Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ২.৭

২.৭

আলিসাহেব আদিরামবাটিতে আসছেন গঙ্গা কবিরাজের আমল থেকে। অনেককাল তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেবার দুর্গাপুজোয় অ্যান্টনি কাকাতুয়া বাড়িতে এল, তার কয়েকবছর পরে হঠাৎ একদিন তিনি এলেন।

দুর্গাদশমীর দিন দুপুরবেলায় বসন্তর নেতৃত্বে বাড়ির চার বালকের দল বেরিয়েছিল নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে। কৈলাশে উড়ে গিয়ে মহাদেবকে মা দুর্গা ও তাঁর পুত্রকন্যার ঘরে ফেরার বার্তা পৌঁছে দেয় নীলকণ্ঠ। কিন্তু সেবার বাড়ির পেছন দিকে আমের বন ছাড়িয়ে নদীর ধারে জেলেদের খোরা জালের বাঁশের ডগায় তন্ত্র তন্ন করে খুঁজেও কোথাও একটাও নীলকণ্ঠ পাখির দেখা মিলল না। ওরা সরস্বতীর পাড় ধরে উত্তর দিকে পর্তুগীজ আমলের বর্গিব্যাটারি ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল। নদীর পাড় ভেঙে বারুদঘরের কিছুটা অংশ ভেঙে পড়েছে খাতে। তার উত্তরে বিস্তীর্ণ আফিমের ক্ষেত, পাট-পচানোর বিল, সুলতানি আমলের ভগ্নস্তূপ। সেইসব পেছনে ফেলে যখন ওরা পৌঁছল এসে গাজীর বাগানে, তখন বিকেল হয় হয়। বড়ো বড়ো গাছ, তাদের গায়ে কোনোদিন কুঠারের ঘা পড়েনি, উঁচু ডাল থেকে ঝুলন্ত লতায় ছায়া জমেছে। বনতল ঘন ফার্নে ছাওয়া। তার মধ্যে দিয়ে পথের চিহ্ন ভাঙা ঘাট থেকে বটের শিকড় জড়ানো মিরাদর বেড় দিয়ে ঢুকেছে। এর আগে ওরা কেউ জনপদ ছাড়িয়ে এতদূরে আসেনি। মাথার ওপর ডালপালার ফাকে খুঁজতে খুঁজতে চার বালক নিঃশব্দ সারিতে শুঁড়িপথ দিয়ে ঢুকে পড়ল বনের ভেতর। লতাপাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে শ্যাওলাকীর্ণ ব্যাসাল্ট, কবেকার গোলাপি বেলেপাথর, তাদের গায়ে রিলিফের কাজ হাতিরা নৃত্য করছে, খঞ্জনি বাজাচ্ছে কিন্নরদল, চক্র, পুষ্পল ঘন্টা, মুক্তোর মালাছড়া।

বসন্ত দলের সর্দার, সবচেয়ে সাহসী যদিও শিবু চক্কোত্তির ছেলে গদাই। সবচেয়ে কনিষ্ঠ হেমন্ত

‘এই দ্যাখ কী পেয়েছি!’ গদাই মুঠো খুলে দেখায়, লাল কুঁচ ফল। ‘এগুলো সোনার মতো দামি!’

‘চ্যাঙ!’ টুনু ফুৎকার দেয়। ‘কে বললে তোকে?’

‘আমি জানি, গদাই বলে। ‘দেবেন স্যাকরার দোকানে আছে। এগুলো দিয়ে সোনা ওজন করে।’

পিপুল গাছের শিকড় বেয়ে উঠেছে কুঁচ লতা, তার শুকনো শুঁটিগুলো ফেটে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে উজ্জ্বল লাল বীজ। প্রতিটি বীজের গায়ে কালো ফোঁটা, ঠিক যেন সাপের চোখ। নীলকণ্ঠ পাখির কথা ভুলে গিয়ে ওরা মুঠো মুঠো কুঁচের বীজ তুলে ভরতে থাকে ধুতির কোচড়ে, ইজেরের পকেটে।

হেমন্ত উঁচু লতায় হাত পায় না, মাটি থেকে কুড়িয়ে নিতে নিতে বসন্তকে বলে,— ‘হ্যাঁ রে দাদা, আমরা কি তাহলে এবার খুব বড়োলোক হয়ে যাব? কলকাতার দিদাদের মতো?’

‘এই বাগানে যত কুঁচফল আছে সব যদি তুলে নিতে পারি তাহলে আমরা একটা জাহাজ কিনতে পারব,’ গদাই ঘোষণা করে। ‘চাঁদ সদাগরের মতো সাগরে যাব আমরা।’

কিন্তু ওদের ধুতির কোঁচড় তত বড়ো নয়, কুঁচফল তুলতে তুলতে ভরে ওঠে। ইতিমধ্যে আকাশে পাকা ডুমুরের মতো রঙ ধরেছে, গাছের ফাক দিয়ে দেখা যায়।

‘চল এবার ফিরে যাই,’ বসন্ত বলে।

‘আর নীলকণ্ঠ?’ হেমন্ত বলে।

‘বাড়িতে গিয়ে বলব দেখেছি।’

‘না, মিছে কথা বললে মা দুগ্‌গা পাপ দেবে!’ হেমন্ত প্রতিবাদ করে।

‘পাকামি করিসনি হিমু! অমন করলে তোকে খেলায় নেব না।’

কিন্তু হেমন্ত অনড়। পাখি না দেখে সে ফিরব না।

নদীর ধারটায় বন নানান পাখির কলকাকলিতে মুখরিত। কিন্তু যতই ওরা ভেতরে ঢোকে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে, শুঁড়িপথটা হারিয়ে যার শুকনো পাতার নীচে। গাজীর বাগান যে এত ঘন আর গভীর ওদের কেউ বলেনি। ঝোপঝাড় ঠেলে ওরা চারজন এসে পৌঁছয় বনের মাঝে খানিকটা ফাঁকা জায়গায়। হাতির পিঠের মতো পাঁচটি কবর, একটি মসজিদ যার গম্বুজ ধসে পড়েছে। এখানে গাছগুলো অতিকায় আর প্রাগৈতিহাসিক, মোটা মোটা ঝুরি যেন পাথরের অজগর। আকাশে জড়াজড়ি করে উঠেছে ঘন ডালপাতা, সবজেটে আলোয় ভরে আছে অঞ্চলটা। অদ্ভুত ভেষজ গন্ধ নাকে এসে লাগে। তারপরেই ওরা দেখতে পায়: নীলকন্ঠ নয়, পায়রা। তাদের পাটকিলে রং, গলার উজ্জ্বল লাল ডোরা-কাটা। অসংখ্য পায়রা এক ডাল থেকে আরেক ডালে নিঃশব্দে ওড়াউড়ি করছে ছাতবিহীন মসজিদের ওপর ভাঙা সৌধের মাথার ওপর পালকের চাঁদোয়া বুনছে। নীচে পরিচ্ছন্ন পাথরের মেঝেয় হাঁটু মুড়ে বসে আছে এক মূর্তি। তাঁর পরনে সাদা জোব্বা, টুপি, মুখভর্তি সাদা গোঁফদাড়ি, দুটো হাত মুখের সামনে মুঠি খুলে ধরে প্রার্থনা করছে।

ভাঙা দেয়ালের আড়াল থেকে উঁকি দেয় ওরা, বুঝতে পারে না মানুষ না-কি ভূত। রাশি রাশি কুঁচফল জমিয়ে জাহাজ কেনার কথা, এমনকি নীলকণ্ঠ পাখির কথাও ভুলে যায়। নিবিষ্ট মূর্তি বইয়ের পাতার মতো খোলা দুটি হাত একবার কপালে ছোঁয়াচ্ছে, একবার সামনে ঝুঁকে মাথা ছোঁয়াচ্ছে মেঝেয়। তার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে দাড়ি ভিজে উঠছে, সবজে আলোয় চিকচিক করছে রাংতার মতো। এক বয়স্ক পুরুষ একা, জঙ্গলের ভেতর কাঁদছে। স্বপ্নের মতো মনে হয়।

প্রার্থনা শেষ হয়। যেন এক অদৃশ্য ইশারায় পায়রাগুলো ওড়াউড়ি থামিয়ে নেমে আসে। লোকটির কাঁধে এসে বসে বকবকম শুরু করে দেয়। আচমকা সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ভাঙা দেয়ালের ওপারে, জড়োসড়ো চার বালকের দিকে। ওরা যে ওখানে আছে সেটা যেন আগে থেকেই জানত। সূর্যাটানা চোখে ইশারা করে, মাথা নেড়ে ডাক দেয়।

‘বাবা গো!’ বলে ওঠে বসস্ত। ওই প্রথম ঝটিতি পেছনে ঘুরে দৌড়য়ে শুরু করে। গদাই, টুনু আর হেমন্তও দেখাদেখি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগায় বনবার, ঠেলে। কিন্তু ওদের সঙ্গে তাল রাখতে পারে না হেমন্ত, পিছিয়ে পড়ে, পাথরের টুকরোয় ঠোক্কর খেয়ে ছিটকে পড়ে যায়। ডান হাঁটুতে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা, চোখ জ্বাল করে ওঠে, হাঁটুর ওপরটা খামচে ধরে দেখে রক্ত। আর তখনই ওকে পেছন দিক থেকে তুলে ধরে দুটো হাত সেই লোকটা! হেমন্তকে পালকের মতো অবলীল তুলে এনে শুইয়ে দেয় পাথরের চাটানের ওপর, ক্ষতমুখ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে।

‘আপনার বাড়ি কোথায়, খোকা?’

এমন মিহি চিকন কণ্ঠস্বর হেমন্ত আগে কখনো শোনেনি। ওকে কেউ কখনে এভাবে— ‘আপনি’ করেও সম্বোধন করেনি। একটু আগে যে চোখদুটো জনে ভরেছিল সেখানে চিকচিক করছে প্রশান্ত হাসি।

‘আদিরামবাটি!’ উদ্গত কান্না চেপে হেমন্ত বলে।

‘গঙ্গা কবিরাজের বাড়ি! আপনি কার ছেলে?’

হেমন্ত উত্তর দিতে পারে না, দমকে দমকে কান্না ঠেলে ওঠে। সে কান্না ক্ষতের যন্ত্রণায় নয়, সে কান্না এই জন্যে যে দাদারা ওকে ফেলে রেখে পালিয়েছে, আর পকেট থেকে সব কুঁচফল পড়ে গিয়েছে, আর বিকেল মরে আসছে, বাড়িে সকলে এখন বিসর্জনের তোড়জোড় শুরু করেছে, মায়েরা সিঁদুর খেলছে, কেউ দেখতেও পাচ্ছে না হেমস্ত ফেরেনি।

‘কাদে না, খোকা!’ তিনি কপালে হাত রাখেন। ‘ছোটো ছেলের রক্ত চোখের আঁশু খুঁচিয়ে তোলে এমন পাথর যদি গাজীর বাগানে থাকে তবে তার দাওয়াইও এখানেই আছে। আপনি একটু চুপ করে শুয়ে থাকুন দিকি, পা নাড়াবেন না। আমি এখনই আসছি।’

এই বলে তিনি ভাঙা মসজিদের ডানদিকে ঝোপের কাছে যান, নীচু হয়ে কী যেন খুঁজতে থাকেন। হেমন্তও সেই ফাঁকে চাটান থেকে নেমে ক্ষতের যন্ত্রণা ভুলে পড়ি-কি-মরি ছুট লাগায় যেদিকে বসন্তরা গিয়েছে।

.

কালীপুজোর পরে হাঁটুর ক্ষতয় ন্যাকড়ার পটি জড়িয়ে ঘুরছিল হেমন্ত। কার্তিক মাস আসছে, আর ক’দিন পরেই সন্ধ্যাবেলা পিতৃপুরুষের আত্মাদের পথ দেখানোর জন ছাতে আকাশপ্রদীপ জ্বালা শুরু হবে। আমপাড়ার লম্বা বাঁশের লগিটার মাথায় পাতল বাখারির ফালি দিয়ে লণ্ঠনের ঘর বানাচ্ছিল বিশুকা। হেমন্ত ওকে দা দড়ির যোগান দিয়ে সাহায্য করছিল। এমন সময় গামা এসে ডাকল। ওষধিবাগানে একজন অচেনা অতিথি এসেছে, রামপ্রাণ ওর খোঁজ করছে।

বেড়ার গেট খুলে ঢুকতেই হেমন্তর বুকের মধ্যে ধড়াস করে হাতুড়ির ঘা পড়ে। সেই লোকটি, নাগকেশরের বেদিতে হাঁটু সামনে ভাঁজ করে বসে বাবার সঙ্গে কথা বলছে! সেই সাদা দাড়িগোঁফ, পরনে সাদা জোব্বা টুপি, ডান হাতে তসবিহ। দশমীর বিকেলে গাজির বাগানে যে ছমছমে রহস্য তাকে ঘিরেছিল সেটা নেই, কিন্তু চোখে সেই চিকচিকে হাসিটা রয়েছে। হেমন্তকে দেখে তসবিটা উরুর ওপর রেখে জোব্বার পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনেন মুঠোভর্তি লাল কুঁচকল।

‘এগুলো সেদিন ফেলে চলে এসেছেন।’ শান্ত গলায় বলেন তিনি, তারপর ওর হাঁটুতে জড়ানো ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে যোগ করেন— ‘এখনও বুঝি সারল না?’

রামপ্রাণ ছেলের হাঁটুর দিকে তাকায়।

‘ওখানে আবার কী হলো?’

‘তেমন কিছু না, পড়ে গিয়ে পাথরে কেটেছে,’ তিনি বলেন। ‘এই বয়সে যত ছুটোছুটি দৌড়ঝাঁপ চলে তার চোট সইতে হয় বেচারি হাঁটুদুটোকে।’

বাবার আদেশে হেমন্ত ন্যাকড়ার পটি খোলে। ক্ষতের চারপাশে লালচে গালার মতো রঙ, জায়গাটা ফুলে রয়েছে। রামপ্রাণ তর্জনী ছুঁইয়ে টিপতেই হেমন্ত ব্যাথায় কঁকিয়ে ওঠে।

‘কী মলম লাগানো হয়েছে?’ ভুরু কুঁচকে জানতে চায় পরাণ ডাক্তার। মায়ের বানানো মলম, হেমন্ত জানায়, রেড়ির তেলে মাছের পটকা আর রসুনের কোয়া ফুটিয়ে তৈরি। শুনে রামপ্রাণের দুই ভ্রূর মাঝে ভাঁজটা গভীর হয়। সেটি ঠাওর করে জোব্বা-পরা লোকটি বলতে থাকেন জাঁসকর উপত্যকার এক আশ্চর্য গুল্মের কথা, যা কেটে দুখণ্ড হয়ে যাওয়া অঙ্গও জুড়ে দিতে পারে। এরপর ওঁরা হিমালয়ের দুষ্প্রাপ্য গাছগাছড়া, এবং তাদের কীভাবে সমতলের উষ্ণ আর্দ্র আবহাওয়ায় এনে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেই বিষয়ে আলোচনায় মজে যান। হেমন্তও সুযোগ বুঝে সরে পড়ে।

লোকটি, আলিসাহেব, গঙ্গারামের কাছে যখন আসতেন তখনো রামপ্রাণের শিক্ষানবিশি শুরু হয়নি। সাতগাঁর বিখ্যাত কবিরাজকে হিমালয় ছেনে জড়িবুটি এনে দিতেন আলিসাহেব। গঙ্গারাম যখন মারা যান সেসময়ে আলিসাহেব কামরূপের পাহাড়ে, একদা যেখানে হজরত শাহ জালাল ডেরা বানিয়ে ছিলেন। সেখান থেকে আরও উত্তরে তিব্বতের দিকে চলে যান আলিসাহেব। তারপর বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ শুরু হল, ইংরেজ সরকার পার্বত্য সীমান্তে সেনা মোতায়েন করল। বহুকাল আর এদিকে ফিরতে পারেননি, গাজীর বাগানে আসতে পারেননি – আলিসাহেব রামপ্রাণকে জানান। ইতিমধ্যে মসজিদটা আরও বনাকীর্ণ হয়েছে, আরও দুটি গম্বুজ ধসে পড়েছে। তবে সিলেট থেকে যে একজোড়া জালালি কবুতর এনে ছেড়ে দিয়েছিলেন সাতগাঁর আকাশে, তারা বংশবিস্তার করেছে। আদিরামবাটির ঔষধিবাগানে তাঁর নিজের হাতে পোঁতা চারাগুলো প্রায় সবকটিই বেঁচে আছে। নাগকেশর গাছটি ডালপালা ছড়িয়ে বাগানে কোমল ওষধি গুল্মের ওপর ছায়া বিস্তার করছে।

.

আলিসাহেব চলে যাবার পর রামপ্রাণ হেমন্তকে ফার্মেসিতে ডেকে নিল। নিজে হাতে হাটুর ক্ষত ধুইয়ে মার্কিউরোক্রোম দিয়ে গজের ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। তারপর ওর হাত ধরে সটান চলে এল রান্নাঘরের সামনে। সরোজা তখন সদ্য স্নান সেরে এসে ভিজে এলো চুলে উবু হয়ে বসে কলাইয়ের ডাল বাটছিল।

‘এতদিন ধরে ছেলেটার পায়ে কাটা ঘা, আমায় কেউ ঘুণাক্ষরেও বলেনি!’ রাগত স্বরে বলল রামপ্রাণ। ‘যদি গ্যাংগ্রিন হয়ে যায় কে জবাবদিহি করবে শুনি?’

সরোজা হাতের কাজ থামাল না, স্বামীর দিকে দৃকপাত করল না। ‘আমায় কারোর কাছে জবাবদিহি করতে হবে না,’ শান্ত গলায় বলল। ‘আমি ওকে পেটে ধরেছি!’

‘বাহ! পেটে ধরেছি!’ হাতদুটো কোমরে রেখে স্ত্রীর গলা নকল করে ভেংচে ওঠে রামপ্রাণ। ‘পেটে ধরেছ বলে ওর পা কেটে বাদ দেবার অধিকার কে দিয়েছে তোমায়? নিজের বুদ্ধিতে হাতুড়ে চিকিচ্ছেটা না করে ওকে ফার্মেসিতে পাঠালে কী ক্ষতিটা হতো শুনি?’

সরোজা রামপ্রাণের দিকে গনগনে চোখে তাকাল একবার, শিলের ওপর ভিজে ডালের স্তূপে চোখ ফিরিয়ে সবেগে নোড়া ঘষতে ঘষতে, হাতে চুড়ি-নোয়া ঝনঝনিয়ে, কর্কশ পাথুরে ধ্বনির ভেতর বেটে মিশিয়ে দিতে লাগল ভেতরে জমে ওঠা অভিযোগের কথা, সতের দিন ধরে ছেলেটা চোখের সামনে খোঁড়ানো সত্ত্বেও তার উদাসীন পিতার না দেখতে পাবার কথা, সারাদিন দুনিয়ার রুগি দেখে বেড়িয়ে বাড়ির মানুষগুলো বাঁচলো না ম’লো সেই নিয়ে থোড়াই কেয়ারের কথা,— ‘তার কারণ বাড়ির লোক পয়সা দেয় না যে!’, আর তাই যখন নিজের সহধর্মিণী ও রাতে অনিদ্রা বা অক্ষিদের কথা জানায় তখন হাই তুলে পাশ ফেরার কথা, আর বেশিবার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করলে দিনে ক’বার উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে জানতে চাওয়ার কথা, আর যখন শোনে সকালে একবার, তখন আরও বার দুই সারা উঠোন ঝাঁট দেবার পরামর্শ দেবার কথা, তার কারণ উঠোন ঝাঁট দেওয়াই নাকি অনিদ্রা আর অক্ষিধের সবচেয়ে ভালো ওষুধ, তাতে এমনকি নাকি গেঁটে বাতও ভালো হয়ে যায়,— ‘ভাবো, নিজের বউকে বলছে একজন ডাক্তার মানুষ!’, আর তাই ছেলের হাঁটু কেটে গিয়ে ঘা হলে কী করবে তার বউ নিজের বুদ্ধিতে চিকিৎসা করা ছাড়া। মালসায় ভেজানো সব ডাল বাটা হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে রামপ্রাণ। শিলের ঘর্ঘর চুড়ির নিক্কন থামলে বলে

‘আচ্ছা বেশ। এবার বলো দিকি রেড়ির তেলে মাছের পোঁটা ফুটিয়ে মলম বানানোর পরামর্শটা কে দিল?’

‘সে মোটা মোটা ডাক্তারি বই পড়েনি বটে, তবে কাটা ছেঁড়া ফোড়ায় তার দাওয়াই অব্যর্থ বলে মানে পাঁচটা গ্রামের মানুষ।’ নোড়া ধোয়া জল হাতের কোষে টেনে নিতে নিতে বলে সরোজা।

তিনি সরোজার বাপের বাড়ি রাধানগরের দাইবুড়ি। হেমন্তর হাঁটুর ক্ষত সারছে না দেখে সরোজা তাঁর শরণাপন্ন হয়। সকালে জোয়ারের স্নানে নদীতে ডুব দিয়ে তাঁর পরামর্শ চায়, বিকেলে ফিরতি ভাটায় বাইশ মাইল উজানে রাধানগর থেকে ভেসে আসে মলমের প্রস্তুত প্রণালী।

‘উফফ্, সেই রাধানগর! মড়া জ্যান্ত, সবকটা ভূত! ভূতের দেশ!’ রামপ্রাণ সশব্দে কপাল চাপড়ে ওঠে। — ‘গঙ্গা কবিরাজের ভিটেয় এমন মূর্খামির চাষ হবে কে জানত!’

বিয়ের সময়ে বাপের বাড়ি থেকে এক দুর্লভ যৌতুক এনেছিল সরোজা। জলে-জলে শব্দতরঙ্গে দূরনিবাসী আত্মীয়পরিজনদের সঙ্গে বার্তা বিনিময় করতে পারত। ব্যাপারটা অনেকটা টেলিফোনের মতোই, শুধু তারের বদলে মাধ্যম হলো নদীর বহতা জল। এবং এই বার্তালাপ শুধুমাত্র দুজন মানুষের মধ্যেই সম্ভব, সেই দুজনকে একই সময়ে জলে ডুব দিতে হয়। দূরত্ব কোনো বাধা নয়, এমনকি একই নদীতে দুজনকে ডুব দিতে হবে তাও নয়। তবে দুই জলধারার মধ্যে সংযোগ আবশ্যক, এবং বার্তালাপীরা পরস্পরকে চেনা, পরস্পরের কন্ঠস্বর জানা আবশ্যক। পুরো ব্যাপারটা এতই সহজ ও সাবলীল যে সাতগাঁয়ে আসার পর সরোজা নদীতে তার নিত্য স্নানের সাথীদেরও শিখিয়ে দিয়েছে। কিছুকালের মধ্যেই তারাও দূরে নদীকুল নিবাসী বাপের বাড়ির লোকজনেদের সঙ্গে এভাবে বাক্যালাপ করে। প্রথম প্রথম কেউ বিষ্ময় প্রকাশ করলে সরোজা হাত নেড়ে বলত—‘ও কিছু না! যে কেউ পারে!’ মাঝেসাঝেই সরোজা অশৌচ পালন করে। রাধানগরে কোনো জ্ঞাতি মারা যাবার খবর আসে, জলে-জলে আসা চেনা কণ্ঠস্বর নীরব হয়ে পড়ে।

.

প্রতিদিন দুপুর গড়িয়ে যাবার পর রামপ্রাণ যখন ফার্মেসিতে রুগি দেখা সেরে ভেতরবাড়িতে ফেরে, কুয়োতলায় এক গামলা জলে পটাসিয়াম পারমাঙ্গানেট গুলে লাইফবয় সাবান আর গামছা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সরোজা। রামপ্রাণ ফতুয়ার দুই পকেট থেকে মুঠো মুঠো সিকি আধুলি কড়ি গামলার জলে ফেলে দেয়, তারপর সাবান দিয়ে হাত পা ধুয়ে গামছায় মুছে ঘরে ওঠে। দিনের অর্জিত মুদ্ৰা জীবাণুমুক্ত করে একটি পেতলের বাক্সে গুনে তুলে রাখে সরোজা।

সেই ঘটনার পরদিন দুপুরের পর উঠোনে এসে রামপ্রাণ সরোজার দেখা পেল না। ‘তোর বৌমণিকে দেখেছিস?’ রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করে বামুনদিকে, যাকে এবাড়িতে কেবল সে ও শাকম্ভরী অন্ন বলে ডাকে। নেভা উনুনে ছাইয়ের মধ্যে থেকে কয়লা বেছে তুলছিল অন্ন, মাথায় ঘোমটা টেনে মাথা নাড়ে সে দেখেনি। গামা চিন্তামণির জন্য ঘাসের বোঝা বয়ে আনছিল খিড়কি দিয়ে। ‘ঠাকরুনকে দেখেছিস?’ রামপ্রাণ শুধোয়। না, গামা দেখেনি। ‘তোর মাকে দেখেছিস?’ জিজ্ঞেস করে বসন্তকে। সেও দেখেনি। ‘পরাণবউ কোথায় গেল দেখেছ নাকি?’ জিজ্ঞেস করে শাকম্ভরীকে। তিনিও দেখেননি। ‘বৌদিকে দেখেছিস?’ ‘কাকীমাকে দেখেছ?’ ‘মেজদিকে দেখেছ?’ বড়োবাড়ির যাকেই সামনে পায়, তাকেই জিজ্ঞেস করে, সম্পর্ক অনুযায়ী সম্বোধন ধরে ধরে যারা ডাকে সেই নারীকে, যাকে রামপ্রাণ নিজে ডাকে— ‘ওগো শুনছো’ বলে। না, কেউ দেখেনি। যে মানুষটাকে বাড়ির সর্বত্র সারাক্ষণ সব কাজে দেখতে পাওয়া যায়, সেই জলজ্যান্ত মানুষটা কোথায় উধাও হয়ে গেল কেউ দেখেনি! অথচ কাউকে দেখে তেমন বিচলিত বলেও মনে হয় না।

কেবল শাকম্ভরী দেবী ছাড়া;— ‘পরাণবউ’-এর অদর্শনে তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ে।

সেদিন রাতেও যখন সরোজা ফিরল না, রামপ্রাণের মনে পড়ল আগের দিনের সেই ঘটনা, মনে পড়ল তার ঠোঁটনিঃসৃত তিক্ত বাক্যগুলো। অনুশোচনায় বিদ্ধ হলো সে, মনে আশঙ্কার ছায়া জমল, রাতে ঘুম হলো না। পরদিন সকাল হতেই গামাকে পাঠাল রাধানগরে। হুগলি নদী পেরিয়ে ওপারে নটিহাটি থেকে ট্রেনে চড়ে দ্রুত যাওয়া যায় রাধানগরে। কিন্তু রামপ্রাণ নির্দেশ দিল নৌকা নিয়ে যেতে, এবং যাবার পথে নদীতে নজর রাখতে।

ভাটার টান কাটিয়ে বাইশ মাইল যেতে গামার আধবেলা লেগে গেল। দুপুরের পর গিয়ে পৌঁছল নিজঝুম রাধানগরে। রেলপথ আসার পর ম্যালেরিয়ার প্রকোপে জনপদ ছেড়েছে মানুষ। এককালের সম্পন্ন জমিদারদের অট্টালিকাগুলো আরও পোড়ো হয়ে যেন সাতগাঁর প্রতিবিম্ব হয়ে উঠেছে। সরোজাদের শরিকী বাড়ির কিছুটা অংশ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, খড়ের ছাউনি দেওয়া দালানকোঠা আঁকড়ে পড়ে আছেন এক বৃদ্ধা আত্মীয়া। তাঁর চরকা-কাটা চাঁদের বুড়ির মতো চেহারা, জরায় জীর্ণ দেহ, পুরোনো ছেঁড়া শাড়ি দিয়ে কাঁথা বুনছিলেন উঠোনে কামিনী গাছের নীচে বসে। গামা অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর কানের পাতায় হাতের তালু রেখে শুনলেন, তারপর বললেন

‘না বাপু, সে আসেনি! সে কেন, কেউই আসেনি! এ বাড়ি এখন ভূতেও মাড়ায় না!’

সরোজার নিরুদ্দেশের দিনগুলো রাতগুলো যত গড়াতে লাগল, বাড়ির সকলে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে মনে হলো, এমনকি কোলের মেয়ে ছোট্ট শিউলিও। ছন্দপতন ঘটল কেবল রামপ্রাণের দৈনন্দিনে। তার চশমা, নস্যির ডিবে যেন স্বতঃচালিত হয়ে ঠাঁইবদল করতে লাগল, তার সকালের বিকেলের চা হয় খুব পাতলা নয়তো খুব কড়া হয়ে উঠল, মাথার বালিশটা শক্ত পাথরের মতো হয়ে ঘাড়ব্যথা শুরু হলো। এমনকি সকালে ডকবাজারে গিয়ে সে ছাড়িগঙ্গার চরের চাষিদের আনা যে তাজা সব্জিগুলো বেছে কিনে আনে, যা দেখেই এক লহমায় সরোজা বুঝে যায় কোন বিশেষ চচ্চড়ি কিংবা ঘন্ট খেতে চাইছে রামপ্রাণ, সেগুলো ভিন্ন পদে রান্না হয়ে বিস্বাদ হলো। বামুনদি আর গামার শত চেষ্টা সত্ত্বেও ক্রমাগত মেজাজ হারাতে লাগল রামপ্রাণ, রোগী দেখতে গিয়েও ধৈর্যচ্যুতি ঘটল।

বাড়ির আর যে সদস্যটির রামপ্রাণের মতোই দশা হলো, সে হলো অ্যান্টনি। দাঁড়ে ঠোঁট ঠুকে ঠুকে সে ক্ষণে ক্ষণে ডাকতে লাগল— ‘পরাণবউ! ও পরাণবউ!’ বামুনদি প্রসাদী কাটা ফল দিতে এলে তাকে দুর্বোধ্য পর্তুগিজ ভাষায় গালি দিল।

ছ’দিন পরে কলকাতা থেকে রামপ্রাণের পিসি রাধারাণীর চিঠি এল। স্বামী তারিণীচরণের অস্বাভাবিক মৃত্যু ও তারপর পুলিশি জটিলতায় তার জীবনে কী যে বিপর্যয়ের আকাশ ভেঙে পড়েছে সে কথা চিঠি লিখে বোঝানো যাবে না, লিখছেন এমত পরিস্থিতিতে সহৃদয় রামপ্রাণ যে স্ত্রী সরোজাকে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য কলকাতায় পাঠিয়েছেন, এজন্য তিনি অকুন্ঠ কৃতজ্ঞতা জানালেন। সরোজা সাক্ষাৎ মা জগদ্ধাত্রী রাধারাণী লিখেছেন সে কলকাতায় এসে সংসারের হাল ধরেছে, সে আসায় রাধারাণী বুকে কী যে বল পেয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য তাঁর নেই। পরিবার যে কী অমূল্য জিনিস তা জীবনে এইরকম অগ্নিপরীক্ষার সময়েই কেবল টের পাওয়া যায়, লিখেছেন। এবং যদিও বা কখনো ভাইয়ে ভাইয়ে মনাস্তর ঘটে, এবং তারপরেও কখনো যদি বা সদিচ্ছার মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে, ইহজগতে রক্তের বন্ধন কখনোই ছিন্ন হবার নয়। এতকিছু লেখার পর রাধারাণী রামপ্রাণের কাছে আবেদন করেছেন যাতে সরোজা আরও দিন কয়েক কলকাতায় তাঁর কাছে থাকে, যদিও তিনি অনুমান করতে পারেন এমন সুদক্ষ গৃহকর্ত্রীর অভাব আদিরামবাটিতে কতখানি অনুভূত হচ্ছে।

রামপ্রাণ চিঠিটা তিনবার পড়ল। রাধারাণী যে শুধু অনেককাল আগে গঙ্গারাম ও পাগলরামের বিচ্ছেদের উল্লেখ করেছেন তাই নয়, বনলতার মর্মান্তিক পরিণতি ও সেই কারণে পরিবারের দুই শাখার বন্ধন ছিন্ন হবার কথাও লিখেছেন। চিঠিটা যতটা সুচিন্তিত ভাষায় লেখা, ততটাই সুপরিকল্পিতভাবে সরোজা স্বামীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ছক কষেছে। কেবলমাত্র রামপ্রাণ আর শাকম্ভরী ছাড়া বাড়ির আর সকলে, এমনকি ছোট্ট শিউলিও, জানত সে কোথায় গিয়েছে। সেটা ভেবে উঠতেই রামপ্রাণের মাথায় রাগ চড়ল। রাগের মাত্রা বেড়ে গেল যখন চিঠিটি চতুর্থবার পাঠে বুঝতে পারল, সরোজা কোথায় আছে সে যে জানেনা সেটাও রাধারাণী জানেন।

প্রাণাধিক দুধপোর মনোকষ্ট দেখে শাকম্ভরী নীচু অথচ রামপ্রাণের কানে পৌঁছয় এমন গ্রামে স্বগতোক্তি করলেন

‘এর চেয়ে পরাণবউ যদি কাটুনিডাঙায় গিয়ে উঠত, তাহলেও এমন আছত্তার হতো না!’

একদা স্রোতোচ্ছল সরস্বতীর পাড়ে কার্টুনিডাঙা। কার্টুনি মেয়েরা চাপার কলির মতো আঙুলে চরকায় সুতো কাটত। স্বচ্ছ মসলিনে ঢাকা তাদের লালফুলি আমের মতো স্তন জাহাজের ডেক থেকে দেখে ভিনদেশী নাবিকেরা বিচলিত হয়ে পড়ত। মসলিনশিল্প মরে যাবার পর কাটুনিডাঙা হয়ে ওঠে সাতগাঁর কুখ্যাত বেশ্যালয়।

সরোজার বিরহের দ্বিতীয় সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যায় পরাণ ডাক্তার চেম্বারে বসে অভয় চট্টরাজের লেখা প্রাচীন বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞান বইটির পাতা উলটোতে গিয়ে দেখল এক জায়গায় লেখা রয়েছে, মিশরে ফারাওয়ের আমলে প্রাণীর চর্বির সঙ্গে মধু মিশিয়ে দুরারোগ্য ক্ষতের নিরাময় হতো। সেটা পড়ে মনে অনুশোচনা প্রগাঢ় হলো। পরদিন সকালে ডকবাজারে আনাজপাতি কিনে গামার হাত দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে ঘাটে নামল রামপ্রাণ। ঘাটে তখন হাটুরেদের নৌকার জটলা, ফাক দিয়ে বইছে সরস্বতীর কাদাজল। সাতগাঁয়ে থাকলে সরোজা ঠিক এইসময়টায় রোজ নাইতে যায়। কলকাতাতেও যদি সে এইসময় গঙ্গাস্নানে যায় এই আশায় এক বুক জলে নেমে ডুব দিল রামপ্রাণ। দুই আঙুলে নাক টিপে রেখে যতখানি সম্ভব ঠোঁট নাড়িয়ে বলে উঠল–

‘ওগো শুনছোওওওওও!’

কয়েক সেকেন্ড ডুব দিয়ে থাকার পর কানে ভেসে এল ক্ষীণ ঝমঝম ঝমঝম ধ্বনি। কাছেই হুগলি ক্যানালে ব্রিজের ওপর দিয়ে সোয়া আটটার বন্দর-হুগলি লোকাল ঢুকছে। খানিকটা কাদাজল গিলে উঠে এল রামপ্রাণ, এবং আত্মসম্মান গিলে সেদিনই হুগলির ভাটায় নৌকায় পালকি দিয়ে গামাকে পাঠাল কলকাতায়। সন্ধ্যার আগে শূন্য পালকি নিয়ে ফিরে এল গামা।

পরদিন সোয়া আটটার গাড়িতে সরোজা ফিরল। সঙ্গে রাধারাণীর পুত্র সুনির্মল, তার হাতে দুই হাঁড়ি ভর্তি শোভাবাজারের নবীন দাশের স্পঞ্জ রসগোল্লা। সরোজা ফিরে আসায় বাড়িতে খুশির হাওয়া, ছোটোরা কিছু বেশিই খুশি, তার কারণ এমন স্পঞ্জ রসগোল্লা, যা চিবোলে মুখের ভেতরে চকমিলানো মেঝেয় নতুন পাম্প শু মসমস করে হাঁটার মতো শব্দ হয়, সাতগাঁয় পাওয়া যায় না। শাকম্ভরী দেবী অবশ্য এই রসগোল্লা পাঠানোর মধ্যে বাঁকা ইঙ্গিত খুঁজে পেলেন। তার কারণ কে না জানে এই সাতগাঁর ময়রাই একদা বিশ্বকে রসগোল্লা বানাতে শিখিয়েছে? তবে তাঁর এই ব্যাখ্যা শোনার মতো ধৈর্য রামপ্রাণের ছিল না, কারণ সেইসময় তার সম্পূর্ণ মনোযোগ অধিকার করে নিয়েছিল স্বামীর জন্য সরোজার আনা একটি বিশেষ উপহার একটি চৌকোনা কাঠের বাক্স আর একটি বই।

মেটিরিয়া মেডিকা পিউরা
ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান প্রণীত
ডাঃ হরিসাধন দত্ত MBBS কর্তৃক অনূদিত
ভ্যান্ডারকুক মুদ্রণযন্ত্রে আদিরাম প্রেস, কলিকাতা-৩ হইতে প্রকাশিত।
প্রকাশক- শ্রীমতী রাধারাণী দেবী।

বাক্সের ভেতর সারিবদ্ধ কাচের শিশিতে টিকটিকির ডিমের আকারে ওষুধের গুলি। সেই বাক্স আর সেই বইটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে রামপ্রাণ সেই মুহূর্তে কল্পনা করতে পারেনি এই দুটি জিনিস চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কেই শুধু নয়, তার গোটা জীবনদর্শনই বদলে দেবে।

ঠিক যেমনটা ঘটেছিল দরপ খান গাজার ক্ষেত্রে, এক জ্যৈষ্ঠের ভোরে কৃষ্ণপক্ষের জোয়ারে।

কলকাতা থেকে ফেরার পর পরাণবউয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন শাকম্ভরী দেবী। পরদিন যখন সরোজা তাঁর প্রাতরাশের বরাদ্দ কাওনের খিচুড়ি নিয়ে এল, তিনি দরজার দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য বামুনদিকে উদ্দেশ্য করে বললেন

‘পরাণবউকে জিজ্ঞেস কর তো অন্ন, এতদিন সে কলকাতার খুড়োর বাড়িতে বসে বসে করছিলটা কী? আর সেটা করে কী সে পেল?’

সরোজা দরজার দিকে ফিরে বামুনদিকে দেখতে পেল না। কয়েক সেকেন্ডে ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে সেও দেয়ালের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল

‘পিসিমাকে বলে দাও, সে এ বাড়িতে নিত্যি যা করে ওখানেও তাই করছিল। সংসারের ঘানি ঠেলা, রান্নাবান্না, ওষুধপথ্য, সবার ভালোমন্দ দেখাশোনা। তার বদলে সে যা পেল এখানে কোনোকালেই সেটা পায় না সবার ভালোবাসা!’