সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৯.২
৯.২
মি’লেডি, নদীর মতোই গতিময় মানুষের জীবন। কখনো তার বাঁকবদল ঘটে। জীবনের মানচিত্রে তার রেখাচিহ্ন রয়ে যায়, কিন্তু দৈববিপর্যয় না ঘটলে সাধারণত সেটা তখনই বোঝা যায় না, পরে নিরুপণ করতে হয়। মানব চরিত্রে পরিবর্তন প্রায়শই ঘটে অলক্ষে, অবচেতনে, ক্যালেন্ডারে তার কোনো চিহ্ন থাকে না। সেদিক থেকে পাগলরাম চক্রবর্তী ব্যতিক্রম। ঠিক কবে কখন কিশোর পাগলরাম অবসাদ ও মনোবিকার কাটিয়ে উঠে নিজেকে খুঁজে পেল, জীবনের পথ খুঁজে পেল, সেটা মাস দিন ক্ষণ ধরে বলে দেওয়া যেতে পারে। সেটা ছিল এক বাইশে নভেম্বর, বুধবার, ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক দুপুর তিনটে। টং টং করে ঠিক তিনবার ঘড়িতে ঘন্টা বেজে উঠল। আদিরামবাটিতে এই অচেনা শব্দটা ছড়িয়ে পড়তে সকলেই চমকে উঠল।
দক্ষিণের বারান্দায় অকেজো জলপাইকাঠের গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা সবারই আজন্ম চেনা। বাতিল আসবাবের মতো অনাদরে পড়েছিল, কেউ কখনো ঘড়িটা চলতে দেখেনি। এই বাড়িতে যারা এর ঘন্টাধ্বনি শুনেছে, তারা কেউ আর জীবিত ছিল না। ঘড়িটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক বড়ো কর্তার উপহার।
*
রাজারাম সার্বভৌমের মৃত্যুর আগের একটি ঘটনা, তখনও পাগলরামের জন্ম হয়নি।। সাতগাঁয় গুটি বসন্তের মড়ক কেটে গিয়েছে। একদিন ফোর্ট উইলিয়াম থেকে আদিরামবাটিতে বার্তা এল, কোর্ট অফ অ্যাপিলের প্রেসিডেন্ট এবং মুখ্য বিচারক টমাস আরুন্ডেল টোলের বাড়িতে পুথিখানার সম্ভারটি দেখতে বড়োই ইচ্ছুক ধর্মসঙ্কটে পড়লেন রাজারাম। ইচ্ছে হলে তিনি কোম্পানিকর্তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। কিন্তু ইংরেজরা বাংলার দেওয়ানি পাবার পর পুরোনো অর্থব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়তে বসেছে, সাতগাঁর টোল চতুষ্পাঠীগুলোর দৈন্যদশা, সেইসময় ওদের প্রস্তাবিত অনুদান নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন শাসকের পক্ষে মত দিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় সাতগাঁয় নৈয়ায়িকদের যে সভা হয়েছিল আদিরাম মন্দিরের চাতালে, সেখানে যে-দুজন অনুদান গ্রহণের সোচ্চার বিরোধিতা করেছিলেন তাঁরা হলেন পঞ্চানন তর্কচূড়ামণি ও সহোদর রামদেব। দুজনের কেউই আর জীবিত নেই।
ইতিমধ্যে দিনকাল বদলেছে, ইংরেজদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সমাজের বিশিষ্টরা একমত হলেন, কোম্পানির অত বড়ো একজন কর্তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা সুবিবেচকের কাজ হবে না। কিন্তু তা বলে এক গরুখোর সাহেবকে তো আর পুথিশালের ভেতরে পা রাখতে দেওয়া চলে না। অগত্যা বাগানের ধারে রাস্তার দিকে অতিথি আপ্যায়নের জন্য দরমা ও খড় দিয়ে একটি ঘর তোলা হলো। সাহেব আসার দিনক্ষণ ঠিক হবার পর কোম্পানির তহশিলদার এসে আয়োজন দেখে গেল, সাহেবের জন্য লাউঞ্জ চেয়ার, টেবিল, কার্পেট ইত্যাদি এনে দরমা খড়ের ছাউনি সাজিয়ে ফেলল। ওরা এককোণে একটি কাঠের চেম্বারপট বসাতে চেয়েছিল, কিন্তু রাজারাম সম্মতি দেননি। এই বাগানের ফুল মন্দিরে ঠাকুরবাড়িতে পুজোয় ব্যবহার হয়।
নির্দিষ্ট দিনে কলকাতা থেকে কোম্পানির বড়ো বিশদাড়ি বজরা এসে লাগল পোর্তোহাটার ঘাটে। সেখান থেকে সেদান চেয়ারে চেপে উর্দি-আঁটা বেহারা আর্দালি সমভিব্যাহারে এলেন কোর্ট অফ অ্যাপিলের প্রেসিডেন্ট। আরুন্ডেল সাহেবের একমাথা সোনালি চুল, সরু খড়্গেঙ্গর মতো নাকের ওপর সোনালি ফ্রেমের প্যাশনে, নীল বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। সদর দরজায় রাজারামকে দেখে সেদান চেয়ার থেকে নেমে আরুন্ডেল দুই হাত জড়ো করে বললেন-
‘নমস্তে বিদ্যন্, সুপ্রভাতম্! ভবতঃ স্বাগতেন অহং সম্মানিতঃ অস্মি!’
এরপর তিনি ইংরেজিতে যা বললেন, তাঁর মুনশির তর্জমা থেকে জানা গেল। সাহেব বললেন :
‘আমি কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে আজ আসিনি। নিছকই ভিন্ন একটি প্রয়োজনে এসেছি। বলা যেতে পারে আমার পূর্বসূরীর অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করতে।’
‘আমার সেই পূর্বসূরী ছিলেন ভাষাতত্ত্বের গবেষক। সাতগাঁয় এসে তিনি হাজার বছরের পুরোনো পুথির সন্ধান পান। সেই পুথিগুলির ভাষা তাঁকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর শিকড় অনুসন্ধানের কাজে একটি নতুন সম্ভাবনাময় পথে চালিত করছিল। কিন্তু কাজটা সম্পূর্ণ করতে পারার আগেই তিনি মারা যান। তাঁর হাতে লেখা কিছু নোট আর অপ্রকাশিত দুটি প্রবন্ধ ছাড়া পুথিগুলি কিংবা সেগুলির কোনো কপি পাওয়া যায়নি।’
‘আপনি জানলে প্রীত হবেন, মারা যাবার আগে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি নামে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে যান, যাতে এই প্রাচ্যদেশের বিপুল প্রাচীন জ্ঞানভান্ডার এক ছাতের নীচে রক্ষিত হতে পারে। কলকাতায় গোরস্থানের রাস্তার মুখে সোসাইটির নিজস্ব কোঠাবাড়ি হয়েছে, সংগ্রহশালা হয়েছে। এছাড়া একটি মুদ্রণযন্ত্র বসানো হয়েছে, মাসিক পত্রিকা ছাপা হয়। সম্প্রতি সোসাইটির সভাপতি হয়েছি আমি। এই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা আমার আছে কি না আমি জানি না, কিন্তু এটুকু বুঝি যে কলকাতা কোম্পানির শাসনকেন্দ্র হলেও এই বঙ্গদেশে সনাতন বিদ্যা ও শিল্পচর্চার কেন্দ্রগুলি ছড়িয়ে আছে তার বাইরে।’
‘সাহেবকে বলো, তিনি সঠিক বুঝেছেন।’ রাজারাম মুনশিকে বললেন। ‘কলকাতাকে আমরা বাংলার প্রাণকেন্দ্র মনে করি না। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে সাতগাঁ এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের রাজধানী ছিল।’
‘সেটা কলকাতা ছেড়ে বেরোলে দেখা যায়। গ্রামেগঞ্জে কত যে আশ্চর্য টেরাকোটার মন্দির। সেইসব স্থাপত্যকীর্তি জঙ্গলাকীর্ণ, অনুমান হয় কত মূল্যবান পুথিপত্র পটচিত্র উইপোকার গর্ভে গিয়েছে। সোসাইটি থেকে আমরা তাই উদ্যোগ নিয়েছি যতদূর সম্ভব সেগুলি উদ্ধার করার।
এরপর আরুন্ডেল সাহেব নীচু স্বরে নির্দেশ দিলেন মুনশিকে, মুনশি নির্দেশ দিল আর্দালিকে, আর্দালি নির্দেশ দিল সাহেবের দলে আসা এক দোআঁশলা ইঙ্গভারতীয় যুবককে। বজরা থেকে আসার সময় দুজন চাপরাশির মাথায় একটি লম্বা কাঠের বাক্স এনে সদর দরজার বাইরে রাখা হয়েছিল। যুবকের নির্দেশে চাপরাশিরা সেটি ভেতরে আনল।
‘সোসাইটির তরফ থেকে এটি একটি বিশেষ উপহার।’ — আরুন্ডেল জানালেন— ‘এই বাড়িতে বিদ্যাচর্চার খ্যাতির স্বীকৃতি, এবং আতিথ্যদানের জন্য কৃতজ্ঞতার প্রতিদান।’
কফিনের আকারের কাঠের বাক্সটিকে দেখে রাজারামের ভুরু কুঞ্চিত হলো। সাহেব কী চান সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। বাক্সটি ঘরে না ঢুকিয়ে দক্ষিণের বারান্দায় এনে দাঁড় করানো হলো। হাফ-ফিরিঙ্গিটি সাঁড়াশি দিয়ে বাক্সের পেরেক খুলে বের করে আনল একটি পাঁচ ফুট উঁচু গ্র্যান্ডফাদার ক্লক, যার ডায়ালে কালো সোনালি অক্ষরে লেখা J. B. Joyce & Co. Shropshire England ।
ঘন্টাখানেক পরিশ্রমের পর যুবক সেটিকে সচল করল। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ স্বস্থানে বসালো, ব্রোঞ্জের আঙুরলতায় সজ্জিত লম্বা পেন্ডুলাম ঝোলালো, চাবি ঘুরিয়ে দম দিল, তারপর টিক টিক করে ঘড়ি চলতে শুরু করল। ঢং ঢং করে ব্রাহ্মণপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ল বিচিত্র অশ্রুতপূর্ব ধ্বনি। মনে হলো জাদুবলে কোয়ার্সভিলের ঘন্টাঘরটা স্ট্র্যান্ড ছেড়ে হেঁটে হেঁটে চলে এসেছে আদিরামবাটিতে।
ফিরিঙ্গিদের দেশের শিল্পপ্রযুক্তির বিস্ময়, কোম্পানির বড়ো কর্তা উপহার এনেছেন। রাজারামের গ্রহণ না-করে উপায় ছিল না। এরপর পুথিশালা থেকে পুরোনো পুথিপত্র পান্ডুলিপি খেপে খেপে বের করে বাগানে দরমা খড়ের ছাউনিতে আনা হলো। সাহেব সারাদিন ধরে খুঁটিয়ে সেগুলি দেখলেন।
ভেতরবাড়ি থেকে মিছিরির পানা, ফল ও চন্দ্রপুলি পাঠিয়েছিলেন ভুবনেশ্বরী। সাহেব পানা ও ফল খেলেন, চন্দ্রপুলি স্পর্শ করলেন না। দিনের আলো ফুরোতে বজরায় ফিরে গেলেন, পরদিন সকালে ফিরে এসে আবার দেখতে লাগলেন। তুলোট কাগজে লেখা কিতাব রুজারের একটি কপি ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের একটি বিরল সংস্করণ তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করল। কিন্তু তাঁর পূর্বসূরীর লেখায় যে এগারোটি প্রাচীন পুথিগুলির উল্লেখ ছিল, সেগুলি দেখতে পেলেন না।
দ্বিতীয় দিন বিকেলের আলো ফুরোনোর আগে মুনশির মারফৎ একটি প্রস্তাব দিলেন আরুন্ডেল: আদিরামবাটির বিরল পুথির সংগ্রহ উপযুক্ত অর্থমূল্যে এশিয়াটিক সোসাইটির জন্য তিনি কিনে নিতে চান। প্রাচীন ভঙ্গুর পুথিপত্র সংরক্ষণের জন্য পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে একটি বিশেষ ধরনের ভল্ট তৈরি হয়েছে, সেখানে পুথিগুলি উই ঘুন সিলভারফিশ জাতীয় কীট ও আর্দ্রতাজনিত ক্ষয়ের প্রকোপ থেকে রক্ষিত থাকবে। আদিরামবাটির পরিবারের লোকজন বংশ পরম্পরায় কলকাতায় সোসাইটির গ্রন্থাগারে এসে সেগুলি অবাধে ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
রাজারাম প্রস্তাবটি মন দিয়ে শুনলেন। মুনশিকে বললেন ‘সাহেবকে বলো পুথিগুলি অমূল্য গর্বের ধন, কিন্তু এই বাড়িতে সবকিছুর চেয়েও আরাধ্য ধন হলো আদিরামের মন্দির। উনি এতদূরে এসে একবার চাক্ষুষ করবেন না?’
আরুন্ডেল সাগ্রহে রাজী। পেগানরা সচরাচর বিধর্মীদের দেবস্থান দেখতে দেয় না, আর এ তো স্বয়ং গৃহকর্তা আহ্বান করছেন। সুবর্ণ সুযোগ! আর্দালি এসে সাহেবের পায়ের জুতো খুলল, রাজারান ওঁকে নিয়ে ছয় ধাপ সিঁড়ি ভেঙে পরিক্রমা পথে উঠে দেয়ালে উৎকীর্ণ চিত্রমালার বিবরণ দিতে লাগলেন।
মুনশি যতদূর পারে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে লাগল এই মৎস্যভূমির জন্মকথা, গঙ্গার মর্ত্যে অবতরণ, কনৌজের সাত রাজপুত্রের ত্রিবেণীতে আগমন, দরপ খান ও তাঁর পঞ্চদশ অশ্বারোহী, সাতগাঁর পণ্ডিত ও তুর্কী শাসকের সাক্ষাৎ, বাঙালি বণিকদের মকরমুখী বাণিজ্যতরীর বহর, লাটিন পালের আরবী ঢাও, নদীপারে সারি সারি চরকায় বসে সুতাকাটুনির দল, ফলন্ত আমের বনে বানরের পাল, স্নানার্থীর পা কামড়ে ধরেছে কামট, নৌকাবোঝাই করে চলেছে কালীক্ষেত্রের তীর্থযাত্রীরা, ত্রিকোণ টুপি পরা ফিরিঙ্গির ঠোঁটে হুঁকোর নল, পায়ে শেকল বাঁধা ক্রীতদাসের সারি নদীগর্ভে মাটি কাটছে, শিখাধারী গুরুর সামনে বসে অধ্যয়ন করছে বিদ্যার্থীর দল, মোগল নৌবহর কামান দাগছে ফিরিঙ্গিদের গড়ে…
দেখতে দেখতে নিবিষ্ট সাহেব হাত তুলে মুনশিকে থামালেন। ‘দৃশ্যই কথা বলছে। ধারাবিবরণীর দরকার নেই।’
রাজারামও চুপ করে গেলেন। দক্ষিণের দেয়াল থেকে পরিক্রমা শুরু করে পশ্চিম ও উত্তর দেয়ালে সূক্ষ্ম নিবিড় কারুকাজ দেখতে দেখতে পূর্ব দেয়ালে এসে থামলেন ওঁরা। বিধ্বস্ত ফাটলে আকীর্ণ মূক দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে টমাস আরুন্ডেল অস্ফুটে বলে উঠলেন–
‘কেন্ এতৎ কৃতম্?’
‘তব দেশবাসী,’ রাজারাম শাস্ত গলায় বললেন। ‘রবার্ট ক্লাইভ তস্য নাম।’ সাহেব আর পুথি সংগ্রহের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন না। মন্দির দর্শন সেরে বিদায় নিলেন। আর্দালি পায়ে জুতো পরিয়ে দিল, তিনি সেদান চেয়ারে উঠে নদীর ঘাটে চলে গেলেন।
বিশদাঁড়ির বজরা ভাটার স্রোতে উত্তুরে হাওয়ায় পাল তুলে তরতর করে ভাটির দিকে চলে যাবার পর সমাজের মাথারা খবর নিতে এল আদিরামবাটিতে।
‘এ যাবৎ যত রকমের দস্যু লুটেরা এই দেশে এসেছে, বর্গি ঘোড়সওয়ার আর মগ হার্মাদদের কথা স্মরণে রেখেই বলছি, এই ইংরেজগুলো সবার চেয়ে নিকৃষ্ট!’ রাজারাম ওঁদের বললেন। ‘যা কিছু মূল্যবান বস্তু ওরা লুটপাট করে নিজের দেশে নিয়ে যেতে পারে না, সেসবের সংগ্রহশালা বানিয়ে রাখে আর তাই নিয়ে সন্দৰ্ভ লেখে। সেদিন আর খুব বেশি দূরে নেই যখন ওরা এ দেশের মানুষ মেরে কেটে তার ওপরে সন্দর্ভ লিখবে!’
রাজারামের এই ভবিষ্যৎবাণী আশ্চর্যজনকভাবে ফলে গেল। কিছুকালের মধ্যেই কলকাতার মেডিকেল কলেজে ঔপনিবেশিক দুর্ভিক্ষে মৃত একটি শবের ব্যবচ্ছেদ করা হলো, এশিয়া মহাদেশে সেই প্রথম। কাজটি করলেন পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত নামে একজন বাঙালি কবিরাজ। বেশ কিছুকাল পরে এশিয়াটিক সোসাইটি এই বিষয়ে সংস্কৃতে লেখা একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। সেটি অবশ্য রাজারাম দেখে যেতে পারেননি। ততদিনে তিনি লক্ষণাকে নিয়ে পরলোকবাসী হয়েছেন।
*
কোলব্রুকের জন্য বাগানের ধারে যে ছাউনিটি বানানো হয়েছিল, সেটি আর খুলে ফেলা হয়নি। বহুকাল রোদ-জল-ঝড় সয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাজারাম সার্বভৌমের মধ্যম পুত্র গঙ্গারাম আয়ুর্বেদশাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠার পর সেটি মেরামত করে নিয়ে ওখানে বসে রোগী দেখবেন। পসার বৃদ্ধি পেলে ওই খড়-দরমা খুলে ওখানেই ইটের পাকা কোঠা তুলে চেম্বার ও ফার্মেসি করবেন।
সাহেবের উপহার দক্ষিণের বারান্দায় পড়ে ছিল। কিছুদিন সেটি চলে, থেকে থেকেই গির্জার মতো ঘন্টাধ্বনিতে বাড়ির মানুষজন বেড়াল গরু এবং এমনকি দেবতারাও চমকিত হতে থাকেন। তারপর একদিন ঘড়ির দম ফুরিয়ে থেমে গেলে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। আদিরামবাটিতে যান্ত্রিক ঘড়ি-বাঁধা সময়ের প্রয়োজন কারোর নেই। গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটি দাঁড়িয়েছিল বছরের পর বছর, ধুলো আর মাকড়শার জালে আকীর্ণ। একবার কালবৈশাখির ঝড়ে পড়ে গিয়ে সামনের কাচ ভেঙে যায়, আরেকবার পেন্ডুলামের দরজাটি খুলে নিয়ে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার হয়। বসন্তের শুরুতে চটকপাখিরা ডায়ালের পেছনে বাসা বাঁধতে থাকে। একবার বাড়ির এক বেড়াল ধুলোর প্রমাতামহস্য প্রমাতামহী সেই পাখির ছানা শিকার করতে গেলে গিয়ারবক্সে আটকে যায়। প্রবল ঘন্টাধ্বনি আর রক্তারক্তি কান্ডের ভেতর থেকে তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
অনেক বছর পরে পাগলরাম যেদিন জে বি জয়েস কোম্পানির ঘড়িটি সম্পূর্ণ খুলে ফেলে তার ২৮৬টি ছোটো বড়ো যন্ত্রাংশ আলাদা করল, তখনও ভেতরে পাখির পালক, কাঠিকুটি আর বেড়ালের লোম ছিল। ইস্পাতের পেঁচানো স্প্রিংটা মরচে ধরে জুড়ে গিয়ে চাকতির মতো হয়েছিল। উনুনের ছাই আর রেড়ির তেল দিয়ে পাগলরাম সেটি আগের রূপে ফিরিয়ে আনল। ছোটো বড়ো গিয়ারের চাকা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে ফের সেগুলোকে নিখুঁত সংস্থাপনের কাজে নাওয়া খাওয়া ভুলে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত যেন এক উজ্জ্বল ধ্যানের ভেতর সমাধিস্থ হল। রোজ বিকেলের পর ডোঙা শর্মার টোল থেকে বাড়িতে ফিরে ছোটো ভাইকে ওই অবস্থায় দেখে গঙ্গারামের মনে সন্দেহ খচখচ করত খেলনা ভেঙে ফেলার মতো এও পাগলরামের এক নতুন মনোবিকার নয়তো?
রেভারেন্ড বিলের বাসায় যেতে শুরু করার পর থেকে তুতলে দুটি-চারটি করে কথা বলতে শুরু করেছে পাগলরাম। আলস্যে ভরা এক শীতের নিজঝুম দিনে দিনটা ছিল বাইশে নভেম্বর যখন উঠোনে নিমগাছে একটিও পাতা নড়ছে না, নাগকেশর গাছে ঘুঘু ডাকছে, সবাইকে হতচকিত করে গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা ঢং ঢং করে তিনবার বেজে উঠল। পেন্ডুলাম দুলিয়ে টিকটিক করে ফের চলতে শুরু হল ঘড়িটা।
‘কী করে পারলি?’ গঙ্গারাম উচ্ছ্বসিত হয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরেছিল। ‘তুই তো ঘড়ির কলকব্জা মেরামতের কাজ শিখিসনি কোথাও!’
‘ও কি-কি-কিচ্ছু না!’ পাগলরাম বলল,— ‘ছা-ছা-ছাআআপাখানায় টা-টা- টাইইপ গাঁথার থ্-থেকেও স্-সোজা!’
দিনের পর দিন মিশন হাউসের একতলার ছাপাখানায় কম্পোজিটারকে পায়রার খোপের মতো বাক্সের সামনে বসে পেতলের ট্রেতে সীসের টাইপ গাঁথতে দেখেছে সে। মুদ্রণের লিপির ভাষা তাকে ঘড়ির যান্ত্রিক বলের ভাষা বুঝতে সাহায্য করেছে। পাগলরামের এই নবলব্ধ দক্ষতা দ্রুত লোকমুখে চাউর হয়ে গেল— ন্যায়শাস্ত্রের জটিল সূত্র টিকা নির্ণয়ের জন্য খ্যাত আদিরামবাটিতে এক দক্ষ ঘড়ির মিস্ত্রির আবির্ভাব ঘটেছে।
ইতিমধ্যে সনাতন বিদ্যাচর্চায় নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমেছে। সাতগাঁয় অনেকেই ফিরিঙ্গিডাঙায় আপিসে আদালতে, এমনকি চিনিকলেও কেরানি মুহুরির কাজ নিয়েছে। বেশ কয়েকটি বাড়িতে ঘড়ি এসেছে। তারা সেইসব অচল ঘড়ি, আর্দ্র আবহাওয়ার প্রভাবে দ্রুতগতি অথবা ধীরগতি, সারাইয়ের জন্য নিয়ে আসতে লাগল। পাগলরামও বিভিন্ন কোম্পানির নানান আকারের ও নকশার ঘড়ি, তার কিছু কিছু স্বতন্ত্র কলকব্জা ও গঠনতন্ত্রের অভিনবত্ব পরখ করে দেখার আগ্রহ থেকেই বিনা পারিশ্রমিকে মেরামত করে দিতে লাগল।
রামানুজ আপত্তি ব্যক্ত করল।–‘কলকব্জা নিয়ে কাজ ব্রাহ্মণের নয়! এ বাড়িতে সরস্বতীর অধিষ্ঠান, বিশ্বকর্মার নয়!’
কিন্তু গঙ্গারামের পূর্ণ সমর্থন ছিল। অগ্রজ হিসেবে রামানুজ আদিরামবাটির কর্তা হলেও গঙ্গারামের সঙ্গে সে কোনোরকম বিতর্কে জড়ায় না, বিশেষত একদিন ডোঙা শর্মার কাছে কাব্য পড়তে যাওয়াকে কেন্দ্র করে বচসার পর।
পাগলরামের দক্ষতার বড়োসড়ো স্বীকৃতি এল। কোয়ার্সভিলের প্রশাসনিক দপ্তর থেকে বার্তাবাহক এসে জানালো, গির্জার সামনে ঘড়িঘরের বিখ্যাত ঘড়িটি আগেরদিন বিকেল থেকে হঠাৎ বিকল হয়ে পড়েছে। যেহেতু ওই ঘড়ি অনুযায়ী শহরের অন্যান্য ঘড়িগুলো মেলানো হয়, অফিস কাছারি যানবাহনের সময় নির্ণয় হয়, শহরে বিচিত্র অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ঘড়িঘরের ওই বিশেষ ঘড়ি মেরামত করতে পারে যে দুই মিস্ত্রি, তারা থাকে কলকাতায়। তাদের ডাকিয়ে আনতে জোয়ারভাটার কারণে গোটা দিন লেগে যাবে। তার আগে নগরপালের সনির্বন্ধ অনুরোধে পাগলরাম চক্রবর্তী কি একবার এসে দেখতে পারেন?
ঘড়িঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে প্রায়ান্ধকার মেঝের ওপর রক্তের ফোঁটা পড়ে থাকতে দেখে পাগলরামের মনে সন্দেহ হলো। সরু মিনারের ভেতর লোহার মই বেয়ে উঠে দুটি বড়ো ট্রান্সমিশনের হুইলের মাঝে প্রায় অগোচরে পাওয়া গেল সন্দেহের কারণটা একটি প্রমাণ সাইজের ভামবেড়াল, তার মুখে ধরা একটি পায়রা, দুজনেই চাকার দাঁতের ফাঁকে পিষ্ট হয়ে মরে আছে। ভামবেড়ালের দেহটা কেটে কেটে বের করে চাকা পরিষ্কার করতে ঘড়ি ফের চালু হলো। বিশাল ঘানির আকারের কলকব্জাগুলো সচল হয়ে উঠতে দেখে, মুঠির মাপের ছোটো ঘড়ির সেই এক যান্ত্রিক বলের সূত্রের বিবর্ধন দেখে তরুণ পাগলরামের মনে যে সম্ভ্রম আর উত্তেজনা সৃষ্টি হলো, ঠিক সেই একরকম অনুভূতি হয়েছিল বহুকাল আগে রুয়ানো ডে ইনফান্টের, যেদিন তিনি নদীর জটিল গতিপ্রকৃতির মধ্যে মানব দেহতন্ত্রের প্রতিরূপ আবিষ্কার করেন।
এই দিনের পর থেকে কোয়ার্সভিলের ফিরিঙ্গি নেটিভ নির্বিশেষে, ভিল হুঁশে ও ভিল নুয়ার বাসিন্দারা, যেকোনো ধরনের ঘড়ি বিকল হলেই সাতগাঁর এই ব্রাহ্মণের শরণাপন্ন হতে লাগল ওর চেয়ে ভালো মিস্ত্রি কলকাতায় পাওয়া যায় না এমনটা নয়, সে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে দেয় সে জন্যেও নয়, এক যৌথ স্বাভিমান থেকে, কলকাতা ও ইংরেজদের প্রতি সাবেক জাতক্রোধ থেকে কিছুদিনের মধেই পাগলরাম ঘড়ি মেরামতের জন্য বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি উপহার পেয়ে সুসজ্জিত হয়ে উঠল। বাগানের ধারে দরমার ঘরটার একদিকে ভাইয়ের জন্য ওয়ার্কশপ বানিয়ে দিল গঙ্গারাম।
এক ভাদ্রের দুপুরে কোয়ার্সভিল থেকে এক্কায় চেপে এল এক ফিরিঙ্গি যুবক। তাল-পাকা গরমেও তার পরনে ধুসর টেল কোট, ঘি রঙের ট্যুইলের ট্রাউজার্স, মেরুন ভেলভেটের ওয়েস্টকোটের ওপর রেশমি সুতোর নক্সা করা— সব মিলিয়ে অত্যন্ত ফ্যাশনদুরস্ত পোশাক। তার মাথায় টুপির নীচে সোনালি চুল নেমেছে কপালে, গলার কাছে ফ্যাকাসে সাদা চামড়ায় ঘামাচির মতো চাকা চাকা লাল দাগ, টিকালো নাক, সবজেটে চোখে অকাল বিষণ্ণতা। সরু ঠোঁট যেন এক বিচিত্র শ্লেষে সদা বঙ্কিম হয়ে আছে।
সাহেব এসেছে একটি বিকল পকেট ঘড়ি নিয়ে। ঝিনুকের আকারের দামি রুপোর ঘড়িটি ব্রেগ্যে কোম্পানির, তার ঢাকনার ওপরে সোনার জলে লেখা হয়েছে যুবকের নাম: Charles Lairebaude। এদেশে সে বেশ কিছুকাল হলো এসেছে, কিন্তু এখনও স্থানীয় ভাষা পুরোপুরি রপ্ত হয়নি, কিন্তু এই অঞ্চলের সেরা ঘড়ি সারাইয়ের কারিগরের কথা সে জেনেছে কোয়ার্সভিলের ট্যাভার্নে। জাহাজে ভারতে আসার সময় ঘড়িটি বন্ধ হয়ে যায়, যুবক জানায়। সম্ভবত এ দেশের প্রখর গ্রীষ্মের তাপে ভেতরের চাকাগুলি গলে গিয়েছে।
পাগলরাম সন্না ও সরু স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে ঝিনুকের ঢাকনা খুলে চোখে আই- পিস লাগাতেই ধরতে পারল সমস্যাটা এসকেপ হুইলটি কোনো কারণে, সম্ভবত সমুদ্রের নোনা হাওয়ার প্রভাবে, আটকে গিয়েছে। সেটিকে নড়াতেই কলকব্জা ফের চালু হয়ে গেল, ঘড়িতে প্রাণ ফিরে এল।
সাহেব হাততালি দিয়ে শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে বার বার বলতে থাকে— ‘মেসি! ম্যেসি! ম্যেসি ব্যকু!’
কিন্তু যখন পাগলরাম দম দেবার পর দক্ষিণের বারান্দায় গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের সঙ্গে সময় মেলাতে কাঁটা ঘোরাতে থাকে, যুবক হাত মুখ নেড়ে ভাঙা ভাঙা বাংলায় এক বিচিত্র অনুরোধ করে, যার সারমর্ম বুঝে উঠতে পাগলরামের বেশ কিছুক্ষণ লাগে।
সাহেব চায় ঘড়িটিতে সময় যেন সাড়ে তিন ঘন্টা পিছিয়ে রাখা হয়।
‘কি-কিন্তু কেন?’ পাগলরাম অবাক হয়।
যুবক উত্তর দেয় না। ওর তীর্যক ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফোটে। ঘড়িটি কোটের বুক পকেটে রেখে আলতো চাপড় মেরে ভেতর পকেট থেকে একটি বেগুনি ভেলভেটের বটুয়া বের করে, কত পারিশ্রমিক দিতে হবে জানতে চায়।
‘কিইইছু দিতে হবে না,’ পাগলরাম মাথা নেড়ে বলে। ‘সামান্য একটা এসকেপ হুইল ঘু-ঘুরিয়ে দেবার জন্য আমি কোনো পা-পারিশ্রমিক নিইনা, ঘড়িতে সা-সাড়ে তিন ঘন্টা সময় পিছিয়ে দেবার জন্যেও কিছু নিইনা।’
‘সাড়ে তিন ঘন্টা সময় পিছাইবার কারণ…একদিন তোমায় আমি বলিবে।’ যুবকটি ঠোঁট প্রসারিত করে মিষ্টি হেসে দুহাত জড়ো করে নমস্কারের ভঙ্গি করে। ‘আবার দেখা হবে। আমার নাম শার্ল, শার্ল লেবো।’
