড়াই, কবুতরবাজি ও অন্দরমহলের রসালো কিস্যা পাগলরামের অতিথিদের মনোরঞ্জন করতে লাগল।

এই শহরেরই বুকে স্মৃতির মরীচিকা বানিয়ে নিয়ে তিরিশটি বছর কাটিয়েছেন উত্তর ভারতের শেষ স্বাধীন নৃপতি। অথচ তাঁর সম্পর্কে কলকাতার বাঙালি সমাজের উচ্চ মহলের ধারণা যে কত সংকীর্ণ, ইংরেজ শাসকের সংস্কারে রাঙানো, সেটা ক্রমশই স্পষ্ট হলো। একদিন বাবু কেবলচাঁদ হাতে আলবোলার নল ঘুরিয়ে ফরিদকে আয়াজকে বললেন–

‘কী হে মিয়া, তোমার নবাব তো শুনেছি সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে মেয়েছেলে যাকেই দেখতেন তাকেই ধরে বিবি বানিয়ে নিতেন? মেথরানি জমাদারনি কাউকেই বাদ রাখেননি! তা হারেমে কতগুলো বিবি ছিল গো তেনার?’

ফরিদ আয়াজ দস্তরখান আগের মতোই মাথা নেড়ে কানের লতিতে আঙুল ছুঁইয়ে জিভ কাটলেন, চোখ বন্ধ করলেন। যেন এসব কথা শোনা, এমনকি উচ্চারিত হতে দেখাও গুনাহ্।

‘বাবু, আমার মালিকের মতো ধর্মপ্রাণ মানুষ পৃথিবীতে আর জন্মাননি। তাঁর ধর্মাচরণে না-মাহরম, অর্থাৎ কী না নিজের বিবাহিতা স্ত্রী নয় এমন কোনো নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত নিষিদ্ধ। হাভেলিতে দৈনন্দিন কাজেকর্মে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্য তিনি যেসব নারীরা খিদমত করত, তাদের শরীয়ত মতে মুতা বেগম বানিয়ে নিতেন। এভাবেই তাঁর পেশ-খিদমত বেগম, মহলদার বেগম, যারা ছিল তাঁর ফৌজ, মুঘলানি বেগম, যারা দর্জি, ভিস্তান বেগম ভিস্তিওয়ালি থেকে শুরু করে জমাদারনি বেগম, পিঠ-চুলকানি বেগম, পাঙ্খাওয়ালি বেগম, ওজু বেগম… সব মিলিয়ে এই মাত্র ২২১ জন বেগম ছিল। তার মধ্যে মাত্র দুজন ছিল নিকাহি বেগম, অর্থাৎ বেগম মহল। বাকিরা বছরে দুবার করে ঘাঘরা-চোলি, হারেমে তিনবার খানাপিনা আর আটটি করে টাকা জলপানি পেত।’

পাগলরামের ডাক্তারি শাস্ত্রের বইপত্রের কারবার দেখে একদিন ফরিদ স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই জানালেন নবাবের এক গোপন ব্যাধি ও তার অত্যাশ্চর্য চিকিৎসা পদ্ধতির কথা। ওঁর মুখে ওষুধের বর্ণনা শুনে পাগলরাম বুঝতে পারলেন সেটি হোমিওপ্যাথি।

কিছুকাল আগে শহরে কলেরার প্রকোপ চলছিল যখন, জন মার্টিন হানিগবার্গার নামে এক হোমিওপ্যাথের চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া গিয়েছিল। ‘কলেরার ডাক্তার’ নামে জনপ্রিয় হয়েছিলেন তিনি, যদিও তার আগেই বিখ্যাত হয়েছেন পাঞ্জাবের মহারাজার জটিল রোগ সারিয়ে। জিহ্বায় বিচিত্র পক্ষাঘাত হয়ে বাক্‌শক্তি হারিয়েছিলেন রাজা, চিনির গুলিতে এক ফোঁটা ডালকামারা ৩x প্রয়োগ করে রাজার মুখে ফের কথা ফোটান মার্টিন সাহেব।

তবে আওয়াধের নবাব যে গোপন অসুখে ভুগছিলেন সেটি বাকযন্ত্র সংক্রান্ত নয়, ফরিদ মিয়া জানালেন। কথা তাঁর ওষ্ঠ থেকে নিঃসৃত হতো অনর্গল, প্রায়শ‍ই ছন্দোবদ্ধ শায়েরির রূপে। অনায়াসে যা হতো না তা হলো মল।

মি’লেডি, বালক বয়স থেকেই ভগন্দরের পীড়ায় ভুগেছেন আওয়াধের শেষ নবাব। মধ্যবয়সে অপরিমিত মশলাদার আহার ও অস্বাভাবিক স্থূলতা জনিত কারণে রোগটা পাকিয়ে ওঠে। হাকিমি ইউনানি থেকে শুরু করে সব ধরনের পদ্ধতি প্ৰয়োগ করে কোনো ফল হয়নি। চিকিৎসকেরা শল্য চিকিৎসার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আগ্রার পাদশাহের মতো নিজের অঙ্গে ছুরি চালাতে দেবার সাহস ছিল না তাঁর। রোগটাও গোপন রাখা যায়নি। খোদ বড়োলাট লর্ড ডালহৌসির নির্দেশে জেনারেল আউট্রাম লখনউয়ের প্রাসাদে চর নিয়োগ করে রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির নিয়মিত সুরতহাল নেবার জন্য। পল্টন পাঠিয়ে নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে, নাকি সেপ্টিসিমিয়ায় মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে সেটা ঠিক করতে কোম্পানির কর্তারা রীতিমত মিটিঙে বসে লাটভবনে।

অপেক্ষায় ফল হলো না, আওয়াধের নবাব তাঁর পরিবার নিয়ে, সভাসদ মোসায়েব সোয়া তিনশো বেগম নিয়ে, গায়ক বাজনদার রকবদার পেশখিদমতদার নিয়ে, ম্যাকাক ম্যাকাও চিতা জিরাফ হাতি উট ও আঠের হাজার কবুতর নিয়ে ফায়ারবোটে চেপে কলকাতায় চলে এলেন। সেখান থেকে তাঁর মা ও ভাই গেলেন লন্ডনে রাণীর কাছে দরবার করতে, অসুস্থ নবাব রয়ে গেলেন কলকাতায়।

এইসময়ে তিনি বাবু ভূপেন্দ্রলাল সরকার নামে এক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। মার্টিন সাহেবের দেখানো পথে কলেরা ম্যালেরিয়া জাতীয় রোগের সুলভ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে ইতিমধ্যেই সুনাম অর্জন করেছেন ডক্টর সরকার। মুখশুদ্ধির মতো মিষ্টি স্বাদহীন ওষুধের গুলি জিভের নীচে রেখে চুষে খেতেও সমস্যা ছিল না নবাবের। কিন্তু বাধ সাধল বাঙালি চিকিৎসকের বেঁধে দেওয়া খাদ্যতালিকা। সেই তালিকায় প্রথমেই বাদ গেল যে-কোনো ধরনের মাংসের পদ। এদিকে নবাবের নৈশভোজে একটি ছোটো হাঁড়ি দমপোক্ত বিরিয়ানি চাইই চাই, এবং তাতে একটি করে স্বর্ণমোহরের ভষ্ম মেশানো থাকে।

আকাশ ভেঙে পড়ল নবাবের মাথায়। তাঁর মুখ চোখের অবস্থা দেখে মনে হবে বুঝি আবার নতুন করে রাজ্যপাট হারিয়েছেন।

‘বিরিয়ানি কি মাংস বিনে হয় না?’ জানতে চাইলেন মৎস্যভোজী ভূপেন্দ্রলাল। ‘শুনেছি কাবুলি বিরিয়ানিতে নাকি মাংস থাকে না?’

নবাবের মনে পড়ল দিল্লির নিরামিষাশী বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের প্রিয় বিরিয়ানির কথা, যাতে মাংসের বদলে কাবুলি চানা, খোবানি, কাঠবাদাম ইত্যাদি থাকত।

‘ওসব ঘোড়ার খাদ্য!’ নবাব শিউরে উঠে বললেন। ‘ওদের বাপদাদারা ঘোড়ার পিঠে অর্ধেক জীবন কাটিয়েছে, ওরা ওসব খেতে পারে। তাই বলে আমি বিরিয়ানি ছাড়া বাঁচতে পারব না। তার চেয়ে বরং আমায় বিব দাও, ডাক্তার!’

‘কী বলছেন নবাব সাহেব? এমন কথা শোনাও যে পাপ!’ ভূপেন্দ্রলাল বললেন। ‘তাছাড়া আমি তো আপনাকে বিরিয়ানি ছাড়তে বলিনি। কেবল মাংসটা বাদ দিতে বলেছি!’

এরপর তিনি যতদূর সম্ভব সহজবোধ্য করে নবাবকে বোঝালেন কীভাবে মাংসের তন্তু পাকযন্ত্রে গিয়ে ক্রিয়া করে, মলকে কঠিন করে তোলে, এবং বৃহদান্ত্রে অহেতুক চাপ সৃষ্টি করে ভগন্দরের নালি ঘায়ের প্রদাহ বাড়িয়ে তোলে।

‘বুঝলাম, কিন্তু… বিন মাংসের বিরিয়ানি?’ নবাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।

‘কেন নয়?’ ভূপেন্দ্রলাল বললেন। ‘আপনি অনুমতি করেন তো আমি আপনার রসুইয়ের প্রধান পাচকের সঙ্গে কথা বলতে পারি।’

মেটিয়াবুরুজে নবাবের রসুইখানার প্রধান পাচক মুন্না পারভেজ দস্তরখান সম্পর্কে ফরিদ মিয়ার মামা। বাঙালি ডাক্তারবাবুর প্রস্তাব শুনে তিনিও নবাবের কথার প্রতিধ্বনি করলেন— ‘বিন মাংসের দমপোক্ত বিরিয়ানি? তাও কি সম্ভব?’

‘কেন নয় মিয়াসাহেব? কলকাতার বুকে যদি একটা ছোটা লখনউ গড়ে উঠতে পারে, যদি হুগলি নদী গোমতীর বিকল্প হতে পারে, তাহলে মাংসের বিকল্প কিছু দিয়ে কেন বিরিয়ানি হবে না?’

এরপর, ফরিদ মিয়ার দাবী অনুযায়ী তিন দিন তিন রাত ধরে একটানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর, তাঁর মামাজান মাংসের এক নির্দোষ বিকল্প খুঁজে বের করলেন

একটি কন্দ, যা প্রথম রুয়ানো ডে ইনফান্টে রোপন করেছিলেন বাংলার মাটিতে, যা সুদূর মেক্সিকো থেকে ইউরোপে নিয়ে এসেছেন তাঁরই দেশের যাজকেরা, যাকে পর্তুগীজরা বলত বাটাটা, এবং যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল এই বাংলায়: আলু!

ঘি জাফরান মেশানো সুগন্ধী বিরিয়ানির ভেতর রেওয়াজি চর্বিযুক্ত মাংসখণ্ডের বদলে একটি সুবৃহৎ সুসিদ্ধ মশলায় ভরপুর আলুতে প্রথম কামড় দিয়ে নবাবের মনের অবস্থা কী হয়েছিল?

ফরিদ আয়াজ দস্তরস্থানের ভাষ্য অনুযায়ী ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তৎক্ষণাৎ মুখে মুখে একটি শায়েরি রচনা করেন–

মোরা সাঁইয়া বুলাওয়ে
আধি রাত
নদীয়াঁ বয়ের পারি

বিষণ্ণ নবাব তাঁর প্রিয় মাংসখন্ডকে সাঁইয়া বলতে চেয়েছিলেন, নাকি ভগন্দরের নালি ঘাকে বাধা সৃষ্টিকারী নদীর প্রতীক হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, সেটা অবশ্য ফরিদ মিয়া স্পষ্ট করেননি। তবে বিরিয়ানিতে মাংস দেবার সামর্থ্য না থাকায় বিকল্প হিসেবে তাঁর রসুইখানায় আলু ব্যবহার হতো, সে ব্যাপারে যে মিথ্যা প্রচার হয়েছিল সে সম্পর্কে বলেছিলেন

‘যে নবাবের ইন্তেকালের দিনেও হাভেলিতে চারবেলা সাতশো লোকের পাত পড়ত, চিড়িয়াখানার সব জানোয়ারেরা খাবার পেত, সেই নবাবের বিরিয়ানিতে একখন্ড মাংস দেবার পয়সা নেই! এর থেকে ঝুট্ বাত আর কী হতে পারে বাবু?’

না, সাঁইয়ার সঙ্গে বিচ্ছেদ স্থায়ী হয়নি। চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিছুকালের মধ্যেই নবাবের বিরিয়ানির হাঁড়িতে মাংসখন্ড ফিরে আসে, কিন্তু সেইসঙ্গে আলুও থেকে যায়। ভূপেন্দ্রলাল সরকারের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় রোগের কিছুটা উপশম হচ্ছিল, কিন্তু মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছে তাঁর রাজ্যপাট ফিরে পাবার আর্জি খারিজ হয়ে যায়। এদিকে মা ও ভাই দুজনেই মারা যান ইউরোপে, লখনউ ফিরে যাবার আশা ধুলিসাৎ হয়ে যায়। নির্বাসিত নবাব তাঁর বেদনার্ত হৃদয় খুঁড়ে কলকাতার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে হুগলি নদীর ধারে স্মৃতির মরীচিকা বানিয়ে তোলেন, তার আকাশ ভরিয়ে তোলেন রঙবেরঙের ঘুড়িতে আর পায়রায়, বাতাস ভরে তোলেন জুঁইয়ের গন্ধে আর পোষা কোকিলের ডাকে, সন্ধ্যাগুলো ভরে তোলেন চিকন কন্ঠের ঠুমরিতে আর নুপুর নিক্কনে। শেষ পর্যন্ত তিনি সেপ্টিসিমিয়ায় মারা যাননি, যেমনটা ইংরেজরা আশা করেছিল। নির্বাসিত নবাব মারা যান অসহনীয় স্মৃতির ভারে দম বন্ধ হয়ে, তাঁর প্রাণপ্রিয় শহরের স্মৃতি, যার আকুতি তিনি ধরেছিলেন কাব্যের আখরে— ‘যব ছোড় চলে লখনৌ নগরী কহেঁ হাল কে হাম পর কেয়া গুজরি….

*

কলকাতার মানুষ নির্বাসিত নবাবকে মনে রাখেনি, কিন্তু মেটিয়াবুরুজে তাঁর রসুইখানায় আবিষ্কৃত আলুযুক্ত মাংসের বিরিয়ানি আত্মপ্রকাশ করল ক্যালকাটা বিরিয়ানি নামে। ইতিমধ্যে শহরে হোমিওপ্যাথি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, এই চিকিৎসাপদ্ধতি শিক্ষা ও প্রয়োগের জন্য হাসপাতাল খোলা হয়েছে কলকাতায় বিশ্বে প্রথম এমন একটি প্রতিষ্ঠান। পরাধীন দেশে অগণিত গরীব মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য সুলভ ও অনায়াস কোনো পদ্ধতি খুব জরুরি, সেটা পাগলরাম আদিরামবাটিতে বাগানের ঘরে ঘড়ি সারাইয়ের কাজ করার সময়ে দর্নার পার্টিশানের ওধারে গঙ্গারামের সঙ্গে রোগীদের কথোপকথন শুনে উপলব্ধি করেছিল। হোমিওপ্যাথি নতুন শাস্ত্র, তার ওষুধ সুলভ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন। কিন্তু একে ঘিরে নানান মিথ এবং বুজরুকি জেঁকে বসেছে। ফরিদ আয়াজ দস্তরখানের কাছে নবাবী চিকিৎসার কিস্যা শোনার পর পাগলরাম বুঝতে পারলেন এই মিথ-মিথ্যা-বুজরুকির একটি প্রধান কারণ হোমিওপ্যাথির বইগুলি জটিল। এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা।

ডাক্তার ভূপেন্দ্রলাল সরকারের পরামর্শে কিছুকালের মধ্যেই তর্জনাকার লাগিয়ে অর্গ্যানন ও মেটেরিয়া মেডিকা প্যুরার মূল ভাব্য ও টিকা বাংলার তর্জমা করে প্রকাশ করতে লাগলেন। তার কিছু কিছু সূত্র ও অংশবিশেষ আদিরাম প্রেস পঞ্জিকার পাতায় প্রকাশ করতে অভূতপূর্ব সাড়া মিলল। ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল পাগলরামের ব্যবসা।

সাচ্চা হোক বা ঝুটো, ভাবাদর্শ হোক কিংবা কোনো দ্রব্য, যেকোনো ধরনের অভিনবত্বেরই তখন কলকাতা শহরে বিস্তৃত বাজার হয়েছে। বাতাসে টাকা উড়ছে, টাকা ধরতে গ্রাম ছেড়ে দলে দলে লোকে শহরে আসছে। নতুন কিছুকে গ্রহণ করার জন্য তাদের মন যেমন সদাসর্বদা প্রস্তুত, তেমনই ছেড়ে আসা গাঁঘরের টানও রয়েছে। এই দ্বিমুখী রুচির জঙ্গমে এসে ননী মুখে মুখে গান বেঁধে, কবির লড়াইয়ে যোগ দিয়ে তার প্রতিভার স্বীকৃতি পেল। সেইসঙ্গে গোবর্ধন ময়রার আবিষ্কার চিনির রসে ফোটানো ছানার রসগোল্লা তৈরির কারগরি আমদানি করল কলকাতায়।

প্রতিদিন নিত্যনতুন ঘটনা ঘটছে, পূবে উত্তরে দক্ষিণে নোনা খাল জলা বুজিয়ে, হেঁতাল ক্যাওড়ার বাদাবন কেটে নগরীর এলাকা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে, নিওক্ল্যাসিকাল গথিক পালাডিয়ান স্থাপত্যশৈলীর হর্ম্যরাজি জেগে উঠে প্রাসাদ নগরী হয়ে উঠছে ফিরিঙ্গিদের হোয়াইট টাউন, জমিদার বানিয়ানদের পাড়া, ব্ল্যাকটাউনেও খাপরা টালির চালে-চালে বসতি সরিয়ে সচ্ছল মধ্যবিত্তের কোঠাবাড়ি জাগছে। এদিকে শহরের আকাশে বাতাসে মশা মাছি কলেরা কালাজ্বরের রোগজীবাণু, তারা ব্ল্যাক টাউন হোয়াইট টাউনের সীমারেখা মানে না। ইউনুস আক্সফার্দির গড়ে তোলা এশিয়াটিক সোসাইটির বাড়ির পাশ দিয়ে কফিনবাহী গাড়ি বিষণ্ণ ক্যাঁচক্যাঁচ ধ্বনি তুলে দিবারাত্র গোরস্থানের দিকে চলে যায়, নিমতলায় ক্যাওড়াতলায় চিতা জ্বলে অবিরাম।

কালাজ্বরে ভুগে হিরণ্ময়ী যখন চিতায় উঠল, কোলের কন্যা সন্তান রেখে গঙ্গারাম ভাবলেন ভাইটা এবার সাতগাঁয় ফিরবে। জ্ঞাতিসমাজ ভাবল ফিরুক না ফিরুক, নির্ঘাৎ আবার একটি বিবাহ করবে নিজের জন্যে না হোক, অন্তত পুত্রলাভের আশায়। কিন্তু সেসব কিছুই করলেন না পাগলরাম। আয়া রেখে, ইংরেজ গভর্নেস রেখে কন্যা প্রতিপালন করতে লাগলেন। এদিকে আরও বেশি করে ব্যবসা আর সমাজকল্যাণমূলক কাজেকর্মে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন।