সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১১.৫
১১.৫
ইউরোপীয় ছিটমহলগুলো বাদ দিলে হুগলি ও সরস্বতীর মধ্যবর্তী এলাকা যার মধ্যে সাতগাঁও রয়েছে খাতায় কলমে ইংরেজশাসিত। কিন্তু পর্তুগিজদের আমল থেকেই ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত দেবোত্তর সাতগাঁর সার্বভৌমত্ব অটুট থেকেছে। কোম্পানির তহশিলদারেরা এখানে খাজনা আদায় করতে পারেনি। ওলন্দাজডাঙার জমি জরিপ করতে যেবার কলকাতা থেকে আমীনের দল এল শিকল ফিতে নিয়ে, তারাও পর্তুগিজ ফটক পেরিয়ে সাতগাঁর ভেতরে ঢুকতে গিয়ে বাধা পায়। তার কিছুকাল পরে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার একদল লোক এসে সুলতানি টাঁকশালের আশেপাশে ধ্বংসস্তূপে তাঁবু ফেলে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করল। ডকবাজারের কাছে পোস্টাপিস আর পুলিশ চৌকি বসল, বন্দর-হুগলি থেকে সাতগাঁ ছোটো ফিডার রেলের লাইন পাততে শুরু করল লন্ডনের মার্টিন্স লাইট রেলওয়ে কোম্পানি। এরপরে আর ওলন্দাজডাঙার পৌর এলাকায় সাতগাঁর অন্তর্ভুক্তি ঠেকানো যায়নি।
পৌর বোর্ডে সরকারের প্রতিনিধি স্থানীয় কাছারির ম্যাজিস্ট্রেট রাজমোহন চাটুজ্জ্যে। তাঁর উৎসাহে পাগলরাম চক্রবর্তীকে বোর্ডের কার্যকরী সমিতিতে সাতগাঁর প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করার প্রস্তাব এল। পাগলরাম সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। যে জ্ঞাতিসমাজের মাথারা তাঁকে অপাংক্তেয় করেছিল, তাঁদের প্রতিনিধি হয়ে সেই অপমানের শোধ নেবার এই সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না।
বড়দা রামানুজের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান থেকে সেই যে অভুক্ত বেরিয়ে গিয়েছিলেন পাগলরাম, তারপর আর আদিরামবাটিতে পা রাখেননি। গঙ্গারামের সঙ্গে আর মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়নি। দুই ভাইয়ের মধ্যে গড়ে উঠেছিল অভিমানের দুর্লঙ্ঘ্য পাঁচিল। কলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে ওলন্দাজডাঙায় পৌর বোর্ডের মিটিঙে যোগ দিতে এসে সেখান থেকেই ফের ট্রেনে চেপে ফিরে যেতেন। তাঁর উদ্যোগে সাতগাঁর কাঁচা নর্দমা পাকা করার জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়, কাঁচা মাটির রাস্তাগুলোয় ইট পেতে পাকা করা হয়। কলকাতার মতো ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালী বসানো যায়নি, তবে খাটা পায়খানার মল মেথরানিদের মাথায় বয়ে নিয়ে যাবার বিকল্প হিসেবে তাদের জন্য ঠেলাগাড়ির ব্যবস্থা হয়। সাতগাঁর অপরিবর্তনীয় জীবনধারায় সেটাও একটা পরিবর্তন তো বটেই। অনেককাল পরে এক ভাদ্রের গুমোট দুর্গন্ধময় সকালে ইট-বাঁধানো রাস্তায় শূন্য ঠেলাগাড়ির শব্দ ত্রাস সৃষ্টি করবে সাতগেঁয়েদের বুকে
ভাইয়ের উদ্যোগে এই আধুনিক নগরোন্নয়নের ছবি গঙ্গারামের মনে অব্যক্ত গর্বের সঙ্গে ফিরিয়ে আনল এক বিবর্ণ ইতিহাসগাথা, যখন বাংলার সুলতানি আমলের গৌরবময় প্রাণকেন্দ্র ছিল এই বন্দর শহর, ইবন বতুতা থেকে শুরু করে র্যালফ ফিচ পর্যন্ত অসংখ্য ভিনদেশি পর্যটকেরা যার প্রশস্তি লিখেছে।
*
একদিন রাজমোহন চ্যাটার্জির লেখা চিঠি নিয়ে গঙ্গারামের সঙ্গে দেখা করতে এলেন ধুতি-চাদর পরিহিত এক মাঝবয়সী পুরুষ।
‘পত্রবাহক প্রসাদ শাস্ত্রী আমার বিশেষ স্নেহভাজন’, রাজমোহন লিখেছেন,— ‘কাটালপাড়ায় আমার বসতবাটির সন্নিকটে তাঁর ভিটে। কলিকাতার সংস্কৃত কলেজ থেকে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে প্রথাগত শিক্ষা সম্পূর্ণ করে জ্ঞানচর্চায় বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেছেন। বর্তমানে প্রাচীন পুথিপত্রে গবেষণামূলক অনুসন্ধানে নিয়োজিত আছেন। উনি একটি বিশেষ অনুসন্ধিৎসা থেকে আপনার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, যা উনি আপনাকে নিজ মুখেই বলবেন।
ছাপানো ইংরেজি লেটারহেডে বাংলায় লেখা চিঠি, নীচে স্বাক্ষর দেখে আচমকা ক্রোধান্বিত হয়ে পড়লেন গঙ্গারাম। এই লোকটার উসকানিতেই পাগলরাম সাতগাঁর সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে কলকাতায় বাস করতে গিয়েছে। তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয় ভাই, ছোটোবেলা থেকে তিনি বুক দিয়ে আগলে মানুষ করেছেন, রেভারেন্ড বিলের থেকে উপহার পাওয়া ছাপার কল বাড়িতে বসিয়ে তার জীবিকার বন্দোবস্ত করেছেন, সুপাত্রী দেখে বিবাহ দিয়েছেন পিতার যা কাজ সেসবই তিনি বড়ো ভাই হয়ে করেছেন। বড়দা রামানুজ এসব ব্যাপারে কখনো মাথা ঘামাননি, নিজের কাজকর্ম আর সংসারধর্ম নিয়েই থেকেছেন। সেই পাগলরাম চাটুজ্জ্যে ডেপুটির প্ররোচনায় কলকাতায় চলে গেল।
গঙ্গারামের মনে সন্দেহ দানা বেঁধে ওঠে।
‘আমার ভাই পাগলরাম চক্রবর্তী কি চ্যাটার্জিকে দিয়ে চিঠি লিখিয়ে আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে? আপনি পুথিগুলোর কথা জানলেন কীভাবে?’
প্রসাদ শাস্ত্রী, যাকে লোকে আড়ালে ক্যালকাটা শাস্ত্রী বলে ডাকে, মুচকি হাসেন। ‘ওই পুথিগুলোর কথা কলকাতার সারস্বত সমাজে কে না জানে? আমি প্রথম জানতে পারি এশিয়াটিক সোসাইটির কাগজপত্রে, স্যার উইলিয়াম জোনস-এর লেখা পড়ে। দুঃখের বিষয়, ঝড়ে নৌকডুবি হয়ে সেগুলি হারিয়ে যায়। একটি ডায়েরিতে লেখা কিছু নোট ছিল, যেখানে উনি পুথির ভাষা সম্পর্কে ওঁর কিছু ভাবনা লিখে রেখেছিলেন।’
‘কীরকম ভাবনা?’
‘সেটা খুব স্পষ্ট নয়। তবে এমন কিছু ছিল যা স্যার জোনসকে উৎসাহিত করে। খুব সম্ভব চলিত বাংলা ভাষার আদিরূপের একটি আভাস খুঁজে পাচ্ছিলেন। ওঁর এই নোট্স একশো বছরেরও বেশি আগের। এতদিনে অবশ্য বাংলা ভাষা অনেক বদলেছে, বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষা চালু হবার পর।
‘হ্যাঁ, ক্যালকাটা বাংলা!’ গঙ্গারাম তীর্যক হাসেন।–‘যে ভাষায় আপনাদের চাটুজ্যে মশাই কেতাব লেখেন।’
ব্যঙ্গটা গায়ে মাখেন না ক্যালকাটা শাস্ত্রী। না শোনার ভান করে বলে চলেন —
‘জোনস সাহেবের নোট্স থেকে অনুমান হয় ওই পুথিগুলি হাজার বছরের পুরোনো। আমি হিসেব করে দেখেছি, সেসময়ে বাংলায় বৌদ্ধ শাসন ছিল। পুথিগুলি দেখতে পেলে তার মধ্যে থেকে বাংলা ভাষার প্রাচীন আদি রূপের একটা সন্ধান হয়তো পাওয়া যেতে পারে, যে রূপটা বহুকাল আগে গোটা বাংলায় চালু ছিল বলে অনুমান হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষের ভাষার সংমিশ্রণে সেটি অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কয়েক বছর ধরে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ ঘুরে আমি ইতিমধ্যে প্রায় চার শতাধিক প্রাচীন পুথি সংগ্রহ করেছি, কিন্তু তার মধ্যে কোনোটিই জোনস সাহেবের ডায়েরির সেই পুথিগুলোর মতো অত প্রাচীন নয়।’
ক্যালকাটা শাস্ত্রীর কথাগুলো শুনতে শুনতে গঙ্গারামের মনে পড়ে যায় পিতামহ রামাই পণ্ডিতের কথা, পুথি উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। আরেকজন সাহেবের কথাও ছেলেবেলায় শুনেছেন। তিনিও ওই এগারোটি হারানো পুথির সন্ধানে এসেছিলেন।
‘আমি জানি, আরুন্ডেল সাহেব!’ ক্যালকাটা শাস্ত্রী বলেন। ‘স্যার জোনসের পর তিনি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হন।’
‘না, আরেকজন সাহেব ওঁর পরেও এসেছিলেন,’ গঙ্গারাম বলেন। ‘যতদূর শুনেছি তিনি লোকলস্কর নিয়ে বজরা হাঁকিয়ে আসেননি। কলকাতা থেকে পায়ে হেঁটে এসেছিলেন। ‘
তাঁর পরনে ছিল একটা মোটা নীল উর্দি আর পাতলুন। রোগা কঙ্কালসার চেহারা, কোটরাগত চোখ যেন দুর্ভিক্ষ-পীড়িতের মতো। ততোধিক শান্ত আর গোবেচারা ধরনের। এমন ফিরিঙ্গি সাতগাঁয় কোনোকালে কেউ দেখেনি, মানুষটিকে সবার মনে ধরে যায়। আরুন্ডেল সাহেবের জন্য বাগানের ধারে যে দরমার ঘরটা পরিত্যক্ত পড়েছিল, সেখানেই তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়। দিনের পর দিন তিনি ওই ছোট্ট ঘরের মধ্যে দিবারাত্র পুথি পাঠ করে যেতেন। সকালে একবার নদীর ধারে গিয়ে স্নান প্রাতকৃত্য সেরে আসতেন, আর বেরোতেন না। দিনে একবার একটি হাতলওয়ালা টিনের পাত্রে আতপ চাল ও সামান্য কিছু সব্জি, যা ওঁকে রোজ সিধের মতো করে বেড়ে দেওয়া হতো, সেদ্ধ করে খেতেন। কোনোদিকে তাকাতেন না, এমনকি আদিরামের মন্দির একবার ঘুরেও দেখেননি। টানা বারো দিন এভাবে কাটানোর পর ঠিক যেমন করুণ দুঃখী মুখ নিয়ে সাতগাঁয় এসেছিলেন, সেভাবেই আবার পদব্রজে কলকাতায় ফিরে যান। যে পুথির সন্ধানে এসেছিলেন সেটি খুঁজে পাননি। আরুন্ডেল সাহেবের মতো কোনো উপহার সঙ্গে আনেননি তিনি, কিন্তু পরিবারের স্মৃতিতে স্থায়ী ছাপ রেখে যান এই ঋষিপ্রতিম ফিরিঙ্গি।
গঙ্গারামের কাছে বর্ণনা শুনে মাথা নাড়েন ক্যালকাটা শাস্ত্রী।
‘চিনতে পেরেছি মনে হচ্ছে! খুব সম্ভব উনি স্যান্ডর কোরোসি চোনা, সোসাইটির লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। উনি কিন্তু ইংরেজ নন, হাঙ্গেরিয়ান। স্বজাতির শেকড়ের সন্ধানে ভারতে আসেন, কিন্তু কিছু খুঁজে পাননি। আমার ধারণা জোনস সাহেবের নোটসে ওই প্রাচীন পুথিগুলির কথা জেনে ওঁর মনে হয়েছিল পথের হদিশ মিলবে। পরে অন্যান্য নথি ঘেঁটে ওঁর ধারণা হয় পূর্বপুরুষের সেই আদিভূমি রয়েছে হিমালয়ের ওপারে। মরীচিকার টানে তিব্বত যাবার পথে দার্জিলিঙে গিয়ে অজানা জ্বরে মারা যান।’
‘উনি স্বজাতির শেকড়ের খোঁজে সাতগাঁয় এসে পুথি ঘেঁটে কিছু খুঁজে পাননি। আর আপনি বাংলা ভাষার শেকড়ের সন্ধান করতে এসেছেন।’ এই প্রথম নরম আন্তরিক স্বরে বলেন গঙ্গারাম। ‘কিন্তু সেই পুথিগুলো এবাড়ির পুথিশালায় নেই। হয়তো এও এক মরীচিকা!’
ক্যালকাটা শাস্ত্রী কিছু বলেন না, শান্ত প্রত্যয়ের হাসি হাসেন।
ইতিমধ্যে ময়মনসিংহ, ঢাকা, বিক্রমপুর থেকে শুরু করে পুব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর ঘোরাঘুরি করে ব্যর্থ হবার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে। এই সুজলা সুফলা দুর্ভাগা মেধাচর্চার বদ্বীপভূমিতে বানে ভেসে-যাওয়া খড়কুটোর মতো এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে গিয়েছে শত সহস্র মানুষ ও তাদের রাশি রাশি পুথিপত্র। সংস্কৃতের কঠিন পাললিক স্তরের নীচে অসংখ্য আঞ্চলিক ভাষা উপভাষার পাতাল স্রোতের মধ্যে থেকে এক নতুন সজীব বাংলা ভাষার জন্ম হচ্ছে–এমন একটা অস্পষ্ট ছবি ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছেন তিনি কিছুকাল হলো। এখন শুধু প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু সূত্রের, যা চাবির মতো, সেতুর মতো, প্রচলিত বাংলা ভাষার সেই উষালগ্নের অনুমানকে সুস্পষ্ট বৈধতা দেবে এবং, ঈশ্বরের কৃপায়, তাঁর পা দুটি এখনও সেই চাবির সন্ধানে দূরদূরান্তে ভ্রমণে সক্ষম, এবং হাত দুটি যদি সেটি খুঁজে পায়, তাহলে তাঁর দৃষ্টিশক্তিও চিনতে সক্ষম, যদি না সেসব লুঠেরা আগুনে কিংবা উইপোকার গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়ে থাকে।
*
পাগলরামের স্বাস্থ্যহানির খবর পাচ্ছিলেন গঙ্গারাম। ইংরেজ রাজপুরুষদের মতো হোম, কিংবা হোম অ্যাওয়ে ফ্রম হোম শিমলা দার্জিলিং না যেতে পারুক কলকাতার নব্য বাবু ভদ্রলোকেরা ছোটোনাগপুরের শুষ্ক জলহাওয়ায় ভিলা বানিয়ে হাওয়া বদল করতে যাচ্ছে। কেউ কেউ কলকাতা ছাড়িয়ে উত্তরে হুগলির পাড়ে বাগানবাড়িতে, কিংবা রাজমোহনের মতো কাঁটালপাড়ায় দেশের বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করেছে। পারিবারিক চিকিৎসক বিন্দুমাধব মল্লিকের পরামর্শে এই শেষ বিকল্পটা পাগলরামের মনে ধরল। আদিরামবাটি সংলগ্ন পারিবারিক জমিতে আধুনিক ডিজাইনের দোতলা কোঠাবাড়ি নির্মাণ করার বরাত দিলেন রাজেন মুখুজ্জ্যের ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থাকে, যাদের নকশায় গোটা কলকাতায় আর্ট ডেকো স্টাইলের সুদৃশ্য ভিলাগুলো গড়ে উঠছে সেইসময়।
নিওক্ল্যাসিকাল ও ভূমধ্যসাগরীয় স্থাপত্য শৈলীর মিশেলে বৎসরাধিক কাল ধরে ওষধিবাগানের পেছনে ভোজবাজির মতো জেগে উঠতে লাগল সেই সৌধ কলকাতা থেকে আনা বেলজিয়ান কাচের শার্সি, বার্মাসেগুনের ঝিল্লি দেওয়া বড়ো বড়ো জানলা, মেঝেয় মার্বেল পাথর, পেটাই লোহার কারুকার্যময় রেলিঙে সজ্জিত হয়ে কোয়ার্সভিলে ধনী ফিরিঙ্গিদের ভিলাগুলোকে যা অনায়াসে টেক্কা দিতে পারে। নবনির্মিত ভবনে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সাতগাঁয় নতুন তার মধ্যে একটি হল খাটা পায়খানার বদলে বাড়ির পিছনের জমিতে মল-নিকাশী সোক পিট, দ্বিতীয়টি ছাতের ওপর ধাতব শলাকা। গেটের পাশে পাথরের ফলকে বাড়ির নাম লেখা হলো— ‘এল-ডোরাডো’।
সাতগাঁয়ে সর্বাঙ্গীণ অবক্ষয়ের মাঝে এই আধুনিক স্থাপত্যের জৌলুস স্বাভাবিকভাবেই সমাজের চক্ষুশূল হলো, বিশেষত যখন জানা গেল এল-ডোরাডো মানে হলো সোনার শহর। আদিরাম মন্দিরের পাশেই মন্দিরের থেকেও উঁচু একটি ইমারত ওঠায় আপত্তি ঘনীভূত হলো। শুধু তাই নয়, মন্দিরের দোচালার শিখরে যেমন ত্রিশূল রয়েছে, ঠিক তেমনই এল-ডোরাডোর ছাতেও একটি ধাতব ত্রিশূলাকার দন্ড আকাশে খাড়া দেখে মনে হয় যেন আদিরামের শিখর ত্রিশূলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে
গঙ্গারামকে অনুযোগ করে লাভ নেই, ক্রমশই তিনি সংসারের সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিচ্ছেন। জ্ঞাতি সমাজের উস্কানিতে সাড়া দিল না রামানুজের বড়ো ছেলে রামশশাঙ্ক। পিতৃদেবের টোলে পড়ানোর মতো বিদ্যা অর্জন করেনি সে; বেশিরভাগ সময় শিষ্যবাড়ি ঘুরে ঘুরে যজমানি করেই কাটায়। অগত্যা ছোটো ছেলে রামরাম যে সদ্য কাশীর বিদ্যাপীঠ থেকে শাস্ত্রী উপাধি নিয়ে ফিরেছে, যার খড়্গ নাসা, পুরু শিখা আর কঠোর চাহনি দেখে গোষ্ঠীপ্রবীণদের মনে পড়ে যায় রামাই পণ্ডিতের কথা চিঠি লিখল খুল্লতাতকে: সাতগাঁর গৌরব আদিরামের মন্দির, তার চৌহদ্দির মধ্যে শিখর ত্রিশূলের থেকেও উঁচু কোনো ধ্বজাদণ্ড থাকা দেবতাকে তাচ্ছিল্য করার শামিল। পাগলরাম যেন তাঁর নবনির্মিত ভবনের ছাত থেকে ত্রিশূলটি পত্রপাঠ সরিয়ে নেবার ব্যবস্থা করেন।
উত্তরে পাগলরাম লিখলেন
‘এল-ডোরাডোর ছাতে ওই বিশেষ বস্তুটি কোনো শিখর ত্রিশূল নয়। ওটি হলো বাজকাঠি, ইংরেজিতে বলে lightening arrester। লক্ষ করলে দেখবে তামা ও ইস্পাত মিশ্রিত ওই শলাকা দেয়াল বরাবর নীচে নেমে মাটির গভীরে প্রোথিত রয়েছে। মন্দির সংলগ্ন এলাকাটি উন্মুক্ত। আদিরাম না করুন, কিন্তু যদি কখনো ওই স্থানে বজ্রপাত ঘটে তাহলে ওই বাজকাঠি মন্দিরকে রক্ষা করবে। তবুও তোমাদের যদি আপত্তি থাকে, আমি ওটি অবিলম্বে খুলে ফেলার নির্দেশ দেব।’
*
ক্যালকাটা শাস্ত্রীর লেখা চিঠি এল গঙ্গারামের কাছে, ডকবাজারে নতুন পোস্টাপিসের পিওন এসে দিয়ে গেল। চিঠির সঙ্গে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালের একটি সংখ্যা। সুসংবাদ: সেই এগারোটি পুথির সমসাময়িক একটি দুর্লভ পুথি অবশেষে পাওয়া গিয়েছে। এবং সেটি পাওয়া গিয়েছে সেই হাঙ্গেরিয় কোরসি চোমার অসমাপ্ত পথ ধরে, হিমালয়ের বুকে।
যদিও সেটা তিব্বতে নয়, নেপালে। খোদ রাজার গ্রন্থাগারে রয়েছে সেই অভীষ্ট পুথি। তবে এগারোটি নয়, মাত্র একটি, প্রাচীন বাংলা কিংবা নেওয়ারি লিপিতে রচিত, যার কয়েকটি পাতা হারিয়ে গিয়েছে।
মি’লেডি, ক্যালকাটা শাস্ত্রীর এই আবিষ্কার বাংলা ভাষাকে মিশ্র অর্বাচীন বুলি হিসেবে যা চিরকাল সংস্কৃত পণ্ডিতদের অবজ্ঞার শিকার হয়েছে, রাজারামের মতো কট্টর নৈয়ায়িকেরা এমনকি দৈনন্দিন কাজেকর্মেও যে ভাষাকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন
কয়েক শতাব্দী প্রাচীন অতীতের কোলে স্থাপন করল। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহেঞ্জোদড়ো আবিষ্কার যেমন ভারতীয় সভ্যতার কয়েক হাজার বছরের প্রাচীনত্ব চিহ্নিত করেছিল, এটিও তেমনই এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।
কিন্তু চিঠিটি পড়ে, জার্নালে ক্যালকাটা শাস্ত্রীর লেখা নিবন্ধের পাতা উলটে অনেক চেষ্টা করেও গঙ্গারাম কোনোরকম উত্তেজনা অনুভব করতে পারলেন না। কিছুকাল ধরে এক বিচিত্র নৈরাশ্য গ্রাস করেছে তাঁকে। চারপাশটা বদলে যাচ্ছে, সেই বদলটা নিজের ভেতরে অনুভব করছেন। কী যেন একটা শুকিয়ে আসছে, পুড়ে যাচ্ছে।
চারদিকে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের আগুন জ্বলছে। সেই কবে শরতের এক পূর্ণিমার সন্ধ্যায় হুগলির তীরে দাঁড়িয়ে– পায়ের পাতায় ছলাৎছল রুপোলি জল, সিক্ত মাতৃ আঁচলের মতো হাওয়া–পরাধীন দেশের নেটিভ হাকিম রাজমোহনের বুকে যে বিচিত্র ভাবের উল্লাস ফুটেছিল, যা সে মন্ত্রের আকারে ধ্বনিতে গেঁথে নিয়েছিল, সেই একটি মন্ত্র যেন স্বতোৎসারিত ডানা মেলে লক্ষ লক্ষ তরুণ হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়েছে। কোনোকালে যারা রাজমোহনের লেখা পড়েনি তারাও জানবে এই মন্ত্রের শক্তি, দেশমাতৃকার বন্দনা মন্ত্রকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করবে তারা।
ছেলেবেলা থেকে গঙ্গারামের সুখদুঃখের সাথি গুঁফো গোঁসাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে জেলে গিয়েছে। একটি প্রোজেক্টার যন্ত্রের হাতল ঘুরিয়ে চলমান ওরিয়েন্টাল সিনারি দেখিয়ে ফিরিঙ্গি ক্লাবে মেম্বারদের মনোরঞ্জন করত অগস্টিন দুফে। তার মৃত্যুর পর সেটি গুঁফোর হস্তগত হয়। গ্রাম্য মেলায় ঘুরে ঘুরে ছবি দেখিয়ে অন্ন সংস্থান করছিল। ছবির রিলে ফরাসী চিত্রগ্রাহকের তোলা কলকাতার রাজপথে মিছিলে সাদা উর্দিধারী ইংরেজ পুলিশের নির্মমতার দৃশ্য ছিল। এদিকে গ্রামে গ্রামে পুলিশের চর ঘুরে বেড়াচ্ছে। গুঁফোর কয়েদ হলো। নিঃসঙ্গতার বোধ আরও তীব্র হল গঙ্গারামের।
তবু বাগানের ধারে পাগলরামের ভিলাটা যখন গড়ে উঠছে– এই গোটা সময়ে একবারের জন্যেও দেখতে আসেননি তিনি — গঙ্গারামের মনের কোণে
একটু আশা জমেছিল। কিন্তু তিনি জানতেন না, পাগলরাম নিজেও জানতেন না, অনেক অর্থ ব্যয় করে কলকাতার সেরা স্থপতি দিয়ে যে আবাসটি তিনি বানিয়ে তুলছিলেন, এল-ডোরাডোর মতোই সে এক স্বপ্নের মরীচিকা মাত্র। সেখানে কোনোদিন বাস করা যায় না। এও এক স্মারক সৌধ – ঠিক যেমন মৃত্যুর আগে রু দ্য বেনারসের ধারে স্মারক সৌধ বানিয়ে গিয়েছিলেন সাত সাহেবের বিবি সুজানা, যেমন আওয়াধের শেষ নবাব কলকাতার গায়ে গড়ে তুলেছিলেন স্মৃতির লখনউ নগরী। এবং সেই স্বরচিত নস্টালজিয়ার ভারে দমবন্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন।
কিন্তু এল-ডোরাডোর মরীচিকায় পাগলরামের মরাও হলো না। কলকাতার মাটিতে প্রথম পা রেখে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বাতাসে লক্ষণার এসেন্স-পমেটমের বাক্সের মতো যে গন্ধটা পেয়েছিলেন পাগলরাম, সেটা যে আসলে অনির্ব্বাপ্য মৃত্যুর গন্ধ ছিল সেটা বুঝতে পারেননি। গঙ্গারামের কাছে সংবাদটা এল বজ্রপাতের মতো। তারপর রাধারাণী সাতগাঁয় এল পিতার অস্থিকলস নিয়ে। সরস্বতীর ঘাটে বাপ-মা হারা ভাইঝিকে দেখলেন গঙ্গারাম খালি পা, চুল খোলা, দুহাতে ধরা পোড়ামাটির কলস।
স্মৃতিতে ঝলসে বসে যায় ছবিটা। বারে বারে ফিরে আসে, মনে হয় কলসের ভেতর ধিকিধিকি আগুন বুঝি জ্বলে যাচ্ছে। জ্বলছে তাঁর বুকের ভেতরেই। ভেতরটা পুড়ে অস্থি কলস হয়ে গেছে। এ এক বিচিত্র জ্বলনের অনুভূতি, কোনো টোটকাতেই যার নিরাময় নেই। ক্রমশ শয়নে জাগরণে গঙ্গারামের সঙ্গী হয়ে উঠল।
জ্বালাটা বুকের নীচ থেকে শুরু হয়ে উদরের দিকে নেমে ক্রমশ পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। কাঁকড়ার ধারালো দাঁড়া দিয়ে যেন আঁচড় কাটতে থাকে, স্নায়ুতন্তুজাল ছিন্নভিন্ন করে তুলছে অনুভব হয়। আজীবন মানব দেহযন্ত্র অধ্যয়ন করে আসা মানুষটি ক্রমশ টের পেতে থাকেন এক বৈরি স্বজ্ঞা তাঁর ভেতরে বাসা বেঁধেছে। শেষ না করে মুক্তি দেবে না। রাতের পর রাত প্রদাহের জ্বালায় বিনিদ্র, একদিন ভোরের আগে রাত্রির সজীব ধ্বনির ভেতর গঙ্গারাম শুনলেন এক যুবকের কণ্ঠস্বর, বহু দূর থেকে তরঙ্গায়িত হয়ে আসছে
‘নিষ্কাম কর্ম কী? …
ফলের ধারণা বিনা কর্ম কীভাবে চালিত হবে?…
তৃষ্ণা নিবারণের বাসনা বিনা বায়স কীভাবে জলপাত্রে উপল ফেলবে? …
পাত্রের ধারণা বিনা কুম্ভকার কীভাবে কাদার মন্ডকে রূপ দেবে?…’
এক রাতে গোপনে গঙ্গারামের সঙ্গে দেখা করতে এল সেই যুবক–শ্যামবর্ণ ছিপছিপে চেহারা, নিজের খণ্ডিত অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বিচিত্র বিদ্রোহে নেমেছে। আরেকদিন এলেন আলি সাহেব, সাদা চুলে দাড়িতে জোব্বার হিমালয়ের বাতাস। একটি অচেনা গাছের ডাল দিলেন।
ছত্রাকচূর্ণ দিয়ে ডোঙা শর্মার ব্যথার উপশম ঘটিয়েছিলেন আলি সাহেব, ভিনদেশি সাপের বিষ নামাতে পারেননি। গঙ্গারামকে তিনি প্রবল প্রদাহের মুহূর্তে গাছের ডাল দাঁতে কামড়ে ধরতে নির্দেশ দিলেন। ছত্রাকের প্রভাবে অস্তিম প্রহরের আগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন ডোঙা শর্মা, গঙ্গারামের বোধ হলো যেন দাউ দাউ জ্বলতে জ্বলতে ভেসে চলেছে এই দেহের ডোঙা, জলে প্রতিফলিত আগুনের শিখার শিকড়।
কই, বায়ুর্নিলমমৃতমথেদং ভষ্মান্তাং তো নয়, যেমন গুরুদেব উচ্চারণ করেছিলেন মৃত্যুর অব্যবহিত আগে? ক্রতো স্মর কৃতং স্মরোও নয়। গঙ্গারামের স্মৃতিতে ফিরে আসে তারও ঢের আগে কাঁচকলাইয়ের গন্ধে ভরা এক কমলা বিকেলে ডোঙা শর্মার কন্ঠে শোনা চরণ
সোনে ভরলী করুণা নাবী
রূপা থোই নহিকে ঠাবী…
সোনায় ভরেছে এই করুণার নাও, রুপা রাখি কোন ঠাঁই?
তাহলে?
বাহ তু গঙ্গা গঅন উবেসে?
ওরে গঙ্গা গগনে ভাসিয়ে দে তোর নাও…
তবু কেন বিগত কোন জন্মের কথা মনে ভেসে ভেসে আসে? ক্রতো স্মরো কৃতং স্মরো নয়
গেলী জাম বহুড়ই কইসেঁ …
গেলী জাম বহুড়ই কইসেঁ…
আহ, সামনে বইছে সরস্বতী, সর্বাঙ্গে ভিজে পলিমাটি লেপা, তবু দাউ দাউ আগুনে পুড়ছে সবকিছু! আলি সাহেবের দেওয়া গাছের ডালে কামড় দিতে মুখ ভরে ওঠে নোনা রসে নিজেরই রক্ত, পিঠে আগুনের তাপ, চিতা জ্বলছে, জীবন্ত পুড়ছে লক্ষণা, এদিকে পাগলরামের বুকের ওপর হাঁটু চেপে, দুই তর্জনীতে ওর কর্ণকুহর চেপে, নারকেল গাছের মাথা থেকে ভেসে আসা ধারাবিবরণী চেপে, পক্ষীমাতার মতো ওর ওপরে ঝুঁকে পড়ে, পিঠে জ্বলন্ত চিতার তাপ নিতে নিতে গঙ্গা টের পায় কব্জি কামড়ে ধরেছে পাগলরাম, রক্ত ঝরছে, কব্জি, গাছের ডাল, পাগলরাম লক্ষণা আগুন, আগুন
খুন্টি উপাড়ি মেলিলি কাচ্ছী
খুন্টি উপাড়ি মেলিলি কাচ্ছী…
খুঁটি উপড়ে কাছি তুলে নিয়ে চলল করুণার নাও। কাদার ভেতর থেকে গঙ্গারামকে তুলে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে চলে গেল ইংরেজ পুলিশের জাহাজ। তারপর যেভাবে ঘাটে পড়ে থাকা হরিণচর্ম আর গন্ডার খড়গের কোষা বাড়ি নিয়ে গেল গুঁফো গোঁসাইয়ের ছেলে বাঁটুল, সেভাবেই সাতগাঁয় ফিরে আসার অব্যবহিত পরে গঙ্গারাম চক্রবর্তীর বাসাংসি জীর্ণানিবৎ দেহ বায়ুনিলমমৃতমথেদং ভস্মীভূত হলো।
