সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৬.৪
৬.৪
মি’লেডি, বিপুল ব্রহ্মান্ডে মিল্কি ওয়ে গ্ল্যালেক্সির এক কোণে সৌরজগতে পৃথিবী গ্রহে হুগলি নদীর ধারে শহর কলকাতা, আর তার উত্তরে দুই নদীর মধ্যবর্তী মৎস্যভূমিতে সাতগাঁ, অতীতের প্রাইমাম এম্পোরিয়াম ইন্ডে, ছোটো রেলগাড়ি চেপে যেতে হয়। একদা মিশরের পিরামিডের ধনরত্ন নীলনদের উপত্যকা দিয়ে বন্দরে নিয়ে যাবার জন্য ইংল্যান্ডের স্ট্যাফোর্ড শহরে তৈরি লাল-কালো ডেল্টা ক্লাস ইঞ্জিন তিনটি বোতল-সবুজ কামরা টেনে পর পর ফরাসী, দিনেমার, ওলন্দাজ, আর্মানি ও পর্তুগীজদের ডাঙার ওপর দিয়ে, ডানদিকে সজীব ভরন্ত হুগলি আর বাঁদিকে মৃতপ্ৰায় সরস্বতীকে রেখে, মাঠঘাট পুকুর চিনিকল গোরস্তান ম্যাওবেড়ালের গির্জা ছাড়িয়ে সাতগাঁয় যাওয়া-আসা করে। সেই ট্রেনে চেপে পালাপার্বণে উৎসবে আত্মীয়বিয়োগে মায়ের সঙ্গে আসে এক বালক।
রামনবমীতে আদিরাম মন্দিরের লাগোয়া জমিতে মেলা বসে। মাটির পুতুল থেকে শুরু করে তালপাতার সেপাই, অগ্রদ্বীপের কাঠের শ্রীচৈতন্য থেকে কাশীর পুতুলের-পেটে-পুতুল ও অন্যান্য খেলনার দোকান দেয় হস্তশিল্পীরা। এছাড়াও বিক্রি হয় গৃহসামগ্রী দেওঘরের পাথরের খোরা, বাটি, খলনুড়ি, শিলনোড়া, শিশু কাঠের বারকোশ, হাতা, চন্দ্রপুলির ছাপ, ইঁদুরকল, বসিরহাটের বঁটি, দা, হামানদিস্তা, নারকেলের ছোবড়া তোলার সাঁড়াশি, কুয়োয় বালতি তোলার হুক ও অন্যান্য ঘরকন্নার অপরিহার্য দ্রব্য। বিশুকা বাপ্পা, তিতলি আর কানাইকে মেলায় ঘোরাতে এনে খেলনা কিনে দেয় – কানাইয়ের জন্য ঝুমঝুমি, ভেঁপু আর বাপ্পা ও তিতলির জন্য প্লাস্টিকের ঘড়ি আর রোদচশমা। এছাড়া তিতলি বাবার কাছে আবদার করে নানারকম পুতুল মূর্তি ও খেলনা কেনে। ঝুলন পূর্ণিমার দিন হেমন্ত সেই খেলনা দিয়ে উঠোনের ধারে ওদের ঝুলন সাজিয়ে দেয়।
প্রথমে গামা কোদালের চার কোপে আয়তাকার ঘাসের চাঙড় কেটে নিয়ে আসে। তার দুদিকে বালির নদী এঁকে তৈরি হয় মাছের আকারের ভূমি। একদিকে কেশুতির ডাল পুঁতে হয় ঘন জঙ্গল, সেখানে পোড়ামাটির গন্ডার হরিণ চরে, ইটের গুঁড়োর রাস্তায় লালনীল মোটর গাড়ি, কাগজের পালকি, একধারে ছোটো ছোটো পিচবোর্ডের ভিলা, পোর্সেলিনের গির্জা, অচল রিস্টওয়াচের ডায়াল দিয়ে ঘড়িঘর, ঝাঁটার কাঠির রেললাইনে দেশলাই বাক্সের রেলগাড়ি, খালের ওপর পাঠকাঠির সেতু, কাগজমন্ডের ঘন ঝুরি-নামানো বটগাছ, তার নীচে কাঠের শ্রীচৈতন্য, খোলামকুচির টুকরো জুড়ে জুড়ে মন্দির, তার সামনে পুতুলের রামনবমী মেলা, বালির নদীতে কঞ্চির ফালি দিয়ে তৈরি ভেলায় ক্ষুদে পোড়ামাটির ঘোড়া, প্লাস্টিকের পালতোলা জাহাজ, কানাইয়ের সদ্য-ছেড়ে আসা নীল চানের গামলার সমুদ্রে গোল হয়ে ঘুরে চলা টিনের পটপটি স্টিমার, ভাসমান রবারের হাঙর। জলের ধারে টুনি বাল্ববে সাজানো দোলনায় রাধাকৃষ্ণ, পেন্ডুলামের কারিকুরিতে অবিরাম দুলে চলেছে। কখনো শিবপার্বতী, কিংবা শ্মশানচারী শিব, পেছনে ডাকিনী যোগিনীর দলে তিতলির পরিত্যক্ত গোলাপি প্লাস্টিকের পুতুল, রংজ্বলা কেশহীন, হাত ছেঁড়া, দুই পায়ের মাঝে গোল বোতামের আকারে যৌনাঙ্গ, পেট টিপে ধরলে কঁকিয়ে ওঠে…
ঝুলন সাজানো হলে রামপ্রাণ থেকে শুরু করে বাড়ির বড়োরা একে একে এসে দেখে যায়। রাধাকৃষ্ণের বৈজ্ঞানিক ঝুলন লীলা দেখে বামুনদি গলায় আঁচল জড়িয়ে প্রণাম করে, নতুনবউ এসে দেখে নেয় ওখানে তার ব্যক্তিগত সংগ্রহের পুতুল চুরি করে আনা হয়েছে কি না, কোমরে গামছা কানে পৈতে জড়িয়ে যুদ্ধে যাবার আগে বসন্ত বলে—
‘ম্যানিফ্যিক্! লা পেতি সাতগাঁও!’
.
ঝুলন পূর্ণিমার ছাপ্পান্ন দিন পরে এল দুর্গাপুজো। ফের আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠল আলোক মঞ্জীর, হাওয়ায় শিউলির সুবাসে দুখযামিনী অন্ধকার স্বচ্ছ হয়ে এল, আমের পাতায় শিশিরের টুপটাপ, প্রথম দোয়েল পাখির সকুন্ঠ ডাক। তার আগে পিতৃপক্ষ পড়লে আত্মীয় জ্ঞাতিরা সাতগাঁয় ফিরেছে, সরস্বতীর নির্জন ঘাটগুলো ক’দিন আবার মুখর হয়ে উঠেছে তিলতর্পণের মন্ত্রোচ্চারণে, কুশল বিনিময়ে। টোলের বাড়িতে মশাইয়ের কাছে নবজাতকের কোষ্ঠীবিচার করতে এসেছে প্রবাসীরা।
ঠাকুরবাড়িতে তোলাঘরের তালা খুলে হার্মাদি সিন্দুকের ভেতর থেকে বের করা হয় পুজোসামগ্রী বাসনপত্র, হরিণচর্ম, শঙ্খ, চমরির লেজের চামর, গন্ডারের খড়্গের কোষা।
এমনই একটি দিনে ব্রথ পাউডারের ভয়ে সিন্দুকের ভেতরে লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তিতলি, বিশুকা খুঁজে পায়। সে কথা বাপ্পা মনে করালে তিতলি প্রতিবাদ করে।
‘মোটেই আমি ঘুমোচ্ছিলাম না!’
‘তাহলে তুমি কী করছিলে, শুঁয়োপোকা?’ বাপ্পা হেসে বলে।
‘আমি বই পড়ছিলাম।’
‘তুই বই পড়ছিলি?’ বাপ্পার গলায় অবিশ্বাস ফোটে।
‘হ্যাঁ রে, হাইডি আর ছোট্ট রাজকুমারের গল্প। ওরা দুজনে খুব বন্ধু তো, যেমন আমি আর তুই। হাইডির পাহাড়ে অনেক প্রজাপতি পাখি আছে, রাজকুমারের দেশে কিছু নেই। হাইডি পাখি প্রজাপতি পাঠাচ্ছিল বন্ধুর কাছে। কত্ত পাখি কত্ত প্ৰজাপতি উড়ে উড়ে যাচ্ছিল পাহাড় থেকে আকাশে অনেক অনেএএএক উঁচুতে…’
‘এসব তুই দেখতে পাচ্ছিলি? মিথ্যুক কোথাকার!—’
‘সত্যি রে, বাপ্পাদাদা! আই সায়ার টু হোলি ব্লেসেড মেরি!’
‘তুই কেরেস্তান ঠাকুরের নাম নিয়ে মিছে কথা বলছিস? সিন্দুকের ভেতরে অন্ধকার। অন্ধকারে কেউ দেখতে পায়?’
‘একটা কথা বলব? তুই আমায় ছুঁয়ে দিব্যি কাট কাউকে বলবি না?’ তিতলি বাপ্পার কাঁধে হাত রেখে বলে।
‘আচ্ছা বলব না।’
‘পিসিমনিকেও বলবি না?’
‘মাকেও বলব না।’
‘দিঠানকেও বলবি না?’
‘দিদাকেও বলব না।’
‘বিশুকাকেও বলবি না?’
‘বিশুকাকেও বলব না।’
বাপ্পা জানতে পারে, কলকাতা থেকে আলিপুরদুয়ার থেকে খয়রাশোল থেকে যে বাপ্পা সাতগাঁয় আসে সে জানতে পারে, যে বাপ্পা আদিরামবাটি ছেড়ে কোথাও যায় না সে জানতে পারে, তিতলির একটি তৃতীয় নয়ন আছে। কপালে চুলের রেখা থেকে দুই ভ্রূর মাঝামাঝি পর্যন্ত আড়াআড়ি, যেমন মা দুর্গার আছে। কিন্তু সেটি অদৃশ্য, দেখা যায় না, কেবলমাত্র ঘুটঘুটে অন্ধকারে সেই চোখ জেগে ওঠে।
কলকাতা থেকে আলিপুরদুয়ার থেকে খয়রাশোল থেকে মাস কয়েক পর পর বাপ্পা যখন সাতগাঁয়ে আসে, তিতলি এমন বিচিত্র অবিশ্বাস্য জ্ঞানের ঝাঁপি নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে ওর জন্য। নাকের পাটা ফুলিয়ে, ঠোঁটে সবজান্তা হাসি ঝুলিয়ে, তর্জনি উঁচিয়ে বিতরণ করে।
‘তুই বড়ো মিথ্যুক রে শুঁয়োপোকা!’ বাপ্পা বলে।
‘আমি মিথ্যুক?’ তিতলি আহত কণ্ঠে বলে। এমন তৃতীয় নয়ন ওর ক্লাসে অনেক সহপাঠীরই আছে। যে কেউ মনে মনে বিশ্বাস করলেই এই নয়ন কপালে ফুটিয়ে তুলতে পারে, কিন্তু সে খুব কঠিন আর কষ্টকর। পূর্ণিমার দিন খালিপেটে থেকে সন্ধ্যাবেলা ঠাকুরের পুজোর নতুন গামছা কপালে একশো আট বার ঘষতে ঘষতে— ‘রাম-রাম-রাম-রাম-রাম’ জপ করতে হবে। ভুল করে যদি— ‘মরা-মরা-মরা- মরা-মরা’ বলেছ তাহলেই কিন্তু অন্ধ হয়ে যাবে!
বাপ্পা মাড়-দেওয়া নতুন গামছা নিয়ে পরীক্ষা করে। কয়েক বার কপালে ঘষতেই জ্বালা করতে থাকে, নুনছাল উঠে যাবার উপক্রম হয়। দিনটা অবশ্য পূর্ণিমা নয়, আর সে খালি পেটেও নেই। তবু চাঁদ-কপালি তিতলির অদৃশ্য তৃতীয় নয়নের ব্যাপারে অবিশ্বাস কাটে না।
রবিবার দুপুরবেলায় খাওয়া-দাওয়া মিটলে বাড়ির সকলে দিবানিদ্রা দিচ্ছে। ঢাকা বারান্দায় লাল মেঝেয় বসে বাপ্পা আর তিতলি লুডো খেলছে। কানাইকে ওরা খেলায় নেয়নি। কানাই ছক্কা চালতে পারে না, দান দিতে জানে না। একটা লাল প্লাস্টিকের মোটরগাড়ি নিয়ে মেঝের ওপর সজোরে গড়িয়ে দিচ্ছে কানাই, দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে গাড়িটা ফিরে আসছে। আবার গড়িয়ে দিচ্ছে, কখনো লুডোর বোর্ডের ওপর দিয়ে, ঘুটি ছত্রাখান হয়ে যাচ্ছে।
তিতলি উঠে গিয়ে ওর পিঠে কিল বসাতেই পা ছড়িয়ে বসে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিল। পোস্তবাটার আবুলি ভেঙে অ্যান্টনি কর্কশ গলায় ডেকে উঠল— ‘ম্যের্দা!’ ভাঁড়ারের চৌকাঠে বামুনদি আঁচলে পাশ ফিরে ফের ঘুমোতে লাগল।
উঠোনে দুপুরের রোদে হলুদ নিমের পাতা নিঃশব্দে ঝরছে। তিতলি লুডোর ঘুঁটি সরিয়ে রেখে ইশারায় ডেকে নেয় বাপ্পাকে।
উঠোন পার হয়ে ঠাকুরবাড়ির দিকে যেতে কানাই পিছু নিল। কিন্তু ওরা দুজনে পা টিপে টিপে গিয়ে যখন তোলাঘরের দরজা ঠেলে ঢোকে, কানাই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। ভেতরে ঢোকে না। ঘরের দেয়ালে হরিণের চামড়া আর চমরির লেজের চামরটায় তার যত ভয়।
নীচু লম্বাটে ঘরের ভেতর সিন্দুকগুলোর ডালা খোলা, পুজোর বাসন ধুয়ে রাখা হয়েছে। হরিণচর্মটা রোদ খাওয়ানোর পর উষ্ণ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ঘুলঘুলির ফোকর দিয়ে সূর্যরশ্মি ঢুকে বড়ো পেতলের গামলায় রাখা গঙ্গাজলে পড়েছে, ছাতের কড়িবরগায় তার প্রতিবিম্ব দপদপ করছে। তিতলি একটাও কথা না বলে বাপ্পার কাঁধ ধরে একটা জলচৌকির ওপর বসিয়ে দিল, ঘরের শেষ প্রান্তে আলকাতরা মাখানো সিন্দুকগুলোর আড়ালে গিয়ে নীচু হলো।
প্রায়ান্ধকার ঘর, জলে প্রতিবিম্বের অস্পষ্ট প্রভা, সূক্ষ্ম ধুলিকণা সূর্যরশ্মিতে চিকচিক করে মিলিয়ে যায়। বাপ্পা অপেক্ষা করে। অন্ধকারে ক্রমশ চোখ সয়ে আসে। কতকালের ধোঁয়ায় মলিন দেয়ালে সারি সারি কুলুঙ্গিতে জলশঙ্খ, পুষ্পপাত্র, পঞ্চপ্রদীপ, তামার টাট, কাঠের রেহাল স্পষ্ট ফুটে ওঠে। তিতলিকে দেখা যায় না। সিন্দুকের আড়ালে খসখস শব্দ হয় কেবল। এদিকে ঢোলকের চামড়ায় লোম বেড়ে উঠতে থাকে, শাঁখের ভেতরে ঘুণপোকার কিটকিট-কিটকিট ধ্বনি। মাথার ওপর চুর চুর প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাপ্পার মাথার মধ্যে ঝিঁ ঝিঁ করে একটা অচেনা অনুভূতি, দমবন্ধ হয়ে আসছে মনে হয়। কালবৈশাখী ঝড় ওঠার আগে বাতাসে বারুদের গন্ধের মতো জিভে একটা স্বাদ। আর তারপরেই ঘরের প্রান্তে হার্মাদি সিন্দুকের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে ওঠে তিতলি, মনে হয় বুঝি জলে ভেসে উঠছে। বাপ্পা দেখে, ওর দুই কাঁধের ওপরটা ডানার মতো চিকচিক করছে। অন্ধকার সিন্দুকে গুটির ভেতর থেকে শৈশবের গুঁয়োপোকাটা প্রজাপতি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। যত সে এগিয়ে আসে, মাথায় সেই ঝিঁ ঝিঁ অনুভূতিটা বাড়ে। বুকের মধ্যে হাতুড়ির মতো শব্দ। আর তারপর তেরছা সূর্যরশ্মির নীচে আসতেই পাকা তেলাকুচোর লালে সোনালি জরির কাজ দাউ দাউ করে করে ওঠামাত্র ওটা যে প্রজাপতির ডানা নয়, একটা শাড়ি, তিতলি গায়ে জড়িয়েছে, বাপ্পা সেটা বুঝে ওঠার আগেই এক অতল নৈঃশব্দ্যের কুয়োর ভেতরে পড়ে যায়।
.
পরে সে জানতে পারবে, বাজ-পড়া গাছের মতো জলচৌকি থেকে মেঝেয় ছিটকে পড়েছিল। দাঁতে দাঁত লেগে ঠোঁট বেগনি হয়ে গিয়েছিল, চোখের পাতা খোলা আর অস্বাভাবিক সাদা। হাত পা বরফের মতো ঠান্ডা। তিতলির আতঙ্কিত চিৎকারে সকলে ছুটে আসে। বিশুকা ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে আসে বারান্দায়, রামপ্রাণ বুকে স্টেথোস্কোপ বসিয়ে নাড়ি দেখতে থাকেন। বাবার নির্দেশে শিউলি দু হাত জলে ভিজিয়ে নিয়ে ওর হাতে পায়ে জোরে জোরে ঘষতে থাকে উত্তাপ ফেরানো জন্য। ইত্যবসরে সরোজা একটা চন্দন কাঠের টুকরো এনে ওর দাঁতের ফাঁকে গুঁজে দিল। জামার বোতাম খুলে দিতে দেখা গেল বাপ্পার গলায় বুকে পৈতের মতো জন্মদাগটা অপরাজিতা নীল হয়ে ফুটেছে।
চার মিনিট পরেও চৈতন্য না ফেরায়, শরীরে উত্তাপ না ফেরায় ওকে কোয়ার্সভিলের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বসন্ত লাথি মেরে মেরে হাৰ্লেকে জাগাতে চেষ্টা করে। পোড়া পেট্রলের গন্ধ নাকে যেতে জ্ঞান ফিরল বাপ্পার। শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল, দেহে উত্তাপ ফিরল। রামপ্রাণকে এতটা বিচলিত হতে এর আগে কেউ দেখেনি, শিউলির চোখমুখ লাল হয়ে ফুলে উঠেছিল। এদিকে তিতলির কান্না আর থামছিল না। তীব্র অপরাধবোধে দমবন্ধ হয়ে আসছিল ওর।
সোনার জরিবসানো পাকা তেলাকুচো রঙের রেশমি শাড়িটা ছিল সতীর। বহুকাল সিন্দুকের ভেতর বংশের অন্যান্য স্মৃতিচিহ্নের মাঝে সঞ্চিত ছিল। রামপ্রাণের প্রপিতামহ রাজারাম সার্বভৌমের দ্বিতীয়া স্ত্রী লক্ষণা সহমরণে যান। আদিরামবাটির ইতিহাসে তিনিই শেষ ও সম্ভবত একমাত্র সতী। বাড়ি থেকে সরস্বতীর ঘাট পর্যন্ত পথ পালকিতে গিয়েছিলেন। সেই পালকি— যাতে চড়ে তিনি বিবাহের পর স্বামীগৃহে আসেন, তারও আগে রামদেবের স্ত্রী আদরিণী আসেন, এগারোটি লুপ্ত পুথি ও নারায়ণশিলা আসে, শেষবার অন্তর্জলীযাত্রা থেকে ফিরে আসেন শাকম্ভরী দেবী। ঘাটে লক্ষণার গা থেকে রেশমের শাড়ি গয়না খুলে নেওয়া হয়, তাঁকে পরানো হয় লালপাড় সুতির শাড়ি, তারপর জ্বলন্ত চিতায় তোলা হয়।
এই ঘটনার কথা সবাই জানে, যদিও কোনো পারিবারিক নথিতে লেখা নেই, মি’লেডি।
.
তোলাঘরে সেই ঘটনার পর বহুদিন তিতলি বাপ্পার কাছে জানতে চেয়েছে, মূর্ছা যাবার পর ঠিক কীরকম অনুভূতি হচ্ছিল? বাপ্পা নিজেও অনেক ভাবার চেষ্টা করেছে। তড়কা লাগার ঠিক আগে কালবৈশাখীর সেই বারুদ গন্ধের পর গ্রীষ্মের প্রথম বৃষ্টির মতো একটা গন্ধ, ঘন সবুজ চুঁইয়ে আসা একটা অন্যরকম আলো। সেই আলোর ভেতর দিয়ে একটা হতশ্রী এক্কাগাড়ি আসছে।…
আর কিছু মনে পড়ে না।
*
বাপ্পারা খয়রাশোলে ফিরে যাবার পর খবর এল অ্যান্টনি মারা গিয়েছে।
বেশ কিছুকাল সে আগের সেই প্রাণশক্তি হারিয়েছিল, কিন্তু মরার বয়স হয়েছিল কি না জানার উপায় ছিল না। ফাল্গুন মাস পড়লেই সরোজা খাঁচার দরজা খুলে দিতেন, ছাড়িগঙ্গার ওপারে আফিম খেতে উড়ে যাবার মতো ডানার জোর তার ছিল। ইতিমধ্যে দেশে নতুন মাদক আইন হয়েছে, আফিম চাষে বিধিনিষেধ চেপেছে। চাষিরা লুকিয়ে গাঁদা ফুলের ক্ষেতে আফিমের চাষ করত, অ্যান্টনিকেও তার নেশার দ্রব্যের জন্য রোজ অনেকটা দূরে উড়ে যেতে হতো। চাষের মরশুম শেষ হলে সরোজা ওকে হলুদ জলে চান করাতেন। ওর সাদা পালক পাকাপাকিভাবে হলদেটে হয়ে গিয়েছিল পোর্তোহাটার হাফ-ফিরিঙ্গিদের মতো।
সেবার শীতের প্রকোপ বেশি হলো, বসন্ত এল দেরীতে। বাতাস আমের বোলে ম-ম করে উঠতে অ্যান্টনি উচাটন হলো। পর পর তিনদিন যাওয়া-আসা করার পর চতুর্থ দিন থেকে ফিরল না। সাত দিন কেটে যাবার পর রামপ্রাণ ছাড়িগঙ্গার ওপারে রোগীদের গ্রামে খোঁজ নিতে লোক পাঠালেন। এর আগেও একবার এমন ঘটেছে, তিনদিন অ্যান্টনি না-ফেরার পর খবর এসেছিল শিকারিরা ফাঁদ পেতে ওকে ধরেছে, কলকাতায় কাশীপুরে পাখির হাটে বেচতে নিয়ে গিয়েছে। পরে দেখা যায় সেটা গুজব, পাঁচদিন পর বহাল তবিয়তেই ফিরে আসে। এবারেও ফিরল, আঠের দিনের মাথায়, কিন্তু বহাল তবিয়তে নয়। অ্যান্টনির দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেল না, কিন্তু দেখা গেল সে কন্ঠস্বর সম্পূর্ণ হারিয়েছে। কেউ বিষপ্রয়োগ করেছে, নাকি আফিমে কীটনাশকের প্রভাবে ঘটেছে, সেটা বোঝা গেল না। সরোজা ওকে ফের পাড়ে বহাল করলেন আগের মতো। কিন্তু অ্যান্টনি নড়াচড়া করে না, টু শব্দটি করে না। সারাদিন ডানায় ঠোঁট গুঁজে ঝিমোয়।
অনেককাল এদিকে আলিসাহেব আসেন না, রামপ্রাণ নিজের বিবেচনামতো চিকিৎসা করেন। অ্যান্টনি মুক হয়ে পড়ায় এক বিচিত্র নৈঃশব্দ্য নেমে এল আদিরামবাটিতে। দুপুরবেলায় দোতলায় নতুনবউয়ের ঘরে রেডিওর ধ্বনি, রাস্তায় ফেরিওয়ালার ডাক, ঠাকুরবাড়িতে বিশু ঠাকুরের ঘন্টাধ্বনি, কুয়োয় কপিকলের শব্দ কেমন যেন অন্যরকম আর বিষণ্ণ শোনায়।
জন্মাষ্টমির দিন সকালে নন্দর-মা এল ডোরাডোর দোতলার বারান্দায় অ্যান্টনির মৃতদেহ দেখল। ঘাড় ভাঙা, বুকের কাছে খোবলানো, চারিদিকে ছড়িয়ে আছে হলুদের ছোপ লাগা সাদা পালক। বোঝা গেল, এ কোনো বড়ো হুলো কিংবা ভাম বেড়ালের কাজ। বোবা হয়ে যাবার পর অ্যান্টনি ভয় দেখানোর ক্ষমতা হারিয়েছিল, ওকে শিকার করা কিছু কঠিন ছিল না। কিংবা কে জানে, হয়তো মরে দাড় থেকে খসে পড়েছিল, তারপর বেড়ালে টেনে নিয়ে যায়।
সরোজার হাতে বোনা শৌখিন পশমের আসনে অ্যান্টনিকে মুড়ে পেছনের আমবনে শিয়ালকাঁটার ঝোপে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে দিয়ে এল গামা। ঘটনার করুণ বিবরণ দিয়ে বাপ্পাকে শিউড়ির নতুন ঠিকানায় চিঠি লিখল তিতলি। ইতিমধ্যে বাপ্পারা খয়রাশোল থেকে জেলাসদরে চলে এসেছে, রথীনের পদোন্নতি হয়েছে।
