Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৪.১

৪.১

হেমন্ত যখন সাত মাসের গর্ভে, শাকম্ভরী দেবী স্বপ্নে ছোটোকাকা পাগলরামকে দেখলেন। ইতিমধ্যে কলকাতায় থেকে অকালে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে গিয়েছে, কিন্তু ছোটোবেলায় যে যুবক পাগলরামকে তিনি চিনতেন স্বপ্নে তাঁকে দেখতে অবিকল সেইরকম। শাকম্ভরী দেবীর ঘরের বাইরে উঠোনে দাঁড়িয়ে বলছেন— ‘আমাকে একবাটি মুড়ি একটু সরষের তেল মাখিয়ে দিতে পারিস, ক্ষেমী? সঙ্গে দুটো কাঁচা লঙ্কা দিস। বড্ড খিদে পেয়েছে রে!’

স্বপ্নের ভেতরে পাগলরাম যুবক, অথচ শাকম্ভরী সময়ের নিয়মে বৃদ্ধা। তাঁর সব স্বপ্নেই মৃতেরা এভাবে যৌবনের চেহারায় দেখা দিতেন, কোনো তরফেই বিস্ময়ের লেশমাত্র থাকত না। কখনো-কখনো এত অনুপুঙ্খভাবে সবকিছু ফুটে উঠত যে স্বপ্নের তীব্রতায় ঘুম ভেঙে জেগে উঠতেন শাকম্ভরী। সেদিনও উঠেছিলেন।

শিশু বয়সের পাগলরামকে দেখেছে তেমন কেউ এই বাড়িতে বেঁচে ছিল না। কিন্তু ছোটোবেলায় হেমন্তর মধ্যে এমন একটি প্রবণতা দেখা যায় যা ওই বয়সে পাগলরামেরও ছিল। যেকোনো ধরনের দম-দেওয়া খেলনা উপহার পেলেই সে বিচিত্র কৌতূহলে সেটি ভেঙে ফেলত, ভেতরের যন্ত্রপাতিগুলো আলাদা করে ফেলত। এবং পরক্ষণেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলত। ন’বছর বয়স পর্যন্ত হেমন্তর মধ্যে এই প্রবণতাটা ছিল। এই সময়ে সে একটি দুর্ঘটনা চাক্ষুষ করে। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি হিমালয়ের বরফগলা জলে সরস্বতীর খাত ভরে এলে বিশু ঠাকুর আদিরামবাটির এবাড়ি-ওবাড়ির ছোটো ছোটো ছেলেদের সাঁতার শেখাতে নিয়ে যেত। এক অমাবস্যার দিন কোটালের বানে ন-রাত্তিরের জ্ঞাতিবাড়ির একটি বারো বছরের ছেলে ভেসে যায়। ভাসতে ভাসতে সে মাঝনদীতে সনাতনের ঘোলে গিয়ে পড়ে। বহুকাল আগে সান্তা আনা নামের সেই সুপারিবাহী জাহাজ ডুবো চরে গিঁথে যে গভীর খাত তৈরি হয়েছিল, সেখানে সৃষ্টি হয় এক মারণ ঘূর্ণি, সান্তা আনার ঘোল, যা লোকমুখে হয়ে ওঠে সনাতনের ঘোল। সাঁতার কাটতে গিয়ে সনাতনের ঘোলে পড়লে দক্ষ সাঁতারুর পক্ষেও ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। ছেলেটিকে ফেরানো যায়নি। ঘাটে দাঁড়িয়ে হেমন্ত আরও অনেকের সঙ্গে সেই দৃশ্য দেখে। জলের তীব্র ঘুর্ণিতে অসহায় ছেলেটি লাট্টুর মতো বনবন করে ঘুরছে, নীচে থেকে যেন কোনো অলীক জন্তু তাকে টেনে নিচ্ছে, দেহটা তলিয়ে যাবার পরেও হাত দুটো শূন্যে তুলে হাতড়াচ্ছে, বাতাস খামচে ধরতে চাইছে, ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে বিদায় জানাবার মতো করে হাত নাড়তে নাড়তে মিলিয়ে গেল।

সেদিন বাড়িতে ফিরে প্রবল কাপুনি দিয়ে জ্বর এল হেমন্তর, সেই সঙ্গে বিকার। ম্যালেরিয়ার মতো লক্ষণ, কিন্তু রামপ্রাণ পরীক্ষা করে বললেন এ হল মেলাঙ্কোলিয়া। কাছ থেকে মৃত্যু প্রত্যক্ষ করলে কখনো-কখনো কোমল মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেহে পরিস্ফুট হয়। বাবার ওষুধ খেয়ে সুস্থ হবার পর হেমন্ত ইস্কুলে যেতে শুরু করল। এবং সেই বছরেই দুর্গাদশমীর দিন দাদা বসন্তের নেতৃত্বে নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে গাজির বাগানে গিয়ে হাঁটু কাটল।

এই সময় হেমন্তর স্বভাবে একটা পরিবর্তন দেখা যায়। ছোটোবেলায় যেসব খেলনাগুলোকে ভেঙে টুকরো করেছিল সে, সেগুলো জোড়া লাগিয়ে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগল। কলকাতা থেকে সরোজা ফিরে আসার পাঁচ মাস পরে এল আমের মরশুম। বাতাসে আমের গন্ধ, ছেলের দল সারাদিন বাড়ির পেছনে আমের বনে ঢুকে আম কুড়োচ্ছে, গাছে উঠে আম পেড়ে গাছে বসেই খাচ্ছে। হেমন্ত তখন একা ঘরের কোণে বসে স্প্রিং ঢাকা গিয়ার জুড়ে জুড়ে খেলনা মেরামত করছে। একদিন সে দক্ষিণের ঘরে মেহগনির আলমারিটার দেরাজে পাগলরামের ব্যবহৃত ঘড়ি সারানোর সরঞ্জাম খুঁজে পেল–বিভিন্ন মাপের স্ক্রু ড্রাইভার, চিমটে, আই-পিস এবং নানান আকারের ঘড়ির যন্ত্রাংশ। দিনের পর দিন সেগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে একটি সত্য আবিষ্কার করল হেমন্ত: যে বলের যে সূত্র অনুসারে ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, সেই একই সূত্র মেনে দম-দেওয়া বানর খঞ্জনি বাজায়, টিনের মোরগ ঘাড় নামিয়ে খাবারের পাত্রে ঠুকরায়, এবং ডিস্কি মোটরগাড়িও তার নির্দিষ্ট গতিতে চলে। স্প্রিং গিয়ার চাকার ম্যাজিক তাকে পেয়ে বসল, খেলনা নিয়ে খেলার বয়স পেরিয়ে যাবার পরেও সে সারাদিন দক্ষিণের ঘরের এক কোণে বসে মেতে উঠল আবিষ্কারের নেশায়।

প্রথমে সে আবিষ্কার করল সরস্বতীতে জোয়ার-ভাটা মাপার একটি মিটার। বাগানের ইঁদারায় কপিকলের ফ্রেমে লাগালো একটি ঘড়ির মতো ডায়াল, তার লাল ও সবুজ রঙের দুটি কাটা, দু গাছি তার নেমে গিয়েছে জলে, তার অন্য প্রান্তে সীসের জালকাঠি আর সোলার টুকরো বাঁধা। ইঁদারায় জলতল ওঠা-নামার সঙ্গে ডায়ালের লাল-সবুজ কাঁটাগুলো সরে। ক্রমে ক্রমে হেমন্ত যন্ত্রটিকে আরও উন্নত ও জটিল করে তুলতে লাগল, জোয়ার-ভাটার কাঁটার সঙ্গে যুক্ত করল আরেকটি নীল কাঁটা, ডায়ালের ওপর বসিয়ে দিল প্রহর চিহ্নের সঙ্গে সমকেন্দ্রিক চন্দ্রকলার চক্র আঁকা আরেকটি ডায়াল, যেটি পাঁজির সঙ্গে মিলিয়ে ইচ্ছে মতো ঘোরানো যায়। সরস্বতীর ওপার থেকে নৌকায় পরাণ ডাক্তারের কাছে আসা রুগিদের প্রবল উৎসাহ ছিল যন্ত্রটিকে ঘিরে। কিন্তু বাড়ির যে দুজন সদস্যের নিত্য জীবন নদীর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য, তাদের কোনো কাজে লাগেনি। দিনে দুবার, কোনো-কোনো দিন তিনবারও ঘাটে স্নানে যেতেন সরোজা। জোয়ার-ভাটার চলাচল নিজের শিরাধমনিতে অনুভব করতেন তিনি, ঘড়ি পাঁজি কিছুই দেখার দরকার হতো না। আর যে মানুষটি সারা দিনে একাধিক বার গঙ্গাজল আনতে যেত, সেই গামার চিন্তা ছিল একটিই কাদা বাইতে হবে কি না? তবু সে হেমন্তকে খুশি করার জন্য মাঝে মাঝে বাঁকে পেতলের ঘড়া বেঁধে নিয়ে ঘাটে যাবার আগে হাঁক পাড়ত

‘ছোটোদাদাবাবু গো, ভাটা কি পড়ে গেল? তোমার ওই কল দেখে বলে দাও দিকিনি!’

হেমন্ত বাইরে না এসে দক্ষিণের ঘরের জানলা থেকেই পেরিস্কোপ চোখে লাগিয়ে বলে দিত। আয়নার টুকরো আর পিচবোর্ড দিয়ে পেরিস্কোপ তার নিজেরই বানানো। ইতিমধ্যে সে যান্ত্রিক বলের কার্যপ্রণালী থেকে আলোকরশ্মির রহস্যে মজেছে। সেবার রামনবমীর মেলা থেকে সরোজা ওকে কিনে দিলেন জাদুলণ্ঠন। হেমন্ত সেটির খোল নলচে বদলে ফেলল। টোলের বাড়িতে মশাইয়ের কাছে চেয়ে চিনতে নিয়ে এল রামাই পণ্ডিতের আমলের এক জোড়া পুরু আতস কাচ, জাদুলণ্ঠনের খোলে কেরোসিন লম্ফটা খুলে সেখানে বসালো সমান্তরাল দুটি আয়নার টুকরো, এবং একটি হাত-আয়নায় দুপুরের তীক্ষ্ণ সূর্য রশ্মি প্রতিফলিত করে বাড়ির সবাইকে ডেকে ডেকে দক্ষিণের ঘরের দেয়ালে দেখালো সেলুলয়েড ফিল্মের বায়োস্কোপ।

প্যারিস থেকে ফিরে ফরাসি ইন্সটিটিউটে চাকরিটা পাকা হবার পর বসন্ত মার্কিন সেনাছাউনি থেকে নীলামে একটি লজঝড়ে মোটরবাইক কিনল। যুদ্ধ মিটেছে, হুগলি নদীর ওপারে জেনারেল ইনফ্যান্ট্রির অস্থায়ী ডেরা রুজভেল্ট নগর গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে, জোয়ারে কচুরিপানার মতো বাজারে ভেসে আসছে মার্কিন সৈন্যদের ব্যবহার করা নানান জিনিস— প্রাইমাস স্টোভ থেকে দাড়ি কামানোর বৈদ্যুতিক ক্ষুর, সিগারেট লাইটার থেকে শুরু করে টুনা আর মার্মালেডের সিল-করা টিন। WLA 45 মডেলের হার্লে ডেভিডসন বাইকটি বসন্ত পেয়ে গেল প্রায় লোহার দরে। তার ৪০০ সিসি এয়ার কুলড ইঞ্জিন, হাতলের পাশে মেশিনগানের ব্র্যাকেট রয়েছে। পোর্তোহাটায় এক সুদক্ষ বাইক সারাইয়ের মিস্ত্রিও পাওয়া গেল। লোকটি জাতিতে বর্ণশঙ্কর, আধা পর্তুগিজ, সোনালি চুল সবজেটে চোখ, চিমসানো ভবঘুরের মতো চেহারা। ওষধিবাগানের পেছনে আমড়া গাছের নীচে ত্রিপল টাঙিয়ে অস্থায়ী কারখানা বানিয়ে নিল সে, তারপর বাইকটাকে সম্পূর্ণ খুলে ফেলল। তার তেলের ট্যাঙ্কে ছ্যাদা মেরামত করতে হলো, কার্বুরেটারটি হাওড়ার লেদ কারখানায় পাঠিয়ে নতুন করে বানিয়ে আনতে হলো, নতুন ব্যাটারি ও স্পার্ক প্লাগ লাগিয়ে, টায়ার টিউব বদলে বাইকটিকে ফের সচল করে তুলতে দেড় মাস লাগল। এই পুরো সময় বিরক্তিকর ধাতব আওয়াজে আদিরামবাটির বাসিন্দাদের শাস্তি বিঘ্নিত হলো, ঠাকুরবাড়িতে দেবদেবীদের দিবানিদ্রার ব্যাঘাত ঘটছে বলে বিশু গজগজ করতে লাগল, এমনকি অ্যান্টনিও রেগে খিস্তি দিল–

‘ম্যাদা! ফোদা!’

এবং এই প্রথম সে রুক্ষ মিস্ত্রিটির কাছ থেকে প্রত্যুত্তর পেল। ‘আ তুয়া মায়ে!’ (তোর মাকে **! )

বাইকটিকে নতুন চাকার ওপর দাঁড় করানোর পর, চারশো সিসি ইঞ্জিনের নিজস্ব ধ্বনি ফিরিয়ে আনার পর যখন তার গ্লাভবক্সের মরচে-আঁটা তালা ভেঙে ফেলা হলো, ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি সুইস ভিক্টোরিয়া ক্রস ছুরি, কালো চামড়ায় বাঁধানো এক জোড়া হেডফোন আর একটি ইংরেজি ডাইম নভেল, যার পাতার ফাঁকে এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবতীর ছবি, যার চুলে ভুট্টাগুছি বেনি, যে এই ছবিটি পাঠিয়েছে তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় মাইকেলকে।

পঁয়তাল্লিশ দিন ধরে হেমন্ত নাওয়াখাওয়া ভুলে আমড়াতলায় ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনের কলকব্জা দেখছিল। যথারীতি হেডফোনটি তার জিম্মায় এল। মাসাধিক কাল দক্ষিণের ঘরে বন্দি হয়ে খুটখাট করার পর এক রবিবার বিকেলে সে ভেতর উঠোনে কুয়োতলায় সবাইকে ডেকে এনে দেখাল তার নতুন আবিষ্কার। হেডফোনটি কানে লাগালে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের সম্প্রচার। ফার্মেসি থেকে গঙ্গারাম চক্রবর্তীর আমলের একটি নীলাভ গ্যালেনা স্ফটিক, সরোজার সেলাইয়ের বাক্স থেকে সূচ ও একটি বাতিল সিলিং ফ্যানের আর্মেচারের তার দিয়ে হেমন্ত বানিয়েছে ক্রিস্টাল রেডিও সেট। ততদিনে ব্রাহ্মণপাড়ায় একাধিক বাড়িতে রেডিও এসেছে, কিন্তু এটির অত্যাশ্চর্য রহস্য হলো অতীব সরল ও স্বচ্ছ কারিগরি। একখন্ড তামার তার কুয়োর জলে ডুবিয়ে আরেকটি নিমগাছে কাপড় শুকানোর তারে জড়িয়ে দিয়ে এরিয়াল বানিয়ে সম্পূর্ণ নিখরচায়, বিদ্যুৎ কিংবা ব্যাটারির শক্তি ছাড়াই, ডাক বিভাগকে কোনোরকম বেতার মাশুল ছাড়াই আর্টেসীয় কূপের মতো অনর্গল বেজে চলেছে সেই রেডিও। আদিরামবাটির সকলে একে একে এসে হেডফোন কানে লাগিয়ে শুনতে লাগল স্থানীয় সংবাদ, কথিকা, কৃষিকথার আসর, বাজারে কাঁচা পাটের দাম, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, লঘুসঙ্গীতের আসর। তারা চোখ গোল গোল করে দেখতে লাগল সেই স্ফটিকের ওপর স্পন্দমান সূচটিকে। বামুনদি দুহাত জড়ো করে কপালে ঠেকিয়ে তাকে প্রণামও করল।

ছেলের উদ্ভাবনী প্রতিভায় সরোজা খুশী হলেন, কিন্তু তেমন অবাক হলেন না। সরস্বতীতে ডুব দিয়ে তিনি রোজ দু’বেলা কোনোরকম যন্ত্রপাতি ছাড়াই কত যে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনেন। আর অবাক হলেন না শাকম্ভরী দেবী। তিনি ওই ম্লেচ্ছ গোরা সৈনিকের কানপট্টি ছুঁয়ে দেখলেনও না। কোমরে হাত রেখে গ্যালেনা স্ফটিকটির দিকে তাকিয়ে ব্যাজার মুখে বললেন–

‘গঙ্গা কোবরেজের ওষুধ যে কথা বলে একথা বুঝি তোদের জানতে বাকি ছিল?’

.

খেলনা ভাঙা ছেড়ে হেমন্ত নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কারের নেশায় মেতেছে, কলকাতায় বসে এই খবর জানার পর রাধারাণীর মনে পড়ে গিয়েছিল নিজের বাবার কথা। ছেলেবেলায় পাগলরামও নাকি এভাবেই বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির ব্যাপারে অনুসন্ধিৎসু ছিলেন, বাতিল ঘড়ির যন্ত্রাংশ দিয়ে স্বয়ংক্রিয় মাছ ধরা ছিপ বানিয়েছিলেন। পারিবারিক সেই গল্প বহুবার শোনা। পরের বার সাতগাঁয়ে এসে হেমন্তর হাতে তিনি তুলে দিলেন এল ডোরাডোর চাবি, যাতে সে ইচ্ছেমতো দোতলায় লাইব্রেরিতে গিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বইগুলো পড়তে পারে। জীবনের সায়াহ্নকাল সাতগাঁয় ফিরে এসে কাটানোর বাসনায় অনেক যত্নে লন্ডনের থ্যাকার অ্যান্ড স্পিংক মারফৎ প্রচুর মূল্যবান বই আনিয়ে দামি মরোক্কো চামড়ায় বাঁধিয়ে লাইব্রেরি সাজিয়েছিলেন পাগলরাম, যাতে আস্ত জীবন ব্যবসায়িক সাফল্যের পেছনে ছোটার পর সূর্যাস্তবিধুর অপেক্ষার দিনগুলো শূন্য না কাটে। সাহিত্য ইতিহাস দর্শন ছাড়াও জ্ঞানবিজ্ঞানের এবং আধুনিক প্রযুক্তি সংক্রান্ত বইপত্র ছিল। অধিকাংশ বইয়ের পাতাই কাটা হয়নি। এরই মধ্যে একদিন হেমন্ত খুঁজে পায় এরিক হৌসম্যানের লেখা এ প্র্যাক্টিকাল বুক অন রেডিও ফোন রিসিভিং। বইটির পাতায় ক্রিস্টাল রেডিও সেটের সার্কিট ডায়াগ্রাম ছিল।

তারিণীর মৃত্যু ও সরোজার কলকাতা যাত্রার পর তখন এল-ডোরাডোয় আবার নিয়মিত আলো জ্বলছে। রাধারাণী ছেলের সঙ্গে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে সাতগাঁয় আসেন। ইতিমধ্যে সুনির্মল লন্ডনে মুদ্রণবিদ্যা সম্পূর্ণ করে ফিরে এসেছে, ব্যবসার হাল ধরেছে। তবে এখন ওরা আসে আগের মতো গাড়ি হাঁকিয়ে লোকলস্কর নিয়ে নয়, ট্রেনে চেপে একজন গৃহভৃত্য সঙ্গে নিয়ে। ডকবাজার থেকে আনাজপাতি কেনে, কুয়োর জল ফিলটার করে কুঁজোয় ভরে পান করে; আগের মতো ফুটিয়ে নয়। পরিবারের দুই শাখার মধ্যে সম্পর্ক অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। দুই বাড়ির রান্নাঘরে মোচার ঘন্ট, ধোঁকার ডানলা, মুলো-বেগুনের তাম্বল, বড়ির ঝাল ইত্যাদি সুখাদ্যে ভরা বাটি চালাচালি হয়। রাধারাণী প্রতিবার আসার সময় বাড়ির ছোটোদের জন্য, বিশেষ করে ছোট্ট শিউলির জন্য, হগ মার্কেটের ইহুদি বেকারির চকোলেট পেস্ট্রি আনেন, রামপ্রাণের জন্য আনেন আদিরাম প্রেসে ছাপা সচিত্র অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির বই। সুনির্মল ফোটো এনগ্রেভিং শিখে আসার পর ছাপাখানার আধুনিকীকরণ হয়েছে, বিলেতের দুটি বড়ো প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ দেশের বাজারের জন্য বই ছাপা হচ্ছে। একের পর এক সাংসারিক ঝড়ঝাপটার পর রাধারাণীর জীবনে সুস্থিরতা এসেছে। এ বাড়িতে এলেই তিনি সরোজা ও রামপ্রাণের কাছে আক্ষেপের সুরে বলেন –

‘বাবা যদি এই দিনগুলো দেখে যেতে পারতেন!’

এই উষ্ণ সৌহার্দ্যর আবহে আদিরামবাটির দুটি মানুষের মন গলেনি। একজন শাকম্ভরী দেবী: রাধারাণী বিধবা হয়েও সব রকমের আচার পালন করেন না, একাদশীতে কঠোর নিরম্বু উপবাস করেন না, মুসুরির ডাল খান। এসব অনাচার উনি মেনে নিতে পারেননি। দ্বিতীয়জন বিশু : দিদি বনলতার মর্মান্তিক পরিণতির জন্য সে কলকাতার মাসিকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না।

.

নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে গাজির বাগানে গিয়ে ভূত দেখার মতো আলি সাহেবকে দেখে দৌড়ে পালাতে গিয়ে পড়ে যাবার পর থেকে হেমন্ত ঘরকুনো আর মুখচোরা ধরনের হয়ে পড়েছিল। সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে যেত না, ইস্কুলে যেতেও ছিল প্রবল অনীহা। সারাদিন বাড়ির আনাচে কানাচে, ছাতের কোণে কিংবা দক্ষিণের ঘরে বসে যন্ত্রপাতি নিয়ে খুটখাট করত। রাধারাণী ওর হাতে এল-ডোরাডোর চাবি তুলে দেবার পর সে ও বাড়ির দোতলায় বইপত্রের ভেতর সারাদিন মুখ গুঁজে কাটাতে লাগল। কিশোর হেমন্তর এই পরিবর্তন দেখে আদিরামবাটির কারোর কারোর মনে পড়ল, পাগলরাম নয়, আরও প্রাচীন এক পূর্বপুরুষের কথা, যাঁকে সবাই বুনোরাম নামে চিনত, যিনি ঘরসংসার ত্যাগ করে গাজির বাগানে বনের মধ্যে আশ্রম খুলেছিলেন। তারা আন্দাজ করতে পারত না, বুঝতে পারুক না পারুক হেমন্ত এল-ডোরাডোর লাইব্রেরিতে মোটা মোটা বই খুলে পাতার পর পাতা উলটে সারাটা দিন কাটিয়ে দিত একটাই উদ্দেশ্যে বাবা যাতে ওকে চাঁদেরডাঙায় কলেজে পড়তে না পাঠায়, কিংবা মশাই যাতে কাশীর টোলে পড়তে পাঠানোর প্রস্তাব না দেন।

কাচের আলমারিতে সাজানো সারি সারি বই, লাল মরোক্কো চামড়ায় বাঁধানো, মলাটে সোনার জলে পাগলরাম চক্রবর্তীর নাম লেখা। বেশির ভাগ বই কোনোদিন খোলা হয়নি। প্রথম দিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বইগুলোর মধ্যে ছবি দেখত হেমন্ত। তারপর ক্রমশ কষ্ট করে ইংরেজিতে লেখা পড়তে শুরু করল: জ্ঞানবিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে ইউরোপের সামাজিক ইতিহাস, মধ্যপ্রাচ্যের স্থাপত্যশিল্প, ইনুইটদের জীবনকথা, আমেরিকার বিভিন্ন জাতীয় উদ্যানের পশুপাখি, জীববিজ্ঞানীদের জীবনী, ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে বিখ্যাত বক্তৃতামালা, গ্রীক দর্শন, এছাড়া তিনটি এনসাইক্লোপিডিয়ার পুরো সেট। এবং নভেল চার্লস ডিকেন্স, উইলিয়াম থ্যাকারে থেকে শুরু করে টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি, তুর্গেনিভ। ওর মধ্যে পাগলরামের আত্মার পুনর্জন্ম ঘটেছে, শাকম্ভরীর স্বপ্নে জানান দিয়ে তিনি এসেছেন– এমন কথা হেমন্ত ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছে। কিন্তু এই বিভিন্ন ধরনের বইয়ের সম্ভার থেকে কলকাতার দাদুর রুচি কিংবা মনের গড়নের কোনো হদিশ পায় না সে।

দুপুরের রোদ পশ্চিমে হেলে পড়লে লাইব্রেরির বড়ো বড়ো ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর শার্সিতে নাগকেশর গাছটা আলোছায়ার জাজিম বোনে, দরজার মাথায় অর্ধচন্দ্রাকার নীল-সবুজ-কমলা বেলজিয়ান কাচে ঝলসে ওঠে অস্ত সূর্যের আলো, বারান্দায় কাঠের জাফরির ছায়ায় ডানা ঝটপটিয়ে ফিরে আসে পায়রারা।

রোজ ধর্মতলার ওদিকে খালপাড়ের বসতি থেকে নন্দর-মা আসে ঘরদোর ঝাড়ামোছা করতে। অনেককালের বিশ্বস্ত পরিচারিকা, হেমন্ত ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছে। রামপ্রাণের জন্য কখনো-সখনো বনবাদাড় ঘুরে দুষ্প্রাপ্য জড়িবুটি সংগ্রহ করে এনে দেয়। তিন-চারটে বাড়ি ঠিকে কাজ করা ছাড়াও নন্দর-মা’র আরেকটি আয়ের পথ হলো এপাড়া-ওপাড়ার মেয়েবউদের বিভিন্ন গোপন মেয়েলি রোগের জন্য টোটকা-তাবিজের কারবার। এর মধ্যে একদিন নন্দর-মা অসুস্থ হলো, এল-ডোরাডোয় বদলি হিসেবে কাজ করতে এল ওর ছেলের বউ। জানতে পেরে সরোজা বলল-

‘কী কাণ্ড দেখো, নন্দর-মা’র যে আবার একটা ছেলের বউ আছে এতকাল শুনিনি!’

সেই শুনে বামুনদি বলল,— ‘বউদিদিমণির যেমন কথা! নন্দর-মায়ের যদি নন্দ নামে ছেলে থাকে তাহলে তার যে একখান অন্তত বউ থাকবে সে আর আশ্চয্যি কী বাপু?’

সে যাইহোক, সেই ছেলের বউয়ের দোহারা চেহারা, চওড়া কোমর, চৌকোনা চিবুকে সামান্য পুরুষালি আদল, নাকে লাল নাকছাবি, হালকা রোমশ হাতে কাচের চুড়ির গোছা আর বাজুতে সুতোয় বাঁধা শিকড়বাকড়ের মাদুলি। ক্ষীণদেহী নন্দর-মা ছায়ার মতো নিঃশব্দে এল ডোরাডোর ঘরদোর ঝাড়ামোছা করে চলে যেত, তার ছেলের বউ সশব্দে আসবাবপত্রে ঝাড়নের আঘাত করে, মেঝেয় কর্কশ জলের বালতি টেনে, ঝমঝম চুড়ি বাজিয়ে কাজ করে। হেমন্তর মনঃসংযোগ ছিন্ন হয়, ভিক্টোরিয়ান লন্ডনে পাথরে বাঁধানো রাস্তায় হ্যাকনি কোচের চাকার ধ্বনি, ঘোড়ার খুরের টপাটপ, ভারি ক্যালিকোর গাউনের খসখস থেকে তাকে ফিরিয়ে আনে মামুলি বর্তমানে।

‘সারাদিন ধরে এত মোটা মোটা বই পড়ো যে বাবু? খেলাধুলো কর না? তোমার মতো তাগড়া ছেলেরা এখন মাঠে বল পিটে কাদা মেখে এসে নদীতে ঝাঁপাচ্ছে। তোমার ইচ্ছে করে না বুঝি?’

মেঝেয় উবু হয়ে বসে জলের বালতি টেনে ঘর মুছতে মুছতে আড় চোখে তাকিয়ে হেসে হেসে কথা বলতে চায় নন্দর-বউ। হেমন্ত চুপ করে থাকে, কখনো অন্যমনস্কভাবে হুঁ-হাঁ করে উত্তর দেয়।

‘এত যে পড়ো, পড়ে পড়ে মাথাখান ভারি হয়ে যাবে। কিন্তু শরীলটা? শরীলটা কে দেখবে শুনি?’

শাড়ি হাটুর ওপর তুলে আমাজনীয় উরু ও নিতম্বের ভার গোড়ালির ওপরে রেখে মেঝেয় বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে মুছে চলে সে, অবিরল কথা বলে যায় স্বগতোক্তির মতো স্বরে। হেমন্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, তার নিজের জীবনের কথা নাকি তার মতো খালপারের কোনো পড়শি বউয়ের কথা, কোনো নির্দয় শাশুড়ির কথা, তার অপোগন্ড ছেলের কথা বলতে থাকে নন্দর-বউ, যে ছেলে নাকি রোজ আকন্ঠ মদ গিলে এসে পড়ে পড়ে ঘুমোয় আর ঘুম ভাঙলে হাতের কাছে যা কিছু পায় তুলে নিয়ে বউকে ধরে পেটায়, উদয়াস্ত গতর খাটিয়ে রক্ত জল করা উপার্জনের কড়ি কেড়ে নিয়ে ফের ভাঁটিখানায় যায়, কাটুনিডাঙায় যায়, এমনকি রাত্রিবেলা পয়সা নিয়ে ঘরে বাবু ঢোকানোর চেষ্টা করে।

সেই সময় হেমন্ত ফ্রেডেরিক লিখটেন্সটাইনের দ্য সোশ্যাল হিস্ট্রি অফ ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ড পড়ছে, গ্রামে খামারে চাষের কাজ হারিয়ে মানুষ কীভাবে কচুরিপানার মতো ভেসে ভেসে শহরের বস্তিতে গিয়ে উঠছে সে সম্পর্কে পড়ছে, লন্ডনে রাতারাতি কীভাবে পতিতালয় বেড়ে যাচ্ছে, ভবঘুরেদের জন্য আইন প্রণয়ন নিয়ে পার্লামেন্টে বিতর্ক হচ্ছে, সে সম্পর্কে জানতে পারছে। নন্দর-বউয়ের একঘেয়ে অনুযোগের ফিরিস্তির মধ্যে সে ক্রমশ এক সমান্তরাল গল্পের আভাস পেল, অত্যন্ত জীবন্ত আর দগদগে, বইয়ে ছাপা ইংরিজি ভাষায় লেখা ইতিহাস ফিকে পানসে মনে হতে লাগল। একটা পলকা অনুসন্ধিৎসা থেকে হেমন্ত কান পাতলো সেই স্বগতোক্তির স্বরে, সূর্যাস্তের আলো দরজার মাথায় রঙিন খিলানের শার্সিতে মরে আসার আগে ভনভনে মশার মতো যা উঠে আসে মেঝে মোছার বৃত্ত থেকে পাক খেতে খেতে, বইয়ের খোলা পাতা থেকে তার চোখ সরলো দেহটির দিকে গোড়ালির আবর্তন-শলাকায় ঘুরে চলেছে যেন কুমোরের চাকে মাটির তাল, নিটোল কলসের আকার নিচ্ছে, সামনে ঝুঁকে মেরুদন্ডটা প্রায় মেঝের সঙ্গে সমান্তরালে পেশল কাঁধের মাঝ বরাবর কোমরের নীচ পর্যন্ত কশেরুকার গভীর খাতের ওপর চুলের বেণি হিলহিল করছে সাপের মতো, আঁচল সরে ঘাড়ের কাছে উন্মুক্ত ত্বকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটেছে।

আর তখনই সে মাথা তুলে চাইবে, আর চোখাচোখি হতেই ফিক করে হেসে উঠবে নন্দর-বউ। হেমন্ত তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে নেবে বইয়ের পাতায়, কানের ডগায় অনুভব করবে পুড়ে যাবার মতো অনুভূতি আর বুকে শ্বাসকষ্ট। এভাবে ডান হাত বাড়িয়ে, বাঁ হাত উরুর ওপর রেখে ঘুরে ঘুরে সে টেবিলের নীচে এসে দুপায়ের চারধারে, দুই হাঁটুর মধ্যিখানে এসে মেঝে মুছতে মুছতে আচমকা দেহের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে যেতে খামচে ধরবে হেমন্তর উরু, আর ওর ফোঁপরা হাড়ের ভেতরে শুরু হয়ে যাবে রাশি রাশি ঘুণপোকার স্রোত।

পাঁচ দিন ধরে আসার পর আর সে এল না। হেমন্ত সিগমুন্ড ফ্রয়েডের দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অফ ড্রিমস টেবিলে খোলা রেখে বসে রইল অস্থির প্রতীক্ষায়, ঘরের মেঝেয় মোজাইকের অসম্ভব ত্রিভুজের নকশার ওপর নৈঃশব্দ্য দপদপ করতে লাগল, মাথার মধ্যে কাটা রেকর্ডের মতো বেজে চলল সেই নারীর একঘেয়ে কণ্ঠস্বর, তার হাতে চুড়ির ঝন্‌ঝন, তার ঘামের তীক্ষ্ণ গন্ধ, তার বাজুতে এঁটে-বসা বিপত্তারিণীর তাগা, তার মিসি-লেপা দাঁতের সারি। বার বার অপ্রতিরোধ্য অনুপুক্ষ্মতায় স্মৃতিতে ফিরে আসতে লাগল মজ্জার ভেতরে সেই ঘুনপোকার অনুভূতি, ডকবাজারের মেছুনির মতো কানকো তুলে আমূল প্রত্যয়ী কর্কশ আঙুলে খপ করে চেপে ধরেছিল আতপ্ত কামনার আর্দ্র নাড়িভুড়ি, তারপর সবুজ পিত্তের থলিটা নখ দিয়ে খুঁটে বের করে এনেছিল, যার অস্তিত্ব হেমন্ত জন্মের পর থেকেই জানত কিন্তু এভাবে প্রকাশ্যে আসায় চরম আতঙ্কে দমবন্ধ হয়ে এসেছিল তার।

হেমন্তর বিক্ষিপ্ত মনোযোগ ধরে রাখার মতো কিছু ওই অস্ট্রিয়ান মনোবিদের লেখায় ছিল না। বাধ্য হয়ে সে মই লাগিয়ে ওপরের দিকের তাক থেকে পেড়ে আনল মাই সিক্রেট লাইফ এগারো খণ্ড, লেখকের নাম অ্যাননিমাস। প্রচ্ছদের ওপর অন্তর্বাস-পরা এক নারীর ফোটোগ্রাফ, তার কোলের ওপর মুখ গুঁজে কোমর জড়িয়ে ধরেছে এক যুবক। প্রথম খন্ডটি কোনোকালে খোলা হয়নি, পাতাগুলো আকাটা। হাত বাড়িয়ে রুপোর কাগজ-কাটা ছুরিটা খুঁজতে গিয়ে পেল না হেমন্ত। হাতির দাঁতের যে বাক্সটার ভেতরে সেটি রাখা থাকত সেটাও পেল না। তার পাশে স্ফটিকের কলমদানিটা নেই, তাতে দুটি পার্কার ও তিনটি শেফিল্ডের ঝরনা কলম ছিল, সেগুলোও নেই। ঘরে ধুলো জমল, ন’দিন পরে নন্দর-মা কাজে যোগ দিল। হেমন্তর মুখে ওর ছেলের বউয়ের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল।

‘হায় কপাল! এক কী কথা শোনাও গো? আমার নন্দ যে বারো পোরার আগেই…’ এই বলে কপাল চাপড়ে মরাকান্না জুড়ে দিল নন্দর-মা। জানা গেল, অনেক বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লু-র মড়কে মারা গিয়েছে সে বারো বছর বয়সে। সেই থেকে ছেলের নামটা বয়ে বেড়াচ্ছে নন্দর-মা, যেভাবে হারানো নদীর নাম বয়ে বেড়ায় পথ।

‘আর বদলির কাজে লোক পাঠাবো কেন গো? বছরে এই পাঁচটা দিন ছুটি নিয়ে ধর্মতলায় গাজনের মাসিক করি এ তো আমার কলকেতার মনিবরা জানে।’

কেবলমাত্র রুপোর ছুরি, হাতির দাঁতের বাক্স, স্ফটিক আর কলমই নয়, দেখা গেল একটি অষ্টধাতুর বুদ্ধমূর্তি, দুটি রুপো-বাঁধানো হুকোর নল, একটি জেড পাথরের ভিনাস ও আরও কয়েকটি দামী গৃহসামগ্রী লোপাট হয়েছে। খালপারে কুমোরদের বসতি থেকে শুরু করে নৌকার কারিগরদের পাড়া, ক্যাওটপাড়া এমনকি কাটুনিডাঙাতেও খোঁজখবর করে হেমন্তর বর্ণনামাফিক কোনো নারীর সন্ধান পাওয়া গেল না। সে যেই হোক, যেন ধোঁয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। হেমন্তকে কেউ ঘুণাক্ষরেও দোষারোপ করল না, কিন্তু একটা চাপা অস্বস্তি আর লজ্জা থেকে সে এল-ডোরাডোয় যাওয়া বন্ধ করে দিল। তবুও সেই ঘরটা, সেই ঘরের মেঝেয় অসম্ভব ত্রিভুজের নকশার ওপর উবু হয়ে বসে সেই নারী, তার গোড়ালির ভারসাম্যে ঘুরস্ত নিতম্ব, পিঠের ওপর ছটফটে বেণি, আদিরাম মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার সেইসব সূত্রধরের ছুরিতে কুঁদে-তোলা অসম্ভব নারীদের আদলে স্মৃতিতে কল্পনায় মিশে হেমন্তর দিনগুলো রাতগুলো ফর্দাফাই করতে লাগল। বিচিত্র সেই তাড়নার তাপ আর হাড়ের ভেতর ঘুনপোকার বিরামহীন কিটকিট শব্দটাকে হত্যা করার প্রয়াসে একদিন হেমন্ত ভোরবেলায় উঠে কাউকে না জানিয়ে বর্গিব্যাটারিতে বাঁটুল দি গ্রেটের ব্যায়ামাগারে গিয়ে ভর্তি হলো।