Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৩.২

৩.২

পোর্তো পেক্যেনোর অধিকর্তা পেদ্রো আলভারেজ তিন মাস ধরে রাজধানীতে ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত থেকে পুবে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত যাঁর সাম্রাজ্য, তাঁর দর্শন আর কিছুতেই মিলছে না। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষটির সাক্ষাৎ পাওয়া যে এতটা কঠিন হবে পেদ্রো এখানে আসার আগে ভাবতে পারেনি। কেউ তাকে সতর্ক করেনি, তামাম হিন্দুস্থান জুড়ে বিছানো রয়েছে খবর সংগ্রহের এক অদৃশ্য জটিল পাদশাহি জাল, যার কেন্দ্রে মাকড়সার মতো বসে আছেন জাঁহাপনা। সুদূর বাংলা থেকে পেদ্রো আলভারেজ যাত্রা শুরু করার আগেই ওর আসার উদ্দেশ্য তাঁর কানে গিয়ে পৌঁছেছে।

মি’লেডি, ভাস্কো দা গামা ভারতে আসার পথ খুঁজে পাবার কিছুকাল পর থেকেই তার দেশোয়ালি বণিকেরা বাংলায় আসতে শুরু করেছে। কিন্তু পর্তুগিজদের গোঁয়াড় লুটেরা স্বভাবের জন্য সাতগাঁ বন্দরের নাখোদারা তাদের কোনোকালে বিশ্বাস করেনি। ফ্যাক্টরির জন্য ছাউনি বানাতে দেয়নি, এমনকি নৌকা মেরামতির জন্য শুখাঘাটাও ব্যবহার করতে দেয়নি। বাধ্য হয়ে তারা দোয়াবের পূর্বপাড়ে ভাগীরথী নামে শাখাটির ধারে বাঁশ আর খুঁটি দিয়ে অস্থায়ী জাহাজঘাটা তৈরি করেছে। এপ্রিল মাসে এসে হোগলাপাতা আর খড় দিয়ে ডেরা বানিয়ে নিয়ে হাট বসিয়ে তাঁত-কাপড়ের কেনাকাটা করে। সেপ্টেম্বরে যখন বাণিজ্যবায়ুর মুখ ঘোরে, ফিরতি হাওয়ায় পাল তুলে পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়ে দেশে ফিরে যায়। যাবার আগে হোগলার ছাউনিগুলো ভেঙে দিয়ে যায়। কার্তিক মাসে সুবেদারের খাজনাদার এসে দেখে সব শুনশান, জাহাজঘাটার ধারে গরু চরছে, জমজমাট তাঁতের হাট জাদুর মতো মিলিয়ে গিয়েছে।

এই চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। এর আগে বাদশাহ হুমায়ুনকে ভুঁইফোড় পশতুন শের শাহ বাদাবনের ধুর্ত বাঘের মতো যতটা না অতিষ্ঠ করেছে, এই পর্তুগিজগুলো তার চেয়ে কিছু কম করেনি। সেজন্য তিনি জীবিত থাকতে ওদের বাংলায় কোনো রকমের স্থায়ী ডেরা বানাতে দেননি। কিন্তু দিনকাল বদলেছে। কিছুকাল ধরেই সরস্বতীর নাব্যতা কমছে, তার বুকে ডুবো চর জেগে উঠছে, নদীটার বুঝি নাভিশ্বাস উঠেছে। বড়ো বড়ো জাহাজগুলো নীচের দিকে বেতোরে নোঙর করে ছোটো নৌকায় মাল টানছে সাতগাঁয়। এভাবে চললে বন্দরের আয়ু আর খুব বেশিদিন নয়। ইতিমধ্যে মসনদে নতুন পাদশাহ। তিনি তরুণ, বিচক্ষণ বলে খ্যাত। আশায় বুক বেঁধে তাই পেদ্রো আলভারেজ আর্জি নিয়ে এসেছে: সাতগাঁর পূর্বদিকে ছোটো বন্দরে, যাকে তারা পোর্তো পেক্যেনো বলে ডাকে, যদি অস্থায়ী হোগলার ছাউনির বদলে পাকাপোক্ত গুদাম বানানোর অনুমতি মেলে।

কিন্তু বাদশাহের নতুন এই রাজধানীতে এসে পেদ্রো ও তার দলবলের চোখে ঝিলমিল লেগে গেল। ছেলের জন্ম উদ্যাপন করতে তিনি তৈরি করেছেন এই নতুন নগর। এর আশ্চর্য সুন্দর সৌধরাজির স্থাপত্যে মিশেছে এমন এক নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক সুষমা, যা এই গ্রাম্য, স্কার্ভি-দষ্ট ফিরিঙ্গিদের বোধের অতীত। তিন- তিনটে নিষ্ফল মাস সেখানে কাটিয়ে হতোদ্যম পেদ্রো আলভারেজ বুঝতে পারল, পাদশাহের কাছে গিয়ে দরবার করার মতো যোগ্যতা তার নেই। সেজন্য প্রয়োজন বিশেষ কূটনৈতিক দক্ষতা, মোগল দরবারের জটিল সূক্ষ্ম রীতিনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, ভুলভুলাইয়ার মতো ক্ষমতা-কাঠামোর অলিন্দ পেরিয়ে খাস পাদশাহের নিকটে পৌঁছনোর অসীম ধৈর্য।

প্রথম প্রচেষ্টাটি বিফলে গেল। পাদশাহের জন্য যে উপহার ওরা এনেছিল –জরিদার রেশমি বস্তায় এক এক কুইন্টাল করে দারুচিনি ও জায়ফল, আর বারোটি পান্না বসানো আংটি–দেখা গেল সেসবের চেয়ে ঢের সরেস জিনিস মীনাবাজারের গলিতে অঢেল পাওয়া যায়। আম দরবারে পৌঁছে নাটুকে ভঙ্গিতে পেদ্রো যখন উপহারগুলো মেলে ধরল, ওমরাহদের মুখগুলো করুণায় আমোদে চিকচিক করে উঠল। পাদশাহ গম্ভীর মুখে পায়রার-ডিমের আকারের রত্নখচিত আঙুলে দাড়িতে বিলি কেটে বার দুই পলক ফেলে চাইলেন অপেক্ষমাণ পরের প্রার্থনাকারীর দিকে।

‘এমন কোন জিনিস দিতে পারো কি যা জাঁহাপনাকে খুশি করবে?’ দুদিন পর দেখা হতে বলল সভাসদ আলী বেগ। আম দরবারে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবার জন্য পেদ্রোর কাছ থেকে ইতিমধ্যে কুড়িটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়েছে সে।

দরবার চলাকালীন পাদশাহ মাঝেমধ্যেই উঠে অন্দরমহলে যান। ওঁর রক্তে আগুন ছোটে, ঘন ঘন জেনানার কচি বেগমের স্পর্শ না পেলে শান্ত হয় না এমন একটি ফিসফাস মীনাবাজারের অলিগলিতে কান পাতলে শোনা যায়। পেদ্রোর কানেও সেটা পৌঁছেছে। সমুদ্র ঝিনুকের মতো ফর্সা চিকন ত্বক, নীলচে সবুজ চোখ আর সোনালি কেশের ফিরিঙ্গি মেয়ে গোয়া থেকে এনে ভেট দেবার প্রস্তাব দিল সে। সাদা ত্বক আর সোনালী কেশের প্রতি তাবৎ হিন্দুস্থানের পুরুষদের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ কে না জানে?

‘গর্দভের মতো কথা বোলো না!’ ধমক দিল আলী বেগ। ‘পাদশাহের হারেমে কয়েক ডজন মেয়েছেলের সোনালি কেশ আছে। এমনকি লাল কেশ সবুজ কেশও আছে–যথাস্থানে, এমনকি অস্থানে কুস্থানেও! হারেমের খাস বিবি মারুম জামানি বেগম আর্মানি, সেটা জানো কি?’

‘গাঁড় মারি এই আর্মানিগুলোর!’ পেদ্রো নিজের দাড়ি খামচে ধরে। ‘সব জায়গায় ওরা আমাদের টপকে এগিয়ে যায়। সব জায়গায়। হারামজাদা অটোমানগুলো কেন যে ওদের ভিটেছাড়া করল!’

আলী বেগ হাসেন।—’বাদশাহি হারেমের হাকিমের নাম জুলিয়ানা, সে আর্মানি। পাদশাহর প্রধান বিচারপতি হলেন আবদুল হাই, তিনিও আর্মানি। এই শহরের চৌহদ্দির ভেতর বিশজন আর্মানি বণিক ব্যবসা করছে।’

‘ওদের এই সাফল্যের রহস্যটা কী বলতে পার? আমরা তো একই ঈশ্বর পুজি। ওরা কেবল প্রভুর জন্মদিন পালন করে জানুয়ারিতে আর কিমার পুরভরা আঙুরপাতা খায়।’

আলী বেগ পেদ্রো আলভারেজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত, ওর হতাশা উপভোগ করল।

‘প্রথমত ওদের চিকন ত্বক আর সুন্দর চেহারা!’ রুপোর কৌটো খুলে সুগন্ধী মুখে ফেলে চিবোতে চিবোতে আলি বেগ বলতে লাগল। ‘তার কারণ তোমাদের মতো ওরা জাহাজে চেপে আসেনি, স্কার্ভির কবলে পড়েনি। পারস্য বায়িানা হয়ে যে পথে ওরা এসেছে, সেই পথেই পাদশাহের পিতামহ হিন্দুস্থানে আসেন। দ্বিতীয়ত ওরা এদেশে এসেই তোমাদের মতো বন্দর গুদাম কেল্লা বানাতে চেয়ে হুলুক-চুলুক করে না। তৃতীয়ত ওরা পাদশাহের জন্য যেসব উপহার আনে সেসব তোমরা বাপের জন্মে চোখেই দেখনি। ভেনিসীয় কাচে ভরা সাগরকন্যাদের নিশ্বাস, কিংবা ধরো রাইন বনের সবুজ আলো জমিয়ে তৈরি তৈলস্ফটিক… দেখেছ নাকি কখনো?’

শুধু সেসবই নয়, মীনাবাজারের পেছনদিকে সরাইখানাগুলোয় কিছুদিন যাতায়াত করে পেদ্রো জানতে পারল আর্মানিদের চতুর্থ একটি গুণ আছে: ওরা জানে কীভাবে গোপন তথ্য খুঁটে বের করতে হয়, এবং উপযুক্ত মূল্যে তার বিকিকিনি করতে হয়। এরপর সে খাজা ফানুস আরাথুন নামে এক জাফরান ব্যবসায়ীর কাছে গেল। উনি বাদশাহি জেনানার হাকিম জুলিয়ানার দাদা। আরও তিনটি সপ্তাহ ঘোরাঘুরির পর, আরও পঞ্চাশটি সোনার দিনার খসিয়ে পেদ্রো আলভারেজ অবশেষে জানতে পারল কী সেই জিনিস যা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাবান পুরুষটিকে খুশি করতে পারে।

.

৪ঠা নভেম্বর আগ্রা থেকে পেদ্রো আলভারেজের জরুরি তলব এসে পৌঁছল রুয়ানো ডে ইনফান্টের কাছে। ইতিমধ্যে রুয়ানোর গোটা একটি বাণিজ্য ঋতু কেটে গিয়েছে পোর্তো পেক্যেনোয়, জলার হোগলায় তৈরি ঝুপড়ির ডেরায়, এলাকার লোকেরা যার নাম দিয়েছে হুগলি। হোগলা থেকে হুগলি। গোয়ার ধর্মীয় যাজনকেন্দ্র থেকে বহু দূরে এই ভাটির দেশে তার স্বজাতির মানুষেরা স্বাধীন বিধর্মীর মতো জীবন কাটায়, নিত্যপ্রার্থনা করে না, স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ রমণী নিয়ে থাকে। তাদের ধ্যানজ্ঞান হলো আয়েশ ফূর্তি শিকার মদ্যপান আর যত দ্রুত সম্ভব অর্থোপার্জন করে স্বদেশে ফেরা, যদি ভাগ্য সহায় হয়, যদি না তার আগেই অতর্কিত মৃত্যু এসে থাবা বসায় বাদাবনের বাঘের মতো। রবিবারের প্রার্থনা কিংবা পাপস্বীকারে তাদের বিন্দুমাত্র রুচি নেই। একটি ছোটো গির্জা নির্মাণের জন্য চাঁদা তুলে তহবিল বানানোর চেষ্টা করেছিলেন, এমনকি জাহাজঘাটার কর্তাদের দিয়ে চিঠি লিখিয়ে লিসবন থেকে অনুদান আনারও চেষ্টা করেছিলেন রুয়ানো। কোনোটিই সফল হয়নি। হতোদ্যম যাজক দেশ থেকে আনা ভেস্টমেন্ট পাট করে শিকেয় তুলে রেখে শল্যবিদের এপ্রন গায়ে চাপালেন। এই উষ্ণ আর্দ্র দেশে ফিরিঙ্গিদের অসুখবিসুখের বিরাম নেই, অন্নসংস্থানের অভাব হলো না। এমতাবস্থায় পেদ্রো আলভারেজের তলব পেয়ে বিস্মিতই হলেন সার্জেন-পাদরি ইনফান্টে। এর আগে এই লোকটি বেশ কয়েকবার দানবাক্স হাতে পাদরির সঙ্গে দেখা করতেই চায়নি।

শীতের কুয়াশাঢাকা মরীচিকার মতো নদীপথে নৌকাযোগে রুয়ানো ডে ইনফান্টে যখন আগ্রার দিকে যাত্রা শুরু করলেন, ততদিনে কনকনে উত্তুরে বাতাস শুরু হয়েছে। কনৌজে পৌঁছে তিনি নৌকা ছেড়ে ঘোড়ার পিঠে উঠলেন। ধুলোয় রাঙা পথের দুপাশে রুক্ষ রিক্ত প্রকৃতি, বাংলার সবুজ সজল সমভূমির থেকে একেবারেই ভিন্ন এক দেশ পাট খুলে এল রুয়ানোর দৃষ্টিসীমায়। অনেক প্রাচীন পাহাড় জঙ্গল বনাকীর্ণ বিহারের ধ্বংসাবশেষ পার হয়ে, পথের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর সরাইখানায় ঘোড়া বদলে, অনেক খাপরার চালে চালে বসতি পেরিয়ে, নিমগাছের নীচে ধুনি জ্বেলে সাধু, অনেক কুয়োর কপিকলে ঘুরন্ত মহিষ, অপার হলুদ সর্ষের ক্ষেত, অনেক সেচখালের ওপর কাঠের সাঁকো পেরিয়ে অবশেষে যখন নতুন নগরীর উঁচু তোরণ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন, তাঁর উত্তেজনার সীমা ছিল না।

কিন্তু সেই উত্তেজনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পেদ্রো আলভারেজের সঙ্গে দেখা করার পর মনে ছেয়ে এল উৎকণ্ঠা।

তিনটি মাস এবং সত্তরটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করার পর পাদশাহের ঘন ঘন দরবার ছেড়ে ভেতরে যাবার প্রকৃত কারণ খুঁজে পেয়েছে পেদ্রো। বেশ কিছুকাল ধরে তিনি ভগন্দরে পীড়িত। কোনোরকম দাওয়াই তেল-সেঁক কিংবা আগরিক ছত্রাকের টোটকায় নিরাময় হয়নি। প্রতিদিন প্রাতঃকৃত্যের পর তীরবিদ্ধ হরিণের মতো ছটফট করেন। পরিবারে নিকটজন ও খুব বিশ্বস্ত কয়েকজন অনুচর ছাড়া আর কেউ জানে না হুজুরে-আলম কেন দরবারের কাজকর্ম ছেড়ে ঘন ঘন, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শলাপরামর্শের মাঝেও, খাসমহলে চলে যান। সেটা জঘনাগ্নি নির্বাপিত করতে নয়, যেমনটা প্রচারিত; তিনি যান পুঁজ-রক্তে সিক্ত রেশমি অন্তর্বাস বদলাতে।

হিপোক্রেটিসের অনুসারী রুয়ানোর এঁকে দেওয়া নকশা মোতাবেক মলদ্বারের স্পেকিউলাম বানাতে প্রধানা বেগমের ব্যক্তিগত স্যাকরার দুদিন লাগল। যাজক- শল্যবিদ রোগীকে ভালো করে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে নিলেন এটি ভগন্দরই বটে মলদ্বারের দুই আঙুল পরিমাণ গভীর থেকে সমান্তরাল নালি ঘা, যেটি সংক্রামিত হয়ে পাদশাহী নিতম্বের ডান অৰ্দ্ধগোলকে জালিকাবিস্তার করেছে।

রোগনির্ণয় শুনে সম্রাট বললেন–‘তুমি কি ছুরি চালাবে মনস্থ করেছ?’

‘মার্জনা করবেন জাঁহাপনা, আর কোনো বিকল্প দেখছি না,’ রুয়ানো ইতস্তত করে বললেন।

‘ছুরিটা কোথায় কীভাবে চালাবে শুনি?’ সম্রাটের অভয়সূচক কন্ঠস্বর।

‘নালি ঘায়ের মুখটি কেটে সুতো দিয়ে বেঁধে দেবার নির্দেশ লিখে গিয়েছেন মহামতি হিপোক্রেটিস। জারগোজায় আমাদের শিক্ষকেরা তেমনই শিখিয়েছেন। কিন্তু বহুকাল ধরেই দেখা গিয়েছে এই পদ্ধতি ব্যাধি নির্মূল করে না, পরে আবার প্রকোপ দেখা দেবার সম্ভাবনা থাকে। এর বিকল্প একটি পন্থা মঠের যাজকদের ওপরে প্রয়োগ করে বিশেষ সুফল পাওয়া গিয়েছে। সেটি হলো নালি ঘা-টিকে আড়াআড়ি ব্যবচ্ছেদ করা। এতে একটু গভীর ক্ষত তৈরি হবে বটে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেটি সেরেও যাবে। এবং আর কখনো চাড়া দেবে না।’

শল্যচিকিৎসা রক্তাক্ত এবং যন্ত্রণাদায়কই হলো। পাদশাহ কোনোমতেই, এমনকি সুতীব্র যন্ত্রণার মূল্যেও, কোনো ধরনের চেতনানাশক ওষুধের প্রভাবে আচ্ছন্ন হতে চাননি। অগত্যা সার্জেন ইনফান্টে ব্যথা উপশমের জন্য ব্র্যান্ডির বাষ্পের ব্যবস্থা করলেন। ছুরি চালানোর কাজটা খুব দ্রুতই সারা হলো। পরিকল্পনা মতো ভগন্দরের নালিটি আড়াআড়ি কেটে মলদ্বারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলো, তারপর সেখানে গুঁজে দেওয়া হলো মধু ও সমুদ্রগুগগুলের দ্রবণে চোবানো এক ফালি মসলিন। পুরো সময়টা পাদশাহ পা দুটি ভাঁজ করে ঊর্ধ্বে তুলে রইলেন প্রসবরতা নারীর মতো, মুখে গোঁজা আতরমিশ্রিত তুলোর গোলায় বন্দি জাস্তব আর্তনাদ, বিস্ফারিত চোখদুটো টকটকে লাল, যেন রক্তের অশ্রু ঝরবে।

ক্ষত সারতে তিন সপ্তাহ লাগল। এবং অবশেষে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষটি অত্যন্ত খুশি হলেন। সেটা শুধু নিত্য যন্ত্রণা আর গোপন অস্বস্তি থেকে মুক্তিলাভের জন্যেই নয়। রুয়ানো ডে ইনফান্টে একটি বিশেষ আকারের ঢালু হাতলবিশিষ্ট কেদারার নকশা বানিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে আরোগ্যলাভের পর্বে সম্রাটের পাঁচ ওয়াক্ত প্রার্থনায় বিঘ্ন না ঘটে।

সুস্থ হবার পর প্রথম দিনের দরবারে হাজির ছিল পেদ্রো আলভারেজ। পাদশাহ গম্ভীর মুখে দাড়িতে পায়রার ডিমের আকারের রত্নখচিত আঙুলে বিলি কেটে দুবার চোখের পলক ফেলে ওর দিকে তাকালেন।

‘আর্জি পেশ করা হোক!’

ফিরিঙ্গি তিন পা এগিয়ে এসে সামনে ঝুঁকে প্রায় মেঝেয় কপাল ছোঁয়ালো, প্রাচ্য কায়দায় সেলাম ঠুকল পাঁচবার, তারপর ভাঙা ভাঙা ফারসিতে বলল

‘হে বিশ্বস্তের আমির, হে ভূলোকে জগদীশ্বরের ছায়া, হে জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ, হে ন্যায়ের পরাকাষ্ঠা, মানবজাতির মহানতম শাসনকর্তা, আমাদের আর্জি অতীব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। বাংলায় সাতগাঁ বন্দরের তিন মাইল পূর্বে গঙ্গার মধ্যবর্তী শাখানদীর ধারে একটি বন্দর, একটি শুখাঘাটা, একটি গির্জা ও কয়েকটি স্থায়ী গুদাম নির্মাণের অনুমতি। এছাড়া তাঁত আর কস্তুরির ব্যবসায় একচেটিয়া অধিকার আর দুই মৌসম কর মকুবের প্রস্তাব।’

তারপর, পাদশাহ বললেন— ‘তথাস্তু’ আর সবাই সুখে-শান্তিতে বাস করিতে লাগিল? লোককাহিনিতে যেমন ঘটে, মি’লেডি? সবাই নয় নিশ্চয়ই? খাজা ফানুস আরাথুনের কী হল? আর তার বোন জুলিয়ানারই-বা কী হলো?

শিরচ্ছেদ?

না, অবশ্যই নয়। মি’লেডি, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাবান শাসক সবচেয়ে বিচক্ষণও ছিলেন। তিনি পেদ্রো আলভারেজের আর্জি মেনে পর্তুগিজদের ৭৭৭ বিঘা জমি দিলেন, তার ঠিক পাশেই আর্মানি বণিকদেরও ১০০ বিঘা জমি দিলেন। এবং খাজা ফানুস আরাথুনকে সেই আর্মানিডাঙার শাসক নির্বাচিত করে পত্রপাঠ পাঠিয়ে দিলেন।

আর জুলিয়ানা?

জুলিয়ানা আর কোনোদিন পাদশাহা হারেমের বাইরে পা রাখেনি, মি’লেডি। হারেমের হাকিম থেকে তার পদোন্নতি হল শাহী বেগমে।