সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৫.১
৫.১
জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণা দশমীর বিকেলে তিনি এলেন। খবরটা সাতগাঁর ব্রাহ্মণদের কানে পৌঁছেছিল আগেই, অনেকেরই শঙ্কা ছিল সংকীর্তনের দল নিয়ে পথে নামলে কী আবার ঘটে যায়। কিন্তু ষোলজন অনুচরসহ গয়নার নৌকাটি ত্রিবেণী ছাড়িয়ে পর পর সাতগাঁর ঘাটগুলো পেরিয়ে, নির্জন জাহাজঘাটা পেরিয়ে দক্ষিণে ভাটির দিকে ভিড়ল। ওঁরা গিয়ে উঠলেন ধর্মতলার বটের নীচে। সাতগাঁর পবিত্রভূমি উপেক্ষা করে অচ্ছুৎদের ধর্মতলায় যেতে কেউ স্বস্তির শ্বাস ফেলল, কেউ বা কুপিত হলো। যারা একটিবার ওঁকে চোখের দেখা দেখতে চেয়েছিল, বিশেষ করে উচ্চবর্ণের পুরনারীরা, তারা গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওঁর দর্শন পেতে সন্ধ্যার আগেই ধর্মতলায় ভেঙে পড়ল হাড়ি ডোম বাউড়ি ও বিভিন্ন নিম্নবর্গের দল। এদিক ওদিক কাঠকুটোর আগুন জ্বলল, খোলকর্তাল বাজল, গান হলো। কুমোরদের আনা নতুন মেটে সরায় মাধুকরীর চাল চাপল। কৃষ্ণা দশমীর রাত্রি যত ঘন হল, বটের নীচে অন্ধকার ততই ক্রমশ দীপ্যমান হয়ে উঠতে লাগল তাঁর কাঁচা সোনার অঙ্গ থেকে বিচ্ছুরিত আলোয়। সেই আলোয় ভোরের বিভ্রমে গাছে গাঙশালিখেরা ডেকে চলল, যতক্ষণ না পূব আকাশে দশমীর ক্ষীণ চাঁদ ওঠে। সেই সোনার বরণ আলোয় দীন আর্তেরা দিশা পেল। তৃষ্ণার্তের জন্য তিনি হাতের লাঠিটি ভূমিতে বিদ্ধ করে জলের ধারা ফোটালেন। মিষ্টি সুপেয় জল। সেই জলে নিজে হাতে কচ্ছপের আকারের পাথরটি সংমার্জন করলেন। বটের নীচে একটি রাত কাটিয়ে ওঁরা চলে গেলেন আরও দক্ষিণে।
কিছুকাল পরে ছত্রভোগ থেকে নৌকাযোগে তিনি পুরীধামে যাবেন। জলে মেঘের ছায়ার মতো মিলিয়ে যাবে তাঁর নশ্বর দেহ। তিনি থেকে যাবেন বাংলার মানুষের মনে, ভক্তি আর প্রেমের প্রবাহে। ধর্মতলায় বটের নীচে সেই আর্টেসীয় ধারাটি বয়ে চলে চৈত্রমাস থেকে বর্ষা নামার আগে পর্যন্ত। খরতপ্ত দুপুরবেলায় পাতার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যরশ্মি জলে প্রতিফলিত হয়ে নীচু ডালগুলোয় দপ দপ করে যে সজীব আলো, লোকে বলে ওইটি হলো তাঁর দেহ থেকে বিচ্ছুরিত দ্যুতি।
মি’লেডি, এই ঘটনার আড়াইশো বছর আগে রামাচার্য যখন পুথি বগলে নৌকায় চেপে দরপ খানের কাছে যাচ্ছেন, মার্কো পোলো তখন জেনোয়ার কয়েদখানায় কারাসঙ্গীকে ভ্রমণবৃত্তান্ত শোনাচ্ছেন, আর ইবন বতুতা তানজাহ শহরে গলির ভেতর একতলা বাড়ির পাথরের মেঝেয় হামাগুড়ি দিচ্ছেন। বড়ো হয়ে তিনি সাতগাঁয়ে আসবেন। ততদিনে দরপ খান গাজী হয়েছেন, ত্রিবেণীসঙ্গমে তাঁর মসজিদ ও দরগা উঠেছে। সাতগাঁয় মুখে মুখে ফেরে তাঁর রচিত গঙ্গাস্তোত্র।
সাতগাঁর ব্রাহ্মণদের নিষ্কর জমি তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কি না জানা যায়নি। এব্যাপারে কোনো নথি বা শাওয়াদ আদিরামবাটির পুথিশালায় বা অন্যত্র নেই। ইতিমধ্যে রামাচার্যের বংশধরেরা চক্রবর্তী পদবি ব্যবহার করছেন। বারোটি গ্রাম নিয়ে চক্রের অধিপতি চক্রবর্তী।
সেই বংশের কুলপতি পণ্ডিত রামতনু চক্রবর্তী, যাঁকে সাতগাঁয় সবাই রামাই পণ্ডিত নামে চেনে, কার্তিক মাসের ভোরে সরস্বতীতে বুক জলে দাঁড়িয়ে গঙ্গাস্তুতি করছেন–
সুরধুনি মুনিকন্যে তারয়েঃ পুণ্যবন্তং
স তরতি নিজ পূণ্যেইস্-তত্র কিং তে মহত্ত্বম্
এই সময়টা নদীর বুক থেকে কুয়াশা উঠে ঢেকে দেয় মৎস্যভূমি। আহ্নিকের প্রহর, পূর্বাকাশে সূর্য উঁকি দিয়েছে, কিন্তু কুয়াশা গলানোর মতো তেজ নেই। একটি দাঁড়কাক ডাকছে থেকে থেকে, কুয়াশার ভেতর কেমন ফাঁপা শোনাচ্ছে। মাঝনদীতে সান্তা আনা জাহাজের কঙ্কাল ঝাপসা জেগে আছে। জলের ধারে মাচায় কাটুনি মেয়ের দল সুতো কাটছে আলো ফোটার আগে থেকে। কুয়াশায় ওদের দেখা যায় না, শুধু ভেসে আসে কাঠের চরকার ঘর্ঘর ধ্বনি আর অনুচ্চ ঝিমধরা স্বরে গান। এরই মধ্যে রামাই পণ্ডিতের কানে এল দাঁড়ের ছপাৎ ছপাৎ শব্দ। কুয়াশা ঠেলে একটি লম্বা নায়রী নৌকা এই দিকেই আসছে। কাছে আসতে দেখা গেল ছইয়ের ভেতর ছায়া ছায়া মানুষ, একটি পরিবার, সর্বাঙ্গ মুড়িঝুড়ি দেওয়া। নৌকার আগায় বসেছে যে দাঁড়ি, তারও মাথায় চাদর ফেলা, চিবুকে দাড়ি থেকে কুয়াশার জল ঝরছে।
ঘাটের ধারে এসে সে দাঁড়টা উঁচু করে ধরতেই ছইয়ের ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে এল এক মাঝবয়সী লোক। পৈতেটা টেনে নিল গলার কাছে।
‘মশাই কি রামাই পণ্ডিত?’ হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল লোকটি।
রামাই দেখেন আগন্তুকটির মুখে চোখে গভীর অবসাদ আর আতঙ্ক মিশে জলে-ডোবা মানুষের মতো দেখাচ্ছে। ছইয়ের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে নারী ও বালক বালিকারা, তাদের মুখেও একই ছাপ।
‘অধমের নাম কৃষ্ণদাস রায়, ব্রাহ্মণ। নিবাস চক্রধরভূম। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য অনেক দূর থেকে আসছি।’
পাঁচ দিন পাঁচ রাত বিরামহীন নৌকা বেয়ে আসছে ওরা, অগুন্তি নদীনালা পেরিয়ে। কৃষ্ণদাস রায়ের স্ত্রীপুত্রকন্যা এবং এগারোটি প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত যা কিছু মূল্যবান স্থাবর সম্পত্তি নৌকার খোলে। পশ্চিমের দেশগাঁ ছেড়ে, পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে পুবের দেশে অনিশ্চিত নতুন জীবন শুরু করতে চলেছে। যাত্রাপথে সাতগাঁয় এসেছে আদিরামবাটির রামতনু চক্রবর্তী ওরফে রামাই পণ্ডিতের হাতে একটি বিশেষ জিনিস তুলে দিতে।
নৌকা ঘাটে বাঁধা হলো। পরিবার নৌকায় রইল, কৃষ্ণদাস একা উঠে এসে ঘাটের মাথায় বাঁধানো চাতালে কাপড়ের পুঁটলি খুলে সন্তর্পণে রাখল ছটি পুথি। পুথিগুলি কাগজের, অতীব প্রাচীন, পাতাগুলি ভঙ্গুর। রামাই পণ্ডিত দেখলেন উপরের পাতগুলিতে ঘন রেখাচিত্র ও ক্ষুদে লিপি—কিমাশ্চর্যম্!
সংস্কৃত নয়, ফারসি। বাল্যকালে পিতার মুখে শোনা অতীতের কথা স্মৃতিতে ফিরে আসার আগেই কৃষ্ণদাস বলল
‘এ হলো কিতাব রুজার। আজ থেকে চার শত বছর আগে মদীয় পূর্বপুরুষ আদিরামবাটির টোলে বসে এই পুথিগুলি নকল করেছিলেন। রাঢ় অঞ্চলে এই জ্ঞানভান্ডারের কোনো অনুলিপি নেই। এজন্য আমাদের বংশ প্রভূত যশশালী হয়, কিন্তু…— ‘ এই পর্যন্ত বলে বুকে বাঁ হাতটা চেপে শ্বাস নেয় কৃষ্ণদাস। ‘আজ আমি ভগ্ন হৃদয়ে এগুলি আপনার কাছে ফিরিয়ে দিতে এসেছি।’
রামাই পণ্ডিতের ভ্রু কুঞ্চিত হয়।–‘কী হেতু?’
আতঙ্কবিহ্বল কৃষ্ণদাস রায় যা বলে তার মর্মার্থ হলো: কিছুকাল হলো পশ্চিমের গ্রামদেশে এক ঘোর দুর্বিপাক ছেয়ে এসেছে। শীতে ফসল কাটার মরশুমে পঙ্গপালের মতো আসে একদল দক্ষিণী ঘোড়সওয়ার। তারা লুঠপাট, অগ্নিসংযোগ, খুন ধর্ষণ করে নির্বিচারে। নবাব বৃদ্ধ হয়েছেন, এদের ঠেকানোর মতো শক্তি তাঁর নেই। চক্রধরভূমের ঘোষালরা তিন বছর করাল আতঙ্কের ছায়ায় দিনযাপন করেছে, রাতের পর রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। এই বুঝি ওরা এল। শেষকালে যখন খবর এল ওরা পঞ্চকোটের রাজাকে হত্যা করেছে, পাহাড়ের ওপর পাথরের গড় ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে, তখন এগারো পুরুষের বাস্তুভিটে ছেড়ে গঙ্গা পেরিয়ে পুবের দেশে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে কৃষ্ণদাসের স্ত্রীর আত্মীয়রা থাকে, জমি কিনে নতুন করে ভদ্রাসন পাতার আহ্বান জানিয়েছে। তার আগে ফসলের গোলা গরু বলদ সব রায়তী প্রজাদের মধ্যে বিলি করেছে, কুলবিগ্রহ রাধাকৃষ্ণের কষ্টিপাথরের আড়াই হাত মূর্তি জলসমাধি দিয়েছে বাড়ির লাগোয়া পুকুরে, যদি কখনো ফিরে যেতে পারে এই আশায়। অনন্য কিতাব রুজারের অনুলিপি তার উৎসমুখে ফিরিয়ে দিতে এসেছে। এগুলি এখানে নিরাপদে রক্ষিত হবে, কৃষ্ণদাস জানে। কোনো অশ্বারোহী লুঠেরার ক্ষমতা হবে না এই জলবেষ্টিত ভূমি আক্রমণ করার।
‘এগুলি গ্রহণ করে আমায় ভারমুক্ত করুন, পণ্ডিতমশাই!’
রামাই পণ্ডিত পুথিগুলি নিলেন। তার বদলে তিনি কৃষ্ণদাস রায়কে দিলেন দুটি সুলতানি আমলের স্বর্ণমুদ্রা ও পাথেয় হিসেবে কিছু পরিমাণ চাল, ঘি ও মধু। অচেতনেই তিনি অস্ফুটে বলে উঠলেন –— ‘সুরধুনি মুনিকন্যে তারয়েঃ পুণ্যবন্তং। তাঁর মনে পড়ে গেল, ছেলেবেলায় পিতৃদেবের মুখে শোনা এমনই এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালের কথা। সরস্বতীর বুকে ভেসেছিল নৌকা, বংশের এক পুরুষ গিয়েছিলেন সাতগাঁয়ের নতুন শাসকের কাছে। সাতগাঁর সমাজে সে ছিল এক তাৎপর্যময় ঘটনা। আজকের এই সকালটিও যে তাঁর জীবনে এমন তাৎপর্যময় হয়ে উঠবে সেটা রামাই পণ্ডিত কল্পনাও করতে পারেননি।
শূন্য পুরানের রচয়িতা রামাই পণ্ডিত ছিলেন বহু যুগ আগের, রামাচার্যেরও পূর্বকালের মানুষ; বাংলার রাজা লাউসেনের সভাকবি ছিলেন। শ্রদ্ধায় হোক অজ্ঞতায় হোক, আদিরামবাটির রামতনু শাস্ত্রীকে যে লোকে রামাই পণ্ডিত নামে ডাকে, সে নিয়ে ওঁর মনে শ্লাঘা বা ক্ষোভ কোনোটাই নেই। জীবনের চল্লিশটি বসন্ত পার করে তিন কন্যার বিবাহ দেবার পর, স্ত্রীবিয়োগের পর, দুই পুত্র প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর তিনি বানপ্রস্থের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। বড়ো ছেলে রাজারামের বিবাহ দেবার পর সংসারের দায়দায়িত্ব ওর হাতে দিয়ে ক্রমশ গার্হস্থ্য জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হবার জন্য ভিটের পেছনে আমের বনে মাটির কুটির বানিয়েছেন। শিশুর ক্রন্দনধ্বনি কিংবা পাকশালে ব্যাঞ্জন রান্নার গন্ধ সেখানে পৌঁছয় না, সারাদিন পাখির কলকাকলিতে ভরে থাকে। রামাই পণ্ডিত দিনে একবার আহার করেন, পঞ্চপ্রহর ধ্যান ও যোগক্রিয়া করেন, শাস্ত্রপাঠ করেন, সরস্বতীর জলে ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক করেন। তাঁর মনে গৃহী জীবনের কুয়াশা কেটে গিয়ে ক্রমশ এক দিব্য উপনিষদীয় আলোয় ভরে উঠছে। কার্তিকের সকালে কুয়াশার ভেতর থেকে ওই নায়রী নৌকা যেন অবচেতনের কোনো সুপ্ত ইচ্ছার মতো ভেসে এসে সেই আলো আড়াল করল।
