সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৬.২
৬.২
হার্লের করুণ শিঙার মতো হর্ণ আর ইঞ্জিনের বিকট ভট্ভট্ ধ্বনি নিয়ে তিতলির সহপাঠীদের হাসি খুনসুটির অন্ত ছিল না। ক্রমশ যত উঁচু ক্লাসে উঠছিল, তার মাত্রা ক্রমশই বাড়ছিল। এ ব্যাপারে তিতলি যত বিচলিত হতো, তত বেশি করে পেয়ে বসতো ওরা। লাস্ট পিরিয়ডে ছুটির ঘণ্টা বাজার আগে মিস লুলু মরিস যখন রোম সাম্রাজ্যের ইতিহাস পড়াতেন, কিংবা বোর্ডে ছবি এঁকে দেখাতেন মিশরে পিরামিডের গড়ন, তখন বাইরে লন ছাড়িয়ে উঁচু পাঁচিলের ওপাশ থেকে পরিচিত ভট-ভট- ভট-ভট শব্দে ক্লাসঘরের ভেতর চাপা হাসির লহর বয়ে যেত, লুলু মরিস বোর্ড থেকে মাথা ঘুরিয়ে লাল ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে জানলার দিকে তাকাতেন, ভ্রূ কুঞ্চিত হতো। রাগে লজ্জায় তিতলি একটি বেণি মুখে পুরে চিবোতো। জ্যোতিকণা ওরফে তিতলিদের হার্লেকে ক্লাসের মেয়েরা ডাকত— ‘পেত্যে হার্লে’,— ‘ফার্টিং হার্লে’,— ‘পেদো হার্লে’ ইত্যাদি নামে। স্কুল ছুটির পর গেটের বাইরে এসে সকলের বিদ্রূপভরা চাহনির সামনে বাবার পেছনে হার্লেতে উঠে বসতে গিয়ে লজ্জায় মরে যেত সে। একদিন লাস্ট পিরিয়ডে ঘন্টা বেজে ওঠার আগে জানলার বাইরে সেই পরিচিত বিকট শব্দ, আর ক্লাসঘরের ভেতর পেছন দিক থেকে একটি কাগজের দলা এসে পড়ল তিতলির কোলে। তাতে বাংলায় লেখা–
পেদো বুড়ো
হার্লে খুড়ো
পেছনে ঘুরে তাকিয়ে সারি দিয়ে হাসি-চাপা মুখগুলো দেখে না বোঝা গেলেও কাগজে অপটু গোটা গোটা বাংলা হস্তাক্ষর দেখেই তিতলি বুঝে যায় ওটা ভার্শা (বর্ষা) চৌহানের হাতের লেখা। তার কারণ সারা ক্লাসের মধ্যে ওই একমাত্র বাংলা লিখতে পারত না, আর যাতে তিতলি কাউকে সন্দেহ না করতে পারে সেজন্যই ওকে দিয়ে লেখানো হয়েছিল। তাছাড়া সবাই জানত ভার্শাকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস তিতলির হবে না। ক্লাসে সকলে ভাশা চৌহানকে সমীহ করে চলে। গ্রীন হাউসের বাস্কেটবল চাম্পিয়ান ভার্শা দিনেমারডাঙা জুটমিলের ম্যানেজারের মেয়ে, স্ট্রবেরি রঙের মরিস মাইনর চেপে ইস্কুলে আসে। উদারিং হাইটস-এর বইয়ের মলাটে ক্যাথি আর্নশ-র মতো মাথার চুলে একটি পেঁচানো স্প্রিং-টুইস্ট লক রাখে, যা সে দুই পিরিয়ডের মাঝের বিরতিতে পেনসিল জড়িয়ে অটুট রাখে। একদিন টিফিনের সময়ে ক্লাসে ভার্শা ঘোষণা করল–
‘হে গার্লস লিসন্, একটা আনবিলিইইভেল বেপার হলো মর্নিং-এ! স্কুলে ঢুকে আজ আমি ওয়াশরুমে গেলম, গেট তভি খুলা থা। বাইরে গাড়ির হর্ন অল দ্য নয়েজ অ্যান্ড দ্যাট ফেমাস ভট-ভট-ভট-ভট সাউন্ড অফ ইউ-নো-হোয়াট। তো আমি চ্যাপেলের সাইড দিয়ে শর্টকাট নিচ্ছে, ভেতরে তাকিয়ে দেখি কি … ক্যানিউ ইম্যাজিন হোয়াট?’
সকলে সমস্বরে বলে ওঠে,— ‘হোয়াট?’
‘লর্ড যীসাসের একটা হাত ক্রুশ থেকে খুলে এল–আপন মাদার হোলি মেরি!–অ্যান্ড হি প্রেসড ইট আগেন্সট হিজ নোজ, লাইক দিস!’
এই বলে ভার্শা ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নাক শিটকানোর অভিব্যক্তি করে ডান হাতটা মুখে চেপে ধরতেই ক্লাসঘরে হাসির হররা ছুটে যায়, হাসতে হাসতে এ-ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে, কেউ কেউ ভার্শার মতো নাকে হাত চাপা দেবার ভঙ্গি করে মুখে আওয়াজ করে— ‘ভট-ভট-ভট’।
আচমকা তিতলি ঝাঁপিয়ে পড়ল ভার্শার ওপর। ওর চুল খামচে ধরে চিৎকার করে উঠল—
‘হারামজাদি গুখেগোর বেটি!’
সকলেই হতচকিত। লিকলিকে চেহারার জ্যোতিকণা চক্রবর্তী যে বাস্কেটবল চাম্পিয়ান ভার্শা চৌহানকে আক্রমণ করে মাটিতে পেড়ে ফেলতে পারে সেই ঘটনায় ততটা নয় যতটা ওর মুখে অমন একটা ভার্নাকুলার গালি শুনে। ইতিমধ্যে ভার্শা বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে একহাতে তিতলির জামা চেপে ধরেছে। দুজনে পরস্পরকে খামচে ধরে গড়িয়ে বেঞ্চির নীচে চলে যেতে যখন প্রিফেক্ট ছুটল ক্লাস টিচারকে খবর দিতে, তখন সম্বিত ফিরল সবার। ওরা দুজনকে দুদিক থেকে টেনে বিচ্ছিন্ন করতে লাগল। আর তখনই আবিষ্কার হল জ্যোতিকণার টিউনিকের ব্যাজ-লাগানো পকেট ছিঁড়ে মাটিতে পড়ে আছে, আর ভার্শার চুলের সেই স্প্রিংটুইস্ট লক জ্যোতিকণার হাতের মুঠোয়।
কেশদাম হারানোর ভয়ানক বিপর্যয়ে সকলে ভাশাকে নিয়ে ব্যস্ত। সেই কাকে তিতলি ক্লাসঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল, চলে এল ইস্কুলবাড়ির পেছন দিকে। এর আগে এদিকটায় কখনো আসেনি। কনভেন্টের চৌহদ্দির মধ্যেই জায়গাটা কেমন অগোছালো নির্জন ধরনের। একদিকে সারি সারি সন্ন্যাসিনীদের পোশাক মেলা রয়েছে, বাতাসে দুলছে সাদা গাউন আর অন্তর্বাস। একটি কাঠচাপা গাছের নীচে পরিত্যক্ত আদ্যিকালের ওয়াশিং মেশিন। নীচু একতলা বাড়ির চারদিকে টানা টালির ছাউনি দেওয়া বারান্দা, একপাশে ঝাঁটা বালতি রাখার ব্রুম কাবার্ড।
তিতলি গিয়ে লুকোলো সেই কাবার্ডের ভেতর। বাইরে উঁকি দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল ফিনাইলের গন্ধের ভেতর, পাথরের ওপর মাদার লুজাডোর পাম্প জুতোর কঠোর মসমস ধ্বনির জন্য। ভাবতে লাগল ঠিক কী মাপের অপরাধ সে ঘটিয়েছে, এবং কী ধরনের শাস্তি পেতে চলেছে। এদিকে সময় বয়ে যায়, ক্লাস শেষ হবার ঘন্টা বাজে একবার। কাছে কোথাও কাপড় কাচার একটানা শব্দ থেমে যায়, কাঠচাঁপা গাছে একটা ঘুঘু ডাকতে থাকে। তিতলির কানে ভেসে আসে একটা চেনা ঝিমধরা গানের সুর। বহুকাল আগে, যেন বা গতজন্মে, এই সুর শুনেছে সে। কাবার্ডের পাল্লা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে বারান্দায় এসে বসেছে বৃদ্ধা আয়া। তার কুচকুচে কালো গায়ের রঙ, ঘাড় অব্দি ছাঁটা সাদা তুলোর মতো ঘন ঝাঁকড়া চুল, পরনে ফুলছাপা ফ্রকের ওপর নীল এপ্রন। বারান্দায় একা একা পা ছড়িয়ে বসে এপ্রনের পকেট থেকে বিস্কুট জাতীয় কিছু বের করে চিবোচ্ছে। কাঠচাপা গাছ থেকে পায়ের কাছে নেমে এসেছে তিনটে কাঠবেড়ালি, তাদের সামনে ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর সেই অদ্ভুত চেনা ভাষাহীন সুর গুনগুন করছে। তিতলির একটু একটু করে মনে পড়তে থাকে খুব ছোটোবেলায় শোনা এই সুর, গুনগুন করে ওকে ঘুম পাড়াতো একটি মেয়ে, শীতের হিমে নারকেলপাতার আগুন করে হাতের ওম দিত, দোলনার ভেতরে শুয়ে দুলতে দুলতে সেই ঝিমধরা সুর শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ত সে।
এতকাল পরে সেই ভুলে-যাওয়া সুরটা আবার শুনতে শুনতে, ফিনাইলের গন্ধের ভেতর, নার্সারি ক্লাসের দিক থেকে ভেসে আসা ভনভনে মৌচাকের মতো— ‘জনি-জনি-ইয়েস-পাপ্পা-ইটিং-সুগার-নো-পাপ্পা’ ধ্বনির ভেতর তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল তিতলি। চটকা ভেঙে দেখে, পাল্লা সরিয়ে এক হাত কোমরে রেখে ওর দিকে চেয়ে আছে, মাদার লুজাডো নয়, সেই আয়া, যাকে ইস্কুলে সবাই কমিটিং-নুইসেন্স নামে চেনে। নার্সারি ক্লাসে কোনো শিশু— ‘কমিটিং নুইসেন্স’ করে ফেললে ঝাঁটা বালতি ডাস্ট প্যান নিয়ে হাজির হন তিনি।
ব্রুম কাবার্ডের ভেতরে তিতলিকে লুকিয়ে থাকতে দেখে একটুও অবাক হলেন না কমিটিং-নুইসেন্স। সারাটা জীবন এই কনভেন্টের পাঁচিলের ভেতর নির্বাক পশুর মতো পঞ্চান্নজন সন্ন্যাসিনী ও সাড়ে সাতশো ইস্কুল পড়ুয়ার বিভিন্ন ধরনের নিত্য প্রয়োজন মেটানোর পর কোনো কিছুই আর অবাক করতে পারে না যাঁকে, এমন কি যিনি প্রথম থেকেই জানতেন তিতলি এখানে লুকিয়ে আছে, সেই কমিটিং- নুইসেন্স একমুখ বলিরেখাময় নরম হাসি হেসে এপ্রনের পকেট থেকে একটি কমিউনিয়ন ওয়েফার বের করে বাড়িয়ে ধরলেন।
‘কাম, বেবি! টেক দিস!’
জ্যোতিকণা চক্রবর্তী কিংবা ভার্শা চৌহান কাউকেই গুরুতর শাস্তি পেতে হলো না। বিচক্ষণ প্রিফেক্ট ক্লাস টিচারের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পেশ করেনি। তার কারণ যদিও জ্যোতিকণার মুখে ভার্নাকুলার গালি ও ভার্শার চুলের লক ছেঁড়াটা ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কিন্তু ভার্শাও ওর টিউনিকে স্কুলের ব্যাজ ছিঁড়েছিল, ফলে দুই অপরাধ কাটাকুটি হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে প্রভু যীশুকে নিয়ে ভার্শার কাল্পনিক অঙ্গভঙ্গি এবং প্রায় গোটা ক্লাস সেই ঠাট্টায় যোগ দেওয়ার ব্যাপারটা ছিল গুরুতর ব্লাসফেমি।
