সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১২.৩
১২.৩
একটা লম্বাটে পাথর, সারা গায়ে আঁশের মতো দাগ। অনেকটা জীবন বিজ্ঞানের বইয়ের পাতায় প্যাঙ্গোলিনের মতো দেখতে। জলের গামলায় ফেলে দিতে প্রথমে ডুবে যায়, তারপরেই ভুস করে ভেসে ওঠে।
‘এই দেখুন, শিলাও কেমন জলে ভাসে,’ আলি সাহেব বলেন। রামপ্রাণের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করেন— ‘এবার আমায় বলুন দিকি, মানুষের কলিজা কি শিলার থেকেও ভারি?’
রামপ্রাণ উত্তর দেন না। বাপ্পা দেখে, নাগকেশরের বেদির নীচে বসে আছেন দুই পুরুষ, দাদু আর আলিসাহেব। আলিসাহেবের সাদা দাড়িতে কয়েক গাছি চুল হলদে, অনেকটা যেন অ্যান্টনির পালকের মতো। চোখের পাতা আগের চেয়েও ভারি আর মোটা হয়েছে দেখে মনে হয় যেন এখনই ঘুমিয়ে পড়বেন, কিংবা এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলেন। আলিসাহেব কি দাদুর থেকেও বুড়ো? বাপ্পা ভাবে। ছোটোবেলায় যখন আসতেন মনে হতো দাদুর থেকে অনেক বুড়ো। কিন্তু এখন আলিসাহেবের পাশে দাদুকেই বেশি বুড়ো দেখায়।
‘মায়ের চিতার ছাই কোথায় পোঁতা হয়েছিল আমায় একটু বলুন তো ভাইজান?’ বাপ্পাকে একপাশে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বলেন আলিসাহেব।
অশোক গাছের পেছনে জায়গাটা দেখিয়ে দিতে উনি হাঁটু মুড়ে বসে আঙুলে মাটি সরিয়ে একটা গাছের চারা পুঁতে দিলেন।
‘ফাগুন মাসে ফুল দেবে বেগনি রঙের। ফুলের পাপড়ি বেটে খেলে কলিজার বেদনা সেরে যাবে।’ আলিসাহেব বলেন।
স্ত্রী ও কন্যার মৃত্যুর পর দাড়ি কামানো বন্ধ করেছেন রামপ্রাণ, সাদা দাড়ি লম্বা হয়ে প্রায় বুক পর্যন্ত নেমেছে। রান্না করা খাদ্য খাওয়া বন্ধ করেছেন। ফলমুল ছাতু আর ভেজানো ছোলা মটর জাতীয় দানাশস্য খেয়ে থাকেন।
‘সব রোগের উৎস হল আগুনে রান্না করা খাদ্য।’ রোগীদের বলেন।–‘সব ধরনের প্রাণীর জন্য নানারকম খাদ্যের ভান্ডার সাজিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। অথচ মানুষ একমাত্র প্রাণী যে সেই খাবারকে আগুনের তাপে বিকৃত করে।
ফার্মেসিবাড়িতে আগের মতো সকাল থেকে রোগীদের ভিড় নেই। সম্প্রতি সাতগাঁয়ে নতুন অ্যালোপ্যাথ ডাক্তার এসেছে; কানাঘুষোয় প্রচার, পরাণ ডাক্তার চিনির গুঁড়োর সঙ্গে স্টেরয়েড ট্যাবলেটের চূর্ণ মেশান। দিনকাল বদলাচ্ছে, নতুন প্রজন্মের রোগীরা দেহমনের গোপন অন্তরঙ্গ বিষয়ে খুঁটিনাটি প্রশ্নের উত্তর দিতে সংকোচ বোধ করে।
প্রথম জীবনে দূরদূরান্তে গ্রামে মরণাপন্ন রুগি দেখতে চলে যেতেন রামপ্রাণ, সারারাত বিনিদ্র কাটিয়ে ফিরে আসতেন নৌকায়। রাতজাগার সেই পুরোনো অভ্যাসটা ফিরে এল শিউলির অসুস্থতার সময়ে। রাতের পর রাত বারান্দায় বার্মাসেগুনের ভারি ইজিচেয়ারটায় বসে কেন্ট সাহেব রচিত মেটেরিয়া মেডিকার মহাগ্রন্থ, ইংরেজিতে লেখা, অভিধান পাশে রেখে পড়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। ঠিক এই রকম মনঃসংযোগে তাঁর প্রপিতামহের ভাই রামদেব এগারোটি রহস্যময় পুথি পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। ঘরের কোণে শায়িত স্ত্রী, অজানা রোগে বিকলাঙ্গ। একদিন অরগানন-এর একটি টীকা পড়ে রামপ্রাণ জানতে পারলেন আদরিণীর সেই রোগটি ছিল এক বিরল স্নায়ুঘটিত ব্যাধি, চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষায় যার নাম অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস, চলতি নাম— ‘লু গেরিগের ব্যাধি’।
সারারাত আরুন্ডেল সাহেবের গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের টিক টিক ধ্বনির সঙ্গে তাল রেখে বাগানে ঝিঁঝি ডাকে, পাঁচিলের ওপাশে কুয়োর ব্যাঙ ডাকে। ভোরের আগে নাগকেশরের উঁচু ডালে রাততাড়ুয়া হাওয়ার শব্দে আরামকেদারা ছেড়ে উঠে পড়েন রামপ্রাণ, ওষধিবাগানের বেড়ার গেট খুলে ভেতরে ঢুকে গাছেদের মাঝে পায়চারি করেন, জড়িবুটির ঝোপে উবু হয়ে বসে শুকনো পাতা সরিয়ে দেন। শেষরাতে খিড়কির পায়খানায় যেতে গিয়ে ভূত দেখে বামুনদি: সাদা দাড়ি, খালি গা, ধুতিটা কোমরে দোপাট্টা করে জড়ানো। খবর ছড়ায়, ছোটো ছেলের মতোই পরাণ ডাক্তারেরও মাথার ব্যামো দেখা দিয়েছে। বসন্তর কানে যেতে একদিন সে বিশুকাকে জিজ্ঞেস করল।
‘তুই জানিস না বুঝি? রাতের বেলা ভূতেরা তোর বাবার কাছে এসে ব্যথাবেদার চিকিচ্ছে করায় তো!’ তিক্ততা গিলে তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে বিশুকা। ‘পর্তুগীজ গোলাবাজ হার্মাদদের ভূত সব, পুরোনো চোট-লাগা ব্যাথা মরার পরেও যায়নি।’
আলিসাহেব বলেন ― ‘মানুষটা ক্রমে ক্রমে দিওয়ানা হয়ে যাচ্ছে।’
দিওয়ানা হলে সবরকমের জাগতিক কর্তব্য পাশ ছিন্ন করে ফেলে বেরিয়ে পড়ে লোকে। এর পরেই রথীনকে চিঠি লিখে বাপ্পাকে সাতগাঁয় আনালো বিশুকা।
.
‘তুমি কি মাঝরাতে উঠে গাছেদের সঙ্গে কথা বল, দাদু?’
‘হুম। বলি তো!’
‘গাছেরা তোমার সঙ্গে কথা বলে?’
‘বলে বোধহয়, কিন্তু আমি ওদের কথা শুনতে পাই না।’
দিনের আলো পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি কিন্তু ওষধিবাগানে অন্ধকার গাঢ় হয়েছে। আকাশপ্রদীপের লগিটার মাথায় বাঁকা চাঁদ উঠেছে, জড়িবুটির ঝোপ থেকে সুগন্ধী ভাপ উঠছে। দূর থেকে মার্টিন্স রেলের হুইশিল ভেসে আসে, পাঁচটা পঁয়তাল্লিশের বন্দর-হুগলি লোকাল ছেড়ে গেল।
‘আচ্ছা দাদু, আত্মার যদি পুনর্জন্মই হবে তাহলে কেন তর্পণের সময়ে তিল গঙ্গাজল দেওয়া হয়?’
‘মানুষের আত্মার পুনর্জন্ম হয়, কিন্তু একটা অখন্ড মানব আত্মা থেকে যায়। বলতে পারো সেটা হলো মাদার টিংচার। তার থেকে এক ফোঁটা নিয়ে দ্রবণ তৈরি করে মানুষের জন্ম। প্রতিটি জন্ম এক-একটি নির্দিষ্ট পোটেন্সি। মৃত্যুর পর সেটা আবার মাদার টিংচারে মিশে যায়, আবার একটা নতুন পোটেন্সির জন্ম হয়। তাতে সেই নির্দিষ্ট ওষুধের গুণাগুণ বজায় থাকে।
‘কিন্তু যাকে তিল-গঙ্গাজল দেওয়া হচ্ছে, সেই আত্মা তো ততদিনে আবার কোথাও জন্মেও গিয়েছে। তাই না দাদু? তাহলে কীকরে তারা সেই তিলতর্পণ নেবে?’
বেদির ওপর পাশাপাশি বসে ওরা দুজন। রামপ্রাণের চশমার পুরু কাচে শেষ গোধূলির আলোয় গোলাপি কমলা ফিরোজা সবুজ রঙের প্রতিসরণ। নাগকেশরের গায়ে থোকা থোকা কামানের গোলা। এই গোলা ছোঁড়া যায় না। কাকে লক্ষ করেই বা ছুঁড়বে? দুষ্টু ইংরেজটা দেশে ফিরে যাবার পর কাগজ-কাটা ছুরি দিয়ে নিজের গলা নলি কেটে ফেলেছিল।
‘কখনো কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের মন হঠাৎ খুশিতে ভরে ওঠে। আমরা কি ঝুঝতে পারি কেন? সন্তুষ্টির একটা ক্ষিদে সর্বক্ষণ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। সেটা পাবে বলে লোকে নেশাভাঙ করে। কেউ পাপকাজও করে। আত্মার দোষগুণ অনুসারে, পোটেন্সি অনুসারে করে। কে বলতে পারে, হয়তো এই আচমকা সন্তুষ্টিটা ঘটে যখন আগের জন্মের কোনো বংশধর তোমায় স্মরণ করছে। তিল-গঙ্গাজল হোক বা অন্য কিছু, সেইসব জন্মের আচাররীতি অনুযায়ী তোমায় কিছু দিচ্ছে। হয়তো শুধু মনে মনে প্রার্থনা করছে। এই সন্তুষ্টির কোনো ব্যাখ্যা হ্যানিম্যান সাহেবের কাছেও নেই। মনে করো খুব সাধারণ কোনো খাবার, যেটা তুমি রোজ খাও, কোনো একদিন তোমার খেতে খুব ভালো লাগছে, কিংবা মনে করো জলের স্বাদটা হঠাৎ খুব মিষ্টি লাগল, একটা ছোট্ট ছাগলছানা দেখে, গাছে ফুল ফুটে থাকতে দেখে তোমার মনটা ভরে উঠল, প্রাণটা ঠান্ডা হয়ে জুড়োলো…’
ফার্মেসিতে শ্রীশ লাহিড়িকে ছুটি করে দেওয়া হয়েছে। বারান্দায় বেঞ্চির ওপর দেয়ালে রুগিদের মাথার তেলচিটে দাগগুলো রয়ে গিয়েছে। হ্যানিম্যান আর গঙ্গারামের পাশাপাশি ছবির কাচে ছাতা পড়ে ঝাপসা হয়েছে, মনে হয় যেন একই পরিবারের দুজন। তার পাশে রামচন্দ্রের ছবিটা আরও টকটকে রঙীন হয়েছে। শেলফে কালো রেক্সিনে বাঁধানো খাতাগুলো দেখিয়ে রামপ্রাণ বলেন–
‘বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় না একই রকম? কিন্তু প্রতিটি খাতায় আলাদা আলাদা মানুষের ধাত গড়ন ইতিহাস লেখা রয়েছে। শিশির ওষুধগুলোও তাই। প্রত্যেকটির আলাদা গুণাগুণ, আলাদা প্রতিক্রিয়া। দুটো ওষুধ এক সঙ্গে দিলে আবার ভিন্ন প্রতিক্রিয়া।’
দাদুর সব কথা বাপ্পা বুঝতে পারে না, তবে মাথার মধ্যে একটা ছবি ভেসে ওঠে: কলকাতার রাজপথে অফিস-টাইম ট্রামে বাসে একইরকম শাদা-শার্ট কালো- প্যান্ট পরা সারিবদ্ধ মানুষ, হাইকোর্টগামী বাসগুলোয় কালো-কোট শাদা-প্যান্ট উকিলের দল, মিশনারিজ অফ চ্যারিটিজ-এর নীল বর্ডার দেওয়া সাদা পোশাকের সন্ন্যাসিনীদের দল। নৌকার পেটের মধ্যে নৌকা, তার পেটের মধ্যে নৌকা।
‘এমন একদিন আসবে যেদিন পৃথিবীর সব গাছগাছড়া থেকে, সব জীবাংশ থেকেই ওষুধ তৈরি হবে। কোনো রোগেই আর কেউ মরবে না। সেই দিনটা আমি দেখে যেতে পারব না, হয়তো তুমি দেখবে।’
‘আমি যদি এই আলমারির সব ওষুধ একসঙ্গে মিশিয়ে খেয়ে নিই, তাহলে কী হবে?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করে। ‘মরে যাব?’
রামপ্রাণ নাতির চোখের দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থাকেন।
‘নাহ্! খুব বেশি হলে হয়তো একটু মাথা যন্ত্রণা, হয়তো একটু পেটখারাপ হবে।’
চৌকোণা মেহগনির বাক্সটা খুলে একটি ছোটো শিশি তুলে নেন। ‘হাঁ করে জিভ বের কর দেখি?’
ছিপি খুলে তর্জনির টোকা দিয়ে বাপ্পার জিভের ওপর ছটি গুলি ফেলে দেন।
‘ধীরে ধীরে চোষো, ভালো লাগবে। মনটা হালকা লাগবে।’
এরপর রামপ্রাণ কাগজের টুকরোয় আরও ছটি গুলি নিয়ে নিজের জিভেও ফেলে দেন। এর আগে বাপ্পা কোনোদিন দাদুকে এভাবে ওষুধ খেতে দেখেনি। এর আগে কোনোদিন সে দাদুর মুখে এত স্পষ্টভাবে তাকায়ও নি।
অনেক বছর আগে তরুণ রথীন তাঁবুর ভেতর জ্বরে পুড়তে পুড়তে লন্ঠনের আলোয় ঝুঁকে-পড়া যে মুখ দেখেছিল, সেরে ওঠার পর যার বর্ণনা দিয়েছিল সে রুপুকে লেখা চিঠিতে, সেই মুখ, রুপোলি চশমার ফ্রেমে গোল চোখ, নাকের ফুটোয় কানের ফুটোয় সাদা রোমের গুচ্ছ, পুরুষ্ট গোঁফ ঠোঁটের দুপাশে ঝুলে নেমেছে। শুধু বুকের নেমে আসা সাদা দাড়ি ছিল না তখন। আর চোখে আলো মরে যায়নি। আর ফতুয়ায় বুকের কাছে নস্যির দাগ লেগে ছিল। রান্না করা খাদ্য ছাড়ার সঙ্গে নস্যির নেশাও ত্যাগ করেছেন রামপ্রাণ
নিজের হাতে তৈরি ওষুধ নিজে খেয়ে দেয়ালে ছবির নীচে পেরেক থেকে ওষধিবাগানের গেটের চাবি বাপ্পার হাতে দিলেন।
‘এই নাও, এটা তোমার কাছে রাখো। যখন মন চাইবে গেট খুলে বাগানে ঢুকবে, গাছেদের যত্ন নেবে।’
.
রামপ্রাণ যে আর সাতগাঁয়ে ফিরবেন না ঠিক করেছেন, সেটা বোঝা গেল যেদিন নিজে হাতে কালো রেক্সিনে বাঁধানো ৮৫৩টি কেস হিস্ট্রির খাতা ফার্মেসির ভাঁটিতে পুড়িয়ে দিলেন। এবারে তাঁর রোগীরা নিশ্চিন্ত হতে পারবে, তাদের শারীরবৃত্তীয় অন্তরঙ্গ খুঁটিনাটি অন্য কারো হাতে গিয়ে পড়বে না।
‘তুমি কি তাহলে এবার ডাক্তারিটা ছেড়েই দেবে?’ বিশু বলল।
‘একটা জীবনে ঢের রোগব্যাধির কথা শোনা হল রে! ঢের ব্যথাবেদনার কথা, গু-মুতের রঙের ব্যাখ্যান, কফের স্বাদের ব্যাখ্যান…’
ঠিক এই কথাগুলো তিনি একবার বলেছিলেন শিউলিকে, শেষবার যখন সে এসে ছিল।
‘কিন্তু মা যে বলত তুমি রোগব্যাধি ছাড়া আর কোনো জগৎ চেনো না?’
রামপ্রাণ উত্তর দেননি, নীরবে হেসেছিলেন।
অন্য আরেকটি জগতের খবর তাঁর কাছে এসে পৌঁছত। ঝোলায় ভরে যেসব অচেনা গাছের চারা, বীজ, শিকড় ও বাকল আনেন আলিসাহেব, সেসব তিনি সংগ্রহ করেন হিমালয়ের দুর্গম উপত্যকায়। সেখানে বছরে তিনমাস অবিরাম বৃষ্টি পড়ে আর আশ্চর্য ফুলের গালিচায় মুহুর্মুহু রং বদলে যায়। পাহাড়ি নালাগুলো ফুলে উঠে নীচে নামার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। তিনটে মাস পাথরের গুহায় বুনো ছত্রাক খেয়ে প্রাণধারণ করেন আলিসাহেব। এমন সব আশ্চর্য ছত্রাক যার একটি ডাটি চিবিয়ে খেয়ে এক সপ্তাহ দিব্যি টিকে থাকা যায়। এইসময়ে তিনি উপত্যকা ছেনে জড়িবুটি সংগ্রহের নেশায় মাতেন, সকাল-সন্ধ্যা গুহার মুখে বসে অবিরাম ধারাপাত দেখেন, দেখেন কীভাবে আস্ত উপত্যকা ক্যালাইডোস্কোপের মতো বিবিধ বর্ণচ্ছটায় ছেয়ে আসে। তারপর একদিন বৃষ্টি থামে। পাহাড়ের গায়ে রঙের ফুলঝুরি মরে এসে সবুজ মখমলে ঢেকে যায় বুগিয়ালগুলো, নালার পথ ফের সুগম হয়ে ওঠে। এই সময় নীচের গ্রাম থেকে পশুপালকেরা তাদের মাদি ঘোড়াগুলোকে নিয়ে আসে। নির্মল শরতে চাঁদনি রাতে পাহাড়ের ওপারে ঢালে আদিম অরণ্য থেকে বুনো রুপোলি পুরুষ গাধারা এসে উপগত হয়, খচ্চরের জন্ম হয়।
কালবৈশাখীর রাতে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেলে গুমোট অনিদ্রায় ভিজে শীতলপাটিতে শুয়ে রামপ্রাণ আলিসাহেবের মুখে শোনা সেইসব গুপ্ত উপত্যকার বর্ণনা দিতেন স্ত্রীকে। পাশ ফিরে শুয়ে হাতপাখা নাড়তে নাড়তে ঘুম জড়ানো গলায় সরোজা বলতেন–
‘এসব তোমার আলিসাহেবের বানানো গল্পকথা। এসব জিনিস কেবল মরার পরেই মানুষ দেখতে পায়।’
‘বানানো কেন হবে? আলিসাহেবের জড়িবুটির গুণাগুণ তো আর মিথ্যে নয়। চোখ বন্ধ করলে রামপ্রাণের মনশ্চক্ষে ভেসে ওঠে সেই আশ্চর্য উপত্যকা। সেখানে এমন সব গাছগাছড়া রয়েছে যাদের গুণাগুণ পৃথিবীর কোনো মেটেরিয়া মেডিকা লেখা হয়নি। সেসব লেখার জন্য মানুষের আয়ু অন্তত আরও তিনগুণ বেশি হতে হবে, যেমনটা নাকি হয় সেইসব সাধুসন্তদের, যাঁরা হিমালয়ের গুপ্ত গুহায় ধ্যানে বসে কাটিয়ে দেন শতাব্দীর পর শতাব্দী।
