সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৩.৮
৩.৮
দাদার ঘোর অমতে সাতগাঁ ত্যাগ করে কলকাতায় গিয়ে পঞ্জিকার ব্যবসায় দ্রুত সাফল্য ও প্রতিপত্তি অর্জন করেন পাগলরাম চক্রবর্তী। সেই সময় বাংলার শিল্পবিপ্লবের জোয়ার এসেছে, হুগলি নদীর দুই পাড়ে পর পর পাটের কল তৈরি হচ্ছে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ শহর কলকাতা হয়ে উঠেছে উদ্যমী পুরুষের ভাগ্য নির্মাণের ঠিকানা। কিন্তু বাদাবন কেটে গড়ে ওঠা ব্ল্যাক টাউনে এমনকি হোয়াইট টাউনেও – পরিবেশ চরম অস্বাস্থ্যকর। ভূমিতে খোলা নর্দমা, আকাশে হাড়গিলে, ঘরে ঘরে ডেঙ্গি ম্যালেরিয়া কলেরার প্রকোপ। রাধারাণীর যখন তিন বছর বয়স, পাগলরামের স্ত্রী হিরণ্ময়ী কালাজ্বরে মারা গেলেন। তাঁর নিজেরও স্বাস্থ্যহানি ঘটতে লাগল। অতিরিক্ত পরিশ্রমের সঙ্গে ক্ষুধামান্দ্য, পিত্তশূল ও অন্যান্য ব্যামো যুক্ত হয়ে দেহ জর্জরিত হলো। শহরের নামজাদা ডাক্তারেরা হাওয়াবদল করতে বললেন, বাংলার পশ্চিমে ছোটোনাগপুরের বিশুষ্ক জলহাওয়ায় ভিলা বানাতে বললেন, কলকাতার নব্যধনীরা যেমন করছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে পাগলরামের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠছে, মাতৃহারা মেয়েটা ছোটো, কলকাতা থেকে অত দূরে গিয়ে বাড়ি বানিয়ে বাস করা অসম্ভব। তিনি হাওয়া বদল না করে ডাক্তার বদল করলেন, বিন্দুমাধব মল্লিক নামে এক সদ্য পাশ করা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন। বিন্দুমাধবের বাড়ি ত্রিবেণীর উত্তরে গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে গুপ্তিপাড়ায়, অতএব বলা যায়— ‘দেশের লোক’। কিন্তু সেও যখন অস্বাস্থ্যের জন্য বাদাবনের বিষবাষ্পকেই দায়ী করল, পাগলরাম ধৈর্য হারালেন—
‘তু-তুমিও আমায় পশ্চিমে গিয়ে চেঞ্জারবাবু হতে বলছ? দ্যাখ বাপু, আমি বি-বিদ্যেসাগর নই, কলকাতা ছেড়ে কুলি মে-এ-ঝেনদের মধ্যে গিয়ে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব।’
‘চেঞ্জে যেতে বলছি, অত দূরে যেতে তো বলিনি,’ বিন্দুমাধব বলল। ‘আপনি বর্ষার শুরু থেকে ভিজে ক’টা মাস গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে সাতগাঁয় গিয়ে থাকুন না?’
‘ঠিক বলেছ! এটা আগে কেন মাথায় আসেনি?’ পাগলরামের মুখে দপ করে যেন কিলবার্ন কোম্পানির বিজলি বাতি জ্বলে উঠল। ‘যদি হাওয়া বদলই করতে হয়, তাহলে ম-মরতে ওই জংলা মুলুকে যাব কেন? যে হাওয়ার টানে কনৌজের সাত রাজপুত্তুর বাঁ-বাঁধা পড়েছিল, দরপ গাজি থেকে শুরু করে ফিরিঙ্গি ব-বণিকেরা আর দেশে ফিরে যেতে পারেনি, সেখানেই ফিরব। তাছাড়া গঙ্গার পশ্চিম কুল বা-বারাণসী সমতুল, কথাটা তো আর এমনি এমনি লোকে বলে না!’
পাগলরাম চক্রবর্তী উদ্যোগপতি, তাঁর যেথা মন সেথা গমন। পরের মাসেই তিনি আদিরামবাটিতে পারিবারিক জমিতে বিলিতি স্থপতির নকশা মোতাবেক একটি দোতলা কোঠাবাড়ি নির্মাণের কাজে হাত দিলেন। কলকাতা থেকে নৌকায় দামি শৌখিন আসবাবপত্র আনিয়ে ভিলা সাজালেন, ভিলার নাম রাখলেন এল- ডোরাডো। পারিবারিক জমিতে পাগলরামের সোয়া পাঁচ আনা অধিকার আছে, ফলে কারোর কিছু বলার ছিল না। কিন্তু আত্মীয় জ্ঞাতিরা ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখেননি। ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু জনপদে বিসদৃশ স্থাপত্যের জৌলুস চোখে আঙুল দিয়ে বিত্তের কুৎসিত প্রদর্শন ভিন্ন আর কিছু কারোর মনে হয়নি। এল ডোরাডো এক কল্পিত সোনার দেশ, দক্ষিণ আমেরিকার জনজাতির পুরাণকথায় তার উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু বাড়িটির নির্মাণ যেন মনে পড়ায় মিশরের ফ্যারাওদের কথা। যে বিচিত্র আবেগে মমতায় পাগলরাম সেটি সাজাতে লাগলেন, এবং জনে জনে গঙ্গার পশ্চিমকূলের সঙ্গে বারাণসীর উপমা আওড়াতে লাগলেন, তাতে কারোর কারোর মনে হলো তিনি এল-ডোরাডোয় গিয়ে বাস করতে নয়, মরতে চেয়েছিলেন।
সে ইচ্ছা পূরণ হলো না। পাগলরাম চক্রবর্তী শেষপর্যন্ত সাতগাঁয় ফিরলেন রাধারাণীর হাতে তামার পাত্রে চিতাভষ্ম রূপে, যা সরস্বতীর জলে ভাসানো হলো। অকৃতদার গঙ্গারাম চক্রবর্তী তখনও জীবিত, ছোটো ভাইয়ের মৃত্যুর পর আর খুব বেশিদিন বাঁচেননি। তার আগে তিনি বড়দা রামানুজের দারিদ্র্যপীড়িত মেয়ে কাত্যায়নীর পুত্র কন্যা বিশু ও কমলাকে আদিরামবাটিতে নিয়ে এসে রাখেন। শাকম্ভরীকে তার আগেই শ্বশুরালয় থেকে উদ্ধার করে এনেছিলেন।
পাগলরাম মৃত্যুর আগে মেয়ের বিবাহ দিয়ে যান তারিণীচরণ নামে এক আশ্রিত ব্রাহ্মণ তরুণের সঙ্গে। তাঁর সাধের এল ডোরাডোয় এসে কোনোদিন বাস করতে পারেননি, কিন্তু পুজোপার্বণে ছুটিছাটায় স্বামীপুত্র বন্ধুবান্ধব নিয়ে রাধারাণীর আসা যাওয়া চলতে থাকে। পরিবারের দুই শাখার মধ্যে সম্পর্ক বেশ কিছুটা সহজ হয়। গঙ্গারামের মৃত্যুর পর বনলতাকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে লেখাপড়া করান রাধারাণী। কিন্তু বেথুন কলেজে পড়াকালীন বনলতা ব্রিটিশ শাসক বিরোধী গোপন আতঙ্কবাদী দলে জড়িয়ে পড়ল, এবং তার ভয়ঙ্কর করুণ পরিণতি ঘটল। যদিও তাতে রাধারাণীর কোনো ভূমিকা ছিল না, কিন্তু পরোক্ষ দায় এসে পড়ে তার ওপরেই। আদিরামবাটির লোকজন মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দেয়।
এসবের পরেও নিয়ম করে দুর্গাপুজোয়, ক্রিসমাসের ছুটিছাটায় এল ডোরাডো রাধারাণীর সপরিবারে আসা অব্যাহত রইল। কলকাতা থেকে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড দিয়ে ওদের মাখন-রঙা ফ্যানটম ৩ রোলস রয়েস গাড়িতে চেপে ওরা আসত, কখনো বন্ধুবান্ধব সমভিব্যাহারে। চাকর বাবুর্চি খানসামার দল ট্রেনে চেপে এসে পড়ত তার কদিন আগেই। এল-ডোরাডোর বাগান সাফ করা হতো, ভেনিসিয় খড়খড়ি আঁটা দরোজা জানলাগুলো খুলে বাড়িটাকে হাওয়া খাওয়ানো হতো, দরজার মাথায় অর্ধচন্দ্রাকার রঙীন কাচের শার্সিগুলো মোছা হতো, সন্ধ্যায় বৈঠকখানায় জ্বলে উঠত রাসেল কোম্পানির বিশাল স্ফটিকের ঝাড়। একবার, দেবীপক্ষ শুরু হবার ঠিক আগে, ছাত বরাবর টাঙানো হলো তামার তারের জাল। পড়শিরা ভাবল এও বুঝি এক কলকাত্তাইয়া বাবুয়ানি চাল। পিতৃপক্ষের শেষ দিন ভোরের আলো ফোটার আগেই এল-ডোরাডোর বৈঠকখানা থেকে ভেসে এল শঙ্খধ্বনি, আর তারপরেই এক পুরুষের জলদগম্ভীর কণ্ঠ— ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর…’
যুদ্ধের সময়ে জাপানি বোমার ভয়ে যখন লোকে কলকাতা ছেড়ে পালাচ্ছে, ওরা তিন মাস এসে ছিল। তখন এল ডোরাডোকে দেখে মনে হতো যেন কোয়ারান্টিনে থাকা একটি জাহাজ। সেই সময় রাধারাণীর বর তারিণীর জন্য নিয়মিত সকালের ট্রেনে চৌরঙ্গী থেকে পেলিটি’জ-এর পাউরুটি আসত। কানাঘুষোয় শোনা যেত, পাউরুটির বাক্সে নাকি নিষিদ্ধ মাংস ও মদের বোতলও আসত। সায়েবসুবো বন্ধু নিয়ে সাহেবদের মতোই খাকি হাফপ্যান্ট পরে আর সোলা হ্যাট মাথায় দিয়ে বন্দুক নিয়ে ছাড়িগঙ্গার ঝিলে শীতের পাখি শিকারে যেত তারিণী।
.
চক-হরিশচন্দ্রপুরের একদা বর্ধিষ্ণু পরিবারের সন্তান তারিণীচরণ লাহিড়ী যখন ভাগ্যের সন্ধানে কলকাতায় আসে, তখন সে সদ্য তরুণ। ট্যাকে একটা ফুটো পয়সাও ছিল না। মি’লেডি, তার অনেক কাল আগে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক গরীব ব্রাহ্মণসন্তান গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় আসেন। কথিত আছে তিনি কর্পোরেশনের কলের জলে ক্ষুধার নিবৃত্তি করে ফুটপাতে গ্যাসবাতির আলোয় পড়াশোনা করে বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠেন, প্রভূত প্রতিপত্তি ও অর্থ উপার্জন করেন। সেই কাহিনি লোকমুখে চাউর হবার পর থেকেই তারিণীর মতো অসংখ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণকে আকর্ষণ করেছে এই কলকাতা শহর। পাগলরাম নিজেও পরিবারের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে, দাদার অমতে কলকাতায় এসে ব্যবসায় আশাতীত সাফল্য পেয়েছেন। এই মহানগরের প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতিদান হিসেবে তিনি বাগবাজারের বাড়ির একতলায় ছাপাখানার লাগোয়া ঘরে দুস্থ মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন, কলেজের ফি ইত্যাদির জন্য মাসিক বৃত্তিও যোগাতে থাকেন।
বুদ্ধিমান, সুদর্শন তারিণীচরণ কলকাতায় এসেছিল চোখে স্বপ্ন আর ঘাড়ের পিছনে মৃত্যুর নিশ্বাস নিয়ে। রেলপথ আসার পর ম্যালেরিয়ার প্রকোপে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মতো চক-হরিশ্চন্দ্রপুরও তখন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। সিটি কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয় সে, আরও তিনটি পড়ুয়ার সঙ্গে ছাপাখানার ঘরে থাকতে শুরু করে। ওর বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা আর অমায়িক ব্যবহারের জন্য সহজেই পাগলরামের নজরে আসে। কলেজে পাস দেবার পর তারিণীকে প্রকাশনার সরবরাহ বিভাগের দায়িত্ব দেন তিনি। এবং কিছুকালের মধ্যেই ওকে সংস্থার ম্যানেজার করে দেন।
মূলত তারিণীর উদ্যোগে আদিরাম প্রেসের প্রকাশনায় বৈচিত্র্য আসে। পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছাড়াও সংক্ষিপ্ত পকেট পঞ্জিকা এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের বিভিন্ন বইপত্র ছাপা হতে থাকে, বাজারে ক্রমশ তার চাহিদা তৈরি হয়। তার সঙ্গে তাল রেখে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ইংল্যান্ড থেকে নতুন ছাপার যন্ত্র এনে বসানো হয়। এরপর অত্যাধুনিক মুদ্রণ প্রযুক্তি শিখে আসার জন্য তারিণীকে লন্ডনে স্কুল অফ ফোটো এনগ্রেভিং অ্যান্ড লিথোগ্রাফিতে পড়াতে পাঠালেন পাগলরাম। তার আগে রাধারাণীর সঙ্গে তার বিবাহ দিলেন।
বিবাহ খুব ধুমধাম করেই হয়েছিল। কলকাতার সাহেবসুবো থেকে শুরু করে স্বদেশী বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নিমন্ত্রিত ছিলেন। মার্টিন্স রেলওয়ে কোম্পানির একটি আন্ত ট্রেন ভাড়া করে, তাকে ফুলে সাজিয়ে সাতগাঁর আত্মীয় জ্ঞাতিবর্গকে আনা হয়েছিল।
রাধারাণীর ছেলে সুনির্মলের বয়স যখন পাঁচ মাস, পাগলরাম মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সব স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি মেয়ে এবং তার নাবালক পুত্রকে দিয়ে যান। রাধারাণী স্বামী তারিণীচরণের সঙ্গে যৌথভাবে আদিরাম প্রেসের কাজকর্ম চালাতে শুরু করে। ইতিমধ্যেই বাবার কাছ থেকে ছাপা সংক্রান্ত খুঁটিনাটি শিখেছিল রাধারাণী, তারিণী সরবরাহ ও বিক্রির দিকটা দেখতে থাকে।
এই সময়েই রাধারাণী জানতে পারল ইংল্যান্ডে গিয়ে তারিণী ফোটো এনগ্রেভিং অ্যান্ড লিথোগ্রাফি স্কুলের পাঠ মাঝপথে ছেড়ে দেয়, শ্বশুরের নিয়মিত পাঠানো টাকা ওড়ায়। যে মেধাবী উদ্যমী যুবককে খিদিরপুরে জাহাজঘাটায় হাত নেড়ে বিদায় জানিয়েছিল সদ্যপরিণীতা রাধারাণী, সে ফিরে এসেছে দুশ্চরিত্র ফুলবাবু হয়ে। আরও জানতে পারল, চক-হরিশচন্দ্রপুরে তারিণীচরণের গুষ্টির সব পুরুষ ম্যালেরিয়ায় মারা যায়নি। কেউ কেউ মারা যায় সিফিলিসে এবং সিরোসিসে, এবং এই কলকাতার বুকেই।
লন্ডন থেকে কলকাতায় ফিরেও তারিণীর ভোগলালসা চরিতার্থ করার জন্য উপায়ের অভাব ছিল না। এদিকে ব্যবসার দিকটাও ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছিল। আদিরাম প্রেসের পাঁজির একচেটিয়া বাজারে থাবা বসিয়েছিল অন্যান্য প্রকাশকের ছাপা নানান গোত্রের পাঁজি ফুল পঞ্জিকা, হাফ পঞ্জিকা, সচিত্র পঞ্জিকা, গার্হস্থ্য পঞ্জিকা, পকেট পঞ্জিকা ইত্যাদি। সেগুলি সদ্য নগরনির্ভর হিন্দু বাঙালির বদলে- যেতে-থাকা দৈনন্দিন জীবনছন্দের চাহিদা অনুযায়ী কোনোটি ক্যালেন্ডার অনুসারী বিধিনির্দেশের তালিকার আকারে, কোনোটি অর্ধশিক্ষিতের জন্য সচিত্র, কোনোটি আবার কলকাতার মেসবাড়িতে থাকতে-আসা কেরানিকুলের জন্য পকেট সংস্করণ হিসেবে ছাপা হতো। এবং হগমার্কেটের বেকারির গরম কেকের মতোই বিক্রি হতো।
একদিকে বিপথগামী স্বামী, অন্যদিকে ব্যবসার এই সঙ্কটকাল বাবার মৃত্যুর পর রাধারাণী সদুপদেশের জন্য ডাক্তার বিন্দুমাধবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। তিনি তো শুধু পারিবারিক চিকিৎসকই নন, অভিভাবকের মতো, এবং সর্বোপরি— ‘দেশের লোক’। বিন্দুমাধব করিৎকর্মা পুরুষ, আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর আগ্রহ, দেশবিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। একদিন তিনি বাড়িতে এনে হাজির করলেন এক বিচিত্র যন্ত্র, ব্রোঞ্জ ও তামার তৈরি মিনারের আকারে পর পর সাজানো পাত্র, নীচে উনুনের মতো খোপ।
‘এই কল আবার কোন দেশ থেকে আমদানি করলেন ডাক্তারবাবু?’ রাধারাণী জিজ্ঞেস করে।’
‘আমদানি করিনি, নিজেই বানিয়েছি,’ বিন্দুমাধব বললেন। ‘এ হল একটি রান্নার সরঞ্জাম। ওপরের পাত্রগুলোয় চাল ডাল তরিতরকারি উপযুক্ত পরিমাণে জল তেল মশলা দিয়ে নীচে কাঠকয়লায় আগুন দিলেই ঢিমে আঁচে আপনা থেকেই রান্না হয়ে যাবে।’
‘এমন অদ্ভুত যন্ত্রে কে করবে রান্না? খুস্তি না নেড়ে রান্না করলে কি আর আমাদের পোষায়?’ রাধারাণী হাসে।
‘তোমরা কেন করবে? গ্রামে মফস্সলে পরিবার রেখে কলকাতায় বাসাবাড়িতে থেকে আপিস করতে আসে কেরানির দল। তারা করবে। এই যন্ত্রে কোনোরকম নজরদারি ছাড়াই ঢিমে আঁচে নিজে-নিজেই ঠিক সময়ে তৈরি হয়ে যাবে গরম গরম ঘরে-তৈরি আপিসের ভাত। পাইস হোটেলে খেয়ে স্বাস্থ্যহানি হবে না, পয়সা নষ্ট হবে না, জাত খোয়াতে হবে না।’
‘ভারি অদ্ভুত কল যা হোক,’ রাধারাণী বলে। ‘পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের পাকশালে চুলার ওপর পরপর সাজানো এমন পাত্র দেখেছি বটে।’
‘বিজ্ঞানটা একই। তবে চীনে বেড়াতে গিয়ে দেখেছি সেখানে প্রবল মন্দার মধ্যে লোকে জ্বালানি বাঁচাতে কতরকম রান্নার পদ্ধতি উদ্ভাবন করছে। এই কুকারের আইডিয়াটা তখনই মাথায় আসে।’ বিন্দুমাধব বলেন—‘এখন চট করে এই যন্ত্রটার একটা বিজ্ঞাপন করে দাও তো দেখি? আমি তোমাদের পঞ্জিকায় ছাপাতে চাই।’
ডাক্তারের নির্দেশমাফিক রাধারাণী যন্ত্রের একটি রেখাচিত্র ও সংক্ষিপ্ত ব্যবহারবিধি সহ বিজ্ঞাপনের কপি তৈরি করল।
‘কিন্তু এই যন্ত্রটির একটা যুৎসই নাম দিতে হবে যে ডাক্তারবাবু?’ রাধারাণী বলল। ‘শিগগিরই একটা নাম ভেবে ফেলুন!’
‘এটা বানানোর সময় দুটি জিনিস আমার মাথায় ছিল, স্বাস্থ্য আর সাশ্রয়,— ‘ বিন্দুমাধব বললেন। ‘এর নাম দেওয়াই যায় হাইজিনিক অ্যান্ড ইকোনমিক কুকার।’
‘ওসব ইক-মিক লিখলে সাধারণ লোকে কিন্তু কিনবে না, ভাববে খটোমটো জিনিস।’
হা হা করে হেসে উঠলেন বিন্দুমাধব। ‘ভালো বলেছ–ইক-মিক…’ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন— ‘আচ্ছা, ইকমিক কুকার নাম দিলে কেমন হয়?’
পঞ্জিকার পেছনের মলাট জুড়ে বিজ্ঞাপন হলো, সঙ্গে হাফটোন ছবি। বিন্দুমাধব রাধারাণীকে শুধু বিজ্ঞাপনের মূল্যই নয়, বিক্রিরও একটি লভ্যাংশ দিতে চাইলেন। পাঁজির পাতাতেই একটি লটারির কুপন জুড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হল, বিজয়ীরা একটি করে কুকার পাবেন। অভূতপূর্ব সাড়া মিলল। শহরের সদাগরি আপিসে চাকরি করতে আসা কেরানিকুলই শুধু নয়, শীঘ্রই কলেজ পড়ুয়াদের জীবনেও অপরিহার্য হয়ে উঠল এই ইকমিক কুকার। বছর খানেকের মধ্যেই আদিরাম প্রেসের ভাগ্যের চাকা ঘুরল, পঞ্জিকার পাতায় বিজ্ঞাপন দিতে নানান ধরনের কারবারীর ঢল নামল।
মি’লেডি, বাংলার ঘরে ঘরে থাকে যে অত্যাবশ্যকীয় বইটি, যা দেখে লক্ষ লক্ষ সাবর্ণ হিন্দু বাঙালি তাদের দিন শুরু করে, তার বিপুল প্রচার ক্ষমতা এর আগে সেভাবে কেউ টের পায়নি। রেলপথ, বিশেষ করে গ্রামেগঞ্জে ন্যারোগেজ ফিডার রেলপথের বিস্তার এবং সরকারি ডাক পরিষেবা প্রসারের সুবাদে অসংখ্য খাঁটি ভুয়ো ডাকযোগে সামগ্রী প্রেরণের কোম্পানি গজিয়ে উঠল। তারা দৈত্যাকার মুলার বীজ থেকে শুরু করে জলকে নিমেষে বরফে রূপান্তরের পাউডার, দেহকে অদৃশ্য করে দেবার আংটি থেকে সেবনে অমরত্ব লাভের ঘি (একশৃঙ্গ অশ্বিনীর দুধে প্রস্তুত), এবং মড়া-ফেরানোর প্রদীপের বিজ্ঞাপন দিতে লাগল।
বাজারে সরবরাহ ও বিজ্ঞাপনের দিকটা দেখত তারিণী, সে সাধু অসাধু ব্যবসায়ীর মধ্যে কোনোরকম বাছবিচার না করে টাকার বিনিময়ে যেকোনো ধরনের বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে দিত পাঁজির পাতায়। প্রথম প্রথম ক্রমবর্ধমান লাভের অঙ্কের দিকে তাকিয়ে রাধারাণী এ ব্যাপারে নাক গলায়নি। ওরই উদ্যোগে আমেরিকা থেকে একটি নতুন লাইনোটাইপ মেশিন আনানো হলো, একমাত্র পুত্র সুনির্মলকে লন্ডনে ফোটো এনগ্রেভিং অ্যান্ড লিথোগ্রাফি স্কুলে ওর বাবা যে বিদ্যা সম্পূর্ণ করে আসেনি সেটাই পড়তে পাঠানো হলো।
এক শীতের সন্ধ্যায় বাগবাজারের বাড়িতে এলেন বিন্দুমাধব, চোখেমুখে চিন্তার ছাপ।
‘আজ আবার কোন নতুন যন্ত্র আবিষ্কারের খবর নিয়ে এলেন ডাক্তারবাবু?’ রাধারাণী হেসে জিজ্ঞেস করল।
‘নতুন যন্ত্র নয়, একজন আহত যুবক!’ বিন্দুমাধব বললেন।
‘তার মানে?’
‘ছেলেটির নাম সহর্ষ দত্ত। ইংরেজ মারবে বলে বোমা বাঁধছিল, সেই বোমা ফেটে ডান হাতটা কনুইয়ের নীচে থেকে উড়ে গিয়েছে। আমি বাড়িতে এনে লুকিয়ে রেখে চিকিৎসা করছি বটে, কিন্তু পুলিশের চর সেটা জেনে গিয়েছে। যে কোনো সময়ে বাড়ি তল্লাসী হতে পারে। তুমি ওকে দিনকয়েক এখানে রাখতে পারো, মা? এ বাড়িতে আশ্রিত ছেলেরা থাকে, কারোর কোনো সন্দেহ হবে না।’
‘বলেন কী’ রাধারাণী চোখ কপালে তোলে। ‘ছেলেটি কোথায়?’
‘তাকে নীচে আমার কোচের মধ্যে বসিয়ে রেখে এসেছি। যদি তুমি রাজি হও!’
ডাক্তার বিন্দুমাধবের প্রতি রাধারাণীর কৃতজ্ঞতার ঋণই শুধু নয়, বাবার স্মৃতির প্রতি দায়বদ্ধতাও আছে। সে তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে
‘করেছেন কী? ওকে এক্ষুনি ভেতরে নিয়ে আসুন। আমি লোক পাঠিয়ে দোতলায় এনে রাখার ব্যবস্থা করছি।’ রাধারাণী বলে।
এই কথোপকথনের সময় তারিণী সেখানে উপস্থিত। সে প্রতিবাদ করে ওঠে। বলছ কী? এর পরিণতি কী হবে ভাবতে পারছ?’
রাধারাণী স্বামীর দিকে কটমট করে তাকায়। ‘তুমি যখন কপর্দকহীন অবস্থায় এই শহরে এসেছিলে তখন এই বাড়িতেই আশ্রয় পেয়েছিলে, সেটা ভুলে যেও না!’
দুটো হাতে কাঁধ পর্যন্ত জড়ানো ব্যান্ডেজ, মুখে গলায় স্প্লিন্টারের ক্ষত নিয়ে সহর্ষ এল। পাতলা গড়ন, গালে সদ্য দাড়িগোঁফ উঠেছে, প্রায় বালকের মতো হাবভাব। বিন্দুমাধব রোজ এসে ড্রেসিং করাতে লাগলেন। রাধারাণী ছেলেটিকে দোতলায় রেখে পূর্ণ উদ্যমে শুশ্রূষা করে কিছুদিনের মধ্যেই অনেকটা সুস্থ করে তুলল।
সেই সময় বনলতা বাগবাজারের বাড়িতে রয়েছে, বেথুন স্কুলে পড়া শেষ করে সদ্য কলেজে পড়তে ঢুকেছে। আত্মগোপনকারী আহত বিপ্লবীর সান্নিধ্য তার মনে যে কী গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করল সেটা তখন কেউই বুঝতে পারেনি। দিনের পর দিন সহর্ষের মুখে শোনা দেশপ্রেম আর আত্মত্যাগের সংকল্প তাকে ঠেলে দিল দাউদাউ আগুনজ্বলা পথে।
তবে বনলতার মনের জমি প্রস্তুত হয়েছিল তার ঢের আগে, রাধারাণীর সঙ্গে কলকাতায় আসারও আগে, সাতগাঁয়ে।
