সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১২.৫
১২.৫
দিদার পারলৌকিক কাজের সময় সেবার তিতলির মধ্যে ওর চিরচেনা শুঁয়োপোকাকে খুঁজেছিল বাপ্পা। খুঁজে পায়নি। দার্জিলিং থেকে তিতলি ফিরে আসার পর ওর মধ্যে সেবার দিদার কাজের সময়ে দেখা সেই তিতলিকে খুঁজল বাপ্পা। খুঁজে পেল না।
তিতলিও কি পেল?
‘তোর গলার সেই দাগটা এখনও আছে রে বাপ্পাদাদা?’
বাপ্পা হঠাৎ লজ্জা পেয়ে যায়, উত্তর দিতে পারে না। দাগটা মিলিয়ে গিয়েছে, ওর ত্বক মোটা হয়েছে, দেহের বিভিন্ন স্থানে রোম গজিয়েছে, গলার স্বর ভেঙেছে। ওর পাশে তিতলি কত উজ্জ্বল, সাবলীল, ওর শ্যাম্পু করা চুলে দার্জিলিঙের সুগন্ধ।
দাদু কাশীতে যাবার আগে তিতলি দেখা করতে এসেছে, কিন্তু সারাক্ষণ ওকে ঘিরে রইল ইস্কুলের পুরোনো বন্ধুরা। বাপ্পা ওকে একান্তে পায় না। ওদের মধ্যে তিতলির পুরোনো শত্রু ভার্শা চৌহানও এসেছে; হাল ফ্যাশনের ট্রাউজার্স পরে এসেছে, নীচের দিকটা ঘন্টার মতো ছড়ানো। সকলেই সুসজ্জিত, কনভেন্ট স্কুলের কড়া নিয়মের চৌহদ্দির বাইরে এসে শোধ তুলছে চটকদার সাজে। ওরা বাপ্পার দিকে আড়ে আড়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নেলপালিশে সজ্জিত আঙুল ঠোঁটের সামনে আড়াল করে ফিসফিস করে কথা বলে, মাথায় ফোলানো ব্লান্ট-কাট বব-কাট মাশরুম-কাট চুল ঝাঁকিয়ে ষড়যন্ত্রের হাসি হেসে ওঠে। তিতলিকে চোখের ইশারা করে বিচিত্র দুর্বোধ্য বুলিতে কথা বলে।
‘এট্টাটা তোট্টর সেট্টই কাট্টাজিট্রিন্টা নাট্টাটা?’
‘গোঁট্রোফ উঠছেট্টে তোট্টো!’
‘কিট্রিস দিটিতে পাট্টারেটে?’
‘ফ্রেট্রেঞ্চ কিটিস?’
পরস্পরের গায়ে চাঁটি মেরে হেসে গড়িয়ে পড়ে ওরা। চমকে উঠে বাপ্পা বুঝতে পারে ওকে নিয়ে কথা হচ্ছে, হঠাৎ মনে পড়ে ওর পোশাক দেহের অনুপাতে ছোটো হয়ে এসেছে, পা দুটো লম্বা হয়ে হাঁটুর নীচে লোম দেখা যাচ্ছে। মা মারা যাবার পর আর ফুল প্যান্ট কেনা হয়নি। বুঝতে পারে, ওরা বাংলাতেই কথা বলছে দুয়েকটা ইংরিজি আর ফরাসী শব্দবন্ধ মিশিয়ে, আর প্রতিটি শব্দের ফাঁকে একটি করে ব্যঞ্জনবর্ণ কিংবা যুক্তাক্ষর গুঁজে দিচ্ছে। এই শব্দের মাঝে ভিন্ন ধ্বনি গুঁজে দেবার খেলাটা ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে, পূর্বনির্দিষ্ট বোঝাপড়া থেকে নতুন নতুন ব্যঞ্জনবর্ণ আর যুক্তাক্ষর আমদানি হচ্ছে। এও বুঝতে পারে, ওদের কথাবার্তার অনেকটা জুড়ে আছে মানবদেহের রহস্যময় জগৎ।
মি’লেডি, টিফিনবেলায় পীযূষের ক্লাসে বাপ্পা যা শিখেছে, ততদিনে ওর থেকে বয়সে ছোটো হয়েও তিতলি ও তার সহপাঠীদের যৌনতা বিষয়ক জ্ঞান ঢের বেশি গভীর ও ঢের কম আজগুবি। ক্লুনির মঠের উঁচু পাঁচিলের ওধারে বহির্বিশ্বের বীজাণুমুক্তকারী ধূপের ধোঁয়া আর মালাবারের সন্ন্যাসিনীদের কড়া পাহারা সেটা আটকাতে পারেনি। তার কারণ মার্কুইস দে সাদ থেকে শুরু করে উনিশ শতকের বিভিন্ন ইউরোপীয় লেখকের যৌনতা বিষয়ক বই, যা ভারশা চৌহান চটকলের বাংলোয় ওর বাবার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি থেকে চুরি করে আনে। সেগুলো বিভিন্ন সত্তদের ছবি সংবলিত ইস্কুলের পুরোনো ক্যালেন্ডারে মলাট দিয়ে ক্লাসে মেয়েদের হাতে হাতে ঘোরে, এবং স্কুল ব্যাগে করে বাড়িতে পড়ার টেবিলে চলে যায়। ফরাসীতে লেখা বই প্রায় কারোর বাড়িতেই অন্যেরা বুঝতে পারে না। ফলে ভেতরে রেখাচিত্র না থাকলে প্রকাশ্যে সকলের সামনে পড়া যায়। সেই ব্যাপারটাও একটা অন্যরকম মাদক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। উনিশ শতকের ফরাসী ঠাসবুনোট গদ্যে লেখা বই, পড়তে গিয়ে প্রায়শই ব্যাকুল হয়ে অভিধানের সাহায্য নেয়, যাতে মানব দেহে বন্দি সুখের স্বর্গ, তাদের প্রতিটি প্রবেশ পথের খুঁটিনাটি মানচিত্র ও ফটক খোলার জাদু বোতাম ও জাদু দন্ড বিষয়ে কোনো কিছু বাদ না পড়ে যায়।
এই সাহিত্যিক জ্ঞানার্জনের ব্যাবহারিক প্রয়োগের মূর্ত উৎস কারোর কারোর নাগালের মধ্যেই আছে। পন্ডিচেরি ও কোয়ার্সভিল দুই জায়গাতেই কনভেন্টের অদূরে রয়েছে জেসুইট পরিচালিত ছেলেদের ইস্কুল। সেখানে ক্ষয়িষ্ণু বানিয়ান পরিবারের শেষ প্রজন্ম আর চটকলের ম্যানেজারের ছেলেরা পড়তে আসে। স্কুলগুলোয় ছুটি হয় প্রায় কাছাকাছি সময়ে, এবং করমন্ডলের সাগরবেলা থেকে হুগলির পাড় বরাবর বঙ্গোপসাগরের ঢেউ ঢেউয়ে নবজাগ্রত হরমোনের জোয়ারে বান ডাকে। ওদের মধ্যে যারা প্রকৃতই বেপরোয়া, বালুতটে জেলেদের নৌকার আড়ালে, নির্জন তালপাতার ছাউনিতে, কিংবা হুগলির ধারে দুশো বছর আগে ক্লাইভের কামানের গোলায় বিধ্বস্ত কেল্লার ধ্বংসাবশেষে যোগসাজস করে এসে মিলিত হয়। স্থানভেদে মাছের আঁশটে কিংবা চামচিকের চিমসানো গন্ধের ছায়ায়, চাতক পাখির ওড়াউড়ির ভেতর প্রলম্বিত হতে থাকে জীবনের ইস্কুলের ক্লাস, নিষিদ্ধ বইয়ে মোলাকাৎ হওয়া fellation ও levres inférieures এর মতো শব্দগুলির ব্যাবহারিক প্রয়োগ ও উপযোগিতা, মি’লেডি।
.
বাপ্পার জন্য দার্জিলিং থেকে ইয়াকের দুধের ছুরপি আর ফ্লিক স্টিকার উপহার এনেছে তিতলি। একটি সবজেটে কোলা ব্যাঙের ছবি, স্টিকারটা সামান্য বাঁকিয়ে ধরলেই রূপ বদলে সোনালি চুলের অপরূপ রাজপুত্র। তিতলিকে দেবার মতো কিছু নেই বাপ্পার কাছে। কিন্তু এবার সাতগাঁয় আসার পর হেমন্তমামা ওকে দুটো বই দিয়েছে। বাংলায় অনুবাদ করা রাশিয়ান গল্পের বই, পাতায় পাতায় ছবি আঁকা।
বাপ্পা বইদুটো তিতলির হাতে দেয়।
‘মনে আছে তুই একবার তোলাঘরে সিন্দুকের ভেতর বই নিয়ে লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলিস? সারা বাড়ি খুঁজেও তোকে পাওয়া যায়নি?’
‘মনে আছে,’ তিতলি পাতা উলটোতে উলটোতে হেসে ওঠে। ‘হাইডি আর লিটল প্রিন্স। কিন্তু ওগুলো তো ফেয়ারি টেল্স।’
‘এই দুটোও তো তাই।’
‘না, এইরকম গল্পকে বলে সায়েন্স ফিকশন।’ তিতলি বাপ্পার হাতে বই দুটো ফিরিয়ে দেয়। —’তুই কি এখনও ফেয়ারি টেলস পড়তে ভালোবাসিস, বাপ্পাদাদা? তাহলে তোর এই স্টিকারটা ভালো লাগবে।’
একটি বইয়ে সৌরমন্ডলের বাইরে টোপাস নামে একটা গ্রহের গল্প বাপ্পা পড়েছে। টোপাস গ্রহে সবাই যৌথ খামারে বাস করে, আর নদীগুলো বাড়ির উঠোনের সামনে দিয়ে বয়ে যায়, ছোটো ছেলেমেয়েরা রকেটে চড়ে ইস্কুলে যায় আর মাঠে চাষ করে রোবটের দল।
‘তুই নিয়ে যাবি? নিয়ে যা না। আমার পড়া হয়ে গিয়েছে।’ বাপ্পা বলে।
‘না, হিমুকাকু তোকে দিয়েছে, তোর কাছেই থাক।’
সায়েন্স ফিকশন আর ফেয়ারি টেসের তফাৎ কী তিতলিকে জিজ্ঞেস করা হয় না। তার আগেই সে হস্টেলে ফিরে যায়। সুস্নাত হয়তো বলতে পারবে। এইরকম গল্প বলে বড়োলোকরা চিরকাল গরীবদের ঠকায়, সুস্নাত বলেছে। কিন্তু বাবা যে বলেছে রাশিয়ায় আর কোনো বড়োলোক নেই?
