সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৩.৯
৩.৯
বাল্যকালে বাবা মা দুজনকেই হারিয়ে যে ছোটো ভাইকে তিনি প্রায় পিতার স্নেহে মানুষ করেছেন, সেই পাগলরাম কলকাতায় গিয়ে থিতু হবার পর থেকেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন গঙ্গা কবিরাজ। বিশেষ কারোর সঙ্গে কথা বলতেন না, চিকিৎসায় তেমন মন বসতো না। ভাইপো রামপ্রাণকে আয়ুর্বেদ অনুসারে মানব দেহতন্ত্রের বিভিন্ন দিক, রোগনির্ণয়, গাছগাছড়ার ওষধি গুণাগুণ সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে ক্রমশ চেম্বারের দায়দায়িত্ব তার হাতে তুলে দেবার তোড়জোড় করছিলেন। কলকাতায় চলে যাবার পর পাগলরাম বহুকাল সাতগাঁয়ে আসেনি, এমনকি দুর্গাপুজোর সময়েও না। তার স্ত্রী হিরণ্ময়ী প্লীহার দহন ও রক্তাল্পতায় ভুগছে খবর পেয়ে—পরে রোগনির্ণয় হয় কালাজ্বর— গঙ্গারাম নিজে হাতে বটিকা তৈরি করে লোক মারফৎ পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পাগলরাম বংশে বহু প্রজন্মের অর্জিত বিদ্যা অস্বীকার করে কলকাতার ডাক্তার দিয়ে হিরণ্ময়ীর চিকিৎসা করালেন। তার বেশ কিছুকাল পরে দাদার সঙ্গে কোনোরকম পরামর্শ না করে যখন পৈতৃক জমিতে এল-ডোরাডো গড়ে তুলতে লাগলেন, এবং বলে বেড়াতে লাগলেন তিনি মরতে আসবেন বলে বাড়ি বানাচ্ছেন, লোকমুখে সেই কথা কানে যেতে গঙ্গারাম স্বগতোক্তির স্বরে আক্ষেপ করেছিলেন—
‘শত শত বছর ধরে দেশবিদেশ থেকে মানুষ সাতগাঁয় বাস করতে এসেছে দীর্ঘায়ু লাভের জন্য, আর ও কি না বলছে মরতে আসবে!’
দুই ভাইয়ের মনান্তর ঘুচল না। এদিকে পৃথিবী বদলাতে লাগল দ্রুত। মানুষ আকাশে উড়ল, বেতার তরঙ্গে বার্তা সম্প্রচার শুরু হলো, জগদীশ বোস উদ্ভিদের দেহে উদ্দীপন আবিষ্কার করলেন। কলকাতায় পাগলরামের স্বাস্থ্যের অবনতির খবর পেয়ে গঙ্গারামের মনে আশা জাগল, এইবার বোধহয় সে সাতগাঁয় ফিরে আসবে। কিন্তু পাগলরাম ফিরলেন তাম্রপাত্রে চিতাভষ্ম রূপে। গঙ্গারামের জীবনটা হঠাৎ বিষবৎ হয়ে উঠল। ক্ষুধামান্দ্য শুরু হলো তাঁর, সর্বক্ষণ একটা জ্বলনের অনুভূতি তলপেট থেকে বিকীরিত হয়ে কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো ছড়িয়ে যায় সর্বাঙ্গে। কোনো ওষুধে তার উপশম হলো না, এমনকি হিমালয় থেকে আলিসাহেবের আনা দুষ্প্রাপ্য স্বচ্ছপ্রভ ছত্রাকেও না।
প্রতিদিন সকালে গঙ্গারাম সরস্বতীর ঘাটে স্নানে গিয়ে পেট থেকে বুক পর্যন্ত ভিজে মাটি মেখে বসে থাকেন, তাতে কিছুক্ষণ দহনের উপশম হয়। এবং এভাবেই রোজ আহ্নিক সারেন তিনি। আবার মধ্যরাতে জেগে ওঠেন প্রদাহের জ্বালায়। এই সময় মাঝে মাঝে তিনি একটি কন্ঠস্বর শুনতে পান। প্রথমে মনে হয়েছিল বুঝি মৃত পাগলরামের। কিন্তু তা তো নয়, এ এক অচেনা যুবকের কণ্ঠস্বর। গঙ্গারামকে সে প্রশ্ন করে:
‘গীতার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ৪৭ নম্বর শ্লোকে অর্জুন উবাচ, তোমার কর্মে অধিকার আছে, তার ফলে নেই। কর্মফল যেন তোমার লক্ষ্য না হয়, অকর্মণ্যতায় যেন আসক্তি না হয়। আচ্ছা বলুন তো, যদি তাহা সত্য হবে তবে জাগতিক ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা কী? পৃথিবীর আহ্নিক গতি, গ্রহনক্ষত্রের আবর্তন, এগুলি জীবজগতকে ক্রমাগত আত্মোৎপাদনের ফলের দিকে চালিত করে। নচেৎ কী? নিষ্কাম কর্ম কি প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধাচারণ নয়? আর ফলের ধারণা না থাকলে কী করে কর্মকে চালিত করা যাবে? তৃষ্ণা নিবারণের বাসনা না থাকলে বায়স কি কভু পাত্রে উপল নিক্ষেপ করবে? পাত্রের ধারণা না থাকলে কুম্ভকার কি কভু কাদার তালকে চাকের ওপর ঘোরাতে সমর্থ হবে? কর্মফলের ধারণা বিনা মন কীভাবে ক্রিয়াশীল হবে? নিষ্কাম কর্ম কি সঠিক কর্ম?’
ভাঙা ভাঙা বাংলা উচ্চারণ, কথায় তৎসম শব্দের আধিক্য আর গুরুচন্ডালি দোষ লক্ষ করলেন গঙ্গারাম। ইতিমধ্যে সেই যুবক কণ্ঠস্বর জানিয়েছে যে সে জীবিত ও মৃত একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। কিন্তু কেউই সঠিক পথের দিশা দেখাতে পারেনি। আলিসাহেবের দেওয়া ছত্রাকের ক্রিয়ায় আফিমের মতো একটা আবেশ সৃষ্টি হয়, কিছুক্ষণের জন্য অসহ্য প্রদাহের উপশম হয়। কিন্তু এই কন্ঠস্বর যে কোনোরকম স্নায়বিক বিভ্রম নয়, সে ব্যাপারে গঙ্গারামের মনে কোনো সন্দেহ নেই। এত স্পষ্ট যে মনে হয় মানুষটি যেন ঘরের মধ্যেই রয়েছে।
‘আপনি কে?’ গঙ্গারাম জিজ্ঞেস করেন।
‘আমার নাম অ্যাক্রয়েড ঘোষ।’ কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।
‘আপনি কি বাঙালি?’
‘হ্যাঁ আমি বঙ্গজ কায়স্থ, কোন্নগর গ্রামে আমার বাটি। বর্তমানে আমি আলিপুর জেলে রাজবন্দি। ইংরেজ শাসক আমার নশ্বর দেহটাকে বন্দি করেছে, কিন্তু বিশ্বের কোনো শক্তি আমার সত্তাকে বন্দি করতে পারে না। সে ভেসে বেড়ায় ঈথারে। আমি শীঘ্রই সশরীরে এসে আপনার সহিত সাক্ষাৎ করব।’
সেই সময় কাত্যায়নীর মেয়ে কমলা ওরফে বনলতা ছায়ার মতো গঙ্গারামের কাছে কাছে থাকে, তাঁর খুটিনাটি স্বাচ্ছন্দ্যের খেয়াল রাখে, তাঁর কাছে গণিত ও সংস্কৃত শেখে। আলিসাহেব গঙ্গারামের জন্য দুষ্প্রাপ্য জড়িবুটি নিয়ে এলে সেসব গুছিয়ে রাখে। কীভাবে তাদের সংরক্ষণ করতে হয়, কীভাবে লেবেল লাগিয়ে রাখতে হয় সেসব গঙ্গারাম ওকে শিখিয়ে দিয়েছেন। একদিন ভোরবেলায় গঙ্গারামকে শূন্যে তাকিয়ে বাক্যালাপ করতে দেখে বনলতা ভাবল দাদামশাইয়ের মতিভ্রম হয়েছে। দাদা বিশুকে কিংবা রামপ্রাণকে জানানো উচিৎ কী না ভেবে দ্বিধায় দীর্ণ হলো, মন্দিরে গিয়ে কেঁদে পড়ল আদিরামের পায়ে— ‘হে ঠাকুর, দাদামশাইকে সুস্থ করে তোলো!’
একদিন রাত্রে সত্যিই এলেন সেই বিদেহী কণ্ঠস্বরের যুবক। ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের জন্য বোমা তৈরির ষড়যন্ত্রে বন্দি হয়েছিলেন। আদালতে কোনোরকম প্রমাণ দাখিল করতে না পারায় ওঁকে ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু পুলিশের নজরাধীন। ব্রিটিশ শাসিত এলাকার বাইরে চাঁদেরডাঙায় পালিয়ে এসে উঠেছেন।
চৈত্রের গভীর রাতে একটি পালকি নিঃশব্দে এসে ওযধিবাগানে নাগকেশর গাছের নীচে থামল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন শ্যামবর্ণ, ছোটোখাটো চেহারার যুবক। তার চিবুকে হালকা দাড়ি, পরনে মোটা গুজরাটি ধুতি কুর্তা আর পায়ে তালপাতার চটি। জানা গেল, তিনি বরোদার মহারাজের বিশেষ সচিব ছিলেন, চাকরি ছেড়ে এসে দেশকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করার গোপন ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়েছেন।
তবে তার আসল ষড়যন্ত্র একটি পুরোনো কুটিল প্রকল্পের বিরুদ্ধে, যার রচয়িতা টমাস মেকলে নামে এক ইংরেজ, যিনি মেরি শেলীর উপন্যাসের ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেস্টাইনের মতো এমন এক নেটিভ ভারতীয়ের জাত সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন যাদের দেহবর্ণ হবে কালো, শিরায় বইবে এশীয় রক্ত, কিন্তু রুচি, মতামত, নীতিবোধ হবে ইংরেজদের মতো। মি’লেডি, সেই গথিক পরীক্ষাগারে যুবকের জন্ম। বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীনস্থ সিভিল সার্জেন, পুত্রের নাম রাখেন অ্যাক্রয়েড এবং তার জন্য একজন খাঁটি ইংরেজ গভর্নেস নিযুক্ত করেন। শিশু অ্যাক্রয়েডকে শেখানো হয় ইংরেজি ও হিন্দি, যার সাহায্যে সে তার আয়া ও চাকরবাকরদের সঙ্গে কথা বলত। পাঁচ বছর বয়সে এ দেশে সাহেব বাবালোগদের মতো অ্যাক্রয়েডকে দার্জিলিঙে বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়, এবং ঠিক দু বছর পর সেখান থেকে পাঠানো হয় ম্যাঞ্চেস্টারের একটি গ্রামার স্কুলে, এক অ্যাংলিকান যাজকের হেফাজতে। অ্যাক্রয়েড ঘোষের ভবিষ্যৎ জীবনের পথটি আঁকা হয়েছিল সরলরেখায় সোজা ও সরু : গ্রামার স্কুল থেকে লন্ডনে কিংস কলেজ, সেখান থেকে কেমব্রিজ এবং তারপর ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস। লিখিত পরীক্ষায় পাস করেন কিন্তু ঘোড়ায় চড়ার পরীক্ষায় অসফল হয়ে একুশ বছর বয়সে দেশে ফিরে আসেন অ্যাক্রয়েড। তাঁর মা তখন মৃত্যুশয্যায়। নিজের পুত্রকে তিনি চিনতে পারেননি, দুজনের মধ্যে ভাব বিনিময়ের কোনো ভাষা ছিল না, গর্ভধারিণী ও জাতকের চোখে জল গড়িয়ে পড়েছে কেবল। এরপর অ্যাক্রয়েড বরোদায় চলে যান।
এদিকে বঙ্গভঙ্গের পর বাংলায় তখন প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে, মি’লেডি, জেগে উঠেছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। তাঁকে টেনে নিল সেই আগুন। মৃত্যুশয্যায় মায়ের সেই অব্যক্ত মর্মভেদী চাহনি আর নিজের স্থবির নির্বাক আবেগের স্মৃতি তাকে ঠেলে দিল সন্ত্রাসবাদী রাজনীতিতে। তারপর ঠাঁই হলো ব্রিটিশ কারাগারে।
সেই চৈত্রের শেষরাতে বাগানের ধারে নির্জন মেটেঘরে বসে আমের বনে সড়সড় হাওয়ার শব্দের মাঝে গঙ্গারামকে নিজের জীবনের গল্প বললেন অ্যাক্রয়েড। বাইরে ঘন অন্ধকার, পালকি বেহারার ছদ্মবেশে তাঁর সঙ্গীরা অপেক্ষা করছে, চালতা গাছের ডালে ডানা ঝাপটাচ্ছে বাদুড়েরা।
‘এতগুলো বছর, এবং এতটা লম্বা জার্নির পর আমার চেতনা হলো জন্মের মুহূর্ত থেকেই আমি একটি ব্রিটিশ জেলখানায় বাস করছি। তখন আমি আমার ফেলে আসা জীবনের দিকে ফিরে তাকালাম, টের পেলাম আমার মনটা একটা অটোমেটিক মেশিনের মতো। আমি তার সুইচ বন্ধ করে থামিয়ে দিতে শিখলাম। আর তারপরেই অনুভব করলাম আমার ভেতর থেকে নৈঃশব্দ্য উঠে আসছে, যেমনভাবে কুয়োর ভেতর থেকে জল ওঠে। ভেতরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমি সেই কুয়োর ভেতরে ডুব দিলাম। দেখলাম অন্তরের সেই জলে কোনো রঙ নেই, কোনো গন্ধ নেই, কোনোরূপ সংস্কার নেই। বিদেশি শাসকের কোনো ডিক্রি সেই গভীরে পৌঁছতে পারে না। আর তারপর একদিন সেলের ভেতরেই আবিষ্কার করলাম আমি আমার নশ্বর বন্দি দেহটা থেকে আমার সেই স্বচ্ছ তরল অন্তরাত্মাকে বের করে আনতে পারছি। শূন্য থেকে দেখলাম কম্বলের ওপর আমার দেহটি শুয়ে আছে, তার গায়ে ডোরাকাটা গরাদের ছায়া। তারপর ক্রমশ আমি সেলের বাইরে, জেলখানার চৌহদ্দির বাইরে এসে ঈথারে ভেসে বেড়াতে শিখলাম, খুঁজে পেলাম মহাজাগতিক সত্তার সজীব সমুদ্র। তার ঢেউয়ে ঢেউয়ে অবিরাম ধ্বনিত হচ্ছে কোটি কোটি ভাষা, যা আমি এতগুলো দেশি বিদেশী ভাষা শিখেও বুঝতে পারি না। আস্তে আস্তে টের পেলাম এই শূন্যতার সমুদ্রে জালের মতো যে এত অসংখ্য ভাষা, তা শুধু বিশ্বের যেখানে যত জীবিত ভাষা আছে তাই নয়। যে ভাষাগুলো হারিয়ে গিয়েছে সেগুলিও আছে। আর সেই মৃত ভাষায় কথা বলছে বহুকাল আগে মৃত মানুষেরা। মৃতেরা মৃতের সঙ্গে কথা বলছে, জীবিতেরা মৃতের সঙ্গে কথা বলছে। এভাবেই আমি একদিন মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারলাম, আরও অনেকের সঙ্গে, আমি চেতনার নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাষাতরঙ্গে ভেসে বেড়াতে লাগলাম। এভাবেই একদিন শুনলাম এক জীবিত মানুষ তাঁর মৃত ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছেন — আর আপনাকে খুঁজে পেলাম!’
‘তুমি কি সেই উজ্জ্বল পথের সন্ধান পেয়েছ, যার কথা সেদিন বলেছিলে?’ গঙ্গারাম জিজ্ঞেস করলেন।
‘হ্যাঁ, আমি সেই পথেই বেরিয়ে পড়ছি। যাবার আগে আপনাকে বিদায় জানাতে এলাম।’ এই বলে গঙ্গারামকে হাতজোড় করে প্রণাম করলেন অ্যাক্রয়েড ঘোষ, কিন্তু পাদস্পর্শ করলেন না।
যখন তিনি পালকিতে উঠলেন, দূরে কোয়ার্সভিলে গির্জার ঘড়িতে চারটের ঘন্টা বাজছে, অন্ধকার ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে। ওঁর সহচরেরা পালকি নিয়ে হুগলির ঘাটের দিকে গেল, যেখানে একটি নৌকা ওঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। পালকিটা সাতগাঁর ঘুমন্ত জনপদ ছেড়ে, ধর্মতলা ছাড়িয়ে কেরেস্তান গোরস্তানের পাশের মেঠো গলিপথ দিয়ে এগিয়ে চলল চাঁদেরডাঙার দিকে। মার্টিন্স কোম্পানির রেললাইনের সাঁকোর নীচেটা গুহার মতো, সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশটা পার হতে যেতেই ভেতরে দুপাশ থেকে লাফ দিয়ে উঠল সাদা পোশাকের ইংরেজ পুলিশ। সার্জেন্ট পালকির পান্না-আঁটা দরোজার দিকে রিভলভার তাক করে চেঁচিয়ে উঠল –‘ইউ আর আড্ডার অ্যারেস্ট, মিস্টার ঘোষ!’
পান্না খুলতে দেখা গেল ভেতরে কেউ নেই। এক কোণে পড়ে আছে কোরা ধুতি, চাদর আর তালপাতার চটি একজোড়া। মানুষটি তার ভেতর থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, যেভাবে খোলস ছেড়ে রেখে যায় সাপ, যেভাবে গুটি কেটে বেরিয়ে যায় প্রজাপতি।
চাঁদেরডাঙা ফরাসী উপনিবেশ, কিন্তু মার্টিন্স লাইট রেলওয়ে ব্রিটিশ কোম্পানি। রেললাইন গিয়েছে যে সরু জমির ওপর দিয়ে সেখানে ব্রিটিশ আইন চলে। কলকাতা থেকে পুলিশের দলটি এসে লুকিয়েছিল সাঁকোর নীচে। তখন ভোরের শান্ত হুগলির বুক চিরে পোর্তোহাটা আর্মানিডাঙা ওলন্দাজডাঙার জনহীন ঘাটগুলো পেরিয়ে ভাটির দিকে চলেছে এক আট দাঁড়ির ছিপ, তাতে বসে আছেন এক দিশি সাহেব। তাঁর পরনে থ্রি-পিস স্যুট, মাথায় বোলার হ্যাট, চোখে প্যাসনে, হাতে রুপো বাঁধানো ছড়ি। ঠিক এই পোশাকেই তিনি সতেরো বছর আগে পেসিফিক অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল কোম্পানির জাহাজে বিলেত থেকে কলকাতায় এসে নেমেছিলেন। আজ চলেছেন করমন্ডল শিপিং রুটে পন্ডিচেরিগামী জাহাজ ধরতে।
.
এই ঘটনার ঠিক পাঁচ দিন পরে চৈত্র সংক্রান্তির শেষ রাতে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম থেকে দুটি স্টিমার হুগলি নদী দিয়ে উজান পথে এল। একটি সোজা গিয়ে ভিড়ল বন্দর-হুগলির জাহাজঘাটায়, অন্যটি হুগলি খাল দিয়ে সরস্বতীতে ঢুকে উজিয়ে এল সাতগাঁয় আদিরামবাটির নিকটস্থ ঘাটের কাছে। রবারের ভেলায় পাঁচজন সশস্ত্র কনস্টেবল ও এক গোয়েন্দা নিয়ে সাহেব অফিসার এসে নামল সিঁড়িতে। জলের ধারে তখন গঙ্গারাম চক্রবর্তী সর্বাঙ্গে মাটির প্রলেপ দিয়ে পদ্মাসনে বসেছিলেন, দেখে চেনার উপায় নেই। তিনটি ধাপ ওপরে তাঁর আহ্নিকের হরিণচর্মের আসন আর গন্ডারের খড়্গের কোষা দেখে গোয়েন্দা সনাক্ত করল। নিরস্ত্র কর্দমাক্ত একজন অশীতিপরকে গ্রেপ্তার করার জন্য এত বিপুল আয়োজন করে এসে অফিসার বেশ অস্বস্তির সঙ্গেই অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টটি পড়ল। গোয়েন্দা সেটি বাংলায় তর্জমা করতে যেতেই গঙ্গারাম বাঁ হাত তুলে তাকে নিরস্ত করলেন। তারপর তিনি বুক জলে নেমে তিনবার ডুব দিলেন, গায়ের মাটি ধুয়ে পরিষ্কার করলেন, গলায় উপবীতটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মার্জনা করলেন, দু হাতের তালু কোষবদ্ধ করে বসন্তের শেষ দিনে উদীয়মান সূর্যের দিকে ফিরে জলাঞ্জলি দিলেন। অবশেষে জল থেকে উঠে অশক্ত পায়ে এগিয়ে গেলেন ভেলার দিকে। সাহেব অফিসার তাঁর বাহু ধরে উঠতে সাহায্য করল।
পুরো ঘটনাটি ঘটতে তিন মিনিটও লাগলো না। ঘাটে কেউ সাক্ষী ছিল না। তবে পাড়ের ওপর কিছুটা দূরে পোড়ো বর্গিব্যাটারির ছাত থেকে সেই দৃশ্য দেখেছিল বাঁটুল নামে এক বালক। প্রতিদিনের মতো সেদিন ভোরেও বর্গিব্যাটারির ছাতে উঠে একা একা শরীরচর্চা করছিল সে। গঙ্গারাম চক্রবর্তীকে সে চিনত। বাল্যকালে তিনি তার বাবা গুঁফো গোঁসাইয়ের বন্ধু ছিলেন, এ কথা সে বাবার মুখে বহুবার শুনেছে। ইংরেজ পুলিশ গুঁফোকে গ্রেপ্তার করে জেলে পোরে। সেই দৃশ্য চোখের সামনে দেখেছে বাঁটুল, কিছু করতে পারেনি। এবারও সে দূর থেকে অসহায়ের মতো দেখল, এবং খবরটা তৎক্ষণাৎ সাতগাঁয়ে ছড়িয়ে দিল।
