সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৪.৭
8.৭
সেদিন সন্ধ্যায় সেই যে হেমন্ত বাড়িতে ফিরল, আর কোনোদিন কমিউনে যায়নি। এবং কাকতালীয়ভাবে ঠিক তার পরদিনই বসন্ত ওকে এমন একটি জিনিস দিল যেটি বহুকাল ওর সম্পূর্ণ মনোযোগ অধিকার করে থাকবে। বাইরের জটিল কঠিন পৃথিবীটা ছেড়ে কালো কাগজে মোড়া প্রায়ান্ধকার ঘরে সে সম্পূর্ণ একা কাটাতে পারবে।
সেটি একটি কোডাক সিক্স ২০ ব্রাউন ক্যামেরা। প্যারিসে স্বল্পকাল প্রবাসের শেষ দিকে বসন্ত ক্যামেরাটি কিনেছিল বিখ্যাত দ্রষ্টব্যের কিছু কিছু স্মৃতি ধরে রাখতে, যেমন সবাই করে। ফোটোগ্রাফি নিয়ে আলাদা করে ওর কোনো উৎসাহ ছিল না। মার্সেই বন্দর থেকে জাহাজে উঠে ফেরার সময়ও কিছু ছবি তোলে সে। তারপর দেশে ফিরে চাকরির চাপ ও রেফারেন্ডাম-পরবর্তী কোয়ার্সভিলের নানাবিধ ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে ক্যামেরার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুলে যায়। অনেককাল পরে একদিন দেরাজ ঘাঁটতে গিয়ে যখন সেটি খুঁজে পেল, সমুদ্রের নোনা হাওয়ার প্রভাবে ক্যামেরার কলকব্জায় বিচ্ছিরিভাবে মরচে ধরেছে, বিভিন্ন অংশগুলো এমনভাবে জুড়ে গিয়েছে যে হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা ছাড়া সেটি খোলা অসম্ভব। যন্ত্রঘটিত যেকোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে বসন্ত চিরকালই যেটা করে এসেছে, তাই করল ক্যামেরাটি ভাইয়ের হাতে তুলে দিল।
এক মার্কিন ইনফ্যান্ট্রিম্যানের ফেলে-যাওয়া ইয়ারফোন আর ফার্মেসির গ্যালেনা স্ফটিক দিয়ে রেডিও তৈরি করল হেমন্ত। তারপর কিছুদিন মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির কারিকুরিতে ডুবে রইল। রেডিও সেটটিকে ক্রমশ আরও জটিল ও সূক্ষ্ম করে তুলতে লাগল। তারপর, যেমন ওর স্বভাব, কিছুকালের মধ্যেই উৎসাহ হারাতে থাকল, এল-ডোরাডোর লাইব্রেরিতে বিজ্ঞান প্রযুক্তির অন্য শাখায় মনোযোগ সরতে থাকল। এরপর ওর জীবনের মোড় ঘুরল, কমিউনিজমে দীক্ষিত হলো। সেই মোড় থেকে ধাক্কা খেয়ে আবার আদিরামবাটিতে ফিরে আসার পরে-পরেই পেয়ে গেল নতুন এক অবলম্বন।
মরচে-ধরা কোডাক ব্রাউনিটা হাতে নিয়ে হেমন্ত ফিরে পেল সেই চিরচেনা উত্তেজনা, যা সে বারে বারে কুয়োর ওপর জোয়ারভাটার মিটার বসানোর সময়, জাদুলণ্ঠনের কাচে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত করার সময়, স্ফটিক খণ্ডে সেলাইয়ের সূচ ছুঁইয়ে ইয়ারফোন কানে চেপে ধরার সময় অনুভব করেছে। সেই উত্তেজনার অভিমুখ নির্জীব ধাতব যন্ত্রপাতি থেকে এক রক্তমাংসের ঘুম-ঘুম চোখের, যেন- কতকালের-চেনা নারীর প্রতি কেন্দ্রীভূত হতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে সে। সিক্স ২০ মডেলের ব্রাউনিটায় খাঁজকাটা ধাতব চাদরের বাক্সের মাথায় বসানো ভিউফাইন্ডার, ফিক্সড অ্যাপার্চার লেন্স আর সিঙ্গল স্পিড রোটারি শাটার। নারকেল তেল আর ঘড়ি সারাইয়ের যন্ত্রপাতি দিয়ে ঘষে ঘষে স্ক্রু ও কব্জায় নাছোড় নোনা হাওয়ার জং ছাড়াতে তিনটে দিন লাগল। ডালাটা খুলতে পেরে দেখল ভেতরে ফিল্ম ভরা রয়েছে, সেলুলয়েডের রোলে মিহি নীলাভ ছত্রাক। এরপর সে দক্ষিণের ঘরের দেয়াল, জানলার খড়খড়ির ফাঁকগুলো কালো কাগজ সেঁটে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার করল, ৪০ ওয়াটের বালবে লাল কাপড়ের শেড দিয়ে ফোটোগ্রাফিক ডার্করুম বানিয়ে নিল। বসন্তর হাতে ফর্দ ধরিয়ে কোয়ার্সভিলে ঘড়িঘরের কাছে নিউ দুফে স্টুডিও থেকে ডেভেলপার আর ফিক্সারের রাসায়নিক আনিয়ে পাঁচ দিন ধরে গভীর ধৈর্যে জড়ানো রোল থেকে সেলুলয়েডের ফিল্ম কেটে কেটে বেশিরভাগটাই উদ্ধার করে ফেলল। তারপর সেগুলি খামে ভরে বসন্তকে দিয়ে স্টুডিওয় পাঠালো প্রিন্ট করে আনতে। দুই বর্গ ইঞ্চি সাটিন কাগজের ওপর ঝাপসা স্মৃতি আর ছত্রাকের কুয়াশায় ঘেরা আইফেল টাওয়ার, সঁঝেলিঝে, মমার্তের অলিগলি, কাফে, মুলা দ্যে লাগ্যালের মাথায় উইন্ডমিলের পাখা, ভার্সেইয়ের প্রাসাদ, গ্যের দু নাদ রেলস্টেশনের চত্বরে অন্ধ বেহালাবাদক, পিগালেতে অলোকের বাসায় রবিবারের আড্ডা, ভারত মহাসাগরে সূর্যাস্ত, পোর্ট অফ ইডেনের সিগাল, জাহাজের ডেকে উদ্দাম পার্টির সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর ছবি ফিরে পেয়ে খুশিতে ডগমগ হলো বসন্ত।
কোয়ার্সভিলে মঁসিয়ে দুফের মূল ডাগেরোটাইপ স্টুডিওটি বহুকাল আগে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবার পর কোয়ার্সভিলে ওঁর নামে তিনটি ছবি তোলার দোকান ছিল। তাদের মধ্যে নিউ দুফে স্টুডিও প্রতিযোগিতার বাজারে পাল্লা দিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনে সেজে উঠছে। বসন্ত জলের দরে ওদের পুরোনো ছবি ডেভেলপিং ও প্রিন্টিং-এর সরঞ্জাম কিনে ভাইকে উপহার দিল। পার্টি কমিউন ছেড়ে হেমন্ত বাড়িতে ফিরে আসায় বাড়ির অন্যদের মতো সেও নিশ্চিন্ত হয়েছে।
ইতিমধ্যে হেমন্ত ক্যামেরাটির ছত্রাক-লাগা লেন্স ও ভেতরের অংশ পরিষ্কার করেছে। দক্ষিণের ঘরে ডার্করুম সাজিয়ে তোলার পর সে শাটার স্পিড ও অ্যাপার্চার নিয়ন্ত্রণ করে স্বল্প আলোয় ছবি তোলার পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করল। মডেল হিসেবে ব্যবহার করল ছোটো বোন শিউলিকে কখনো ওষধিবাগানে নাগকেশর গাছের নীচে, কখনো নিমের ঝিরিঝিরি আলোছায়ায় (যে ছবিটি রামপ্রাণ শিউলির ঠিকুজি সহ পাঠাবেন গৌহাটিতে খোকার ঠিকানায়)। এভাবে ক্রমশই সে রাত্রিবেলা সাধারণ বৈদ্যুতিক আলোয়, এমনকি মোমবাতির আলোতেও মানুষের মুখচ্ছবি, পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় মন্দিরের ছবি, নিমগাছের নীচে চিন্তামণির ছবি তুলতে লাগল। সেই সময় স্টুডিওয় কিংবা বিয়ে ইত্যাদি অনুষ্ঠানে রাতের বেলা ছবি তুলতে যে ধরনের ফ্ল্যাশ বাল্ব ব্যবহার হতো, তাতে প্রায়শই ছবির মানুষদের চোখ বন্ধ দেখা যেত। কখনো আবার নববধূর চোখের মণিতে আলোর ঝলকানির প্রতিফলন ফুটে উঠে প্রেতিনীর মতো দেখাতো। ছবি ছাপার পরে চীনা কালি দিয়ে সেই রেড-আই মেরামত করতে হতো। হেমন্ত কোডাক ব্রাউনির মতো সাদামাটা ক্যামেরার খোলনলচে বদলে সেই সমস্যার সমাধান বের করে ফেলল।
শুভ সামাজিক অনুষ্ঠানে ফোটোগ্রাফার হিসেবে হেমন্তকে ডাকার ব্যাপারে সমাজে বাধা ছিল, মেথর মিছিলের স্মৃতি সাতগাঁর মানুষ চট করে ভুলতে পারেনি। তবে বাড়ির অশীতিপরেরা চিরকালের মতো কাশীবাসী হবার প্রাক্কালে ছবি তোলানোর একটা রেওয়াজ ছিল, যে বাড়িতে মানুষটি আস্ত জীবন কাটিয়েছেন তার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখার জন্য। এই কাজটা হেমন্ত বিশেষ আগ্রহ সহকারে করে দিত, এবং ছবির কাগজের দামটুকু ছাড়া কোনো বাড়তি মজুরি নিত না। তার কারণ প্রাকৃতিক আলোয় দীর্ঘ এক্সপোজারে ছবি তোলার চ্যালেঞ্জটা এসব ক্ষেত্রে পূর্ণমাত্রায় পাওয়া যেত, অশীতিপর মানুষটিকে বহুক্ষণ লেন্সের দিকে চোখ নিবদ্ধ করিয়ে বসিয়ে রাখা যেত, যতক্ষণে সুপ্রাচীন মুখের সব বলিরেখাগুলো, বার্ধক্যের কুয়াশার ভেতর থেকে চোখের মণির সবটুকু আলো, নিজের ঘরবাড়ি আত্মীয়পরিজন ছেড়ে চিরবিদায়ের আবেগঘন প্রহরের সব তীব্রতাটুকু, সব রিক্ততা আর সমর্পণ, সময়ের যাবতীয় ভার আর ধৈর্যের পাহাড়, যা তাঁরা জীবনে প্রথম এক অচেনা পৌরাণিক শহরে গিয়ে চিরকৃপণের মতো ব্যয় করবেন মোক্ষলাভের প্রলম্বিত অপেক্ষায় যতক্ষণে এই সবকিছু সেলুলয়েডের রাসায়নিকে সঞ্চারিত হয়, মি’লেডি।
এইসব ছবির একটি করে কপি হেমন্ত নিজের কাছে রেখে দিত বিভিন্ন চিত্রগত বৈশিষ্ট্যের জন্য। এবং এভাবে পরাণ ডাক্তারের চেম্বারে শেলফে সারি সারি কালো রেক্সিন-বাঁধানো নোটবুকে যেমন সাতগাঁ ও সংলগ্ন অঞ্চলের আধিব্যাধির এক মহাফেজখানা গড়ে উঠছিল ধীরে ধীরে, সেভাবেই হেমন্তর কালো-কাগজে- মোড়া দক্ষিণের ঘরে জমে উঠতে লাগল আস্ত একটি প্রজন্মের মুখচ্ছবির মিউজিয়াম— সেইসব প্রবীণেরা, যাঁরা এই দ্যাবা পৃথিবীতে আর কোনোদিন না-ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
.
ওই মরচে-ধরা ক্যামেরাটা যে বিপথগামী ভাইকে এভাবে এক নতুন অনুসন্ধানের পথে ঠেলে দেবে, এমনকি উপার্জনের পথেও, সেটা বসন্ত কল্পনাও করতে পারেনি। এর ফলে সে নিজে যে এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে সেটাও কখনো ভাবেনি। এক শুক্রবার সকালে অন্যান্য দিনের মতোই মগভর্তি গরম চায়ে কোষ্ঠবদ্ধতার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ব্যর্থ লড়াইয়ের পর তৈরি হয়ে নিয়ে হার্লে ডেভিডসনের পিঠে চেপে বসন্ত আপিস গিয়েছে। নতুনবউ উঠোন থেকে হাত নেড়ে স্বামীকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানিয়ে এসেছে। শোবার ঘরে উঠে এসে রেডিওয় অনুরোধের আসর চালিয়ে তার ৩৫৩টি পুতুলের ধুলো ঝেড়ে ঘরদোর গোছাচ্ছে। এই সময় একটি দেরাজের ভেতর হাবিজাবি জিনিসের মধ্যে সে নিউ দুফে স্টুডিওর ছাপ মারা একটি খাম খুঁজে পায়। খামের ভেতর এক গোছা ফোটোগ্রাফ, যার ওপরের দিকেই দাদা অলোকের প্যারিসের বাসার ছবি। যে বাসাটির কথা সে অনেকবার নানাভাবে শুনেছে কিন্তু কখনো চোখে দেখেনি, যে মেপলের ছায়াঘেরা মমার্তের উঁচুনীচু গলিপথগুলো বহুকাল কল্পনা করেছে কিন্তু কখনো সেখানে পা রাখেনি, আইফেল টাওয়ারের ছায়ায় পায়রার ঝাঁক, প্লাজ শার্ল দ্য গলের ধারে সুসজ্জিত দোকানগুলো, বাইরে বিখ্যাত বিপণির নাম লেখা ব্যাগ কাঁধে একাকী নারীর কপালে রোদচশমা, তাতে প্রতিফলিত আর্ক দে ত্রিয়ম্ফ, ফুটপাথে কাফের একাকী টেবিলে দুটি কাপ ডিশ, সেইনের ধারে বেঞ্চিগুলোয় জোড়ায় জোড়ায় নারীপুরুষের জীবনগুলো, যার মধ্যে একটি তার নিজের হতে পারত, হবার কথা ছিল, কিন্তু… ভাবতে ভাবতে, পর পর ছবিগুলো খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে নতুনবউ চলে গেল মার্সেইয়ের জাহাজঘাটায়, এডেন বন্দরের আকাশে সিগালের ওড়াউড়িতে, জাহাজের ডেকে কুকুর নিয়ে নাবিকের কারসাজিতে, সহযাত্রীর দলে ভিড়ে বসন্তর আমোদে।
একটি ছবিতে এসে চোখ আটকে গেল: রৌদ্রকরোজ্জ্বল ডেকের ওপর একদল খালি গা শর্টস-পরা যুবক আর বিকিনি-আঁটা যুবতীর মাঝে দেখা যাচ্ছে বসন্তকে। প্রায় সকলেরই হাতে বিয়ারের বোতল, কারো ঠোঁটে সিগারেট, একে অপরের কাঁধ জড়াজড়ি করে রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে। বসন্তর দুপাশে দুই সুঠাম এশীয় যুবতী, তাদের মধ্যে একজন পেছন থেকে বসন্তর কোমর জড়িয়ে ধরেছে, অন্যজনের কাঁধের ওপর বসন্তর হাতটা ফেলা রয়েছে। ওই ছোট্ট ঝাপসা ফোটোগ্রাফেও খুঁটিয়ে নজর করলে দেখা যায় বসন্তর আঙুল সেঁধিয়েছে বিকিনি টপের ফিতের নীচে, ডালিম-সদৃশ বুকের কয়েক মিলিমিটার ওপরে। সবাই হাসছে, কিন্তু কালো রোদচশমায় ঢাকা মেয়েটির চোখের অভিব্যক্তি দেখা যাচ্ছে না। যুগপৎ ঈর্ষা আর কৌতূহলে পুড়তে পুড়তে নতুনবউ ওর হবু স্বামীর জাহাজী রোমান্সের আরও প্রামাণ্য চিহ্ন খুঁজতে শুরু করে দিল। কিন্তু চিঠিপত্র ডায়েরি চিরকুট কাগজপত্র তন্ন তন্ন করে হাতড়েও কিছুই পাওয়া গেল না। আলমারি দেরাজ সব লন্ডভন্ড করে ক্রমবর্ধমান অন্ধ রাগ আর আত্মগ্লানির ভেতর ওয়ার্ডরোবের একেবারে ওপরের তাকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেল ফরাসী যৌন পত্রিকা ক্ল্যাপ এক্স-এর চারটি পুরোনো সংখ্যা আর দু বোতল ক্যাবারনে স্যভিনিয়। মদের বোতল দুটি দেশে ফেরার আগে ইকোল দ্য লাং-এ সহপাঠীদের দেওয়া উপহার। বসন্ত এতকাল যত্ন করে জমিয়ে রেখেছিল, যদি কোনোদিন ফের গণভোট হয়ে কোয়ার্সভিল-চাদেরডাঙা আবার ফ্রান্সের অন্তর্ভুক্ত হলে তাহলে ওই বোতল খুলে উদ্যাপন করবে এই আশায়। পত্রিকাগুলো কেন যে জমিয়েছিল সে নিজেও ভুলে গিয়েছে; হয়তো দাম্পত্য অন্তরঙ্গতার শীত মরশুমে উত্তাপের আশায়।
দাদার কল্যাণে বার কয়েক রেড ওয়াইন চেখে দেখেছে নতুনবউ, কিন্তু বিচিত্র টোকো স্বাদ মোটেই ভালো লাগেনি। সেদিন উন্মত্ততার ভেতর ছবি আর পত্রিকার পাতাগুলো ছিঁড়ে কুটি কুটি করার পর একটি বোতল খুলে গলায় ঢালতে গলার কাছে দমচাপা কান্নার ফাঁসটা ভিজে আলগা হয়ে এল, চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগল, হিক্কার মতো কান্নার দমক চাপা দিতে আরও খানিকটা তরল গিলতে বুকের মধ্যে তীক্ষ্ণ ঈর্ষা মিশ্রিত গ্লানিবোধ সহনীয় হয়ে এল, তন্দ্রার মতো মাথাটা হালকা লাগতে লাগল, মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসে পড়ে নতুনবউ কোলের ওপর বোতলটা নিয়ে চারিদিকে ছড়ানো ছবির টুকরোর ভেতর কোনটা বসন্তের হাত আর কোনটাই বা এক প্যারিসীয় ক্যাবারে নর্তকীর জালে আঁটা উরু, কোনটা জাহাজের সেই এশীয় যুবতীর রোদচশমা আর কোনটাই বা শ্বেতাঙ্গিনীর নগ্ন নিতম্বের ওপর চামড়ার চাবুক, সেসব আলাদা করে চিনতে না পেরে যে যৌনমিলনের ভঙ্গি তার চেনা, যা তার অচেনা কিন্তু কল্পিত, যা অবিশ্বাস্য অথবা স্বপ্নের মতো, সেইসব চরম ঘৃণ্য তুরীয় কোলাজের মাঝে চুমুক দিতে দিতে এক লিটারের বোতলের মদ সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে ফেলল।
দুপুর গড়িয়ে গেল। বাড়ির পুরুষদের খাওয়া হয়ে গিয়েছে কিন্তু নতুনবউ নীচে নামছে না। অনেক ডাকাডাকির পরেও সাড়া দিচ্ছে না দেখে বামুনদি দোতলায় উঠে দেখল শোবার ঘরের মেঝেয় অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে সে, পাশে খালি মদের বোতল আর অশ্লীল ছবির টুকরো। তাড়াতাড়ি ঝাঁট দিয়ে সে সেগুলো খাটের নীচে চালান করে দিয়ে বাড়ির লোকেদের ডাকল। রামপ্রাণ এসে নাড়ি দেখলেন, চোখের পাতা উলটে দেখলেন, বামুনদিকে দিয়ে ঠোঁট ফাঁক করিয়ে মুখে ফেলে দিলেন ছটি হোমিওপ্যাথিক গুলি। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই নতুনবউয়ের চৈতন্য ফিরল, ধড়মড় করে উঠে বসে ঘরের লাগোয়া বারান্দায় নালার কাছে গিয়ে হড়হড় করে বমি করল। বাতাস ভারি হয়ে উঠল এক বিচিত্র টক গন্ধে। সরোজা ভয় পেয়েছিলেন নতুনবউ নির্ঘাৎ খারাপ কিছু করার চেষ্টা করেছে, হেমন্ত ডেভেলপারের বিষাক্ত রাসায়নিকের চেনা গন্ধটা পেয়েছিলেন। বমি করায় কিছুটা ভয়মুক্তি হলো। রামপ্রাণ বহুদিন ধরেই সন্দেহ করেছিলেন বৌমা হোমিওপ্যাথির পরিভাষায় ফ্লুরি, যে ধাতের মানুষদের স্নায়বিক স্থৈর্যের অভাব, এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও থাকে। তিনি তাঁর অনুমান সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন।
এদিকে খবর পেয়ে বসন্ত তড়িঘড়ি অফিস থেকে এসে দেখল খাটের ওপর শুয়ে আছে সৌভাগ্যলক্ষ্মী, মাথার চুল ভেজা, মুখচোখ ফোলা, লালচে। নীচু হয়ে সে অন্তরঙ্গ স্বরে ডাকল-
‘বুড়ি! বুড়ি! চেয়ে দেখ আমি এসেছি!’
নতুনবউ ওর দিকে অস্বচ্ছ চোখে তাকালো, তারপর একঘর লোকের সামনে জড়ানো গলায় বলে উঠল—
‘পোঁদে নেই চাম হরেকৃষ্ণ নাম!’
এই ঘটনার কিছুকাল পরে হেমন্ত ছবি তুলে ওর নিজস্ব আয়ের টাকায় একটি নতুন ইয়াশিকা মিডিয়াম ফরম্যাট ক্যামেরা কিনল। দাদাকে ওর কোডাক ব্রাউনিটা ফেরত দিতে চেয়েছিল, কিন্তু বসন্ত নেয়নি। ইতিমধ্যে নতুনবউয়ের গর্ভে কানাই এসেছে।
