Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৩.৪

৩.8

মি’লেডি, মহাবিষুবের পর নদীর নাব্যতা কমে আসতে এই অত্যাশ্চর্য কর্মকাণ্ড শুরু হলো। দুশো জন বিশ্বস্ত হাবসির অধীনে বারোশো ক্রীতদাস নামানো হলো। এই হাবসিদের পূর্বপুরুষ তুর্কী শাসকদের ক্রীতদাস হয়ে বাংলায় এসেছে, তাদের একজন এমনকি মসনদেও বসেছে। শিকলে বাঁধা এক দল নারীপুরুষের থেকে কীভাবে শ্রম আদায় করতে হয় তারা জানে। গলায় দূরবীন ঝুলিয়ে রুয়ানো বজরার ছাত থেকে কর্মকাণ্ড তদারকি করতে লাগলেন। ক্রীতদাসেরা শাবল গাঁইতি এমনকি খালি হাত ও বেতের বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে কাজ করেছিল। একটানা সত্তর দিন ধরে ত্রিবেণীর কাছে তারা নদীতল সেঁচল, বাঁশের লম্বা লম্বা মিনার ও সাঁকো বেঁধে মানব শৃঙ্খল বানিয়ে হাতে হাতে তুলে আনল শত শত বছর ধরে সঞ্চিত বালি আর মাটি। যমুনার খাতের মুখে ফেলে বোঁজানো হলো। এছাড়া সাতগাঁ দোয়াবের পূর্বপ্রান্তেও গড়ে উঠল কাদামাটির ছোটোখাটো একটি পাহাড়। উঠে এল আদিম অরণ্যের কালো চিটচিটে পিট, অচেনা জন্তুর হাড়ের ফসিল এবং কোনো লুপ্ত সভ্যতার হলদে বেলেপাথরের ইঁট। মৎস্যভূমির গলার কাছে আড়াআড়ি হুগলি ও সরস্বতীর সংযোগকারী একটি খাঁড়ি ছিল, তার দুধারে এককালের বাদাবনের কিছু চিহ্ন তখনও ছিল। সেই খাঁড়িটি সংস্কার করে তার দুদিকের মুখ প্রশস্ত করে দেওয়া হলো।

বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে হিমবাহ গলে আসা জলে গঙ্গার উপরিভাগ পুষ্ট হতে লাগল, রুয়ানো ডে ইনফান্টের শল্যচিকিৎসার ফল দেখা দিল একটু একটু করে। সরস্বতীর বুকে বালির চর জেগে উঠতে লাগল, যমুনা প্রায় একটি মৌসুমী খালে পরিণত হলো, এদিকে গঙ্গার সিংহভাগ জল মাঝের শাখা দিয়ে বইতে লাগল। তার নাম এখন খাতায় কলমেই হুগলি। সংস্কারের পর নীচের দিকের খাঁড়িটা সরস্বতীর জোয়ারের জল হুগলির খাতে টেনে এনে তার নাব্যতা বৃদ্ধি করল। তার নামও হলো হুগলির খাল।

দুটি গ্রীষ্ম, একটি বন্যা ও একটি নৌদুর্ঘটনার পর মৎস্যভূমির মানুষ এই বৈপ্লবিক ভূ-শল্যচিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল টের পেল। বর্ষার শেষদিকে, শরতের ঠিক আগে মহাপ্লাবন এসে সরস্বতীর কূল ভাসালো, পশ্চিমে নতুন খাত ধরে বইতে শুরু করল। প্লাবন সরলে দেখা গেল পুরানো অশ্বখুরাকৃতি খাতটি বদ্ধ জলা হয়ে রয়ে গিয়েছে। তার নাম হলো ছাড়িগঙ্গা। এই ঘটনায় অনেকগুলো সমৃদ্ধ নদীমাতৃক জনপদ নিস্তেজ হয়ে পড়ল। পরের এপ্রিলে সান্তা আনা নামে একটি চারশো টনের ঢাও মালাবার থেকে সুপুরি নিয়ে সাতগাঁ বন্দরে আসছিল, সরস্বতীর চোরা বালির খাতে গিঁথে গেল। সব মাল খালাস করার পরেও তাকে আর কখনো উদ্ধার করা গেল না।

বহুকাল পরেও মজা সরস্বতীর বুকে দেখা যেত সান্তা আনার কঙ্কাল মাস্তুলের গায়ে ছেঁড়া পালের টুকরো, গা থেকে ব্যবহারযোগ্য সব কাঠ ধাতু খুবলে নেওয়া হয়েছে, বার্নাকলে ছাওয়া ধনুকাকৃতি গলুই উঁচিয়ে আছে একদা বিখ্যাত নদীবন্দরের কবরের সৌধ হয়ে।

.

মি’লেডি, প্রকৃতিতে কিছুই নিত্য নয়, কিছুই অনির্ব্বাপ্যও নয়। সাতগাঁ বন্দরের মৃত্যুঘন্টা বেজে গেল, কিন্তু এই সময়েই আদিরামের খড়ে ছাওয়া কাঠের মন্দিরের স্থানে গড়ে উঠল অপূর্ব টেরাকোটার মন্দির। নতুনটি আগের মতোই দোচালা গড়নের, কিন্তু অনেকগুণ বড়ো আর মজবুত, তার চার দেয়ালে ঘন ত্রিমাত্রিক চিত্রের কারুকাজ। রুয়ানো ডে ইনফান্টের শল্যচিকিৎসায় গঙ্গার বুক থেকে যে পাহাড় পরিমাণ পলিমাটি উঠেছিল, তাই দিয়েই মন্দির হলো। তার আগে পুরো ভাদ্রমাস ধরে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একশো আটটি গরুর গাড়িতে বোঝাই করে বিপুল পরিমাণ মাটি টেনে আনা হলো আদিরামবাটিতে। বিষ্ণুপুরের এক সূত্রধরের অধীনে বাইশজন মৃৎশিল্পী ও চল্লিশজন শ্রমিক একটানা কাজ করল শরতের শেষ থেকে বসন্ত পর্যন্ত। বড়ো বড়ো ভাঁটি বানিয়ে ইট ও টালি পোড়ানো হলো। কাঠ এল সদ্য সংস্কার হওয়া হুগলি খালের দুপাশে বাদাবন কেটে, যে বনে একদা গভারের বাস ছিল। খাল সেঁচে নৌকা বোঝাই করে আনা গেড়িগুগলি পুড়িয়ে কলিচুন তৈরি হলো। বন্দর-হুগলি পত্তনের ফলে ভিটেছাড়া হয়েছিল জানি ও হালিক কৈবর্তরা, হুগলি খালের বাদাবন সাফ হবার পর তারা সেখানে গিয়ে বসত গড়ল।