সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৯.৬
৯.৬
তিরিশে জ্যৈষ্ঠ দুপুর সোয়া দশটায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। সাতগাঁর গ্রহবিপ্ররা গণনা জানালেন, ওইদিন কলিযুগ শেষ হবে। একে গ্রহণ তায় যুগের ক্রান্তি, ঠিক কী যে ঘটতে চলেছে কেউ জানে না। সকলে গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। পানাহার মলমূত্র ত্যাগ থেকে শুরু করে আবশ্যক যা কিছু আগেভাগে সেরে নেওয়া হল। রান্নাঘরে বাসি খাবার পানের জল ফেলে দিয়ে উনুন নিকোনো হলো, মন্দিরে পুজোপাট সারা হলো। বাইরের কাজ সেরে নিয়ে সকলে ঘরে ঢুকে জানলা-দরজা বন্ধ করে দিল। বেলা দশটার আগেই পথঘাট হাট বাজার সব শুনশান, যেন মারীজব্দ নগর। গ্রহণকালে বিভিন্ন মহাজাগতিক অপশক্তির তরঙ্গ বাতাসে প্রবাহিত হয়, যার সংস্পর্শে এলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে, গর্ভবতী নারী ও গবাদি পশুদের বিকলাঙ্গ জাতক হয়। আর এবারে তো একেবারে যুগাবসান! সাবর্ণ পাড়ার লোকজন বাড়ির ভেতর সেঁধিয়ে গিয়ে দুরু দুরু বুকে ইষ্টনাম জপতে লাগল। কেউ কেউ এমনকি যতদূর সম্ভব শ্বাস বন্ধ করে রাখার চেষ্টা করল, যাতে প্রশ্বাসের সঙ্গে অনিষ্টকারী তরঙ্গ দেহে না প্রবেশ করে। ক্রমে ঘনিয়ে এল সেই কাল।
কিন্তু বেলা এগারোটাতেও বাইরে সূর্যের আলো কমেছে বলে মনে হলো না। তবে কি নতুন যুগের নতুন সূর্যের উদয় হলো? নাকি জ্যোতিষীরা গণনায় ভুল করল? আশা আশঙ্কা সন্দেহের দোলাচলে দুলছে যখন গোটা সাতগাঁর মানুষ, কেউ কেউ এমনকি জানলার কপাট ফাঁক করে দেখছে বাইরে দিব্যি ঝাঁ ঝাঁ গ্রীষ্মের রোদ, পথেও নেমে এসেছে কেউ কেউ, তখনই পুবের দিক থেকে বাতাসে ভেসে এল বিচিত্র অতিলৌকিক ধ্বনি ময়ূরের কেকাধ্বনি, অচেনা পাখির কলকাকলি, বাঘের হাক, হাতির বৃংহণ, বানরের ডাক, আর ঘুঙুর ও বাদ্যযন্ত্রের সুরধ্বনি। আর এই সবকিছু ছাপিয়ে একটা যান্ত্রিক ধকধক ধকধক ধ্বনি, এবং থেকে থেকে গগনবিদারী ভোঁ। যারা বাইরে বেরিয়েছিল তারা সকলেই পড়ি-কি-মরি করে ফের ঘরে গিয়ে সেঁধোলো, খোলা জানলা দরজা দমাদ্দম বন্ধ হয়ে গেল ফের, কিন্তু সেই অলৌকিক ধ্বনি ক্ষীণ হতে হতে ক্রমশ দক্ষিণের দিকে মিলিয়ে গেল। তারও ঘন্টাখানেক পর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যেতে লোকজন যখন ফের বাইরে আসতে শুরু করেছে, স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হয়েছে, তখন, বেলা দেড়টা নাগাদ, দিনের আলো কমে আসতে শুরু হলো।
গ্রহবিধরা মস্ত ভুল করেছে! সূর্য রাহুর কবলে পড়ল গণনামাফিক সময়ের তিন ঘন্টা পরে।
সেই অলৌকিক ধ্বনির রহস্য ক্রমশ জানা গেল ক্যাওটপাড়ার বাসিন্দাদের কাছ থেকে, সাতগাঁর উচ্চবর্ণদের মতো বেদাঙ্গ জ্যোতিষের দ্বারা চালিত নয় যাদের জীবন। হুগলি নদীর দিক থেকে বিচিত্র সব শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে শুনে কেউ কেউ খালপাড় ধরে ছুটে গিয়েছিল, নদীতে জেলে নৌকার মাঝিরা দেখেছিল উত্তরের দিক থেকে এক বিশাল ফায়ারবোট তরতর করে চলেছে ভাটির দিকে। ওপরে খাঁচায় বাঘ, হাতি, হরিণ, পাখি ও আরও সব নাম-না-জানা জন্তু, আর জাহাজের একেবারে ওপরের ডেকে সবুজ সোনালি জরি দেওয়া রেশমি চাদোয়ার নীচে নাচগান হচ্ছে।
আওয়াধের নবাবের বোট। ছল করে ইংরেজরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। রাজা লখনউ ছেড়ে লন্ডনে চলেছেন রাণী ভিক্টোরিয়ার কাছে নালিশ জানাতে।
‘একশো বিশ টনের আগুনবোট, নাম তার জেনারেল ম্যাকলাস্কি!’ গোবর্ধনের দোকানের সামনে চাতালে দাঁড়িয়ে কোম্পানির ঢেঁড়াদারের মতো করে ঘোষণা করল ননী। —‘আগুনবোটে লখনউয়ের রাজা, রাজার মা, ভাই আর পরিবারের ২৮ জন লোক আছে, আটটা সিন্দুকে হীরে জহরত আর সোনার ডেও-ঢাকনা বাসনকোসন আছে, ৪০ জন মোসায়েব, ৩০০ বেগম আছে, গায়ক বাজনদারের দলে আছে ১২০ জন, বাবুর্চি খানসামা আছে ৮০ জন, রাজার চিড়িয়াখানা আছে–এক জোড়া সাদা বাঘ, তিনটে চিতা, একটা জিরাফ, দুটো হাতি, দুটো উট, আর এক জোড়া সোনালি ল্যাজঝোলা পাখি আছে যার নাম ম্যাকাও!’
কিছুকাল হল হাল অ্যান্টনি গত হয়েছেন। কিন্তু আজব শহর কলকাতার নিত্যনতুন খবর আসায় ভাটা তো পড়েইনি, বরং কোয়ার্সভিল থেকে দিনে দুবার কলকাতায় বোট সার্ভিস চালু হওয়ায় খবরের ডানা গজিয়েছে। কয়েকদিন সরগরম হয়ে রইল ধর্মতলার বাতাস।
আঠের দিন ধরে গ্রীষ্মের বিশীর্ণ গঙ্গায় বালির চর কন্টকিত খাত ধরে অভূতপূর্ব তাপপ্রবাহের ভেতর দিয়ে কলকাতায় এসে পৌঁছেছে আওয়াধের নবাবের দল। পথে আন্ত্রিক আর খোস-পাঁচড়ায় রাজামশাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পশুগুলিও মৃতপ্ৰায়।
গ্রীষ্মে তাপমাত্রা যত চড়ছে গোবর্ধনের দোকানে সুশীতল ভাঙ শরবতের চাহিদা তত বাড়ছে। রোজ সকালে কোয়ার্সভিলে বরফ আনতে গিয়ে নিত্যনতুন খবর বয়ে আনে ননী। দশ সের বরফের দাম তিন আনা, এক গন্ডা খবরের দাম পাঁচটি ফুটো পয়সা। দোকানের চাতালে দাঁড়িয়ে টোলের পোড়োদের মতো দুলে দুলে সুর করে চেঁচায় ট্যাড়াদার ননী:
‘কুড়োবা কুড়োবা কুড়োবা লিজ্যে
কাঠায় কুড়োবা কাঠায় লিজ্যে’
‘রাজামশাই লন্ডন অব্দি যেতে পারেনি। জেনারেল ম্যাকলাস্কি কলকাতায় এসে থেমে গেছে। রাজার মা আর ভাই লন্ডনে গিয়েছে মহারাণীর কাছে দরবার কর্তে…’
‘কুড়োবা কুড়োবা কুড়োবা লিজ্যে’
‘রাজামশাই মুচিখোলায় সব ঘরবাড়ি কিনে নিয়েছে, ওখানেই আরেকটা লখনউ শহর ফাঁদার মতলব! রাজার বাইয়ানা পোশাক, পায়ে আলতা। দেকতে ঠিক য্যান অপ্সরা…’
‘কুড়োবা কুড়োবা কুড়োবা লিজ্যে
কাঠায় কুড়োবা কাঠায় লিজ্যে’
‘অপ্সরা নয়, অপ্সরা নয়— রাজা কালো-কোলো, ঘাড়ে গদ্দানে, নাকে আবার সোনার চশমা…’
‘কুড়োবা কুড়োবা কুড়োবা লিজ্যে’
‘নতুন আইন পাশ হয়েচে, এবার থেকে বেধবারা বে কর্তে পারবে! কলকাতায় বেধবা রাঢ় মাগীরা দলে দলে বে কচ্চে…’
‘কুড়োবা কুড়োবা কুড়োবা লিজ্যে
কাঠায় কুড়োবা কাঠায় লিজ্যে’
‘মড়াফেরার দিন গোনা হয়েচে! পনেরোই কাত্তিক দশ বছরের মধ্যে যে যেখানে মরেছে সক্কলে যমালয় থেকে ফিরবে। এদিকে যেখানে যত বেধবা মাগীরা বে করেছিল তাদের নলিখলি শুরু হয়েছে…
‘কুড়োবা কুড়োবা কুড়োবা লিজ্যে’
‘পল্টনের ব্যারাকে নেটিভ বন্দুকবাজেরা মিউটিনি করেছে! লালমুখো ইংরেজ দেখলেই কচুকাটা করছে…’
‘কুড়োবা কুড়োবা কুড়োবা লিজ্যে
কাঠায় কুড়োবা কাঠায় লিজ্যে’
‘দেশে ইংরেজদের শাসন শেষ হয়েছে, দিল্লিতে বুড়ো বাদশাহ মসনদে বসেছে…’
‘কুড়োবা কুড়োবা কুড়োবা লিজ্যে’
‘ইংরেজরা মিউটিনি রুখে দিয়েছে! বন্দুকবাজ সেপাই দেখলেই রাস্তায় গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দিচ্চে! দিল্লির বুড়ো বাদশাহকে ফাটকে পুরেছে! লন্ডনের রাণী ভিক্টোরিয়া এখন থেকে আমাদের মহারাণী…
*
নিত্যনতুন খবরে আর হুগলিতে দিনরাত লাল-নীল ইউনিয়ান জ্যাক পতাকা তুলে গানবোটের আনাগোনায় মৎস্যভূমির মানুষ যখন বিভ্রান্ত, হাটে ঘাটে সর্বত্র মানুষের জটলা, বাতাসে ফিসফাস, মন্দিরে পুরোহিতের দল মন্ত্রোচ্চারণ ভুলে যাচ্ছে, টোলের পোড়োরা পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী সূত্র ভুলে যেতে বসেছে, কেউ কেউ এমনকি শৌচবিধি ভুলে চুঁচুপেত্নির শাপে ব্যাঙ হয়ে কুয়োয় ঝাপ দিচ্ছে, তখন সাতগাঁর ব্রাহ্মণপাড়ায় এক যুবক এই সবকিছু থেকে দূরে আশ্চর্য যন্ত্রবিদ্যার রেশমগুটি বুনে চলেছে নিজের চারপাশে। তার নাম পাগলরাম।
দেশে ফিরে যাওয়ার আগে রেভারেন্ড বিল সাহেব গঙ্গারামকে যে হুইটেকার কোম্পানির অ্যালবিয়ন প্রিন্টিং প্রেসটি দিয়ে গিয়েছিলেন, সঙ্গে কিলো দশেক সীসের টাইপ, যেটি গঙ্গারাম এনে বসিয়েছিল বারবাড়ির একতলায়, তার কৃৎকৌশলের জাদুতে আটকে পড়েছিল পাগলরাম। ইতিমধ্যে ঘড়ি সারাইয়ের দক্ষতার জন্য সুনাম হয়েছে তার, ফিরিঙ্গিডাঙায় মাঝেমধ্যেই ডাক পড়ে। শার্ল লেবোর মতো কেউ কেউ অচল ট্যাকঘড়ি নিয়ে চলেও আসে। আরুন্ডেল সাহেবের জন্য বানানো বাগানে সেই দরমার ঘরে একদিকে গঙ্গারানের ফার্মেসি, আরেকদিকে পার্টিশান দিয়ে পাগলরামের ওয়ার্কশপ। বড়ো ভাই রামানুজের তীব্র উষ্মা উপেক্ষা করে দুই ভাইই পারিশ্রমিক নিতে শুরু করেছে। গঙ্গারাম অবশ্য গরীবগুর্বোদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করে, এবং এমনকি রোগী দেখতে অসবর্ণ অচ্ছুৎদের গ্রামেও যায়।
‘ঘোর কলির আর বাকি রইল কী!’ রামানুজ আক্ষেপ করেন। ‘স্মার্ত নৈয়ায়িক বংশের সন্তান যজন অধ্যাপন ছেড়ে কর্মকার হয়েছে। আরেকজন শুদ্র অস্পৃশ্য দেহ স্পর্শ করে রোগনির্ণয় করছে। স্বর্গত পূর্বপুরুষেরা এইসব দেখে কী নরকযন্ত্রণাই যে ভোগ করছেন!’
‘স্বর্গত পূর্বপুরুষেরা কলের যুগ দেখে যাননি!’ গঙ্গারাম জবাব দেয়। ‘আর কলকাতায় মেডিকেল কলেজে আজকাল নিয়মিত সব জাতিবর্ণের শব ব্যবচ্ছেদ হয়। দেখা গেছে, ব্রাহ্মণ দেহ আর শুদ্র দেহের গঠনতন্ত্রে কোনো পার্থক্য নেই!’
ঘড়ি সারাইয়ের সূত্রে ফিরিঙ্গিডাঙার গুটিকয় তরুণ ফ্যাক্টরের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠার পর পাগলরাম ধর্মতলায় গোবর্ধনের ঠেকে যাওয়া-আসা শুরু করেছিল, বাতিল ঘড়ির কলকব্জা দিয়ে স্বয়ংক্রিয় মাছ ধরা ছিপ বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সকলকে। কিন্তু গঙ্গারাম ছাপার কলটি নৌকায় চাপিয়ে দিনেমারডাঙা থেকে আনার পর নাওয়া-খাওয়া ভুলে এই আশ্চর্য খেলনার নেশায় মেতে উঠেছে সে।
আশ্চর্য খেলনাই বটে। মিশনহাউসে গেলে পিটার-জনের সঙ্গে খেলা ছেড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা যে যন্ত্রের কারিকুরি দেখে আর আশ মিটত না তার, সেই যন্ত্র এখন বাড়িতে নাগালের মধ্যে! এ যেন এক আশ্চর্য তাত। পেতলের সরু কম্পোজিং ট্রেতে সীসের অক্ষর গেঁথে যন্ত্রে বসিয়ে কাগজের ওপর ছাপ তুলতে শিখল পাগলরাম। দিন কয়েকের চেষ্টাতেই সে ক্রাউন অক্টেভো আকারের কাগজে ঠাস ছাপা ও সারণী ছাপা শিখল, দরমার ঘরে দাদার রোগী দেখার খুপরির দেয়ালে ঝোলালো ছাপা উপদেশাবলী, যা দিনের পর দিন ঘড়ি সারাইয়ের সময় পার্টিশানের এপার থেকে শুনে শুনে তার স্মৃতিতে গাঁথা হয়েছে—
গুটিকয় সাধারণ খাদ্য ও তাহাদিগের দোষগুণাবলী
| আক (ইক্ষু) | পুষ্টিকর, বলবর্দ্ধক, মূত্রকারক | |
| আঙ্গুর | শীতল, রুচিকারক, শুক্রবৰ্দ্ধক, কফপিত্ত-নাশক, চক্ষুর হিতকর | |
| আদা | অগ্নিবর্ধক, মলমুত্রকারক, বায়ুনাশক (ভোজনের পূর্ব্বে আদা ও লবণ ভক্ষণ করিলে ক্ষুধা বৃদ্ধি হয়) | |
| আম | কচি আম | শীতল, কষায়, পিত্তনাশক |
| কাঁচা আম | ঈষৎ অম্ল, ডাইল কিংবা ঝোল করিলে কচি আমের ন্যায় গুণযুক্ত | |
| ডাঁসা আম | মলরোধক, রক্তপিত্ত-প্ৰকোপক | |
| পক্ক আম | গুরুপাক, মলভেদক, ধাতু ও কান্তি বর্ধক | |
| আম্র বৌল | রক্তদৃষ্টিনাশক, শীতবীর্য ও বায়ুবন্ধক | |
| আমসত্ত্ব | রুচিকর, কিয়ৎ গুরুপাক, বায়ুপিত্তনাশক | |
| উচ্ছে | উষ্ণবীর্য, মলভেদক, পিত্তদোষনাশক, বিষণ্ণ | |
| ওল | লঘু, পাচক, অর্শরোগের উপকারক (রক্তবর্ণ ওল উপকারী নহে) | |
| কচু | মুখী কচু গুরুপাক ও বায়ু পিত্ত আমদোষের বৃদ্ধিকারক। মানকচু শীতল ও শোথনিবারক | |
| কলা | ||
| কলার থোড় | শীতল, কেশের হিতকর, দাহ ও ক্ষয়রোগে হিতকর | |
| মোচা | গুরুপাক, বায়ুপিত্তরোগে হিতকর | |
| কাঁচকলা | কষায় রস, মলরোধক, রক্তবর্ধক | |
| পাকা কলা | অগ্নিমান্দ্যকারক, বলবর্ধক, শুক্রবর্ধক, কফবর্ধক |
মাস তিনেকের মধ্যেই প্রতি সপ্তাহে দুই পৃষ্ঠার একটি বুলেটিন ছাপাতে শুরু করল পাগলরাম, নাম দিল ধর্মতলা বার্তা। তাতে ধর্মতলায় চুঁইয়ে আসা দুনিয়ার খবরাখবর থাকে। এছাড়া সাপ্তাহিক তারিখপঞ্জী (ইংরেজি ও বাংলা), স্থানীয় মেলামোচ্ছবের হদিশ, ঝটিতি দাওয়াই ও রাশিচক্র। ধর্মতলা বার্তা গোবর্ধনের খদ্দেরদের কাছে অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে উঠল। সেটা শুধু তার ব্যাবহারিক উপযোগিতার কারণে নয়; নিজেদের অহিফেন-রঞ্জিত কেচ্ছা ও গুজবগুচ্ছ ছাপার অক্ষরে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখতে পাবার মধ্যে এক বিচিত্র মাদকতা ছিল।
ধর্মতলা বার্তা পড়ে তারা জানতে পারল, রেঙ্গুনে কারাগারে শেষ মোগল সম্রাট মারা গিয়েছেন; জানতে পারল, ইংরেজরা একদিকে আইন পাশ করিয়ে সনাতন হিন্দুধর্মের সর্বনাশ করছে, অন্যদিকে কলকাতায় নেটিভ মেয়েদের জন্য কলেজ খুলে তাদের মাথায় বিজাতীয় বিধর্মী চিন্তাভাবনার বীজ বপন করছে; জানতে পারল, ধর্মসভার সদস্যরা ব্রাহ্ম ও একেশ্বরবাদীদের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে, ঘোষণা করেছে ব্রাহ্মরা কেরেস্তানদের থেকেও বড়ো শত্রু, কারণ কেরেস্তানরা অন্তত ঈশ্বরের ত্রিত্বে বিশ্বাসী, এবং ধর্মান্তকরণের উদ্দেশ্যে তারা যেসব মিরাল দেখায় তা দেশজ অলৌকিকের থেকে ভিন্ন কিছু নয়।
বছর ঘোরার আগেই দুই পৃষ্ঠার ধর্মতলা বার্তা ফোলিও আকারে আট পৃষ্ঠা ছাপা হতে লাগল। তাতে রাশিচক্র, তারিখপঞ্জি ও কলকাতা থেকে কলের বোটে আসা দেশবিদেশের বিভিন্ন খবরাখবরের পাশাপাশি সংযোজন হলো ইংরেজ শাসনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্যাদি : খাজনা বিষয়ক নতুন আইন; ডাক ও তার বিষয়ক প্রয়োজনীয় জ্ঞাতব্য; নবনির্মিত রেলপথে গমনাগমনের নিয়মাবলী, ভাড়া, সময়সারণি; ঘোড়ার গাড়ি ও পালকির নির্দিষ্ট ভাড়া; বাড়ি ও জমির ট্যাক্স; মিউনিসিপ্যালিটির দপ্তরের ঠিকানা; কলিকাতা পুলিশ দপ্তর ও হাইকোর্টের ঠিকানা,; কলিকাতার পথের নাম; মুষ্টিযোগ; মেট্রিক পদ্ধতির ওজন ও মাপ; তীর্থযাত্রীদের প্রতি সতর্কতা, ইত্যাদি। এছাড়া বেদাঙ্গ জ্যোতিষ মতে তিথি নক্ষত্র যোগ ও করণ, মাসিক রাশিফল, শুভাশুভ কালনির্ণয়, হলকর্ষণ ও বীজবপন সংক্রান্ত তথ্যাদি, সুর্যোদয়-সূর্যাস্ত চন্দ্রোদয়-চন্দ্রান্ত ও জোয়ারভাটার সময়সারণি।
বহুকাল আগে থেকেই সাতগাঁয় পঞ্চাঙ্গ পুথি লেখা হতো। পণ্ডিতেরা রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্বম অনুসারে মুখে মুখে তিথি নক্ষত্র নিরূপণ করতেন, দশকর্মাদি পালনের কাল নির্ণয় করতেন। সাতগাঁ বন্দরের আমলে ভিনদেশি জাহাজীরা ফিরতি মৌসমের দিনক্ষণ নির্ণয়ের জন্য গণকদের শরণাপন্ন হতো। দরপ খানের সুবাদে কাগজের ব্যবহার শুরু হবার পর কাগজে লেখা পঞ্চাঙ্গ নির্ণয় দূরের সমুদ্রে পাড়ি দিত। আদিরামবাটির পুথিশালায় তার কিছু নিদর্শন ছিল। পান্ডবেরা বারো বছর বনবাসের পর শেষ এক বছর অজ্ঞাতবাসের সময় নির্ধারিত হয়েছিল যে গণনা মতে তার পুথি যেমন ছিল, তেমনই চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যে যাবার কাল নির্ণয়ের গণনা ছিল, মেনকার সাধভক্ষণের শুভক্ষণের উল্লেখও ছিল। এছাড়া ছিল তুলোট কাগজে আঁকা ইসলামি জ্যোতির্বিজ্ঞানের রেখাচিত্র, যার সাহায্যে রাতের আকাশে নক্ষত্রের দিক নির্ণয় করে অনন্ত মরুভূমি পেরিয়ে আলিসাহেবের পূর্বপুরুষেরা এসেছিলেন বাংলায়। পর্তুগিজ নৌবিশারদদের আঁকা দুটি মানচিত্র ছিল দক্ষিণমুখী, সেখানে নদীপাহাড়ে ছাওয়া বেঙ্গালা নামক দেশের ঝাপসা জমির ওপর ভাসমান দুই মাস্তুলের জাহাজ, সুস্তনী মৎস্যকন্যা, দাড়িওয়ালা সিলমাছ, ডানাওয়ালা ড্রাগন, হাতির পাল ও সার্কাসের তাঁবুর আকারের বসতি আঁকা।
ছোটোবেলায় বার দুয়েক এইসব আশ্চর্য পুথি পান্ডুলিপি চাক্ষুষ করেছে পাগলরাম। ধর্মতলা বার্তা-য় অয় কিছু কিছু চিত্তাকর্ষক অংশ ছাপার জন্য একদিন পুথিশালায় যেতে বাধা দিলেন রামানুজ।
‘এইসব পুথিপত্র তুমি স্পর্শ করবে না! আমাদের স্বর্গত পিতামহ রামাই পণ্ডিত এগুলি বর্গি আগুনের থেকে রক্ষা করার জন্য প্রাণদান করেছিলেন। আর তুমি রামাচার্যের বংশজাত হয়ে বেদের একটি শ্লোকও সঠিক উচ্চারণ করতে পার না, কলের কারিগর হয়েছ!’
আদিরামবাটিতে রামানুজ গৃহকর্তাই শুধু তো নন, পারিবারিক টোলের অধ্যক্ষও বটেন। সেই অধিকার বলে তিনি পুথিশালার দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিলেন, চাবিটি নিজের পৈতেয় বেঁধে রাখলেন।
ছোটো ভাইয়ের হয়ে সওয়াল করার চেষ্টা করেছিল গঙ্গারাম।
‘ও তো আর এগুলো নিয়ে গিয়ে নষ্ট করছে না, বড়োজোর কিছু অংশ কপি করবে। কুলুঙ্গির ভেতর গোছা বাঁধা অবস্থায় ঘুণপোকার থেকে আর কীই বা বেশি ক্ষতি করবে?’
‘এইসব পুথির রচনাকারেরা সূর্যবিজ্ঞান জানতেন, তাঁরা ছিলেন বড়ো বড়ো গ্রহবিপ্র গণক।’ রামানুজ পৈতেয় বাঁধা চাবি দিয়ে পেটের কাছে ঘামাচি চুলকোতে চুলকোতে বললেন। ‘সেসব ছাপার কলে ফেলে সর্বত্র প্রচার করা গণিকাবৃত্তি ছাড়া কিছু নয়।’
