Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৬.১

৬.১

শীতের শেষে রাধারাণী নিউমোনিয়ায় মারা গেলেন। সেবার আলিপুরদুয়ার থেকে কলকাতায় এসে বাপ্পা মায়ের সঙ্গে ওদের বাগবাজারের বাড়িতে গিয়ে জীবনে প্রথমবার অপরাধবোধে আক্রান্ত হলো। কয়েক বছর আগে এক সন্ধ্যায় ওবাড়িতে গিয়ে হুইলচেয়ারটা দেখে বড়ো লোভ হয়েছিল। সেবার রনোমামা ওকে একটি ডিস্কি মোটরগাড়ি উপহার দিতে চেয়েছিল, বাপ্পা নেয়নি। কিন্তু মনে মনে আদিরামের কাছে প্রার্থনা করেছিল, মায়ের কলকাতার পিসি যেন মরে যায় আর হুইলচেয়ারটা ও পায়। তাহলে ওই হুইলচেয়ারে চড়ে ট্রামলাইনের ওপর দিয়ে কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়াবে সে। কিন্তু সেদিন ওই বাড়িতে গিয়ে ঘরের কোণে শূন্য হুইলচেয়ারটাকে দেখে, রাধারাণীর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে প্রণাম করতে গিয়ে আগেরবার ছবিটায় প্রণাম করতে হেসে উঠেছিলেন, কিন্তু এবার ছবিতে ফুলের মালা পরানো ছিল— গলার কাছে একটা কী যেন দলা পাকিয়ে উঠল। চোখ ভিজে উঠল বাপ্পার। কেউ দেখে ফেলার আগেই জামার হাতায় চোখ মুছে নিল।

ছেলেদের কাঁদতে নেই। সে এখন বড়ো হয়েছে। আলিপুরদুয়ারে ইস্কুলে যেতে শুরু করেছে।

*

মে মাসে বাপ্পার ইস্কুলে ছুটি পড়ার আগেই আলিপুরদুয়ার থেকে রথীনের বদলি হলো বীরভূমের খয়রাশোলে। ততদিনে সেখানে গ্রীষ্মের দাবদাহ শুরু হয়েছে। তার দাপট কমার, এবং আগের অফিসার বাংলো খালি করে দেবার মাঝে মাস দুয়েকের জন্য বাপ্পাকে নিয়ে শিউলি চলে এল কলুটোলা লেনের বাসায়। রথীন সপ্তাহান্তে যাওয়া আসা শুরু করল। এখন বাপ্পার লেখাপড়া চলে মায়ের কাছে। রবিবারগুলোয় বাবার কাছে অঙ্ক শেখা আর সাপ্তাহিক হোমটাস্ক নেওয়া।

মাঝেমাঝেই তাতে ছেদ পড়ে যায়। আগে শিলং থেকে চিনি এলে সিলেটি গুষ্টির আড্ডা বসতো, এখন শনি-রবিবারে রথীনের কলকাতায় ফেরাটা উপলক্ষ্য হয়ে উঠল। ব্যবসার কাজ নিয়ে শিলং থেকে চিনি এসে পড়লে সেটা আরও জমে ওঠে। বাপ্পার জন্য জেমস অ্যান্ড সন বেকারির মিন্ট চকোলেট আসে, আসে কাঁচা সিদল, জয়ন্তী পাহাড়ের নাগা মরিচ। এছাড়া নানান সুখাদ্যের পসরা নিয়ে আসে খোকাজেঠু, মোমবুচান, মিঠুপিসি, বাবিদাদা ও অন্যান্যরা। ছোটোবেলায় ছেড়ে- আসা, আর কোনোদিন ফিরে যেতে-না-পারা স্বদেশভূমিকে ঘিরে বাবা-কাকাদের জটিল আবেগ আর সাতগাঁ নিয়ে আদিরামবাটির বাসিন্দাদের একেবারে অন্যরকম গর্বের মধ্যে কোথাও যেন একটা তফাৎ রয়েছে, বুঝতে শেখে বাপ্পা।

রথীন ও চিনির সিলেটে ছেলেবেলার স্বর্ণালি স্মৃতিতে তেমন কোনো অভিজ্ঞতার খাদ মিশে নেই। ওদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো মিঠুর আবছা পারিবারিক স্মৃতির বাইরে কিছুই নেই। কেবলমাত্র খোকার কিছুটা বিস্তৃত চেনাজানা রয়েছে, পরিবারের গন্ডির বাইরে সমাজটা কীভাবে বদলে যাচ্ছে সে সম্পর্কে ধারণা রয়েছে। গৌহাটিতে চলে যাবার পরেও সিলেটে থেকে যাওয়া পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে সে। কলুটোলা লেনের আড্ডায় খোকা জানায় ওদের পুরোনো পাড়ার লোকজনেরা কেমন আছে। আলতাফের পরিবার বংশ পরম্পরায় ওদের পারিবারিক নৌকার মাঝি ছিল, ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ান ছিল। তারা এখন আপিসে চাকরি করছে, ছেলেমেয়েরা ইস্কুলে যাচ্ছে। এছাড়া শ্রীহট্ট শহরে নতুন নতুন পাকা বাড়ি হয়েছে, নর্দমা হয়েছে, তৈরি হয়েছে ওসমানি মেডিকেল কলেজ…

শুরু হয় এক বিচিত্র স্মৃতির খেলা: কোনো একজন পরিচিতের নাম, তাকে কেউ চিনতে না পারলে তার কোনো আত্মীয়ের নাম, তার কোনো আত্মীয়ের আত্মীয়ের নাম… কোনো একটি বিশেষ ঠিকানা, সেই ঠিকানাটিকে চিহ্নিত করার জন্য একটি গলি, একটি রাজপথ, সুরমা নদীর ওপর একটি সেতু, একটি ফেরিঘাটের কথা বলতে বলতে, স্মৃতির ঝাঁপি হাতবদল করতে করতে ক্রমশ ফুটে ওঠে এক অলীক শহরের মানচিত্র, তাতে জড়িয়ে থাকা স্মৃতির গলিপথ, বাড়ি, চেনা আধোচেনা মানুষের বংশলতিকা পাটে পাটে খুলে আসতে থাকে কলুটোলা লেনের অপরিসর মেঝের ওপর। হাত-পা-ছড়িয়ে এ-ওর-গায়ে-ঠেস দিয়ে থাকা সাত-আটজন তরুণ নাতি-তরুণ নারীপুরুষের ওপর দিয়ে বইতে শুরু হয় নদী, নদীর ওপরে পাখির ছায়া, ছায়ার ওপর দিয়ে খাসি পাহাড়ের হিমেল বাতাস।

একটি পোস্টকার্ডের কথা ঘুরেফিরে আসে। পূর্বজ সাতপুরুষের– এবং নারীর— নামের তালিকা সংবলিত সেই পোস্টকার্ডটা সিলেট থেকে এসেছিল কলকাতায় ২৩/৩ কলুটোলা লেনের ঠিকানায়। এক বাঙাল যুবক ও এক ঘটি তরুণী যেদিন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলো তার ঠিক আগের দিন। ছেলেটি ইতিহাসের মহাপ্লাবনে ভেসে এসেছিল শহরে, মেয়েটির পরিবার পৌরাণিক কাল থেকে শিকড়ে-গাঁথা ছিল সাতগাঁর দোয়াবে। একজন পূর্ববঙ্গীয় শাক্ত বংশের, অপরজন রামের উপাসক কনৌজিয়া ব্রাহ্মণ বংশের। সেই বিবাহ প্রত্যয়িত হয়েছিল শাক্ত কিংবা বৈষ্ণব আচার মেনে নয়, চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি বিশেষ ধারায়, যার নাম হোমিওপ্যাথি।

কলুটোলা লেনের সেই গুষ্টিসুখের রবিবারগুলোয় দীর্ঘ সময় ধরে বিবিধ পদ সহযোগে ভোজনের শেষে যখন বিরান চালের আঠালো ভাত আর গাঁজানো সিদলের প্রভাবে মিঠে নেশার মতো আবুলি জড়িয়ে আসে, যখন জানলার বাইরে পাশের বাড়ির দেয়ালে দিনের আলো মরে আসে, দুঃখ-সুখের স্মৃতির হরতন ইস্কাবনগুলো হাতবদল হতে হতে মলিন ঝাপসা হয়ে নেতিয়ে আসে, তখন সেই পোস্টকার্ডের প্রসঙ্গ ওঠে।

‘হ্যাঁ, অই পোস্টকার্ড!’ খোকা বলে, ঠোঁটে বিচিত্র রহস্যের হাসি। এরপর সে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে গোড়া থেকে বলতে শুরু করে কীভাবে লগ্নপত্রের দিন বিবাহের আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম কী কী শাস্ত্রাচার মেনে হবে সেসব নিয়ে যখন কথাবার্তা হচ্ছে, সেই সময়— ‘বাজ পণ্ডিত’ রামরাম শাস্ত্রী মশাই— ঘন ভুরুর নীচে তীক্ষ্ণ শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে জানতে চাইলেন

‘তা পাত্র বাবাজীবনের পূর্বতন পাঁচ পুরুষের নামের তালিকা?—’

‘পাঁচ পুরুষের নামের তালিকা?’ রথীনের অগ্রজের এক গাল মাছি।

‘ওটি তো লাগবেই,’ মশাই বাঁকা হাসি হেসে বলেছিলেন। ‘ওটি ছাড়া যে সম্প্রদানের আগে আভ্যুদয়িক হবে না।’

‘আমি মনে মনে কইলাম, আছুদার মাত হুন! দুই নয় তিন নয়, পাঁচ পুরুষ!’ খোকা বলে। ‘বাবা সেজকাকিমা কেউ দুতিন পুরুষ আগের ঠাকুদ্দা ঠাকমার নাম জানে না, তয় বলে কী না পাঁচ পুরুষ! একটা লাল খেরোর খাতায় কুলজি লেখা থাকত, ছেলেবেলায় দেখসি। কিন্তু ওসব তো দেশ ছাড়ার সময়ে ফেলে আসা হয়। আউকাল করসে! এহন কী করি? বাজ পণ্ডিতের যা মেজাজ, নামের লিস্টি না ধরাই দিতে পারলে বেঠাটার বিয়াই না ভেঙে যায়। তো ছাড়লাম দেশের বাড়ির পুরুত ভশ্চাজ ঠাকুরকে চিঠি। ভশ্চাজটা একটু উদ্বুহুছু টাইপ, বিয়ের দিন আসি আসি করে রিপ্লাই আর আসে না। আমার হাল বুঝছ তো, এক্কেরে লাউয়া লাউয়া। শ্যাষকালে বিয়ার ঠিক আগের দিন……

‘পাকিস্তান থিক্যা রিপ্লাই আইল,’ রুপু ডিবে থেকে পানের খিলি মুখে গুঁজে বলে।

‘পাকিস্তান না, তহনও ইস্টবেঙ্গল!’ খোকা শুধরে দেয়। ‘দেশ ভাগ হয়েসে, পোস্টাল সার্ভিস বেহাল। তার ওপর ব্যাটা ভশ্চাজ ঠাকুর পোস্টকার্ডে নামের লিস্টি লিখে বাক্সে ফেলসেন, কিন্তু এমন চুকুমবুদাই যে হালায় স্ট্যাম্প সাঁটেননি।’

‘সে যাইহোক, ঠিক সময়ে তো পোস্টকার্ড এল,— মিঠু বলে-–’ রথিদার বিয়াও মিটল!’

‘এবং গুঁয়ারা সুখে শান্তিতে বাস করিতে লাগিলেন,’ চিনি বলে।

‘ছোট্‌টা বড়ো বিতলা!’ চিনির পিঠে চাঁটি মেরে মোমবুচান বলে, তারপর বাপ্পাকে ডেকে— ‘অ ডিমপোনা, আমার পিঠটা এট্টু চুলকে দে না বাপ।’

‘কিসসা অহনও শেষ নয়।’ খোকা ইস্কাবনের টেক্কা হাতে চেপে রাখার মতো চোখ করে বলে। ‘রথির বিয়ার দুই মাস হইসে, পল্টনবাজারে সিলেটের এক গাউয়া পুঙ্গার হঙ্গে দেখা। সে ব্যাটায় কয় কি পুরুত ভশ্চাজ তো কবেই ওলাউঠায় মরসে, বছর ঘুরে গেসে।’

‘তার মানে?’ মিঠুর ভ্রূ কুঞ্চিত হয়। ‘চিঠিটা তবে লিখল কে? ভশ্চাজের পোলা?’

‘উঁহু!’ খোকা গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে। ‘ওই হাতের লেখা আমার ভুল অইব না। আমার পৈতার সময় ভশ্চাজ একখান খাতায় গায়ত্রী মন্ত্র লিখে দিসল, সেই খাতা এহনও আছে।’

‘তাইলে? ওই পোস্টকার্ড কেডায় লিখল, বড়দা?’ মিঠু চোখ গোল গোল করে তাকায়।

খোকা মুখে রহস্যের ছমছমে অভিব্যক্তি করে অসহায় ঠোঁট ওল্টায়। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে, ঘরের ভেতরে ঘনায়মান ছায়া আর আলো জ্বালানোর মধ্যবর্তী এই প্রহরে বুঝি এর বেশি কিছু বলতে যাওয়া সমীচীন নয়।

‘এ বড়ো অসৈরণ!’ বলে মিঠু ফেরে চিনির দিকে। চিনিও মুখে উপযুক্ত রহস্য ফুটিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এমনভাবে চেয়ে থাকে যেন ঘরের বাতাসে সেই পোস্টকার্ডটা রহস্যময়ভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এরপর মিঠু রথীনের দিকে ফিরে বলে,— ‘পোস্টকার্ডটা এখন কোথায় আছে, রথিদা?’

‘ভ্যানিশ করে গেছে,’ চিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে।

‘মোটেই ভ্যানিশ করেনি! ওটা যত্ন করে রাখা আছে, বাপ্পার পৈতের সময়ে ঠিক বের করা হবে!’ শিউলি মিঠুর দিকে ফিরে আশ্বাসের হাসি হাসে, তারপর উঠে সুইচ টিপে ঘরের আলো জ্বেলে বলে—

‘সবাই চা খাবে তো এবার?’

বাপ্পার পৈতের সময়ে অবশ্য সেই পোস্টকার্ডের কথা কারোর মনে ছিল না, মৃত্যু শিউলির দরজায় কড়া নাড়ছে তখন। কিন্তু সে পরের কথা, মি’লেডি।

*

পৃথিবী গ্রহটা অসীম ব্রহ্মান্ডে তার নিজস্ব কক্ষপথে যাত্রা করছিল। এই গ্রহের এক কোণে মৎস্যাকৃতি নদীবিধৌত চরভূমির ওপর দেশলাই বাক্সের ছোটো রেলগাড়ি, পোর্সেলিনের গির্জা আর পোড়ামাটির বাউলের জগতে দুই সদ্য বালকবালিকা, সম্পর্কে তারা তুতো ভাইবোন, এই মহাজগতের অভিযাত্রিক। ইতিমধ্যে সেই বালিকা কোয়ার্সভিলে সিস্টার্স দ্য ক্লুনি কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সাদা শার্ট, হাঁটুর ওপর নীল স্কার্ট, নেকটাই পরে, নীল রিবনের প্রজাপতি-তোলা দুটি সরু বিনুনি পিঠে ঝুলিয়ে ইস্কুলে যায়। আদিরামবাটির অন্যান্য মেয়েদের মতো তাকে নিকটবর্তী সাতগাঁ আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিভাগে না পাঠিয়ে ফরাসী সন্ন্যাসিনীদের ইস্কুলে ভর্তি করাটা তার বাবা-মায়ের তরফে, বিশেষত মায়ের তরফে, একটা ছোটোখাট বিদ্রোহ।

প্রতিদিন সকালে বাবার সঙ্গে WLA 45 মডেলের ৪০০ সিসি এয়ার কুলড ইঞ্জিনের হার্লে ডেভিডসন চড়ে ইস্কুলে যায় তিতলি। ওকে সাজিয়ে গুছিয়ে মোটরবাইকের সিটে বসিয়ে দেবার সময়ে নতুনবউ হাত নেড়ে বলে—’টাটা! অভ্যোয়া!’

অ্যান্টনি বলে–‘টাটাটাটাটাটা…ট্‌শাও!’

কুয়োতলায় বামুনদি কপিকলে জল টানার ক্যাচক্যাচ শব্দে স্বগতোক্তি মিশিয়ে দিয়ে বলে–‘এখন ভটভটি হাঁকিয়ে ইস্কুলে যাচ্ছেন এরপর মোটরগাড়ি হাঁকিয়ে কালেজ যাবেন কলকেতার মাগীদের মতো!’

বসন্তর অফিসের পথেই তিতলির ইস্কুল। সাতগাঁর পূর্বদিকে হুগলি নদীর পাড় বরাবর রাস্তাটার নাম কে যে রেখেছিল রু দ্য সওদাদ। সেই রাস্তা ধরে একে একে পোর্তোঘাটা, আর্মানিডাঙা, ওলন্দাজডাঙা, দিনেমারডাঙা পেরোলে চাঁদেরডাঙা- কোয়ার্সভিলের সীমানা। উঁচু পাঁচিল ঘেরা সিস্টার্স দ্য ক্লুনি কনভেন্টটা স্ট্র্যান্ডের ধারেই। পরপর গীর্জা, ট্যাভার্ন, ঘড়িঘর আর ফরাসি ইন্সটিটিউট, বসন্তর অফিস, এককালে ছিল ফরাসী গভর্নরের বাংলো। তিতলিকে ইস্কুলে নামিয়ে দিয়ে ইন্সটিটিউটে যায় বসন্ত, ইস্কুল ছুটির পর অফিসে লাঞ্চ আর সিয়েস্তার দীর্ঘ অবসরে মেয়েকে ফের বাড়িতে দিয়ে আসে। মাঝেমাঝে ইস্কুল ছুটির সময় অফিসের বেয়ারা গিয়ে তিতলিকে নিয়ে আসে, বসন্ত তাড়াতাড়ি কাজ গুটিয়ে ওকে নিয়ে বাড়ি ফেরে।

.

খয়রাশোলে গিয়ে নতুন ইস্কুলে ভর্তি হয়েছে বাপ্পা। কিন্তু গ্রীষ্মের শেষেও সেখানে প্রবল জলাভাব, ইস্কুলে ছুটি প্রলম্বিত হলো। অনেক দিন পরে বাপ্পা মায়ের সঙ্গে সাতগাঁয়ে এসে থাকতে শুরু করল।। তিতলির ইস্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি পড়ে যায় আগে, খুলেও যায় আগে। কনভেন্টে ফরাসী সন্ন্যাসিনীরা বেশিরভাগই দেশে ফিরে গিয়েছে রেফারেন্ডামের পর, তাদের জায়গায় এসেছে কেরালা মিশনের ক্যাথলিক নানরা। গ্রীষ্মে তারা নিজেদের গ্রামদেশে ফিরে যায়, মালাবার উপকূলে বর্ষা ঢোকার সঙ্গে তাল রেখে ছুটির নির্ঘন্ট তৈরি হয়। সুদূর দক্ষিণ থেকে ভারতের বদ্বীপভূমি পার হয়ে বাংলায় বর্ষা আসার মাঝে তপ্ত গ্রীষ্মের দিনগুলোয় হাফছুটি হয়ে যায় তিতলির স্কুলে।

এতদিনে হার্লের পিঠে চড়ার সুযোগ এল বাপ্পার। কতকাল ধরে কল্পনা করেছে, সেও একদিন হার্লের বাঁকানো শিং মুচড়ে ধরে ওর পিঠে চেপে বসবে বসন্তমামার মতো, কামানের মতো তোপ দাগতে দাগতে ছুটবে হার্লে, পেট্রোলের মিষ্টি ধোঁয়ায় ভরে উঠবে চারদিক, বসন্তমামার মতো বিকেলে অফিস ফেরত হার্লের গ্লাভবক্স থেকে বেরোবে হাতেগরম ফ্রেঞ্চ লোফ, চিনির গুঁড়ো মাখানো কোয়াসঁ, যা দিয়ে বাপ্পার শৈশব কল্পনার কোয়ার্সভিলের বাড়িঘর গির্জা হাসপাতালগুলো তৈরি।

সেই শৈশবকালটা, টোকো দুধ আর জনসন বেবি পাউডারের গন্ধের সেই জগত্‍টা, যার মধ্যে এখন রয়েছে তিতলির ভাই রামকানাই, মনে হয় যেন কতকাল আগে ছেড়ে এসেছে। তখন বাপ্পা আর তিতলিকে চিন্তামণির পিঠে বসিয়ে বাগানো ঘোরাতো গামা।

ইতিমধ্যে চিন্তামণি আরও বুড়ো আর বেতো হয়েছে, তার মেজাজমর্জি খোকাজেঠুর ভাষায় যাকে বলে— ‘মুড়াহুরইনদিয়া’। বসন্তমামার হার্লেও বুড়ো, রোজ সকালে তাকে লাথি মেরে মেরে জাগাতে হয়। তার পরেও প্রায়ই গামাকে পেছন থেকে ঠেলে গলির মুখ পর্যন্ত ছুটতে হয়, যতক্ষণ না ইগনিশান লাগে। নিলামে কেনার সময়ে চালকের পেছনে যাত্রীর সিট ছিল না, বসন্ত পোর্তোহাটার গ্যারেজে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছে। তাছাড়া সামনের মাডগার্ডের পাশে রাইফেল রাখার গান ব্র্যাকেট সামান্য অদলবদল করে জিনিসপত্র রাখার মতো হয়েছে। তাতে তিতলির ইস্কুলের ব্যাগ থাকে, কখনো অফিস-ফেরতা চাষিদের হাট থেকে আনা নধর সবুজ শাকপাতা থাকে—যতটা না স্বাদের জন্য, তার চেয়েও বেশি বসন্তর নাছোড় কোষ্ঠবদ্ধতার তাড়নায়। যে গানব্র্যাকেটে একদা ইনফ্যান্ট্রির মেশিনগান থাকত, সেখানে উঁকি দেয় সদ্যতোলা কচুর ডাঁটা, কখনো শালুক, তার গা থেকে জল ঝরে আর গোলাপি আধফোটা ফুলগুলো দোলে। এদিকে চালকের পেছনে শালুক ফুলের মতো দোলে দুই সদ্যবালক-বালিকার হাস্যোজ্জ্বল মুখ।

বাবা আর বাপ্পাদাদার মাঝে বসে তিতলি বাবার ভুঁড়ির বিষুবরেখা বরাবর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে, ছোট্ট হাত অপর গোলার্ধে বেশিদূর পৌঁছয় না। ওর পেছনে পা ঝুলিয়ে বসে বাপ্পা মরীয়া খামচে ধরে থাকে বসন্তমামার ট্রাউজার্সে সাসপেন্ডার বেল্টের নীচের দিকটা। সকাল বিকেল পথচারীরা দেখে এক মোটাসোটা লোক ও দুই ছোট্ট রোগাপাতলা ছেলেমেয়ে একটি লজঝড়ে জলপাই-রঙা ভটভটি চেপে বিকট শব্দ করে চলেছে। লোকটির মাথায় চামড়ার হেলমেট, চোখে গগলস্‌, মেয়েটির পরনে সাদা-নীল স্কুল ইউনিফর্ম, মাথার পেছনে জোড়া বিনুনি উদ্বুত্তু মাছের মতো উড়ছে, ছেলেটার নাকে লেগে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। যত সে হেঁচে উঠছে, ততই দুজনে বেদম হেসে উঠছে, হেসে গিয়ে পড়ছে চালকের পিঠে।

এমনিতে রু দ্য সওদাদের দুপাশে হাসির উপকরণের অভাব নেই। ভটভটির প্রবল শব্দে পথের ধারে গরুবাছুর ধেই ধেই করে নেচে উঠছে, খোঁটা উপড়ে পালাচ্ছে, ধুতি-পরা পথচারী ছিটকে সরে যেতে গিয়ে কাছা খুলে যাচ্ছে, হুগলি খালে ব্রিজের আগে লেবেল-ক্রসিং পড়ে গিয়ে সোয়া আটটার বন্দর-হুগলি লোকালের লাল-কালো ইঞ্জিন আর সবুজ তিনটি কামরা চলে যেতে যেতে সাদা পোশাকের গার্ড সাহেব ব্যাকুল মুখে দেখছে, পাদানিতে কাদামাটি-মাখা ছেলের দল মোটরবাইক ও তার আরোহীদের দেখে অঙ্গভঙ্গি করছে। প্রত্যুত্তরে ওদের জিভ ভেঙিয়ে কাঁচকলা দেখায় বাপ্পা, আর তিতলি হাতদুটো কানের ওপর শিঙের মতো তুলে চিৎকার করে ওঠে— ‘ম্যার্দ! ম্যার্দ!’

ট্রেনের শব্দ, হার্লের শব্দ ছাপিয়ে চামড়ার শিরস্ত্রাণ ফুঁড়ে কথাগুলো বসন্তর কানে পৌঁছচ্ছে কি না, পৌঁছলে সে কন্যার ইস্কুলে নবলব্ধ ভাষাজ্ঞানে গর্বিত কি না মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। তার কারণ রাস্তাটা এবার ঢালু দিয়ে বাঁক হুগলির পাড় ধরে চলেছে। বাঁদিকে জলের ওপর জেলেদের নৌকা, ডানদিকে প্রাচীন ক্ষয়াটে ভিলাগুলো, তাদের ভূমধ্যসাগরীয় স্থাপত্যশৈলী, খসে-পড়া পঙ্খের কাজ, গায়ে ঝাপসা প্যাস্টেলের রঙ, বাগানে বন্য বোগেনভেলিয়ার ঝাড় পেরিয়ে একের পর এক একদা ফিরিঙ্গিদের ডাঙার ফটকগুলো পার হয়ে যেতে যেতে তিতলির দেখাদেখি বাপ্পাও ছড়া কাটার মতো করে বলে উঠবে— ‘আর্মানিডাঙা! ওলন্দাজডাঙা! দিনেমারডাঙা!’ আর প্রতিটি ফটকের নীচে পাতা লোহার শিকের ওপর দিয়ে বাইকের চাকা যাবার সময় বসন্তর পেটটা থরথর করে কেঁপে উঠবে, আর ওদের দুজনেরও নাড়িভুঁড়ি কিলবিল করে উঠবে, খিলখিল করে হেসে উঠবে ওরা, আর তিতলি ঘাড় ঘুরিয়ে বিজ্ঞের গলায় বাপ্পাকে বলবে, শিকগুলো কেন পাতা রয়েছে জানিস বাপ্পাদাদা? –‘কেন রে’–যাতে এক ফিরিঙ্গিডাঙার গরু ছাগল কুকুর অন্য দেশের ডাঙায় যেতে না পারে, তার কারণ শুধু মানুষ নয়, যা কিছু জ্যান্ত সেই সেই দেশের আইনের আওতায়, যে আইনগুলো সব আলাদা আলাদা, কোথাও ভটভটি এসে রাস্তার লোককে ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেললে অপরাধ সেই লোকের, আর সেইজন্যেই ওদের দেখে লোকজন ছিটকে সরে যাচ্ছে, কারণ হার্লের ধাক্কায় যদি কোনো লোক মরে যায় তাহলে তাকেই পুলিশকে ফাইন দিতে হবে আর তাকেই জেলখানায় যেতে হবে, এমনকি মরার পরেও, আর সবাই মরার থেকেও জেলখানাকে বেশি ভয় পায়, তাই পালাচ্ছে।

এভাবেই ওরা পৌঁছে যাবে কোয়ার্সভিল। ইস্কুলের গেটের বাইরে এক ঝাক পড়ুয়ার মাঝে সাদা-গাউন-নীল-ঘোমটা পরা সন্ন্যাসিনীরা, কচি কন্ঠের কলকলানির ভেতর পাঁচিলের ওপাশে চ্যাপেলের অভ্যন্তর থেকে ভেসে আসে গভীর অর্গ্যানের ধ্বনি। তিতলিকে নামিয়ে বসন্ত এরপর বাপ্পাকে নিয়ে চলে আসবে ইন্সটিটিউটে। বাগানের মাঝে থামে ঘেরা ভিলা প্যাটার্নের বাড়িটায় একদিকে মিউজিয়াম, বিগত শতকের বিবর্ণ পত্রপত্রিকা আর জার্নালের আর্কাইভ, আরেকদিকে ক্লাসঘরে বিশীর্ণ বৃদ্ধা মাদাম নেলিন বিভিন্ন বয়সের একদল ছাত্রছাত্রীকে ভাষাশিক্ষা দিচ্ছেন। মাদাম নেলিনের ন্যাশপাতির মতো ত্বক, রেফারেন্ডামের পরেও আবুলির টানে থেকে গিয়েছে যারা তাদের একজন; নকল দাঁত সামলিয়ে পাখি-পড়ানোর মতো বলে চলেছেন,— ‘স্যোঁ শা শ্যাঁটে সা শ্যঁসঁ’ (son chat chante sa chanson)। বারান্দার এপাশে পর পর ঘরগুলোয় পুরোনো দিনের ধুলো পড়া আসবাবপত্র মিউজিয়ামের তালিকাভুক্ত নয়, শেলফে টেবিলে মেঝেয় ছড়িয়ে আছে।

প্রথমদিন এই বাড়িটায় বাপ্পাকে এনে বসন্ত বলেছিল–‘এখানে তুই ইচ্ছেমত যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াতে পারিস, যে কোনো ঘরে ঢুকতে পারিস। কিন্তু মনে থাকে যেন, জোরে শব্দ করবি না, কোনো জিনিসে হাত দিবি না, একটা ধুলোর কণাও যেন না সরে। ইচ্ছে হলে বাগানে গিয়েও খেলতে পারিস।’

ভবিষ্যতের ভূতের মতো বাপ্পা পা টিপে টিপে ঘুরে বেড়ায় সেই ঘরগুলোয়, যেখানে বাতাস শাকম্ভরী দেবীর অন্তর্জলী-ফেরা নিশ্বাসের মতো গন্ধে ভারি, এতই প্রাচীন যে তার মরার সময়ও পার হয়ে গিয়েছে যতক্ষণ না তিতলি ইস্কুল থেকে এসে যোগ দেয়, আর দুজনে মিলে সাহস সঞ্চয় করে ছায়াচ্ছন্ন ঘরগুলোয় ঢুকতে পারে। কোয়ার্সভিলের গভর্নরের ব্যক্তিগত কক্ষে মোটা মোটা থামওয়ালা খাট, ওপরে ঝুলছে বেত-কাপড়ের পাঙ্খা, দেয়ালে জলরঙে আঁকা বিলিতি নদীর ছবি, র‍্যাকে বিভিন্ন আকারের বন্দুক, ওয়ার্ডরোবে সোনালি ট্যাসেল দেওয়া সবুজ মেরুন ভেলভেটের কোট আর ব্রিচেস বিবর্ণ হয়ে এসেছে।

রোদের তাপ পড়ে এলে বসন্ত অফিস ছুটি করে বেরিয়ে পড়ে ওদের নিয়ে। ফিরতি পথে তিতলির আবদারে থামতেই হয় ঘড়িঘরের পাশে সার্কাস বেকারিতে, যেখানে উষ্ণ কোয়ার্স কিংবা স্ট্রবেরি টার্ট আর বাধ্যতামূলক আইসক্রিম সোডার পর ফের যখন ওরা হার্লের পিঠে, ততক্ষণে স্ট্র্যান্ডে ভিস্তিওয়ালারা জলছড়া দিয়েছে, গরম ধুলোর ভাপ উঠছে, হকারেরা কুলফি, ঘটিগরম আর ভুট্টাপোড়ার পসরা নিয়ে বসতে শুরু করেছে, একজন দুজন করে বৃদ্ধ ফিরিঙ্গি দম্পতি যাঁরা এখনও মনে করেন ফরাসী কোয়ার্সভিলেই আছেন— ততোধিক বৃদ্ধ কুকুরের পিছু পিছু লাঠি ঠুকঠুক করে ব্যোয়া-দু-ভয় (হাওয়া খেতে) বেরিয়ে পড়েছেন। গির্জার সামনে পাথরে বাঁধানো চত্বরে ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রার নীলচে ধূসর ঢেউয়ের বিক্ষোভে পালতোলা জাহাজের মতো দুই নীল-সাদা গাউনের সন্ন্যাসিনীকে হেঁটে যেতে দেখে তিতলি চিৎকার করে উঠবে— ‘বনাপ্‌ফেমিদি সিস্টার আনা মারিয়া!’

‘বনাপ্‌ফেমিদি সিস্টার জুলিয়া!’ কুলফিওয়ালা ভুট্টাওয়ালাকে দেখে বাবার পিঠের সাসপেন্ডার বেল্ট টেনে বলে উঠবে,— ‘বাবা- কুলফি খাবো!’

‘বাবা-ভুট্টা-খাবো!’ বসন্ত কর্ণপাত না করে স্ট্র্যান্ড ছাড়িয়ে রু দ্য সওদাদ ধরে পড়ন্ত রোদে রুপোগলানো হুগলি নদীকে ডান দিকে রেখে, বুনো বোগেনভেলিয়ায় ছাওয়া বিবর্ণ ভিলাগুলোকে বাঁদিকে রেখে, একে একে ফিরিঙ্গিডাঙার ফটক পেরিয়ে চড়াই বেয়ে লেবেল ক্রসিং পেরিয়ে নির্জন শিরিষ আর বুনো আমগাছে ছাওয়া কেরেস্তান গোরস্তানের ধারে এসে থামবে, কারণ দিনেমারডাঙা ছাড়ানোর পর থেকেই তিতলি বলতে শুরু করে দেবে— ‘বাবা পিপি! বাবা পিপি!

নিরুপায় বসন্ত হার্লের ব্রেক টিপে দাঁড় করাবে কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ করবে না। তিতলি জনহীন পথের পাশে উবু হয়ে স্কার্টের পেছনদিকটা দুহাতে ছাতারে পাখির ডানার মতো মেলে ধরবে, হার্লে থেকে নেমে বসন্তর মনে পড়বে তার নিজেরও রাস্তার পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন, রাস্তার অন্যপারে, লানটানা ঝোপের দিকে মুখ করে কাঁধের থেকে সাস্পেন্ডার বেল্ট কোমরের দুপাশে ঝুলিয়ে। এবং তখনই মামার পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে বাপ্পাও ওর প্যান্টুলের বোতাম খুলবে।

সাস্পেন্ডার বেল্ট কাধে তুলে ট্রাউজার্সের বোতাম লাগাতে যতক্ষণ লাগে, হার্লের ইঞ্জিনের শব্দ শুনশান ঝিঁঝিডাকা কেরেস্তান গোরস্তানে স্বাভাবিক কান- সওয়া ধ্বনি হয়ে উঠতে যতক্ষণ লাগে, ততক্ষণে তিতলি আর বাপ্পা কবরখানার শ্যাওলাকীর্ণ ওবেলিস্কগুলোর মাঝে লজ্জাবতী লতাগুলোকে পর পর ছুঁয়ে কুঁকড়িয়ে দিতে দিতে একদিন বিকেলে সৌধের আড়ালে গিয়ে দেখল এক ফিরিঙ্গি সাহেব। ভাঙা শ্যাওলাকীর্ণ থাম আর গম্বুজের ছায়া থেকে তাকে আলাদা করা যায় না, গোটা দেহের চামড়া ভয়ঙ্কর রকমের কুঁচকে গিয়েছে, পরনে ফরাসি ইন্সটিটিউটে সেই ওয়ার্ডোবে ঝুলন্ত পোশাকের মতো ব্রিচেস আর টিউনিক, কাঁধের জায়গায় শুকনো পাখির বিষ্ঠা লেগে আছে, মাথায় ভেলভেটের তেকোনা রঙজ্বলা টুপি। গম্বুজের দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে হেলে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা, ব্রিচেস নামানো। তলপেটের নীচ থেকে সাপের মতো লম্বা গোলাপি অঙ্গ ধরে টানছে প্রাণপণে, যেন ওটা পেট থেকে ছিঁড়ে ফেলবে। দৃশ্যটা দেখে বাপ্পা তিতলি দুজনের কেউই ভয় পেল না। মনে হলো কোনো কঠিন অসুখ করেছে মানুষটার। গম্বুজের দিকে ফেরানো মুখটা পেছন থেকে যতটুকু দেখা যায় মনে হয় যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট, কাদছে, মনে হয় এক্ষুণি বুঝি মারা যাবে। আর তাই ওরা ছুটে রাস্তায় উঠে গিয়ে বসন্তকে দৃশ্যটার বর্ণনা দিতেই এক বিচিত্র কাণ্ড করল সে— দুই ঝটকায় পর পর ওদের ওদের দুজনকে হার্লের পিঠে তুলে নিজে চড়ে বসল, আর তীব্র গতিতে হার্লে ছোটালো সাতগাঁয়ের দিকে।

সেদিন রাতে দিদার কাছে শুয়ে গল্প শোনার ফাঁকে তিতলি অদ্ভুত ঘটনাটার কথা ফাস করে দিল। পরদিন সকালে সরোজা বসন্তকে আড়ালে ডেকে বকুনি দিলেন।

‘বলিহারি তোর আক্কেল! বাচ্চাদুটোকে অমন জায়গায় বিকেলের অলক্ষুণে পহরে ছেড়ে দিয়েছিলি?’

‘ম্যের্দ!’ বসন্ত বলল— ‘কেরেস্তান গোরস্তানের ফিরিঙ্গিগুলো কবেই মাটি হয়ে পাদরি আমগাছের সার হয়ে গ্যাছে। কে জানত!

আর কোনোদিন তিতলি-বাপ্পাকে নিয়ে ওই জায়গাটা পেরোনোর সময় থামেনি বসন্ত, হার্লের হর্ন বাজাতে বাজাতে গিয়েছে, যদিও রাস্তার ওই অংশে বিকেলের ওই সময়ে জনমনিষ্যি দেখা যায় না।