Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১০.১

১০.১

গামা হারিয়ে যাবার পর গঙ্গাজল আনা, ফাইফরমাশ খাটার জন্য নিবারণ নামে এক ভারীকে বহাল করা হয়েছিল। এক বিকেলে বাগানে ইঁদারার মুখে গরাদ সরিয়ে বাগানে ফুলগাছে জল দিয়ে বন্ধ করতে ভুলে গেল নিবারণ। সন্ধ্যাবেলা ইঁদারায় পড়ে গেল চিন্তামণি। পরদিন দুপুরের পর দমকলের কর্মীরা ওর ফুলে-ওঠা দেহটা দড়ি দিয়ে টেনে তুললে দেখা গেল চিন্তামণির চোখের কোটর শূন্য, মণিদুটো নেই। দেখে মনে হবে মাছে ঠুকরে খেয়েছে, যদিও বাগানের ইঁদারায় কেউ কোনোকালে মাছ দেখেনি।

গামা অদৃশ্য হতে চিন্তামণি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিল। জরাগ্রস্থ হয়েছিল, হয়তো চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে এসেছিল। ওকে গোয়ালের বাইরে ছেড়ে রাখা হতো। সারাদিন বাগানের আশেপাশে, বাড়ির পেছনে আমবনে, শিয়ালকাঁটা ঝোপের ধারে দেখা যেত চিন্তামণিকে। জ্যোৎস্না রাতে কখনো কখনো ভেতর উঠোনে বাঁধানো ইটে শোনা যেত চিন্তামণির খুরের শব্দ।

বাড়িটা ক্রমশ নির্জন হয়ে পড়েছিল। মশাইয়ের মৃত্যুর পর এতকালের টোল উঠে গেল। ছজন আবাসিক বিদ্যার্থী ছিল, তারা যে-যার গ্রামে ফিরে গেল।

.

তিতলির হাঁপানি ধরা পড়ল।

শিশু বয়স থেকে সিঁড়ির অন্ধকার কোণে, পালঙ্কের নীচে, কুলুঙ্গিতে, তোলাঘরের সিন্দুকের ভেতর লুকোনোর অদম্য আকর্ষণ ছিল যার, একদিন তার ফুসফুস বিদ্রোহ করল, আচমকা পৃথিবীটা বায়ুশূন্য মনে হয়ে উঠল। রাত্রিবেলা টান উঠলে তিতলি মশারির বাইরে এসে জানলা খুলে গরাদ ধরে বসে থাকে, মুখটা বাইরের দিকে ঝুঁকিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস নেয়। ওর পিঠটা হাপরের মতো ওঠা-নামা করতে দেখে মনে হয় যেন পাঁজরের খাঁচায় বন্দি কেউ বুক ফাটিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। হঠাৎ হঠাৎ শুরু হয়, কয়েক মিনিট চলার পর সম্পূর্ণ কেটেও যায়। অন্যসময়ে সে সুস্থ স্বাভাবিক, কোনোরকম উপসর্গ নেই।

‘মেয়েটা সারাদিন দস্যিপনা করে আদাড়ে পাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়,’ বামুনদিদা বলল। ‘অশুভ বাতাস লেগেছে গো।’

সরোজার ঘাটের সখী গঙ্গাজলেরা কেউ জলপড়ার নিদান দিল, কেউ দিল মাদুলি। বিশুর মনে পড়ল বনলতার কথা, তিতলি জন্মানোর আগে সে স্বপ্নে এসেছিল। মনে পড়ল মশাইয়ের মৃত্যুর আগে বলে যাওয়া সেই গোপন কাঁটার মতো রাত্রির কথা। দুধের শিশুকে মঠে গচ্ছিত রেখে নদীতে মরতে গিয়েছিল দিদিটা। মরার আগে দম বন্ধ হয়ে বুক ফেটেছিল।

রামপ্রাণ উপসর্গ পরীক্ষা করে রোগনির্ণয় করলেন।

‘তোমরা যাকে বল হাঁপানি, হ্যানিম্যান সাহেবের শাস্ত্র অনুযায়ী এ হলো এক তিন-মুখো অপদেবতার একটি মুখ।’

‘অন্য দুটো মুখ কী?’ সরোজা বললেন।

‘চর্মরোগ আর যৌনরোগ। কড়া অ্যালোপ্যাথি ওষুধ দিয়ে এদের মধ্যে একটিকে চাপা দিলে অন্য একটি ফুটে বেরোতে পারে।’

‘ওইটুকু মেয়ে, এ আবার কেমন কথা!’ সরোজা প্রতিবাদ করলেন।

‘যদি একই মানুষের দেহে নাও ঘটে তাহলে পরের কোনো জাতকের মধ্যে হতে পারে,’ রামপ্রাণ বললেন। ‘এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিবারে কিংবা ওর মায়ের দিকের পরিবারে আগের প্রজন্মে কারোর কি এর মধ্যে কোনো একটি রোগ ছিল?’

এই প্রশ্নের কে উত্তর দেবে? এই পরিবারের অতীত প্রজন্মের কথা যে দুজন মানুষ বলতে পারতেন, শাকম্ভরী ও তাঁর ভাই মশাই, তাঁরা কেউই আর ইহলোকে নেই। রামপ্রাণ নিজে কিছু স্মরণ করতে পারলেন না। তাঁর কাছে সাতগাঁর মৎস্যভূমির সাড়ে আটশো মানুষের রোগের খুঁটিনাটি তথ্য আছে, চেম্বারে নোট বইয়ের আকারে বর্ণানুক্রমিক সাজানো আছে। তার মধ্যে আদিরামবাটির কেউ নেই।

তিতলিকে আর্সেনিক অ্যালবাম-৩০ ছটি করে গুলি দিনে দু-বার জিভের নীচে রাখতে দিলেন রামপ্রাণ। বেগুন, মুসুরির ডাল, আটার রুটি থেকে শুরু করে ডিম, চিংড়ি, যেকোনো ধরনের সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া এবং চকোলেট ভক্ষণে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। তাতে টানের প্রকোপ কিছুটা কমল, কিন্তু ব্যাপারটা নতুনবউয়ের মনঃপুত হলো না।

‘ঠিক যে যে খাবারগুলো মেয়েটা খেতে ভালোবাসে সেগুলোই বাদ!’ স্বামীর কাছে একান্তে অনুযোগ করল সে। ‘মা হয়ে আমি এটা সইতে পারব না। এই চিকিচ্ছে পদ্ধতি চলবে না!’

‘এই পদ্ধতি মেনেই তো চলছে অধিকাংশ মানুষ,’ বসন্ত বলল।

‘সে যে মানে মানুক, হাতের তালুতে মেরে ওষুধের অণু-পরমাণু ভাঙেন আর গাছের সঙ্গে কথা বলেন যিনি, তেনার ওষুধে যে ভালো হচ্ছে হোক। আমার একটা মাত্র মেয়ে, ওর ওপর ওসব উদ্ভট পরীক্ষা আমি চালাতে দেব না।’

নতুনবউয়ের এক জাঠতুতো দিদি মিনেসোটায় থাকেন। তিনি জানালেন, অ্যালার্জি পরীক্ষার মাধ্যমে এক নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি ওদেশে সম্প্রতি চালু হয়েছে। আমেরিকায় নাকি প্রচুর মানুষ হাঁপানি রোগে আক্রান্ত হয়, বিশেষ করে বসন্তকালে যখন বাতাসে নানা ধরনের ফুলের পরাগ ভাসে। এই নতুন চিকিৎসায় অনেকেই সুফল পাচ্ছে। কিছুকাল আগে এক ভারতীয় চিকিৎসক প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে ক্লিনিক খুলেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল সেটি মাদ্রাজে, এবং জটিল পরীক্ষার মাধ্যমে বিশেষ অ্যালার্জি নির্ণয় করে চিকিৎসা শুরু করতেই ছয় থেকে আট সপ্তাহ লাগে।

‘আমি তিতলিকে ওই নতুন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে চাই,’ নতুনবউ সাফ ঘোষণা করল।

‘সেটা কীভাবে হবে?’ বসন্ত প্রতিবাদ করে। ‘বাবার অনুমতি ছাড়া এবাড়ির কেউ কখনো বাইরের ডাক্তার দেখায়নি।’

‘তাহলে অনুমতি নাও!

‘সেটা আমি এক্ষুনি পারব না। বাবার চিকিৎসায় আরও অন্তত কিছুদিন দেখা হোক।’

‘তাহলে চল আমরা কোয়ার্সভিলে গিয়ে উঠি। আর নয়তো আমি ছেলেমেয়ে নিয়ে কৃষ্ণনগরে চলে যাই।’

দুটোই অসম্ভব প্রস্তাব। নতুনবউয়ের বাবা মারা যাবার পর কৃষ্ণনগরের জীর্ণ বাড়িতে ছেলেমেয়ে নিয়ে গিয়ে থাকার হুমকিটা যে ফাপা, সেটা বসন্ত জানে। আর স্বাধীন রোজগার থাকলেও ওর পক্ষে বাস উঠিয়ে কয়েক মাইল দূরে গিয়ে থাকা সম্ভব নয়। তার অন্যতম কারণ হলো ছেলেবেলা থেকেই সে বাবার হাতের মুঠোয়, আক্ষরিক অর্থেই আন্ত্রিক স্তরে: ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিয়মিত বাবার ওষুধপথ্য ছাড়া বসন্তর দাস্ত অচল। সত্যি বলতে, ওর বৃহদান্ত্রে জন্মগত ফাঁসের সঙ্গে তিতলির হাঁপানি রোগের কোনো সম্পর্ক আছে কী না এই নিয়ে রামপ্রাণের মনে একটু খটকা ছিল।

*

অবশেষে সঙ্কটমুক্তির একটি রাস্তা খুঁজে বের হলো। সেই সময় ইসতিত্যুত দ্য ফঁস-এর পন্ডিচেরি শাখা তাদের কাজের পরিধি বিস্তার করছে। পুরোনো নথিপত্র সংরক্ষণের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ নেবার জন্য সেখানে ডেপুটেশনের আবেদন করল বসন্ত, সেটি মঞ্জুরও হলো।

সেই সময়ে সাতগাঁর তরুণ প্রজন্মের অনেকেই অন্যত্র চাকরি নিয়ে ভাগ্যের সন্ধানে চলে যাচ্ছে। তবে আদিরামবাটিতে ব্যাপারটা একটু ভিন্ন; এর আগে পাগলরামের ভিটে ছেড়ে যাওয়াটা সুখের হয়নি। তবু শেষ পর্যন্ত সরোজা ছেলের সিদ্ধান্ত সমর্থনই করলেন। সপরিবারে পন্ডিচেরিতে চলে গেল বসন্ত।

সপ্তাহে তিনদিন করে বাসে মাদ্রাজে গিয়ে সেই বিলেত-ফেরত ডাক্তারের ক্লিনিকে তিতলির পরীক্ষানিরীক্ষা চলতে লাগল। ছয় সপ্তাহ ধরে ছুঁচ ফোটানোর পর সর্বমোট ৩২টি অ্যালার্জিকারক দ্রব্য শনাক্ত হলো। তার মধ্যে তিতলির খাদ্যতালিকা থেকে রামপ্রাণের ছেঁটে দেওয়া সুখাদ্যগুলো তো ছিলই, আরও অতিরিক্ত কিছু যোগ হলো। ইতিমধ্যে করমন্ডলের নোনা সামুদ্রিক আবহাওয়ায় তিতলির স্বাস্থ্য ফিরেছে, হাঁপানির টান চলে গিয়েছে। সাতগাঁর যে বিখ্যাত হাওয়া দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষদের মৎস্যভূমিতে বেঁধেছিল, দেখা গেল ওর ক্ষেত্রে সেটি কার্যকর নয়। ডেপুটেশনের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করল বসন্ত, তিতলিকে পন্ডিচেরির সেক্রেড হার্ট কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করল।

এই সময়ে বাগানের ইঁদারায় পড়ে মারা যায় চিন্তামণি। পরদিন দমকলের লোকেরা এসে ওর ফোলা, চক্ষুবিহীন দেহটা তোলার পর ট্রাকে চাপিয়ে হুগলির খালপাড়ে বাদাবনের ভাগাড়ে নিয়ে গিয়ে সৎকার করা হয়।

বামুনদি বলল—‘চিন্তামণি সুসাইট করেছে!’

বিশুকা বলল—‘ইঁদারার পথে পাতালে গামাকে খুঁজতে গিয়েছে। দেহটা নিয়ে যেতে পারেনি, চোখদুটো শুধু গিয়েছে।’

*

অ্যান্টনির মৃত্যু ও অন্ত্যেষ্টির বিবরণ দিয়ে বাপ্পাকে চিঠি লিখেছিল তিতলি। এবারে তিতলি নেই, বাপ্পা সাতগাঁয় এসে সব জানল। গোয়ালঘরে চিন্তামণির নির্দিষ্ট জায়গাটা ফাঁকা দেখল। একপাশে হার্লে ডেভিডসন একা দাঁড়িয়ে আছে কালো ত্রিপলে ঢাকা, যেন শোক পালন করছে।

তিতলি-কানাই নেই, চিন্তামণি নেই, অ্যান্টনি নেই, নতুনবউয়ের ট্রাঞ্জিস্টারে অনুরোধের আসর নেই, টোলের বাড়িতে পোড়োদের মুগ্ধবোধ মুখস্তের ধ্বনি নেই। এক বিচিত্র নৈঃশব্দ্যের ভেতরে বাপ্পা শোনে আদিরাম মন্দিরে ঘন্টাধ্বনি, মার্টিন্‌স লাইট রেলের হুইশিল, দক্ষিণের ঘরে ক্রিস্টাল রেডিওয় অশান্ত পূর্ব সীমান্তের খবর পড়ছেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। টিনের বাক্সে স্নো-পমেটম বেচতে আসা ফেরিওয়ালির ডাক, হিন্দুস্থানী ঘুঁটেওয়ালিদের ডাক, পেতল-কাঁসার বাসনওয়ালার ডাক, শিল-কাটাই-অলা আর কুয়োর কাটা-তোলাবে-গো-র ডাকগুলো ভর দুপুরে উঠোনে নিমের ছায়ায় গাঢ় হয়ে ওঠে। বারান্দায় গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের ঘন্টা আর বিশুকার উনত্রিশ দেবদেবীর আহার নিদ্রা জাগরণের ঘন্টাধ্বনি বাজে। তোলাঘরে অতিকায় শঙ্খের কুহরে কিট-কিট-কিট-কিট করে ডেকে চলে ঘুণপোকা, ডুগডুগিটার চামড়ায় লোম বাড়ে, চামরের চুল পাকতে থাকে হার্মাদি সিন্দুকের ভেতর।

ফার্মেসিতে রামপ্রাণের রোগী দেখা চলে যথা নিয়মে, কুয়োর ধার থেকে নিমের ছায়া সরে গেলে গামছা আর পটাশিয়াম পারমাঙ্গনেট মেশানো জলের বালতি নিয়ে সরোজার অপেক্ষাও চলে যথাপূর্বং। কিন্তু মিষ্টি প্লাসেবো গুলির টানে বাপ্পার আর চেম্বারে যাবার মতো বয়স নেই, তিতলি নেই, জড়িবুটির ঝুলি নিয়ে আলিসাহেবের আসা-যাওয়া নেই। ইদানীং নাকি বছরের বেশিরভাগ সময় তিনি হিমালয়ে কাটান।

এদিকে হেমন্ত ক্রমশ আরও ঘরকুনো হয়ে পড়েছে। সারাদিন ওই আলোবিহীন ঘরে থেকে থেকে গায়ের রং ফ্যাকাশে হয়েছে, দাড়ি রাখতে শুরু করেছে। পার্টি কমিউন ছেড়ে বাড়িতে ফিরে আসার পর যখন ফোটোগ্রাফির নেশায় মাতল, রামপ্রাণ একদিন সরোজাকে একান্তে বলেছিলেন—

‘সাতগাঁয়ে একটা ছবি তোলার দোকান নেই, লোকে ছবি তোলাতে সেই চাঁদেরডাঙায় যায়। ডকবাজারে এক পেশেন্টের বড়ো দোকানঘর ভাড়া নেওয়া আছে, ঘরটা ছেড়ে দেবে বলছিল। ওটা নিয়ে হিমুকে একটা স্টুডিও বানিয়ে দিলে কেমন হয়?’

‘তাহলে তোমায় রেডিও সারাইয়ের দোকানও করে দিতে হবে,’ সরোজা উত্তরে বলেছিলেন। ‘ঘড়ি সারাইয়ের দোকান, পাখা সারাইয়ের দোকানও দিতে হবে। আর কোন্ কোন্ কল সারাইয়ের দোকান যে দিতে হবে সে একমাত্র আদিরামই জানেন।’

বসন্ত ফোটোগ্রাফির সরঞ্জাম এনে দেবার পর ছবি ডেভেলপ ও প্রিন্ট করা ছাড়াও বিকল ক্যামেরা সারাইয়ের কাজ করতে শুরু করে হেমন্ত। এছাড়া ঘড়ি, রেডিও, টর্চ, পাখা, বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, এমনকি দম-দেওয়া জটিল বিলিতি খেলনাও সারাই করে। পাড়া-বেপাড়ার পরিচিত অপরিচিত যারা সেসব সারাতে নিয়ে আসে, তারা কেউ কেউ এজন্য ওকে পারিশ্রমিক দেয়। অনেকেই কিছু দেয় না। কেউ কেউ এমন সব পুরোনো বিরল মডেলের জিনিস নিয়ে আসে যার স্পেয়ার পার্টস হয়তো আর পাওয়াই যায় না। বিকল সামগ্রী ঘরের কোণে ডাই হয়ে পড়ে থাকে, ধুলো জমে। কখনো হেমন্ত তার মধ্যে থেকে কোনো যন্ত্রাংশ খুলে অন্য কোনো বিকল যন্ত্রে লাগিয়ে দেয়, এবং তারপর আগের সামগ্রীটির বিকল অংশের অনুরূপ কিছু পাওয়া গেলে সেটি বসিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করে খুলে নেওয়া যন্ত্রাংশের কপি আসার জন্য। এভাবে এক অনন্ত চক্র চলতে থাকে, ঘরের চারদিকে ক্রমশ বিকল বাতিল গিয়ার, ইস্ক্রুপ, ওয়াশার, পিন, সার্কিটবোর্ড, নব, ভাল্‌ব, আর্মেচার ও মোটরের পাহাড় জমে।

অনেকেই সারাই করতে দিয়ে আর কোনোদিন নিতে আসে না। আসবে না যে সেটা জেনেই হয়তো রেখে যায়, যেভাবে লোকে সরস্বতীর ঘাটে শীতলা কার্তিক শনি দেবতার মূর্তি রেখে যায়, গঙ্গাসাগরের মেলায় বয়স্কা আত্মীয়া রেখে হারিয়ে যায়। বহুকালের ব্যবহৃত বিকল গৃহসামগ্রী প্রবীণ আত্মীয়ের মতোই, মি’লেডি, তাকে না-যায় ফেলা না-যায় ঘরে তুলে রাখা।

দক্ষিণ ঘরের দেওয়ালে তাকগুলোয় কাশীবাসী বৃদ্ধ বৃদ্ধা আর পরলোকগতদের রাশি রাশি পোর্ট্রেট ডাই হয়। ফোটোগ্রাফির নেশাতেই ছবি তোলে হেমন্ত— মুখে ঘন বলিরেখার জ্যামিতি, চোখের তারায় ক্ষীয়মাণ আলোর রেশ ধরে রাখার বিশুদ্ধ নান্দনিক চ্যালেঞ্জ তাকে ক্যামেরা হাতে ঘর থেকে টেনে বের করে। যারা ছাপাই কাগজ আর রাসায়নিকের খরচ দেয় তাদের কপি করে দেয়, নয়তো নিজের কাছে জমিয়ে রাখে। শীতের মরশুমে ছবির ব্যক্তিরা কেউ কেউ ঝরে যায়— স্বদেশে, প্রবাসে। কিন্তু হেমন্ত কখনো মৃতের ছবি তোলে না, শত অনুরোধে কিংবা মোটা টাকার লোভ দেখালেও না।

*

খেলার সাথি নেই, বাড়িটা উদাস হয়ে পড়েছে, সরোজা নদীতে স্নানে যাবার সময় বাপ্পাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে লাগলেন। শীত পড়লে সরস্বতী শুকিয়ে গিয়ে বালির খাতে শীর্ণ ধারা হয়ে যায়। কিন্তু গ্রীষ্মে হিমালয়ের বরফ-গলা জলে পুষ্ট নদী, কাকচক্ষু, কাঠফাটা দুপুরেও আশ্চর্য ঠান্ডা তার জল। বাপ্পা সাঁতারটা শিখে ফেলল।

বহুকাল আগে, হেমন্ত যখন ছোটো, বিশু ঠাকুর ও তার স্যাঙাৎ শিবু ঠাকুর ইস্কুলে গরমের ছুটি পড়লেই পাড়ার ছোটোদের নিয়ে নদীতে সাঁতার শেখাতে যেত। একবার ভরা কোটালের বানে জ্ঞাতিবাড়ির এক ছেলে ডুবে যায়, তারপর থেকে ওরা আর কাউকে সাঁতার শেখাতে নিয়ে যায়নি। বছর দুই আগে—তখনও তিতলির হাঁপানির টান শুরু হয়নি—পিতৃপক্ষে তর্পণের সময়ে বসন্ত দিনকয়েক বাপ্পা আর তিতলিকে আঘাটার কাছে স্থির অগভীর জলে সাঁতার শেখানোর চেষ্টা করে। ওদের কোমরে গামছা বেঁধে দুজনকে দুহাতে পেছন থেকে ধরে জলের ওপর ভাসিয়ে দিয়ে চিৎকার করত— ‘অ্যালি! অ্যালি! অ্যালি!’ বাপ্পা আর তিতলি কুকুরছানার মতো মাথা তুলে চোখ বন্ধ করে মরীয়া হাত-পা ছুঁড়ত। তিন-চার দিনে প্রচুর নদীর জল পেটে যাওয়া ছাড়া কিছু লাভ হয়নি।

এবারে সরোজাই বাপ্পাকে সাঁতার শেখালেন। এবং যে অব্যর্থ উপায়ে যেকোনো প্রাকৃতিক বিদ্যা শেখানো যায়, শেখানো হয়ে এসেছে অতীত কাল থেকে, সেভাবেই শেখালেন অর্থাৎ, কিছুই শেখানোর চেষ্টা করলেন না। বাপ্পাকে ঘাটের তিনটি জলে-ডোবা সিঁড়ির চৌহদ্দিতে স্বাধীনভাবে থাকতে দিলেন, এদিকে নিজে বুকজলে দাঁড়িয়ে স্নানের সখী গঙ্গাজলেদের সাথে নিত্যকার জপতপ অবগাহন আর গল্পগুজবের সুরক্ষাবৃত্ত রচনা করলেন।

তিন নম্বর সিঁড়িতে কোমর-ডোবা জলে বাপ্পা শোনে দিদার সখীদের ছোটো ছোটো সুখদুঃখের বার্তা বিনিময় দুপুরে কী রান্না হলো, রাতে কী রান্না হবে, কোন নিরামিষ্যিতে কখন হিং দিতে হয়, কোন ব্যারামের কী পথ্যি, কার বাড়িতে কোন এসো-জন বসো -জন এল, গেল… এইসব।

বহুকাল পরে সেইসব দৃশ্যগুলো স্মৃতিতে ফুটে উঠলে বাপ্পার উপলব্ধি হবে: এইসব প্রবীণারা— যাঁদের কেউ কেউ বুক জলে দাঁড়িয়ে নদীকে সাক্ষী রেখে, পরস্পরের হাতে হাত রেখে আজন্ম বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ গঙ্গাজল হয়েছেন নিত্যকার তুচ্ছ খুঁটিনাটিতে ভরা জীবনকে এক বিচিত্র আলোর সুতোয় বুনে তুলতেন, প্রাত্যহিক ঘরকন্নার কাজগুলো জপমালার মতো আউড়ে যেতে যেতে সময়কে শ্লথগতি করে তুলতেন, নিরন্তর আত্মীয়স্বজনের বার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে লতায় পাতায় শিকড়ে জড়ানো এক বিপুল গোষ্ঠী-অরণ্যের মানচিত্র নির্মাণ করতেন। তাঁদের কথায় প্রবাদ প্রবচন বাগধারার ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই জড়িয়ে থাকত মমতা আর অসূয়া, দয়া আর লোভ, কিন্তু সেসব তখন বোঝার মতো বয়স বাপ্পার হয়নি। তাঁরা কথায় কথায় হাসতেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন, মাঝেমাঝেই একে অপরের হাতে হাতে ধরে ডুব দিয়ে উঠতেন। কেউ কেউ কিছু বেশি সময় অবগাহন করে ভুস করে উঠে জানাতেন—-

‘আমার বাছুরডোবার ননদের মেজবৌমার মেয়ে হয়েছে কাল রাতে! এইমাত্তর জানালো!’

‘কে? পোটোর বুঝি নাতনি হলো?’

‘ছেলের কোলে মেয়ে এল না?’

‘তা হোক, ঘরে নক্ষ্মী এল!’

সূর্যের আলোয় ওঁদের জলে-ভেজা মুখগুলো ঝিকমিক করত।

জলে-জলে এই বার্তা বিনিময়ের ক্ষমতা নিয়ে বাপ্পার বিস্ময় কোনোকালে ঘোচেনি। হেমন্তমামার গ্যালেনা ক্রিস্টাল সেটেও আশ্চর্য বিস্ময় ছিল, কিন্তু সেখানে যে কন্ঠস্বর শোনা যেত সেটি প্রায় নৈর্ব্যক্তিক। টেলিফোনে সংলাপের মতো কোনোরকম তার বা যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই দুটি মানুষ একই নদীর দুই বিচ্ছিন্ন ঘাটে ডুব দিয়ে কীভাবে কথা বলে সেটা দিদাকে জিজ্ঞেস করলে সরোজা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলতেন—

‘ও কিছু না, যে কেউ চেষ্টা করলেই পারে। এদেশের নদীনালা কত মানুষের কত কথায় সারাক্ষণ গমগম করছে। আসল কায়দাটা হলো সেসব শুনতে পারা নয়, যে কথাগুলো শুনতে চাওনা সেগুলো না শুনতে পারা। যার কথা শুনতে চাও, যাকে কিছু বলতে চাও, মনটাকে তার কথার সঙ্গে বাঁধা।’

তিন নম্বর সিঁড়িতে হাঁটু মুড়ে বসে বাপ্পা দুহাতের তর্জনি আর বুড়ো আঙুলে নাকের পাটা আর কান চেপে ধরে মাথাটা ধীরে ধীরে ডুবিয়ে দেয় জলের ভেতর, তারপর কান থেকে তর্জনি সরিয়ে নেয়। চোখের খোলা পাতায় সবজে-ধূসর আলো দোলে, কানে মৌচাকের মতো ভোঁ ভোঁ শব্দ হয়। কয়েক মুহূর্ত, তারপরেই বুক ফাটে, মাথা তুলে শ্বাস নেয় বাপ্পা। কিন্তু জলের ভেতরে ওই শব্দটা… অবিকল যেন হেমন্তমামার ক্রিস্টাল রেডিওয় ভেসে আসা স্ট্যাটিক! জীবিত মৃত মানুষের কন্ঠস্বর? বাপ্পা ভাবে। গ্যালেনা ক্রিস্টালের রেডিও বাতাসে অদৃশ্য চৌম্বক তরঙ্গকে মানুষের কন্ঠস্বরে বদলে নিতে পারে। আর বাপ্পা? বাপ্পা ফের জলের ভেতরে ডুব দেয়। জীবন্ত খলবলানো জল, জলের ভেতরে চোরা ঢেউ… গুনতে থাকে পাঁচ, দশ, পনেরো… ক্রমশ ফুসফুসে শ্বাস ধরে রাখা অনুশীলন করে।

পরপর কয়েকদিন ধ্বনিপ্রবাহের মধ্যে থেকে দুর্বোধ্য কোলাহলগুলো না শোনার অভ্যাস করতে করতে, একটিমাত্র স্বরে মন বাঁধার অভ্যাস করতে করতে, একদিন শুনতে পেল অতি ক্ষীণ ঝমঝম ঝমঝম ধ্বনি হুগলি খালের ওপর দিয়ে সোয়া আটটার বন্দর-হুগলি লোকাল যাচ্ছে! মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে পেল না, কিন্তু দিনের পর দিন হাঁটু মুড়ে বসে সামনে ঝুঁকে সম্পূর্ণ দেহটা জলে ডুবিয়ে মনটাকে তরল প্রবাহে মুক্ত করে গলতে দিয়ে একদিন সে জিভে অনুভব করল আলোর ধাতব স্বাদ। টের পেল, তার পা ঘাটের সিঁড়ি ছেড়েছে, মেরুদন্ডটা ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে ওপর দিকে, দেহটা হেটমুন্ড ঊর্ধ্বপদ হতে চাইছে যেন! তিন- চারদিন এভাবে অভ্যাস করার পর পিঠটা জলতলের ওপর ভেসে উঠতে বাপ্পা ঝিকিমিকি আলোয় ভরা আকাশে মাথা তুলে শ্বাস নিল। দেখল, চার-পাঁচ হাত দূরে দিদাদের স্নানের বৃত্তে চোখ বুজে বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন একজন, একজন দুহাতের কোষায় জলাঞ্জলি দিচ্ছেন সূর্যকে, বাকিরা ডুব দিয়েছেন, ডুব দিয়েছেন দিদাও। জলের ওপর দিদার লালপেড়ে শাড়ির আঁচলটা ধোঁয়ার মতো ভাসছে, হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

বাপ্পা দু পায়ে জল ঠেলে, দু হাতে জল কেটে এগিয়ে গিয়ে খপ করে ধরে ফেলল আদাজিরেবাটাগন্ধী আঁচলটা।

*

চিত্তামণির মৃত্যুর পাঁচ মাস পরেও বিশু ঠাকুর মাঝরাতে মাঝে মাঝে ভেতরবাড়ির উঠোনে খুরের খপ খপ শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। সে কথা সরোজা বৌঠানকে বলতে তিনি বামুনদির সঙ্গে চোখ চাওয়াচাওয়ি করলেন, বামুনদি ঠোঁটে আঁচল চেপে হাসি ঢাকল। সরোজা একান্তে রামপ্রাণকে জানাতে তিনি বললেন—

‘বোধ করি শিবুর সঙ্গে ছাড়িগঙ্গার ধারে বসে গঞ্জিকাসেবনটা একটু বেশিমাত্রায় হচ্ছে!’

কিন্তু কোনো কটাক্ষে কর্ণপাত না করে বিশু পিতৃপক্ষের কালে প্রয়াত পূর্বজদের পাশাপাশি চিন্তামণির জন্যেও তিলতর্পণ করল সরস্বতীর ঘাটে। নিশুতিরাতে উঠোনে খুরের শব্দ বন্ধ হলো।