সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৬.৩
৬.৩
পাটকাঠির মতো লিকলিকে হাত-পা নিয়ে জ্যোতিকণা কীভাবে যে গ্রিন হাউসের বাস্কেটবল চাম্পিয়ানকে ধরাশায়ী করল, সেই নিয়ে ওর সহপাঠীদের বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। তার রহস্য ওরা জানত না; জানা সম্ভবও ছিল না। শৈশব থেকে বালিকাবেলায় এসে তিতলি তরতর করে দৈর্ঘ্যে বাড়ছিল, প্রস্থে নয়। এই নিয়ে ওর মায়ের প্রবল দুশ্চিন্তা ছিল। সেটা তীব্র হতো প্রতি শীতে অলোক সপরিবারে কৃষ্ণনগরে এলে। হৃষ্টপুষ্ট ভাইপো-ভাইঝিদের পাশে নিজের রোগাপাতলা ছেলেমেয়েদের দেখে, বিশেষত তিতলিকে দেখে, নতুনবউ আক্ষেপ করত।
শ্বশুরবাড়ির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে অভিযোগ ছিল তার। আদিরামবাটিতে ঠাকুর- দেবতা থাকার কারণে নানারকম বিধিনিষেধ মেনে আমিষ রান্না হয়, সপ্তাহে দু- তিনদিন মাত্র মাছ হয়। তাও রুই কাতলা ইলিশ কিংবা সরপুঁটি জাতীয়। মাংস ডিম রান্নাঘরে ঢোকার প্রশ্নই ওঠে না। সাতগাঁয় এলে বাপ্পারও খুব অসুবিধা হয়। দুবেলা মাছের পদ না হলে রথীনের পরিবারে ভাত ওঠে না, আর সকালে জলখাবারে রোজই ডিম থাকে।
এই নিয়ে নতুনবউ খোঁটা দিলে হেসে উড়িয়ে দেয় বসন্ত, নিজের বিপুল উদরের ওপর ট্রাউজার্স টেনে তুলতে তুলতে বলে–
‘নিরামিষ খাবারের কী দোষ? পেট পুরে ডাল তরকারি খেয়ে আমরা কি বড়ো হইনি? হিমুটা যখন বাঁটুল গোঁসাইয়ের আখড়ায় মুগুর ভাঁজতে যেত ওর কেমন গুলি পাকানো চেহারা হয়েছিল সে তো আর তুমি দেখনি। তিতলি আমার মায়ের ধাত পেয়েছে।’
পাতলা ছিপছিপে চেহারার সরোজার অফুরান প্রাণশক্তি, ভোর থেকে রাত্রি পর্যন্ত একান্নবর্তী পরিবারের নানান ঝক্কি একা হাতে সামলান। আর রোগা হলেও তিতলির মধ্যেও কোনো অস্বাস্থ্যের লক্ষণ নেই, সারাদিন ছুটোছুটি করে বেড়ায়। তবু স্ত্রীর গঞ্জনার ঠেলায় বসস্ত রাতবিরেতে রামকানাইয়ের জন্য দুধ গরম করার অছিলায় শোবার ঘরে একটি ইলেক্ট্রিক হিটারের ব্যবস্থা করল। গোপনে তাতে ছেলেমেয়ের জন্য ডিম সিদ্ধ হয়, অবশ্যই হাঁসের ডিম। এদিকে তিতলির জিভের ধারা এবাড়ির মেয়েদের মতো— ঠাকুরবাড়িতে বিশুকার রাঁধা ধোঁয়ার গন্ধ-লাগা ভোগের খিচুড়ি দেখলে তার জিভে জল আসে, ডিমের আঁশটে গন্ধে তার বমি আসে। ভাতের সঙ্গে চটকে কানাইকে যদিও বা খাওয়ানো যায়, তিতলিকে খাওয়ানো অসম্ভব।
সেবার অলোক প্যারিস থেকে বোনকে এনে দিল মুরগির ব্রথ পাউডার। ‘জানিস বুড়ি, এই পাউডার দুধে গুলে খেয়ে ফরাসী সৈন্যরা হিটলারের বাহিনীর সঙ্গে যুঝেছিল,’ অলোক ঘোষণা করল। ‘শুধু তাই না, যুদ্ধ মিটলে কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্প ফেরৎ কঙ্কালসার ইহুদিরা এর জোরেই আরবদের তাড়িয়ে ইজরায়েল দেশ গড়েছে!’
কিন্তু আদিরামচন্দ্রের ভিটেয় নিষিদ্ধ পাউডার ঢোকানোর ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা যতটা কঠিন, তার চেয়ে ঢের কঠিন সেটি তিতলিকে খাওয়ানো। ওই বস্তু দুধে গুললে উৎকট গন্ধ বের হয়। এবং তারপর তিতলিকে সারা বাড়ি গরুখোঁজা করেও কোথাও পায় না নতুনবউ। বেশি ডাকাডাকি করাও যায় না, যদি জানাজানি হয়ে যায়। তবু কিছুদিনের মধ্যেই সরোজা কীভাবে যেন টের পেয়ে গেলেন, হয়তো তিতলিই রাতে দিদার কাছে গল্প শোনার ফাঁকে ফাঁস করেছিল। বসন্ত যা আশঙ্কা করেছিল, তার ঠিক উলটো প্রতিক্রিয়া হলো।
‘অত লুকোছাপার কী আছে বুঝি না বাপু, জিনিসটা ওষুধ বই তো নয়,’ সরোজা বললেন। ‘ফার্মেসিবাড়িতে অমন কত পশুপাখির নিয্যাসই তো আছে। খাওয়ার পরে মাথায় একটু গঙ্গাজল ছিটিয়ে নিলেই তো হয়।’
কিন্তু তিতলিকে খাওয়ানো গেলে তবে না গঙ্গাজল। জন্মকালে মায়ের পেট থেকে বের হতে চায়নি সে, পেট কেটে বের করতে হয়। বড়ো হয়ে ওঠার সময়েও অনেককাল ওর সেই প্রবণতাটা ছিল। কটু গন্ধের জন্য দক্ষিণের ডার্করুমে ঢুকত না বটে, কিন্তু হেমন্ত জুতোর বাক্সে পিন-হোল ক্যামেরা বানিয়ে দেবার পর যেদিন সকালে সরোজার ঘরে মশারির ভেতর জেগে উঠে বাইরে উঠোনের উলটোনো সিল্যুয়েট দেখা গেল পিনহোল ক্যামেরার মতো, তার পর থেকেই উঁচু পালঙ্কের নীচে জলচৌকিতে রাখা বালিশ লেপের আড়ালে, ভাঁড়ারঘরে মই-লাগানো উঁচু কাঠের মাচায় বড়ো বড়ো চিনামাটির বয়ামের আড়ালে আমসত্ত্ব কাসুন্দির গন্ধে ম-ম অন্ধকারে লুকিয়ে থাকার নেশা পেয়ে বসল তিতলিকে। ইস্কুলে সেই ঘটনার পরেও বেশ কয়েকবার অকারণেই সেই ওই ব্রুম কাবার্ডে লুকিয়ে থেকেছে।
দুর্গাপুজোর ক’দিন আগে নতুনবউ পাউডারের কৌটো খুলে দুধে গুলতে শুরু করেছে, যথারীতি তিতলি উধাও। ওর প্রিয় লুকোনোর জায়গাগুলোয় খোঁজাখুঁজি করেও, আদিরামবাটির সব কটি বাড়িতে খুঁজেও টিকিটি দেখা গেল না। এদিকে দুপুর গড়িয়ে যায়, সরোজার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। বামুনদি বাড়ির কুয়োগুলোয় উঁকি দিয়ে আসে। পশ্চিমে শিয়ালকাঁটায় ঢাকা গর্তগুলোয় দেখে আসে গামা। রামপ্রাণ ফার্মেসি থেকে ফিরে আসেন। বিকেল গড়িয়ে যাবার পর—তখনও বাড়ির কারোর মুখে এক দানা ভাত ওঠেনি— বিশু ঠাকুরবাড়ির তোলাঘরে পুজোর জন্য ধোয়া বাসন-কোসন নিয়ে গিয়ে হার্মাদি সিন্দুকের ডালা তুলে দেখে ভেতরে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে তিতলি, হাতে ধরা দুটি রঙীন ছবির বই, হাইডি আর ছোট্ট রাজকুমার।
.
সোনালি চুলের ছোট্ট রাজকুমার বাস করে ছোট্ট গ্রহে। ছোট্ট মেয়ে হাইডি দাদুর সঙ্গে থাকে সুইস আল্পসের কোলে কটেজে। রাজকুমারের সেই গ্রহে তিনটি আগ্নেয়গিরি, বাওবাব গাছ আর একটি গোলাপচারা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই নেই। হাইডির গ্রামে আছে পিটার নামে এক মেষপালক বালক, ভেড়া, কুকুর, পাখি আর প্রজাপতি। হাইডি স্যুইস আল্পস থেকে রঙিন প্রজাপতি আর পাখি পাঠায় ছোট্ট রাজকুমারের গ্রহে। হলুদ প্রজাপতি আর সবুজ পাখি হামাদি সিন্দুকের ভেতর অন্ধকারে উড়ে উড়ে যাচ্ছিল এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে। বিশুকা এসে ডালা খোলা মাত্রই সেগুলো গিয়ে সেঁটে গেল তিতলির সাদা ভয়েলের টেপক্ষকে, হলুদ সবুজ সুতোর নকশা হয়ে গেল।
সেই দৃশ্য দেখে কেঁপে উঠল বিশু, হাত থেকে তামার হোমকুন্ড সশব্দে মেঝেয় পড়ল। মনে পড়ল, তিতলির জন্মের ঠিক আট দিন আগে দিদিকে স্বপ্নে দেখেছিল সে। সনাতনের ঘোলের নীচে জল কুয়োর মতো স্থির, সেখানে পাশ ফিরে শুয়ে আছে বনলতা। চোখ খোলা, চুলে অসংখ্য উজ্জ্বল কুচো মাছ জড়িয়ে রয়েছে।
নতুনবউকে চাঁদেরডাঙায় হাসপাতালে নিয়ে যাবার পরে সিজারিয়ান করে তিতলি প্রসব হল। সেই স্বপ্নের কথা কাউকে কখনো বলতে পারেনি বিশু। মেয়েমানুষের আত্মা পুনর্জন্ম নিয়ে ফিরে এসেছে, এমন কথা সাতগাঁয় কেউ শোনেনি।
বনলতা যখন নিরুদ্দেশ হলো বিশু তখন সদ্য কিশোর। সেই অনিশ্চিত আতঙ্কের দিনগুলোয় বনলতার প্রতিটি চিহ্ন এই বাড়ি থেকে মুছে ফেলা হয়। শৈশবে তিতলির চেহারায় কিংবা স্বভাবে বনলতার কোনো লক্ষণ ফুটে উঠেছে কি না সে জানে না। সেই স্বপ্নের কথা তার মনে থাকেনি, যদিও তিতলির প্রতি একটা অন্যরকম টান ছিলই। ইস্কুলের পড়া শেষ করে তিতলি যখন বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে, তখন ওর মধ্যে বনলতার স্বাধীনচেতা ভাবটা খুঁজে পাবে বিশু। ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াবে।
কিন্তু সে অনেক পরের কথা, মি’লেডি।
*
তিতলিকে গোলগাল করার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। এদিকে ব্রথ পাউডারের প্রভাবে কানাই অস্বাভাবিক মোটা হয়ে গেল, হাঁটার বয়স হয়ে যাবার পরেও হামাগুড়ি দিতে লাগল। তিতলির মতো ওকে পেট কেটে বের করতে হয়নি, স্বাভাবিক প্রসব হয়। এবার নতুনবউ সন্তান প্রতিপালনের ভার নিজের হাতে তুলে নিল। এবার আর মেথি পোড়ানো তেল, ফণীমনসার পাতায় প্রদীপের ভুষো ধরে ঘিয়ের কাজল, পুরোনো শাড়ি-ধুতি সেলাই করে কাঁথা ইত্যাদি হলো না। তার পরিবর্তে এল টিনের অলিভ অয়েল, প্লাস্টিকের চুষিকাঠি, তোয়ালে, প্যারাম্বুলেটার। নতুনবউয়ের ঘরে ৩৫৩টি মাটির পুতুলের সঙ্গে আরেকটি নতুন পুতুল যোগ হলো।
এই সময় সরোজা নিজেই নিয়মিত বাড়িতে মাংস রান্নার উদ্যোগ নিলেন। শনিবার অফিসে হাফছুটির পর বসন্ত ফিরলে হার্লের গ্লাভবক্স থেকে বেরোয় শালপাতায় মোড়া ছাগমাংস। মেটেঘরের দাওয়ায় উনুনে পেতলের হাঁড়ি চাপে। পেঁয়াজ রসুন ছাড়া দই, হিং গরম মশলা দিয়ে মাংস ভালো করে কষার পর নিভন্ত কাঠকয়লার দমে দিয়ে বসে থাকতে থাকতে আবুলিতে চোখ লেগে আসে সরোজার। দাওয়ার ওপরেই আঁচল পেতে শুয়ে পড়েন। জীবনে কোনোদিন মাংস দাঁতে কাটেননি, কিন্তু তন্দ্রার ভেতর এক অনির্বচনীয় আস্বাদ জাগিয়ে তুলতে থাকেন। পশ্চিমের আমবনে ঘুঘুর ডাকে ঝিমধরা বেলা পড়ে আসে। মলাক্কার জায়ফল, সিংহলের দারুচিনি, মালাবারের মরিচের আশনাইয়ে হাঁড়ির ভেতরটা হারানো সাতগাঁ বন্দরের সরাইখানা হয়ে ওঠে। কুয়োতলা থেকে নিমের ছায়া সরে যাবার পর হাঁড়ি নামিয়ে নদীতে ডুব দিতে যাবার আগে যখন মটকা থেকে হাতায় করে গাওয়া ঘি ছড়িয়ে দেন সরোজা, বাড়িময় দেবীদুর্লভ সুগন্ধ ছড়িয়ে যায়।
বারান্দায় খাঁচার ভেতর অ্যান্টনি চঞ্চল হয়ে ডেকে ওঠে— ‘দেলিসিয়জা! দেলিসিয়জা!’
আবুলির ভেতর কষিয়ে তোলা মাংসের ঝোলের থেকে কিছু কম চিত্তাকর্ষক নয় জল ছেঁচে বুনে তোলা ঘুমপাড়ানি গল্পকথাগুলো। সেবার গ্রীষ্মে বাপ্পারা সাতগাঁয় এলে সরোজা ওকে দুপুরের স্নানে যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে যেতে লাগলেন। ঘাটে সিঁড়িতে বসে বাপ্পা দেখে, দিদা ও তার চানের সখী গঙ্গাজলেরা বুক জলে দাঁড়িয়ে গল্প করে। সংসারে নিত্যদিনের খুঁটিনাটি, অসুখবিসুখ টোটকা-তাবিজ এসোজন- বসোজনের আনাগোনা ছাপিয়ে কথার বেশিটাই জুড়ে থাকে রান্নাঘরের কথা— সকালে কী কী পদ রান্না হলো, রাতে কী হবে, কোন শাকে কী মশলা দিতে হয়, কোন তিথিতে কোন রান্নায় কোন ফোড়ন দিতে নেই, বাড়ির কোন সদস্য কোন পদ খায় না, কবে কার জন্মদিন থাকায় মাচার নধর বেগুনটা পোড়ানো গেল না, চাকা চাকা করে ভাজা হলো, এইসব। দিদার মতোই তার চানের সখীরাও ডুব দিয়ে জলে-জলে বার্তালাপ করে, দূরদূরান্তে গঙ্গাপাড়ে বাপের বাড়ি কিংবা কাশীবাসী আত্মীয়াদের সঙ্গে। সেখানেও খুঁটিনাটি রন্ধনপ্রণালী বিনিময় হয়, ডুব দিয়ে উঠে জলের ঘড়া ভরতে ভরতে, চুলে গামছা পেঁচাতে পেঁচাতে তার রেশ চলতে থাকে।
তিতলি বাপ্পা বড়ো হয়েছে, মন্দির চত্বর আর ফার্মেসির গন্ডি ছাড়িয়ে পাড়া- বেড়ান্তি হয়েছে। আদিরামবাটির আশেপাশে জ্ঞাতিবাড়ি গেলে বড়োরা জিজ্ঞেস করে— ‘আজ কী দিয়ে ভাত খেলি রে? কী রান্না হ’ল আজ?’ বড়ো হয়ে বাপ্পা জানতে পারবে, ইংরেজদের আবহাওয়াচর্চার মতোই এ হলো এক সম্ভাষণের রীতি। রামপ্রাণ বলেন –
‘পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। একদল যারা বাঁচার জন্য খায়, আরেকদল যারা খাবার জন্য বাঁচে। ভাগ্যিস এই দ্বিতীয় দলটা আছে, নইলে আমার মতো বদ্যি-হাকিমের ভাত জুটত না!’
প্রতিদিন সকালে তিনি স্ত্রীর কাছে গচ্ছিত রাখা সিকি আধুলি ফতুয়ার পকেটে ভরে গামাকে নিয়ে ডকবাজারে যান। সেখানে ছাড়িগঙ্গার চরে তোলা ভোরের শিশির মাখা ঝিঙে পটল উচ্ছে কুমড়ো চিচিঙ্গে থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঋতুতে নানান ধরনের শাক, কঙ্কারাঙা থেকে শুরু করে গিমে, এছাড়া বিবিধ কন্দ, যথা ওল মানকচু রাঙালু ইত্যাদি হাত-বাছা করে কিনে বাড়ি ফেরেন। সকালের বাজারে জ্যাস্ত বিলের মাছ আসে, কিন্তু রামপ্রাণ সেদিকে মাড়ান না কারণ এই বাজার থেকেই ঠাকুরবাড়ির ভোগ রান্না হয়। একজন বাঁধা মেচুনি সপ্তাহে কয়েকদিন, বিশেষ করে সধবাদের মাছ খেতেই হয় যে দিনগুলোয়, বাড়ির পেছনে আমবাগানের পথ দিয়ে মাছের ঝাঁকা নিয়ে আসে। সরোজা আর বামুনদি এসে কেনাকাটা করেন। বর্শার আকার রুপোলি আঁশযুক্ত ছাড়া অন্য জাতের মাছ অশাস্ত্রীয়, রান্নাঘরে ওঠে না। স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে শাস্ত্রসম্মত মাছ হলো ইলিশ।
আদিরামবাটিতে ইলিশের ঝাল, ঝোল, পাকা আমড়া ও গুড় দিয়ে অম্বল, ইলিশের শুক্তো, পাতুরি এবং নারকেল-কোরা ইলিশ হয়। কোনো কোনো বাড়িতে জোড়া ইলিশ দেবী সরস্বতীর পুজোয় সিঁদুর মাখিয়ে বরণ করে, এমনকি ওদের বিয়েও দেয়। বর্ষা নামলে নদীখাতে প্রাণ ফেরে, ইলিশের ঝাঁক সাগরের নোনা জল ছেড়ে ডিম পাড়তে মিঠে জলে উঠে আসে। যত ওপরদিকে ওঠে ততই তার গায়ে তেল জমে, সুস্বাদু হয়ে ওঠে। এই সময় সরস্বতীর বুকে ঝাকে ঝাকে ইলিশের নৌকা ভাসে। সাতগাঁর মানুষ ঘাটে স্নান করতে এসে দরদাম করে ইলিশ কিনে কানকোয় আঙুল গিঁথে হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি ফেরে। ইলিশের নৌকা দেখলেই ছেলেবুড়ো ঘাট থেকে চিৎকার করে— ‘কত্তা, আছে নাকি?’ থাকলে জেলেমাঝি লগি টেনে ঘাটে আসে, খোল থেকে তুলে গলুইয়ের ওপর ফেলে। না থাকলে মাথা নেড়ে চলে যায়। সবাই বলে,— ‘কত্তা, আছে নাকি?’ ইলিশের নাম মুখে নিতে নেই।
‘কেন নিতে নেই, মা?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করে।
‘ইলিশ আছে নাকি বলাটা জেলেদের কাছে অপয়া,’ শিউলি বলে। ‘ইলিশের নাম নিলে জালে আর মাছ উঠতে চায় না।’
শিউলি গল্প বলে। ছোটোবেলায় তারা বর্ষাকালে ইস্কুল ছুটির পর ঘাটে গিয়ে ইলিশের নৌকা দেখলেই চিৎকার করত গলুইয়ে বসে দাঁড় টানতে টানতে বলত–‘কত্তা, আছে নাকি?’ রসিক মাঝি— ‘না গিন্নি নেই!’ সে ছিল এক মজার খেলা।
বাজার থেকে ফিরে গামা সব্জির ঝাঁকাটা রান্নাঘরের উঁচু দাওয়ায় নামিয়ে রাখার পর সেদিকে একবার তাকালেই সরোজা বুঝে যাবেন রামপ্রাণ কী পদের কথা ভেবে কোন আনাজপাতি কিনেছেন; বুঝে যাবেন, নাজনে ডাঁটাগুলো দিয়ে লম্বা-করে-কাটা চন্দ্রমুখী আলু আর পোস্ত-সর্ষেবাটার চচ্চড়ি হবে, শুক্তো নয়; বুঝে যাবেন, মোটা কাটোয়ার ডাঁটা দিয়ে কুমড়ো পটল পাঁচ আনাজের তরকারি হবে, নাকি হিং দিয়ে মটর ডাল হবে; কচি লাউটার খোসা মোটা মোটা করে কেটে আদা কালোজিরে দিয়ে ছেঁচকি হবে; এবং মুলো রাঙালু কুলি বেগুন তেঁতুল গুড় আর মেথি ফোড়ন দিয়ে অম্বল হবে, ঠিক যেমনটি শাকম্ভরী দেবী রাঁধতেন।
সব্জির ঝাঁকা রান্নাঘরের দাওয়ায় ওঠার আগে একবার ঠাকুরবাড়ি ঘুরে আসে। সেখানে বিশু ঠাকুর পাঁজি দেখে তিথি অনুযায়ী, এবং তার পোষ্য উনত্রিশ দেবদেবীর রুচি অনুযায়ী, ভোগের আনাজপাতি বেছে নেয়। কাঠের জ্বালে গঙ্গাজল ও সম্পূর্ণ দেশজ মশলায় পেতলের পাত্রে সাদামাটা রান্নায় বিশুকাও অকৃপণ ধরিত্রীর দেবভোগ্য সুগন্ধ জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা রাখে। আর তাই ইস্কুল থেকে ফিরে তিতলি ব্যাগ নামিয়ে ইউনিফর্ম ছাড়ার আগেই প্রসাদী ভোগের লোভে ঠাকুরবাড়িতে ছোটে।
এ বাড়ির পুরুষেরা রন্ধনপটু। শেষ বয়স পর্যন্ত গঙ্গা কবিরাজ ডকবাজারের শাকবুড়িদের দিয়ে জড়িবুটি আনিয়ে ওষুধ তৈরি করতেন, চ্যবনপ্রাশ মকরধ্বজ তৈরি করতেন। সেই ধারা বজায় রেখে রামপ্রাণও বিভিন্ন ঋতুতে আচার মোরব্বা ইত্যাদি তৈরি করেন। খয়রাশোলের বাংলোয় সেবার গন্ধকমেশা জল পান করে বাপ্পার ক্ষুধামান্দ্য হলো, দাদুর বানিয়ে দেওয়া আমলকীর মোরব্বা রোজ সকালে খালিপেটে খেয়ে সে জীবনে প্রথম আবিষ্কার করল ওষুধও এত সুস্বাদু হতে পারে। এবং, তার চেয়েও আশ্চর্য, সেটি খাবার পর জলের স্বাদও মিষ্টি হয়ে ওঠে!
ক্রিসমাসের আগের দিন বসন্ত অফিস ফেরৎ হার্লের গানব্র্যাকেটে বেঁধে নিয়ে এল একটা বাক্স। পরদিন দুপুরে সেটি রান্নাঘরের দাওয়ায় এনে সাড়ম্বরে বাক্স খুলে বের করল নীলচে ধাতু নির্মিত একটি পাত্র, তার বেকেলাইটের হাতল আর ঢাকনার মাথায় ছোট্ট টুপি।
‘এ তো ইকমিক কুকার,’ সরোজা বলল। ‘কলকাতার বাড়িতে এরকম যন্ত্র দেখেছি।’
‘এ তার থেকে ঢের সরেস যন্ত্র,’ বসন্ত বলে। ‘ইকমিক কুকারে রান্না করতে বেলা কাবার হয়। এখন মানুষের হাতে তত সময় কই? এই পাত্রে ডাল রান্না হয় দেড় মিনিটে, আলু সেদ্ধ হয় কুড়ি সেকেন্ডে, আর মাত্র কুড়ি মিনিটে এমন সুসিদ্ধ খাসির মাংস রান্না হয় যে মুখে দেওয়া মাত্রই মিলিয়ে যাবে। রান্না চলাকালীন উনুনের ধারে তোমায় আর ঠায় বসে থাকতে হবে না মা, আঁচল পেতে ঘুমিয়ে পড়তেও হবে না। রান্না হয়ে গেলে পাত্র নিজেই বাঁশি বাজিয়ে জানিয়ে দেবে। আর এই সবই হবে এক আশ্চর্য শক্তির সাহায্যে, যা আধুনিক বিশ্বে শিল্পবিপ্লব ঘটিয়েছে।’ এই বলে সে বামুনদির সন্দিগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে ট্রাউজার্সের সাসপেন্ডার বেল্টে হাত রেখে ঘোষণা করল— ‘স্টিম! ভাপ!’
মাংস ধুয়ে শিলে বাটা মশলা মাখিয়ে বসন্ত সেই পাত্র যখন উনুনে চাপালো, তখনও বামুনদির মুখে সন্দেহের ছায়া ঘোচেনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে যখন তীক্ষ্ণ সিটি বেজে উঠতে লাগল, বামুনদির দুচোখ বিস্ফারিত হলো, সরোজা কানে হাত চাপা দিল, গামা বাগানে কাজ ফেলে ছুটে এল, ডার্করুম থেকে বেরিয়ে এল হেমন্ত, চোখে সাঁটা আই-লুপ, আফিমের চটকা ভেঙে অ্যান্টনি চেঁচাতে লাগল— ‘মের্দা! কালিয়াবোকা! গুখোরপুত!’
ঠাকুরবাড়িতে ভোগের নৈবেদ্য সাজাচ্ছিল বিশু। ওকে ঘন্টা হাতে ছুটে আসতে দেখে বসন্ত দাঁত বের করে বলল—‘তুমি কী ভেবেছিলে বিশ্বকা, রেল ইঞ্জিন লাইন ছেড়ে পাড়ায় ঢুকেছে?’
বেকুব বিশু এই বিচিত্র পাত্রের কারিকুরি শোনার পর হতচকিত দশা সামলে বলল — ‘ভাবলাম বুঝি স্টিমারের ভোঁ, অযোধ্যার নবাব বুঝি এতকাল পরে দলবল নিয়ে লখনউ ফিরে চলেছে!’
বসন্তর বড়াই মোতাবেক মাংস সত্যিই সুসিদ্ধ নরম হলো, কিন্তু তাতে সরোজার রান্নার সেই অনির্বচনীয় স্বাদ ফুটল না। তার কারণ সেই জাদুপাত্র রেল ইঞ্জিনের মতো (কিংবা স্টিমারের মতো) বাঁশি দিতে পারে, কিন্তু ঢিমে আঁচে দুপুরের চোখ-লাগা আবুলিতে স্বপ্ন দেখতে পারে না। বার কয়েক সশব্দ প্রদর্শনের পর বসন্তও উৎসাহ হারিয়ে ফেলল, প্রেসার কুকারটির ঠাঁই হলো ফার্মেসিতে। সেখানে হেমন্তর পরামর্শমতো রামপ্রাণ ঢাকনার মাথায় টুপিটি খুলে তাতে ইন্ডিয়া রাবারের নল লাগিয়ে বিভিন্ন জড়িবুটি পাতনক্রিয়ায় মাদার টিংচার প্রস্তুত করতে লাগলেন। যে বাড়িতে সময় বয়ে চলে উঠোনে ইটের ওপর নিমের ঝিরিঝিরি ছায়ার ছন্দে, বাগানে বড়ো কুরোয় জোয়ারভাটার ছন্দে, ফার্মেসিতে রোগী সমাগম বাড়া-কমার ছন্দে, ঠাকুরবাড়িতে উনত্রিশ দেবদেবীর নিদ্রা ও জাগরণের ছন্দে, ডার্করুমে কম এক্সপোজারে তোলা ছবির সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বলিরেখা কাগজে ফুটে ওঠার ছন্দে, এবং যেখানে কেবলমাত্র বসন্তর দৈনন্দিন নিয়ন্ত্রিত হয় ইন্সটিটিউটের ঘড়ির কাঁটার ছন্দে, সেখানে সময় সাশ্রয়কারী রন্ধনযন্ত্রের কোনো কদর হলো না। সরোজা আগের মতোই শনিবার দুপুরে রান্নার পাট চোকার পর মেটেঘরের দাওয়ায় হাঁড়ি চাপিয়ে আঁচল বিছিয়ে শুয়ে দিবাস্বপ্নের ভেতর বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রোগন জোশ রান্না করতে লাগলেন।
আদিরামবাটির ছেলে হয়েও মাংসের প্রতি বসন্তর অদম্য আকর্ষণ। এদিকে তার বৃহদান্ত্রে জন্মগত ফাসের কারণে ছোটোবেলা থেকেই কোষ্ঠবদ্ধতার ব্যাধি। রামপ্রাণ হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক ও বায়োকেমিক ওষুধপথ্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিয়ে সামলে রাখতেন। প্যারিসে থাকাকালীন নানান ধরনের মাংসের পদ খেয়ে পুরোনো রোগটা ফের চাগাড় দিয়ে ওঠে। এই নিয়ে বিশু মাঝেসাঝেই পেছনে লাগত, চার মাস প্যারিসে থেকেও বসন্ত কেন যে একটা ফরাসী বউ জুটিয়ে আনতে পারল না, তার কারণ ব্যাখ্যা করত
‘সকালবেলায় পতিদেবতাটি ব্রেকফাস্টের টেবিলের থেকেও বেশি সময় ওই চিনেমাটির মালসায় বসে কাটাবে, এ জিনিস কোন্ ফিরিঙ্গি মেয়ে মেনে নেবে তোমরাই বলো!’
সাতগাঁয় সাতসকালে বাপ্পার দেখা একটি পরিচিত দৃশ্য হলো উঠোনে এ মাথা থেকে ও-মাথায় গামছা পরে কানে পৈতে জড়িয়ে বসন্তমামার ব্যাকুল পায়চারি। সকালে ওকে ওই অবস্থায় দেখে বাজারে গিয়ে কোনো-কোনোদিন রামপ্রাণ বাজার থেকে ফিরে দেখতেন বড়ো ছেলে পাছদুয়ার দিয়ে যুদ্ধবিদ্ধস্ত হয়ে ফিরছে। জিজ্ঞেস করতেন—
‘আজ কেমন হলো?’
বসন্ত পরাজিত সৈনিকের গলায় বলত–‘গুটিকয় ছাগলনাদি, বাবা!’
এক যুদ্ধের পর আপিসের ভাত খেয়ে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ: হার্লে ডেভিডসনের নিদ্রাভঙ্গ।
খাদ্য ও তার রন্ধনপ্রণালীর খুঁটিনাটি নিয়ে রথীনের পরিবারের লোকজনদের মতোই আদিরামবাটির সদস্যদেরও তীব্র আসক্তি ছিল। কিন্তু ছেড়ে-আসা সিলেটকে ঘিরে যে টান বাপ্পা দেখত কলুটোলা লেনের আড্ডাগুলোয়, তার বিপ্রতীপে সাতগাঁ নিয়ে মায়ের পরিবারের গর্বের যে ফারাকটা বাপ্পার বালক মনে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল, খাদ্য বিষয়েও তেমনই কিছু কিছু তফাৎ টের পেতে লাগল:
| ২৩/৩ কলুটোলা লেন | আদিরামবাটি | |
| ১ | সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়া হয় | প্রথমে ছোটোরা, রোগীরা, তারপরে বাড়ির পুরুষেরা, সব শেষে মেয়েরা, এই ক্রম অনুযায়ী খাওয়ার নিয়ম |
| ২ | খেতে বসে সকলে কথা বলে, আড্ডা জমে ওঠে | খাওয়ার পর্ব হয় নীরবে, বিশেষ করে পুরুষেরা একটিও শব্দ উচ্চারণ করে না |
| ৩ | মেঝেয়, বিছানায়, সোফায় যত্রতত্র বসে রান্না করা খাবার খাওয়া যায় | রান্না করা খাবার (এমনকি মুড়ি জাতীয় চালের তৈরি শুকনো খাবারও) খাওয়ার নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে |
| ৪ | একে অপরের পাত থেকে, কিংবা কামড়ানো খাদ্য সহজেই খাওয়া চলে | অন্যের পাত থেকে কিংবা ভুক্তাবশিষ্ট কখনোই খাওয়া হয় না (শিশু সন্তানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম) |
| ৫ | এঁটো-সকড়ির ব্যাপারে প্রায় কোনো এঁটো-সকড়ির ব্যাপারে প্রায় কোনো ছুঁৎমার্গ নেই | এঁটো সকড়ি সংক্রান্ত জটিল নিয়মকানুন রয়েছে |
বার তিথি অনুযায়ী খাদ্য অখাদ্যের সূচি এবং উনত্রিশ দেবদেবীর রুচি অনুসারে ভোগের প্রসাদ কলাপাতায় নিয়ে খাওয়ার এবং এঁটো পাতা ফেলার নির্দিষ্ট বিধি আছে। সেই রান্নায় কাঠের ধোঁয়া আর ক্ষীণ ফুল চন্দনের গন্ধে দৈবী প্রসাদের স্বাদ পাওয়া যায় স্পষ্ট। ‘অন্ন হলো পবিত্র, মা অন্নপূর্ণার দান, তার একটিও দানা নষ্ট করতে নেই’–দিদা শেখায়।
এই সত্যটা গামার ভাত খাওয়া দেখে টের পায় বাপ্পা।
সারাদিন নির্বাক পশুর মতো নদী থেকে জল টানা আর নানান ফাইফরমাশ খাটার মাঝে গামা রান্নাঘরের বাইরে দাওয়ায় খেতে বসে। ওর নির্দিষ্ট নীল-সাদা কলাই করা থালায় বামুনদি ভাতের পাহাড় বেড়ে দেয়, পাতের একপাশে তরকারি দেয়, ভাতের চুড়োয় গুঁজে দেয় দুটি কাঁচা লঙ্কা। প্রতিটি দানা আলাদা করে চিবোতে চিবোতে গামার মুখের কঠিন পেশি অদ্ভুত নরম হয়ে আসে। মাঝে মাঝে তরকারিটা পাতের একপাশ থেকে অন্য পাশে সরিয়ে থালায় লেগে থাকা তেলমশলায় ভাত মাখে, লঙ্কা তুলে দাঁতে কাটে, মাঝে মাঝে মুখটা আকাশে তুলে ওর নির্দিষ্ট কাঁসার ঘটি থেকে জল উঁচু থেকে হাঁ-মুখে ঢালে। মনে হয় যেন গভীর নিষ্ঠাভরে পুজো করার মতো কোনো কাজ করছে গামা।
আবার ভাদ্রমাসে যখন রান্নাঘরের চালে অতিকায় চালকুমড়ো ফলে, পাজি দেখে সরোজা কলাইয়ের ডাল ভিজোতে দেন, পরদিন বামুনদি শিলে সেই ডাল বেটে দিলে চালকুমড়ো ছেঁচে মিশিয়ে ভাদ্রের কড়া রোদে কাপড়ের ওপর সারি সারি বড়ি দেন, যেন আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজিয়ে টোপর-পরা সৈন্যদল চলেছে, তাদের সেনাপতি দুই বুড়োবুড়ি, বুড়োর দুব্বোর গোঁফ আর বুড়ির কপালে সিঁদুর, বাপ্পার তখন মনে পড়ে মান্দাসীর কথা। সন্ধ্যাবেলা আটার তাল মাখার সময়ে পুতুল-মানুষ গড়ত মান্দাসী, সেই পুতুলের গোল নাড়ুর মতো মুখে পটল-চেরা চোখ, ঝাঁটার কাঠি দিয়ে ছেঁড়া ঠোঁট। নারকেল পাতার আগুনে সেঁকা হয়ে এলে সেই পুতুল-মানুষের হাত পা মুন্ডু ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেত বাপ্পা আর তিতলি।
এক সন্ধ্যার পর আদিরামবাটিতে ছোটোদের পাত পড়েছে, তিতলি আর কানাইয়ের সঙ্গে মেঝেয় খেতে বসে বাপ্পা বাঁ হাত দিয়ে জলের গেলাস ধরে এ বাড়ির কেউ ভাত খাবার সময়ে জলপান করে না— ঠোঁটে তুলে চুমুক দিতেই নতুনবউ হাঁ হাঁ করে উঠল—
‘গ্যাল গ্যাল, সব কিছু এঁটো হয়ে গেল এবার!’
এরপর শিউলির আদেশে পুরো খাবার সময়টায় বাঁ হাত শূন্যে তুলে রাখতে হল বাপ্পাকে, এবং খাওয়া শেষে হাত ধোয়ার সময় তাকে বাঁ হাতে জলের কল স্পর্শ করতেও দেওয়া হলো না। সেদিন আবিষ্কার হলো, এঁটো সকড়ি সংক্রান্ত যে নিয়মকানুনগুলো এমনকি ছোট্ট রামকানাইও জানে, তিনজনের মধ্যে বয়সে বড়ো হয়েও বাপ্পা তার কিছুই জানে না।
‘জানে না আবার কী! শেখানো হয়নি তাই জানে না! শিউলিকে শুনিয়ে বলল নতুনবউ।
সেদিন বাপ্পাকে তিতলি পাখি-পড়া করে শেখাল একটি সূত্র: রান্না-করা খাবার ডান হাত দিয়ে মুখে তোলা হচ্ছে, সুতরাং মুখ এঁটো > বাঁ হাতে জলের গেলাস নিয়ে মুখে ছোঁয়ানো হচ্ছে, সুতরাং > গেলাসটা এঁটো > এঁটো গেলাস বাঁ হাতে ধরা, সুতরাং > বাঁ হাত এঁটো > এঁটো বাঁ হাতে কাপড়জামা আসবাবপত্র ছুঁলেই সেসব সকড়ি।
ব্লকের সর্বোচ্চ সরকারি আধিকারিকের পুত্র হবার সুবাদে কোনোরকম পরীক্ষা ছাড়াই ইস্কুলে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে বাপ্পা, ওর পাঠ্যবইয়ে ভৌতশক্তি নিয়ে কয়েকটি লাইন আছে। সেই পড়া বোঝাতে গিয়ে একদিন রথীন ওকে বৈদ্যুতিক শক্তি সম্পর্কে বলেছিল, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন কীভাবে ঘুড়ি উড়িয়ে এই শক্তি আবিষ্কার করেন, এবং সুপরিবাহী মাধ্যমে বিদ্যুৎ কীভাবে চলাচল করে সে ব্যাপারে বুঝিয়ে ছিল। সেদিন দুপুরবেলায় তিতলি যখন ওর ক্লাস টিচার লুলু মরিসের মতো তর্জনি উঁচিয়ে এঁটো-সকড়ির পরিবহনতত্ত্ব বোঝাতে লাগল, বাপ্পার মনে পড়ে গেল বাবার মুখে শোনা সেই মার্কিন সাহেবের কথা।
এঁটোপেত্নি তার বোন চুঁচুপেত্নির মতো অতটা অনিষ্টকর নয়, মানুষকে ব্যাঙ বানিয়ে দেয় না। কিন্তু ছুঁচুপেত্নি যা পারে না, এঁটোপেত্নি যে কোনো স্থানে অবাধে চলে যেতে পারে বিদ্যুতের গতিতে। সেজন্য বাঁ হাতে জলের গেলাস ধরে অদৃশ্য এঁটো হয়ে গেলে সেই হাতে আর জলের কলও ছোঁয়া যাবে না। তাহলেই জলের সব পাইপ এঁটো হয়ে যাবে।
‘আর পাইপের জল?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করে।
‘পাইপের জলও এঁটো হয়ে যাবে!’ তিতলির বিজ্ঞের মতো জবাব দেয়।
‘আর যদি কেউ তখন অন্য কোথাও সেই জলে কাপড় কাচে?’
‘তাহলে সেই কাপড়ও সকড়ি হয়ে যাবে!’
‘কেউ যদি তখন সেই জলে চান করে?’
‘সেও সকড়ি হয়ে যাবে!’
‘যদি কেউ বই ছোঁয়?’
‘বইটাও সকড়ি হয়ে যাবে, আর পড়া যাবে না!’
‘যদি কেউ ঠাকুর ছোঁয়? ঠাকুরও কি আর পুজো করা যাবে না?’
‘মোটেই না!’ নতুনবউ বলে। ‘ঠাকুর পাপ দেবেন কিন্তু নিজে সকড়ি হবেন না।’
বাপ্পা শেখে: দেবদেবীরা সদাপবিত্র, গঙ্গাজল সদাপবিত্র, মানুষের ভুক্তাবশিষ্ট খাদ্য হয় এঁটো, দেবতাদের ভুক্তাবশিষ্ট খাদ্য হয় প্রসাদ, তাতে অমৃতের ছোঁয়া লাগে। সেজন্য ভোগের খিচুড়ি পায়েস এত সুস্বাদু হয়।
‘এসব তো সকলেই জানে। বাপ্পাদাদা কেন জানে না, মা?’ তিতলি জিজ্ঞেস করে।
‘বাপ্পাদাদার নিজের বাড়িতে এসবের চল নেই যে,’ নতুনবউ মেয়েকে বলে। ‘কেন নেই, মা?’
‘ওরা যে বাঙাল, ভিটেমাটি রীতি রেওয়াজ সবকিছু ছেড়ে এক কাপড়ে এদেশে চলে এসেছে!’
