Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৫.২

৫.২

কিতাব রুজারের ছটি পুথি নিয়ে কৃষ্ণদাস রায়কে সোনার মোহর দেবার পরিণাম রামাই পণ্ডিত কল্পনা করতে পারেননি। চারিদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল, প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য পুথির জন্য তিনি অর্থমূল্য দিতে প্রস্তুত। দূরদূরান্ত থেকে লোকে পুরোনো ছেঁড়া ধসা পারিবারিক পুথি পুঁটুলি বেঁধে নিয়ে আসতে লাগল। তার কিছু কিছু প্রাচীন, বহুকাল অযত্নে পড়ে থাকা, সিন্দুকের গর্ভে আরশোলার রাজ্যে নয়তো দরজার মাথায় কুলুঙ্গিতে ছত্রাক আর পায়রার বিষ্ঠায় লাঞ্ছিত। বেশিরভাগই সহজলভ্য গ্রন্থের নকল, কিছু কিছু দুষ্প্রাপ্যও ছিল, বহুকাল আগে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে ভাবা হয়েছিল।

রামাই পণ্ডিত কাউকে ফেরালেন না। সরস্বতী মজে গিয়ে বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র বন্দর-হুগলিতে সরে যাবার পর বর্তমানে সাতগাঁ ক্ষয়িষ্ণু, অতীতের মেদুর স্মৃতি- আঁকড়ে-থাকা একটি জনপদ। জ্যোতিষশাস্ত্রীদের গৃহে বণিকদের আনাগোনা নেই, টোল চতুষ্পাঠীগুলো দূরদূরান্ত থেকে আসা বিদ্যার্থীদের কণ্ঠস্বরে গমগম করে না আর। এরই মধ্যে রামাই অতীত গৌরব পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখলেন। বন্দরে সমৃদ্ধির কালে কয়েক প্রজন্ম ধরে পরিবারে যে ধনসমাগম ঘটেছিল, সেসব ফের তিনি বদলে নিতে চাইলেন ব্রাহ্মণের বর্ণসূচক অনধিগম্য মুদ্রায়ঃ অর্থাৎ, বিদ্যা।

এ এক অভিনব ফিরতি জোয়ার, চারশো বছর আগে এই জনপদ থেকে ছড়িয়ে গিয়েছিল বিস্তীর্ণ বাংলায়। প্রাচীন, ভঙ্গুর, কীটদষ্ট তালপাতা, কাঠের পাত আর তুলোট কাগজের পুথি যেন জাদুবলে বেরিয়ে আসতে লাগল বর্গির হামলায় ছেড়ে যেতে থাকে ভিটের সিন্দুক থেকে, চিলেকোঠা থেকে, গোপন কুলুঙ্গি থেকে, মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে, গোয়ালের চালের বাতা থেকে। একাধিক বিরল গ্রন্থ, কৌম জ্ঞানচর্চার বৃত্ত থেকে হারিয়েছিল কতকাল: মীমাংসা দর্শনের নতুন ব্যাখ্যা থেকে শুরু করে স্মৃতিশাস্ত্রের প্রথাভাঙা টীকা, কর্মানুষ্ঠানপদ্ধতির বিস্মৃত সুত্র থেকে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের অজানা সংস্করণ, ইসলামী জ্যোতির্বিদ্যার আলোকে বরাহমিহিরের জ্যোতিষশাস্ত্রের বিচারমূলক ভাষ্য, আস্তুরলাবের সচিত্র বর্ণনা ও কর্মপদ্ধতিও। এসবই রামাই পণ্ডিত নিলেন সোনা রুপোর মুদ্রা দিয়ে, যা তাঁর পূর্বপুরুষেরা সঞ্চয় করেছিলেন জাহাজি নাবিকদের কোষ্ঠী গণনা ও রোগনিরাময় করে।

পুথিই শুধু নয়, বিভিন্ন বর্গের বিগ্রহ আসতে লাগল। বর্গির হানায় যারা ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তারা অনেকেই প্রাণে ধরে গৃহদেবতাকে জলসমাধি দিতে পারল না। পুথিপত্রের সঙ্গে পারিবারিক পুজোর বিগ্রহ নিয়ে এল; রামাই পণ্ডিত যদি আদিরামের মন্দিরে ওঁদের ঠাঁই দেন, নিত্যপুজোর বন্দোবস্ত করেন। এক্ষেত্রেও তিনি কাউকে ফেরালেন না।

সাতগাঁর সমাজে আপত্তি উঠল—বিভিন্ন বর্গের দেবদেবীর বিগ্রহ, তাদের পূজার উপচার আলাদা, এতে করে মন্দিরের অধিপতির শাস্তি বিঘ্নিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

‘এটা কি উচিৎ কাজ হচ্ছে, রামতনু?’ প্রবীণ গোষ্ঠীপতি এসে বললেন,— ‘এতে কি আদিরাম কুপিত হবেন না?’

‘এমনি এমনি তো আর উনি মর্যাদা পুরুষোত্তম নন, রামাই পণ্ডিতের প্রত্যয়ী কন্ঠস্বর। ‘বাস্তুচ্যুত দেবদেবীদের আশ্রয়দান করতে পেরে তিনি যে অত্যন্ত প্রীত হবেন এ আমার বিশ্বাস, সে তাঁরা যে বর্গেরই হোন।’

বৈদিক, বৈষ্ণব, শাক্ত, এমনকি বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর বিগ্রহ আসতে লাগল। তাদের কারোর মধ্যে এমনকি তান্ত্রিক বৌদ্ধ চিহ্নও আছে। শুধু তারারই তিনটি ব্রোঞ্জ ও অষ্টধাতুর মূর্তি, যিনি একাধারে ভদ্রকালী ও সরস্বতীরূপে পূজিত এক বিঘত পরিমাণ দীর্ঘ স্টিয়াটাইট পাথরের দিগম্বর তীর্থঙ্করের মূর্তি, যিনি আবার মহাদেবরূপে পূজিত। অপরিসর গর্ভগৃহে এতজন বিভিন্ন দেবদেবীর নির্দিষ্ট আচারমাফিক নিত্য পূজাপাঠ কঠিন হয়ে পড়ল। রামাই পণ্ডিত তালপাতার ছাউনি দেওয়া কাঠের ঠাকুরবাড়ি নির্মাণ করালেন।

ফাল্গুনেও যে মানুষটি সংসারের মায়া কাটিয়ে হিমালয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, পরের জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা রৌদ্রে সেই তিনিই কি না বেতের ছাতা কাঁধে, মুন্ডিত মস্তকে ভিজে গামছা চাপিয়ে, মাইলের পর মাইল আলপথে, কখনো নৌকায় কখনো পালকিতে, চষে বেড়াতে লাগলেন গ্রাম থেকে গ্রামে, বিরল পুথির সন্ধানে।

পশ্চিম রাঢ়ে এসে তিনি চাক্ষুষ করলেন এক অকল্পনীয় ধ্বংসের ছবি দাবানলের পর জঙ্গলের চেহারা যেমন হয়, তেমনই কিছু যেন বয়ে গিয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম গঞ্জ নগর বিজন, ফসলের মাঠ রিক্ত, দিনের বেলাতেও শিয়ালের পাল ঘুরে বেড়ায়, হাট বাজার বসে না। দলে দলে দেশ ছেড়েছে সচ্ছল সাবর্ণরা। যাদের কিছুই তেমন হারাবার নেই, কোথাও যাবার নেই, সেই সব প্রান্তিক বর্গের মানুষেরা রয়ে গিয়েছে।

তাদের মুখে রামাই পণ্ডিত শোনেন বর্গির লুটেরাদের কথা। আগের শতকে যে হার্মাদ আর মগ জলদস্যুরা পূববাংলার উপকূলভূমি ছারখার করেছে, তাদের চেয়ে কিছু কম নৃশংস নয় এরা। তফাৎ একটাই ওরা আসত দ্রুতগামী জেলিয়া নৌকায় নদীনালাবেষ্টিত অঞ্চলে, এরা আসে সাজবিহীন বেঁটে আরবি ঘোড়ায়, মাথায় পাগড়ি আর কোমরে ধুতি ল্যাঙটের মতো পেঁচিয়ে পরে। শীতকালে যখন গোলা ভর্তি ফসল, গ্রামে গ্রামে দেবী অন্নপূর্ণার পুজোর উৎসব, মাইল মাইল রিক্ত নাড়া-ওঠা মাঠের ওপর দিয়ে ওরা আসে। ঘোড়ার খুরে খুরে ভর দুপুরেই আকাশে ছেয়ে আসে গোধূলির মেঘ, আগুন ধোঁয়া আর রক্তের ছোপলাগা, রিরংসা আর বিলাপের ধ্বনিতে দপদপ করে। গঞ্জের বাজারে গিয়ে পাইকারদের কাঁচামাল লুঠপাট করে, খোড়ো চালায় আগুন ধরিয়ে দেয়, কেউ বাধা দিতে এলে লম্বা বল্লম আর তরোয়ালে কচুকাটা করে, নবাবের ফৌজ নড়েচড়ে ওঠার আগেই যে পথে এসেছিল সেই পথে ফের ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যায়, রেখে যায় প্রলয়ের চিহ্ন। গাইবলদ ছেড়ে, গৃহদেবতার থান ছেড়ে, নৌকায় গরুর গাড়িতে পাল্কিতে যা কিছু নেবার মতো সম্পত্তি চাপিয়ে নিয়ে দলে দলে লোকে রাঢ় বাংলা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

সম্পন্নরা কেউ কেউ যাচ্ছে কলকাতায়। কাদামাটির গড় আর কয়েকশো কোঠাবাড়ি নিয়ে হুগলির পশ্চিম পাড়ে নোনা জলার মাঝে জেগে উঠছে ইংরেজদের শহর। কেউ কেউ চলে যাচ্ছে আরও পূর্বে, পদ্মা বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে। মগ হার্মাদ জলদস্যু দমনের পর সেদিকে এখন শান্তি ফিরেছে।

মি’লেডি, পদ্মা বুড়িগঙ্গার পুবের দেশকে এতকাল অপবিত্র বলে এসেছে এদিকের লোকেরা। দাক্ষিণাত্যের হিন্দু সেন রাজারা রাঢ় বাংলা দখল করার পর অত্যাচারিত বুদ্ধের অনুগামীরা দলে দলে গিয়ে খালবিল জলা থেকে সদ্য-জেগে- ওঠা ডাঙাভূমিতে বন কেটে বসত গড়ল, বিহার গড়ল, মুন্ডিতমস্তক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সুবাদে ওইসব অঞ্চল চিহ্নিত হলো নেড়ানেড়িদের দেশ নামে। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার বাস্তব কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন সুফি সাধকদের সংস্পর্শে এসে নবীন জলাভূমিকে বশে এনে চাষবাস শিখল, ইসলাম ধর্ম নিল। এপারের সাবর্ণদের চোখে নেড়ানেড়ির দেশ হয়ে উঠল পরিত্যাজ্য। কিন্তু প্রাণধারণ বড়ো বালাই, মি’লেডি। পুরোনো সংস্কার ধুয়ে মুছে গেল পরিস্থিতির চাপে।

.

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পুরীতে যাবার পর বাংলায় ভক্তি আন্দোলনে ভাটা পড়েছিল। তাকে ফের উজ্জীবিত করতে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের নেতা শ্রীনিবাস আচার্য একদা পুরীধাম থেকে আসছিলেন, তাঁর সঙ্গে ছিল গরুর গাড়িতে বোঝাই মহাপ্রভুর প্রত্যক্ষ শিষ্য ছয় গোস্বামীর লেখা বৈষ্ণবসূত্রের পুথি। বিষ্ণুপুরের ঘন জঙ্গল দিয়ে আসার সময়ে ডাকাতের কবলে পড়েন, ওরা তাঁর সর্বস্ব কেড়ে নেয়। তার মধ্যে একশো আটটি পুথিও ছিল। প্রায় দুশো বছর পরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে রামাই পণ্ডিত গোস্বামীদের লেখা কয়েকটি পুথি পেয়ে গেলেন।

ছোটোবেলা থেকে রামাই মহাপ্রভুর সাতগাঁয়ে আসার কাহিনি শুনে আসছেন। তাঁর দন্ডির আঘাতে সৃষ্ট চৈতন্যধারা আজও তিরতির করে বয়ে চলে ধর্মতলার বটগাছের নীচে। সেই জলে প্রতিফলিত সূর্যের বীচিকাটা আলো গাছের ডালে গৌরাঙ্গদ্যুতি হয়ে ফোটে। সাতগাঁর সাবর্ণদের কাছে ধর্মতলা অগম্য স্থান। তা সত্ত্বেও বালক বয়সে একবার তিনি গোপনে গিয়ে দেখে এসেছেন। পুরীধামে নীলাচলে কিংবা জগন্নাথদেবের দারুবিগ্রহে তাঁর লীন হবার কাহিনিও কিছু কম অলৌকিক নয়। ততোধিক রোমাঞ্চকর তাঁর হত্যার কাহিনি, রামতনু ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছেন। পুথি সংগ্রহের অভিযানে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানলেন সেই ভয়ঙ্কর নৃশংস ঘটনার বিবরণ সম্বলিত একটিমাত্র পুথি এই বাংলাতেই কোথাও আছে। ওড়িয়া ভাষায় লেখা পুথি, নাম চৈতন্য গৌরাঙ্গ চখরা। লেখক বৈষ্ণব দাস নাকি জগন্নাথ মন্দিরের চৌহদ্দির ভেতরে সেই হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী।

একদিন রামাই পণ্ডিতের কাছে খবর এল, সাতগাঁ থেকে ষোল ক্রোশ পশ্চিমে কানা দামোদরের ধারে ঘুঘুডাঙা গ্রামে এক পুরোহিতের কাছে পুথিটি আছে। পত্রপাঠ তিনি বেরিয়ে পড়লেন সেই গ্রামের উদ্দেশ্যে। কিছু পথ নৌকায় কিছুটা পায়ে হেঁটে, পরিত্যক্ত আগাছা কবলিত উর্বর চরভূমি পেরিয়ে বৈশাখের দীর্ঘ দিনের আলো ফুরিয়ে যাবার আগেই ঘুঘুডাঙায় পৌঁছলেন।

.

ঘুঘুডাঙা গ্রামটি বড়ো। দেখেই বোঝা যায় একদা বর্ধিষ্ণু ছিল। বর্তমানে প্রায় পরিত্যক্ত, জনবিরল। তালাবন্ধ কোঠাবাড়িগুলোয় বহুকাল চুনের পোঁচ পড়েনি, কালচে শ্যাওলায় ছাওয়া, গলিপথের দুপাশে ছেয়ে এসেছে আগাছা। পথের বাঁকে একটি জীর্ণ কাঠের রথে তেলাকুচো লতায় টুকটুকে লাল ফল ধরেছে। কয়েক পা এগিয়ে একখন্ড ঘাসজমি, দ্বাদশ শিবের মন্দির। দরজাগুলি খসে গিয়েছে, ভেতরে ধুলোয় ধূসর শিবলিঙ্গ, তাদের মাথায় ঝুলছে বিশুষ্ক কবেকার মাটির হাড়ি। বাঁধানো চাতালে শুকনো পাতা আর ছাগল নাদির স্তূপ। তারই এক পাশে দাগ কেটে পাঁচটি ছোটো মেয়ে এক্কাদোক্কা খেলছে। তাদের গায়ে বিবর্ণ শাড়ি, পায়ে হাঁটু অব্দি পুরু ধুলো। কন্ঠের কলকাকলি শূন্য মন্দিরের ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে দিনশেষের আলো ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে। ওদের মধ্যে যে মেয়েটি সবচেয়ে ফুটফুটে, নাকে চিকচিক করছে সোনার নাকফুল, তার এক পায়ে কোনো সমস্যা রয়েছে। খেলতে গিয়ে বারে বারে আছাড় খেয়ে পড়ে যাচ্ছে, আবার উঠে পড়ছে। এ নিয়ে ওর বা সাথীদের কোনো হেলদোল নেই।

‘বাছারা, বলতে পার দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের বাড়িটি কোনদিকে?’ রামাই পণ্ডিত বলেন।

বালিকার দল ওঁর গলা পেয়ে খেলা থামায়, নাকফুল-পরা মেয়েটি ডান পা টেনে এগিয়ে এসে সপ্রতিভ গলায় বলে— ‘আপনি কি দাশুঠাকুরের কথা বলছেন?’

‘হ্যাঁ, তিনিই হবেন।’

‘আমার সঙ্গে আসুন।’

মেয়েটি খেলা ছেড়ে এসে সামান্য লেংচে হাঁটতে হাঁটতে রামাই পণ্ডিতকে এগিয়ে নিয়ে চলে। দুদিকে সারি দিয়ে মেটে কুঁড়ে। মাঝে সংকীর্ণ গলিপথ গরুর গাড়ির চাকায় ক্ষতবিক্ষত। রামাই দেখেন, মেয়েটির পায়ে অসুবিধা, কিন্তু হরিণীর মতো ত্বরিৎ গতি তার। লাল ডুরে শাড়িটা হাঁটুর ওপরে তুলে গাছকোমর করে পরেছে, ডাগর পা দেখে বোঝার উপায় নেই সমস্যাটা কোথায়। রাংচিতের বেড়া দেওয়া বাগান, বাঁশবনের প্রান্তে টালির চালের বাড়ির ভেতরে ওঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে। উঠোনের একপাশে একফালি সব্জির বাগান, মাটিলেপা তুলসীমঞ্চ, ওপরে মেটে হাঁড়ি থেকে জল টুপিয়ে পড়ছে। গোয়ালে খড়ের ছাউনির নীচে দুটি কঙ্কালসার গরু। মাথায় গামছা জড়িয়ে এক চল্লিশোর্ধ্ব প্রৌঢ় মাটিতে উবু হয়ে বঁটির সামনে বসে নারকেলের বালদো থেকে ঝাঁটার কাঠি বের করছেন। তাঁর গৌরবর্ণ ত্বক, গলায় পৈতে।

মেয়েটি কুঁড়েঘরের দরজায় উঁকি মেরে ভেতরে কাউকে ডাকে— ‘ঠাকুরমশাই, ও ঠাকুরমশাই?’ তারপর উঠোনে ব্যক্তিটির দিকে ফিরে দুষ্টুমিভরা মুখে বলে— ‘ঠাকুরমশাই কি বাড়িতে আছেন? জানো মুনিষদাদা?’

ব্রাহ্মণের মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নারকেলের কাঠিগুলো জড়ো করে ঝাঁটার মতো তুলে বলেন— ‘দাঁড়া রে দুষ্টু মেয়ে! তোকে একবার ধরি!’

মেয়েটি বিস্ময়ের ভাণ করে রামাই পণ্ডিতের দিকে ফিরে বলে–‘আমার মন বলে এই মুনিষদাদাই দাশুঠাকুর!’

দাশরথি মুখোপাধ্যায় উচ্চৈঃস্বরে হেসে বঁটি ছেড়ে উঠে মাথার গামছার পাক খোলেন, সেই ফাঁকে মেয়েটি পালানোর উপক্রম করে। উনি সঙ্গে সঙ্গে ওঁকে স্মরণ করান, বাড়িতে অতিথি ব্রাহ্মণ এসেছেন। মেয়েটি লম্বা জিভ কেটে ঘরের ভেতর থেকে জলভরা পেতলের ঘড়া ও গামছা এনে রামাই পণ্ডিতের পা ধুইয়ে মুছিয়ে দেয়, দাওয়ায় পেতে দেয় কুশের মাদুর।

‘এবারে আমি খেলতে যাই?’ মেয়েটি জিজ্ঞেস করে। ‘ঢেঁপিটা আমার দান চুরি করে নিলে গৌরী খুব খোঁটা দেবে!’

‘আয় মা, আয়!’ দাশরথি বলেন, মুখে চিকচিক করে অপত্য স্নেহ।

দাওয়ায় উঠে বসে প্রাথমিক পরিচয়পর্বে জানা যায় এঁরা পাশ্চাত্য বৈদিক বংশোদ্ভূত। পরস্পরের বংশলতিকার বিভিন্ন শাখাপ্রশাখার তথ্য বিনিময় করে দেখা হয় কোথাও কোনো সম্বন্ধের গ্রন্থি আছে কি না, এসব ক্ষেত্রে যেমন হয়ে থাকে। অবশেষে রামাই পণ্ডিত তাঁর আসার উদ্দেশ্য জানান।

‘হ্যাঁ, এমন পুথি আছে বটে কোনো এক অজ্ঞাত ভাষায় লেখা, দাশরধি বলেন। ‘কিন্তু সেই পুথি তো একটি নয়, এগারোটি।’

তিন ভাই বর্গি হানার ভয়ে বাস উঠিয়ে ঢাকায় গিয়েছে, পুথিগুলি তার হেফাজতেই আছে। দাশরথি ভাইদের সঙ্গে নেড়ানেড়িদের দেশে যেতে চাননি। বাড়িতে নারায়ণ আছেন, নিত্য পুজো হয়, আর আছে বেশি বয়সে বিবাহের একমাত্র ফল ওই কন্যাটি। স্ত্রী দেহ রেখেছেন তিন বছর হলো।

মুখোমুখি দুই বিপত্নীক পুরুষ, আলাপ চলে। অনেক দিন পরে কথা বলবার মতো একজনকে পেয়েছেন দাশু ঠাকুর। আকাশে আলো কনে আসছে, ওঁর গলায় সেই চেনা নির্লিপ্তির স্বর খুঁজে পান রামাই পণ্ডিত। উঠোনের ধারে বাঁশবনে কাকের দল ফিরছে, কাকা রব কানে বেজে উঠে মনে হয় যেন সুদূর হিমালয়ে কোনো ঝরনায় উপলখণ্ড গড়াচ্ছে। তার মনে পড়ে যায় এখানে আসার উদ্দেশ্য।

‘পুথিগুলি কি একবার স্বচক্ষে দেখতে পারি?’

‘বিলক্ষণ!’ দাশরথি বলেন। ‘তবে একটি শর্ত আছে।’

‘কী শর্ত?’ রামাই পণ্ডিতের ভ্রু কুঞ্চিত হয়।

‘আজ আমার কী সৌভাগ্য যে আপনার মতো যশস্বী পণ্ডিত, তদুপরি স্বজাতির, আমার এই নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর কুঁড়েয় পদধুলি দিয়েছেন। এত দীর্ঘ পথ এসেছেন, আপনাকে আজ এখানে রাত্রিবাস করতে হবে, আমার হাতে সামান্য দুটি অন্ন গ্রহণ করতে হবে।’

বাঁশের বনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগে মেয়েটি ফিরল। উঠোনে শুকনো বাঁশপাতা ঝাঁট দিয়ে সরালো, তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে শাঁখ বাজালো। দাশু ঠাকুর গৃহদেবতার পুজো দিয়ে প্রসাদী ফল বাতাসা নিয়ে এলেন রামাই পণ্ডিতের জন্য। তারপর বিবর্ণ শালুতে মোড়া এগারোটি পুথি নিয়ে এসে রাখলেন জলচৌকির ওপর।

রামাই পণ্ডিত দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের গৃহে রাত্রিবাস করলেন। একটি রাত নয়, পর পর তিনটি রাত। এগারোটি পুথির মধ্যে কোথাও মহাপ্রভুর জীবনের শেষ দিনটির আখ্যান নেই। থাকা সম্ভবও নয়। তার কারণ অতীব বিশুষ্ক ভঙ্গুর তালপাতার পুথিগুলি তার চেয়ে ঢের প্রাচীন, রামাচার্যের কালের থেকেও প্রাচীন। এগুলি যে ওড়িয়া লিপিতে লেখা নয় সেটা রামাই বুঝতে পারলেন। পুথিগুলি সংস্কৃতেও লেখা নয়। বাংলার খুব কাছাকাছি কোনো ভাষায় ছোটো ছোটো পংক্তি, কখনো টানা গদ্য— অনুমান হয় মগধী প্রাকৃত। কিছু কিছু শব্দ বুঝি রাঢ় সমতট এমনকি অসম ও ওড়িশার সীমান্তে কথ্য রীতিতে প্রচলিত। বিগত কয়েক বছরে অসংখ্য প্রাচীন বিরল পুথি নাড়াচাড়া করে এই ব্যাপারে বেশ কিছুটা জ্ঞান অর্জন করেছেন তিনি। তিনটে দিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত, এবং তার পরেও রাত্রি দ্বিতীয় যাম অবধি প্রদীপের আলোয়, মুখুজ্জ্যেবাটির চারচালা বসার ঘরে বসে পুথিগুলি পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করে নিশ্চিত হলেন, এই রকম কোনো কিছু তিনি এর আগে কখনো দেখেননি।

সেটি কেবল পুথিগুলির প্রাচীনত্বের কারণেই নয়। সাধারণ মানুষের কথ্যভাষা যে এভাবে লিপিবদ্ধ হতে পারে, সেটা তাঁর কল্পনার অতীত ছিল। বিষয়ের যতটুকু আভাস তিনি পেলেন, তাতে স্পষ্ট এই গীতিকবিতাগুলি কোনো দৈব কিংবা মহাজাগতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে নয়, দেবদেবীর মাহাত্ম্য বর্ণন কিংবা রাজারাজড়াদের বংশলতিকাও নয়। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকথা আবেগ, হতাশা, কামনা, বঞ্চনা, গরম ধোঁয়া-ওঠা ভাতের রসনা, স্নিগ্ধ নদীর জলে স্নানের আরাম, শিমুল গাছের ঝিরিঝিরি আলোছায়ায় চিত্রল হরিণের আনাগোনা…

পাতগুলি এতই ভঙ্গুর যে সামান্য কেশে উঠলে বায়ুর আঘাতে বুঝি ধুলো হয়ে যাবে; দীর্ঘকাল আর্দ্রতা শুষে তালের তন্তুগুলি পরস্পরে জুড়ে রয়েছে। অতীব সতর্ক আঙুলে একটি একটি করে পাত খুলে উলটে রামাই পণ্ডিত এমন এক সুতীব্র উত্তেজনা অনুভব করলেন, যা সোয়া চারশো বছর আগে তাঁর পূর্বপুরুষ রামাচার্য অনুভব করেছিলেন এক ভোরে, যখন দরপ খান ভেড়ার শিঙের ভেতর থেকে বের করেছিল পাকানো বাগদাতিকোষ।

মুখোপাধ্যায় পরিবারের এই এগারোটি পুথি গৃহদেবতা শালগ্রাম শিলার থেকে কিছু কম প্রাচীন বা কম পূজ্য নয়। কবে কীভাবে এগুলি এল, কোথা থেকে এল, কীই বা লেখা আছে এতে, সেসব দাশরথি জানার চেষ্টা করেননি।

‘আমি আপনার মতো জ্ঞানতাপস নই,’ তিনি বলেন। ‘নিতান্তই গ্রাম্য পুরোহিত। তবে আমার পূর্বপুরুষেরা কেউ কেউ অধ্যাপনও করতেন। পিতৃদেবের মুখে শুনেছি, তিনি তাঁর পিতৃদেবের মুখে শুনেছেন, বল্লাল সেনের আমলে পুথিগুলি আমাদের গোত্রপিতার হস্তগত হয়। সেসময়ে নেড়ানেড়ি সন্ন্যাসীর দল দুমুঠো অন্নের যোগাড় করতে মূল্যবান পুথিপত্র, সোনার জরি-দেওয়া থংকা বিনিময় করছিল। তার কারণ ওদের ভিক্ষা দেবার মতো সাহস কারোর ছিল না। সঙ্ঘ বিহারের জোতজমি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই জমির প্রজা বাগদি হাড়ি ডোমদের জলচল করে উৎখাত করা হয়েছিল। বৌদ্ধ বেনেরা দেশ ছেড়েছিল আগেই। তারপর সন্ন্যাসীরাও পুথিপত্র পুঁটুলি বেঁধে নিয়ে হিমালয়ের ওপারে ভোট দেশে চলে যেতে লাগল দলে দলে। ও দেশ ছিল বৌদ্ধদের, ওখানে এসবের কদর ছিল। ভোট ব্যাপারীরা সোনার ধুলো আর কম্বল দিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে পুথি থংকা সংগ্রহ করত। বংশের এক পুরুষ কোনো এক ডোমনির কুঁড়ে থেকে পুথিগুলি উদ্ধার করেন। ভিনগাঁয়ে যজমানি করে ফিরছিলেন, পথে প্রবল ঝড়বৃষ্টি আর বাজের কবলে পড়েন। নিরুপায় হয়ে মাঠের মাঝে তালপাতায় ছাওয়া দীনহীন ডোমনির কুঁড়েয় আশ্রয় নেন। সেখানে ডোমনি তার পাঁচটি ক্ষুধার্ত সন্তানের মুখে অন্ন দেবার জন্য চাল ফোটানোর আয়োজন করছিল। বৃষ্টিতে জ্বালানি কাঠ ভিজে গিয়েছিল, বার বার চকমকি পাথর ঠুকেও আগুন জ্বলছিল না। এদিকে শিশুগুলা ক্ষিদের জ্বালায় কাদছে। তখন ডোমনি বাঁশের খলুঞ্চে থেকে এই পুথিগুলো বের করে আগুন ধরাতে যায়। দেখতে পেয়ে তিনি যজমানের দেওয়া ঘি আমসত্ত্ব ছাতু গুড় ফলের পুঁটলি বিলিয়ে দিয়ে পুথিগুলো উদ্ধার করেন। সেই থেকে আমাদের বাড়িতে রক্ষিত আছে, কিন্তু কেউ কখনো পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করেছে বলে মনে হয় না। বুঝতেই পারছেন, সঙ্ঘ বিহারের পুথি, বৈষ্ণব বাড়িতে আর কীইবা কাজে লাগবে।’

তিনদিন ধরে নিরলস চেষ্টার পর রামাই পণ্ডিত টের পাচ্ছিলেন, ওই আপাত সহজ চম্পুগুলি বারে বারে পাঠে উপমার ভেতর যেন অস্পষ্ট বেজে উঠছে নিহিত গভীর কোনো অর্থ, বিশুষ্ক ফলের ভেতরে যেমন বীজ বেজে ওঠে।

‘আমি এই পুথিগুলি সংগ্রহ করতে চাই ঠাকুরমশাই, এজন্য যা অর্থমূল্য আপনি চাইবেন আমি দিতে প্রস্তুত।’ রামাই কোমরে জড়ানো গেঁজেয়া থেকে একটি ফিরোজা রঙের রেশমি বটুয়া বের করে গিঁট খুললেন। প্রদীপের আলোয় চিকচিক করে উঠল তুঘলকী ছাপ মারা সাতগাঁর টাকশালের মোহর। ‘কিংবা আপনি যদি জমি চান, সরস্বতীর পাড়ে উঁচু তিনফসলি জমি…’

দাশরথি মুখোপাধ্যায় মুচকি হাসেন।— ‘সোনার মোহর জমিজমা এসব নিয়ে আমি কী করব পণ্ডিতমশাই? আমি যে কাশীবাসী হবার জন্য পা বাড়িয়ে আছি। কিন্তু নিরুপায় গৃহে নারায়ণ আছেন, আর পায়ে সোনার বেড়ি ওই মেয়েটা। বিলম্বে বিবাহ করেছিলাম, আদরিণীর যখন আট মাস ওর মা পক্ষাঘাত হয়ে বিছানা নিল, আর উঠল না। বচ্ছরাধিক কাল খুব কষ্ট পেয়ে চলে গেল। সেই থেকে মেয়েই আমার শিবরাত্রির সলতে। আদরিণী ডাগর হচ্ছে, আমি চোখ বুজলে ওর কী হবে? আদর আমার পাত্রস্থ হবার আগেই যদি ঋতুমতী হয়? সাত পুরুষের অর্জিত পুণ্য ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে যে! ভেবে ভেবে দুচোখের পাতা এক করতে পারি না, জানেন? কে আমার নারায়ণকে ফুল জল দেবে? মাঝরাতে হাওয়া দিলে বাঁশবনে খটাখট শব্দ শুনে জেগে উঠি, ভ্রম হয় এই বুঝি ঘোড়া ছুটিয়ে বর্গি এল। সে যে কী আতঙ্ক পণ্ডিতমশাই!’

‘ওরা কি এ তল্লাটেও এসেছে?’ রামাই জিজ্ঞেস করেন।

‘কোন তল্লাটে আসেনি বলুন? ওদের জ্বালায় গ্রামকে গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ছে শুধু নয়, সেইসব অঞ্চলের ইতিহাসও মুছে যাচ্ছে। যেকোনো দলিল দস্তাবেজ পুথিপত্র দেখলেই অগ্নিকুন্ডে ছুঁড়ে দেয়, এমনকি বেদ পুরাণ গীতাও।’

‘বলেন কী? শুনেছি ওরা দেবীর পূজারী?’ রামাই জিজ্ঞেস করেন।

‘ঠিকই শুনেছেন,’ দাশরথি বলেন। ‘কিন্তু তাতে কী? এসব নষ্ট করতে ওদের বাধে না। এমনকি যুবতী নারী মন্দিরের গর্ভগৃহে টেনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণও করে। আর কী যে নৃশংস! বাধা দিলে তরোয়াল দিয়ে স্তন কেটে নেয়, জ্বলন্ত মশাল যোনিতে গুঁজে দেয়। শুনেছি ওদের দেশ অনুর্বর জনবিরল, সমৃদ্ধির চিহ্নমাত্র নেই। গোপালক আর বনবাসীদের সঙ্গে লড়াই করে শক্তি শানিয়েছে।’

অন্ধকার যেন গাঢ় হয়ে আসে। দাশরথি গভীর শ্বাস নেন, প্রদীপের শিখাটি আঙুলে উস্কে তোলেন।

‘আপনি যদি আমায় এই সংকট থেকে উদ্ধার করতে পারেন, পুথিগুলি আপনার হাতে তুলে দিতে পারলে কৃতার্থ হব। আপনার দুই পুত্র আছে বলেছিলেন না?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু বড়োটি যে বিবাহিত। আর ছোটোটি নেহাতই নাবালক, এখনও চোদ্দ পূর্ণ হয়নি।’

‘আদর এই বৈশাখে আট পেরিয়ে নয়ে পা দেবে।’

রামাই পণ্ডিতের মনে ভেসে ওঠে মেয়েটির ফুটফুটে মুখ, কলকলে কথা, সারাক্ষণ প্রজাপতির মতো ফরফরিয়ে বাড়িময় ঘুরে বেড়ানো।

‘ওর পায়ে কি কোনো সমস্যা হয়েছে?’

‘পুকুরঘাটে জল আনতে গিয়ে পা মচকেছে, দাশরথি বলেন। ‘চুন-হলুদ দিয়েছি, কিন্তু ক’দিন যে পা-টাকে বিশ্রাম দেবে সে জো কই? মেয়ের আমার পায়ের তলায় সর্ষে।’

রামাই পণ্ডিত আদরিণীর কোষ্ঠীবিচার দেখতে চান, এবং স্বজাতির ব্রাহ্মণের উৎকণ্ঠা নিরসনের ঐকান্তিক চেষ্টা করবেন এই আশ্বাস দিয়ে ঘুঘুডাঙা থেকে নিষ্ক্রান্ত হন।

কার্তিক মাসে দেবোখানী একাদশীর পরদিন সাতগাঁ থেকে পালকি চেপে বালক রামদেব ঘুঘুডাঙায় বরবেশে এল। সম্প্রদান, কুশম্ভিকা ও এয়োদের আচারের পর পাশ্চাত্য বৈদিক রীতি অনুসারে অঋতুমতী নববধূকে পিত্রালয়ে রেখে বরযাত্রীদের সঙ্গে গরুর গাড়িতে আদিরামবাটিতে ফিরে এল। পালকিতে এল এগারোটি পুথি।

.

সেবার চৈত্র পঞ্চমীর সন্ধ্যা নামার আগেই উপর্যুপরি কামানের তোপে কেঁপে উঠল মৎস্যভূমি। সারারাত ধরে অবিরাম গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসতে লাগল কোয়ার্সভিলের দিক থেকে। সাতগাঁবাসীর কৌম স্মৃতিতে ফিরে এল মোগল নৌবাহিনির গোলায় পর্তুগীজদের বন্দর-হুগলি গুঁড়িয়ে যাবার দিনটি। এক সময়ে কড় কড় করে বাজ পড়ার মতো শব্দ হলো, গোলা এসে পড়ল সাতগাঁতেও। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না, বাতাসে ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধ। মানুষজন ঘরের ভেতরে পালঙ্কের নীচে, সিন্দুকের ভেতরে গিয়ে সেঁধোলো। আর্ত শাঁখ বাজতে লাগল, গোয়ালে গরুগুলো ডাকাডাকি করতে লাগল। শেষরাতে গোলাগুলির শব্দ থামল,

কিন্তু দক্ষিণের আকাশ দাউ দাউ আগুনের আভায় কমলা হয়ে রইল। হাওয়ায় দূর থেকে ভেসে এল বিলাপের ধ্বনি। সাতগাঁবাসীর আরও গভীর কৌমস্মৃতিতে ফিরে এল জৈষ্ঠ্যের কৃষ্ণপক্ষের রাত, যেদিন ষোলজন অশ্বারোহী নিয়ে দরপ খান এসেছিল দিল্লি থেকে।

ভোরের আলো ফুটতে কোয়ার্সভিল থেকে ভেসে আসা সেই বিলাপের ধ্বনি হাহাকার হয়ে ফুটল আদিরামবাটিতে। মধ্যরাতে কখন একটি বিয়াল্লিশ পাউন্ডার কামানের গোলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আদিরাম মন্দিরে উড়ে এসে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। দেয়ালে অসংখ্য পোড়ামাটির প্যানেল সেই অভিঘাতে খুলে খসে পড়ে চুরমার হয়েছে, মন্দিরের গায়ে গভীর ফাটল। দোচালা ইমারতটি উত্তরপশ্চিমে টাল খেয়ে গিয়েছে।