সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ২.৫
২.৫
শাকম্ভরী দেবীকে জল থেকে তুলে ঘাটের মাথায় ছাউনিতে এনে শোয়ানোর পর সন্ধ্যা নামার আগেই তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল। তারপরে শুরু হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর। শ্মশানযাত্রীদের মধ্যে যারা কথক, সাতগাঁর ইতিহাস আর পুরাণ যাদের স্মৃতিতে পোড়ামাটির মন্দিরের গায়ে রিলিফের মতো হয়ে আছে, তারা পালা করে গল্প বোনে।
বহুদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে বাপ্পার মনে ভেসে উঠেছে সেই অন্তর্জলীযাত্রার ছবি। মশারির ভেতর গুমোট বাতাসে ছবিগুলো বিস্ফারিত হয়ে উঠত। সেদিন অন্ধকার নামার আগে শ্মশানঘাট থেকে সে ফিরছে গামার কাঁধে চড়ে, একটি দলের সঙ্গে। মজা নদীর পাড় ছেড়ে কাঁচা পায়ে-চলা পথ, বাঁশের সাঁকো, নীচে খাঁড়িতে জোয়ারের জল ঢুকছে, প্রতিমার কাঠামো পড়ে আছে। পাশে পাশে চলেছে ওর হেমন্তমামা, চুপচাপ, খালি পায়ে হাঁটু অব্দি পুরু ধুলো, মাথার ঠিক ওপরে একঝাক মশা ধোঁয়ার মতো দুলে দুলে উড়ছে। অনেকগুলো পায়ের আঘাতে শুকনো ধুলো উড়ে পড়ছে পথের ধারে লানটানা ঝোপে, লাফিয়ে উঠছে গঙ্গাফড়িং। আকাশে বাদুড় উড়ে যাচ্ছে দূরে শিমুল গাছের সারির দিকে।
বাদুড়গুলো ঘাটের ছাউনির কড়িবরগায় ঝুলে থাকে, বাপ্পা দেখেছে। তার ঠিক নীচেই মাদুরে শোয়ানো শাকম্ভরী দেবী। পায়ের পাতাদুটো জলে থেকে মাছের পেটের মতো সাদা, রক্তহীন।
‘বুড়িদিদা বাড়ি যাবে না?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করে হেমন্তমামাকে।
‘না।’
‘এখানেই থাকবে একা একা?’
‘একা কেন? লোক থাকবে।’
‘কী খাবে?’
‘কিছু খাবে না। শুধু গঙ্গাজল।’
‘ভয় পাবে না?’
‘না। ভয় পাবার কী আছে?’
কিন্তু বাপ্পা জানে ভয় পাবার আছে। যখন পুরোপুরি অন্ধকার নেমে আসবে, আর ছাউনির বাদুড়গুলো উড়ে যাবে সরস্বতীর ওপারে ফলের বাগানে, আর রাতচরা পাখি ডাকবে শিমুল গাছে, আর শিয়ালের পাল আসবে জলের ধারে, যখন দূরে কোয়ার্সভিলে গীর্জায় ঘন্টার ধ্বনি ভেসে আসবে, আর ঝিঝিপোকারা ক্লান্ত হয়ে চুপ করে যাবে, ঠিক যখন ওষধিবাগানে নাগকেশর গাছের কোটরে তক্ষকটা ডেকে উঠবে তিনবার, তখন খুবই ভয় পাবার আছে। ভয় আর দুঃখ। এত দুঃখ যে বাপ্পার দম বন্ধ হয়ে আসে, ঘুমের মধ্যেই সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। জেগে উঠে নিজেকে আবিষ্কার করে কলুটোলা লেনের বাসায়। পাশে শুয়ে মা, মায়ের ওপাশে বাবা।
শিউলি ওর মাথায় ছোটো ছোটো চাপড় মেরে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে। ওপাশ থেকে রথীন জিভে বিরক্তিসূচক শব্দ করে।
‘মনে হয় স্বপ্ন দেখেছে,’ শিউলি ফিসফিস করে বলে।
‘স্বপ্নের আর দোষ কী!’ রথীন ঘুমজড়ানো গলায় বলে। ‘বড়ো অদ্ভুত তোমাদের বাড়ির নিয়মকানুন! ওরা মেয়েদের শ্মশানে যেতে দেবে না, এদিকে একটা ছোটো বাচ্চাকে সেখানে পাঠানোর আগে দুবার ভাববে না। কেন? না এক বুড়ি যাতে সঙ্গে যাবার আগে কবে মরে ভূত হয়ে-যাওয়া কাকাকে দেখে যেতে পারে!’
বাপ্পা কিছুতেই বুঝতে পারে না কেন সে কাঁদে। বুঝতে না পারার জন্য আরও ভয় পেয়ে যায়, আরও জোরে জোরে কাদে। শিউলি ওকে দেয়ালের দিকে পাশ ফিরিয়ে দিয়ে পিঠে ছোটো ছোটো চাপড় মারতে থাকে। কিন্তু বাপ্পা সত্যিই জানেনা তার কীসের দুঃখঃ ওই শ্মশানের দৃশ্যগুলো জলের মধ্যে ধোঁয়ার মতো ডুবে যাচ্ছে গলে যাচ্ছে বুড়িদিদা, নাকি পরিত্যক্ত প্রতিমার খড়কাঠামো, জলের ধারে বুনো লতায় ছাওয়া ডিঙি নৌকো; ধুলো নামের বেড়ালটা মুখে পায়রা নিয়ে চলে যাচ্ছে, ফোঁটা ফোটা রক্ত লাল মেঝের ওপর গড়িয়ে চৌচির ফাটল দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে বাদলা পোকাদের দেশে; ছোটো রেলগাড়িটার শেষ জানলাবিহীন ভেন্ডার কামরা, যার দরোজার গায়ে আঁকা মৃতদেহের ড্রয়িং, ওপরে লাল কাটা চিহ্ন; কাটা চিহ্নের নীচে লেখা যা বাপ্পা তখনও পড়তে পারে না— ‘এই গাড়িতে মৃতদেহ বহন করা দন্ডনীয় অপরাধ’। দুঃখ সেই জন্যে? নাকি দুঃখটা এই কারণে যে ঘুম ভেঙে সে টের পেয়েছে সাতগাঁয় নয়, সে রয়েছে কলকাতায়? এখানে ম্যাওবেড়ালের গির্জার ঘন্টাধ্বনি নেই, ঘুপচি ঘরে মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটা খড়কাটা কলের মতো শব্দে বাতাস কাটছে। আবার সে ঘুমিয়ে পড়বে আর জেগে উঠবে সকালবেলায়, যে সকালের স্বাদ হরলিক্সে ডোবানো থিন অ্যারারুট বিস্কুটের মতো অপরিবর্তনীয়, আর সারাদিন ধরে ওকে দেখবে দম-দেওয়া একলা টিনের ভাল্লুকটা, যার নীল পুঁতির চোখ, দু হাতে খঞ্জনি, রঙ চটে গিয়েছে।
সেদিন ওর মাকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িটা আদিরামবাটির দিকে চলে গেল, বাপ্পা গামার কাঁধে চেপে শ্মশানের পথ ধরল। ওর ভেতরে আমিটাকে একা করে দিয়ে আরেকটা আমি মায়ের সঙ্গে চলে গেল, আদিরামবাটিতে যে— ‘আমি’-টা রয়েছে তার সঙ্গে মিলিত হতে। বাপ্পা যখন কলকাতায় থাকে, সেই আমি থাকে সাতগাঁয়ে। তার কাছে জমা থাকে মায়ের কাছে বাপ্পার যাবতীয় গোপনীয়তার দিব্যিগুলো। মন্দিরের অন্ধকার গর্ভগৃহে রয়েছে যে পাথরের ছোট্ট ছেলেটা, যার চোখে রুপোলি রাঙতার চশমা, কাধে তীরধনুক, সে সাতগাঁয়ে বাপ্পার সেই আমিটার খেলার সাথি।
.
ঘোড়ার গাড়িটা সদর দরজায় এসে থেমেছিল। চামড়ার খোপকাটা ব্যাগের ভেতর থেকে টিপকল-আঁটা ছোটো বটুয়া বের করে কোচোয়ানকে ভাড়া দিল শিউলি, গর্ভগৃহে পাথরের বালক সেই দৃশ্য দেখেছে। আদিরামবাটিতে পা রেখে সকলেই প্রথমে মন্দিরে যাবে, ছয়টি ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে ঘন্টা বাজিয়ে হাত জড়ো করে চোখ বন্ধ করবে, দরজায় মাথা ছোঁয়াবে। কিন্তু সেদিন শিউলি এসব কিছুই করেনি। একই কারণে গুরুজনদের দেখে পা ছুঁয়ে প্রণামও করেনি। প্রবীণরা তখনও দাঁড়িয়েছিলেন ভেতরবাড়ির উঠোনে নিমগাছতলায়। এত নীচু স্বরে কথা বলছিলেন যে নিমের পাতায় হাওয়ার শব্দও শোনা যাচ্ছিল। বারান্দায় দাঁড়ে অ্যান্টনি কাকাতুয়া তখনও একঘেয়ে স্বরে ডেকে চলেছে— ‘দুর্গা দুর্গা! আবার এসো!’
যাঁর উদ্দেশে এই বিদায় সম্ভাষণ, ততক্ষণে তিনি নদীর পাড়ে পৌঁছে গিয়েছেন পরপারের জন্য তাঁকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। আদিরামবাটির বিভিন্ন বাড়ির মাসিপিসি জ্ঞাতিবউরা উঠোনে অপেক্ষা করছিলেন ঘাট থেকে সেই সংবাদ বয়ে আসার জন্য। শিউলিকে দেখে আরেক প্রস্থ বিলাপ শুরু হলো: শাড়ির আঁচল মুঠোয় ধরে ঠোঁটের ওপর চেপে, চোখে উদ্গত অশ্রু, কেউ বা ওর মাথাটা দুই তালুর ফাঁকে ধরে, কাঁধে কাঁধ ছুঁইয়ে গোল হয়ে ঠিক যেন ফুটবল ম্যাচ শুরুর আগে একদল সংকল্পবদ্ধ খেলোয়াড়।
তিনদিন আগে শাকম্ভরী দেবী স্বপ্নে দেখেন দক্ষিণের জানলায় রোদ বেয়ে নেমে আসছে পালকি, চার বেহারার পরনে লাল ধুতি। তখনই টের পান তাঁর অস্তিম সময় আগত। আগের দিন দুপুরে বাক্শক্তি হারানোর আগে তিনি অন্তর্জলীযাত্রার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ওরা পালা করে শিউলিকে জানায় ক্রমশ তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির কথা, অন্নজল ত্যাগ করার কথা, শয্যা নেবার কথা। সেই এক ধারাবিবরণী, যা তারা সকাল থেকে বার বার জনে জনে বলেছে, আরও বার বার বলে যেতে পারে ক্লান্তিহীন, যতক্ষণ না অন্ধকার নেমে আসে, কাকেরা নিমগাছে ফিরে আসে, যতক্ষণ না শ্মশানযাত্রীর দল ঘাট থেকে ফিরে আসে।
.
অন্তর্জলীযাত্রার আট দিন পরে শাকম্ভরী দেবী বাড়ি ফিরলেন।
সন্ধ্যার আগে জল থেকে তুলে ঘাটের ছাউনিতে শোয়ানোর পর তিনি রামপ্রাণের ডাকে সাড়া দিলেন, চোখ খুললেন, তাঁর ঠোঁট বেয়ে নামল কয়েক ফোঁটা গঙ্গাজল। পরদিন ভোর থেকে তাঁর নাড়ির গতি স্বাভাবিক হলো। তৃতীয় দিনে ক্ষীণ কন্ঠস্বর ফিরল। বিশু ঠাকুর আদিরামের চরণামৃত ও প্রসাদী এলাচদানা এনে দিতে গ্রহণ করলেন। ষষ্ঠ দিনেই বোঝা গেল বৃদ্ধা মৃত্যুর কড়া নাড়া প্রত্যাখ্যান করেছেন। এবারে কঠিন সিদ্ধান্ত নেবার সময় এল।
শুক্রবার শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি শুরু হতে শাকম্ভরী দেবী পাল্কিতে চড়ে আদিরামবাটিতে ফিরলেন। স্পষ্টতই তিনি স্বপ্নের ইঙ্গিত বুঝতে ভুল করেছিলেন। এই একই পাল্কিতে চেপে তিনি বিবাহের পর চাঁদেরডাঙায় পতিগৃহে যান, উনিশ বার মৃত পুত্র প্রসব করার পর ফিরে আসেন এই পাল্কিতেই। ভেতরবাড়ির উঠোনে নিমগাছতলায় যে জ্ঞাতিবউঝিরা তাঁকে ন’দিন আগে বিদায় জানিয়েছিল, তারাই ফের অভ্যর্থনা করতে এল।
‘কইমাছের জান বটে দিদিঠাকরুণের!’ কেউ বলল।
‘বাড়িটা অ্যাদ্দিন আঁধার হয়েছিল, এবার আলো ফুটল!’ বামুনদি বলল।
‘থাক থাক বাছা! সুখী হও! থাক থাক বাছা!’ অ্যান্টনি কাকাতুয়াটা বলল।
শাকম্ভরী দেবীর ঠাঁই হলো ভেতর উঠোনের পশ্চিম প্রান্তে পাঁচিলের গায়ে একটেরে মেটেঘরে। ছোট্ট খড়মাটির কুঁড়েঘরটি বহুকাল আগে বংশের পুরুষ রামাই পণ্ডিত বানিয়েছিলেন গৃহীর জীবন থেকে ক্রমশ মুক্তিলাভের জন্য। ওই ঘরের পরেই আদিরামবাটির সীমানা। তার পরে শুরু হচ্ছে ঝোপজঙ্গল আমবাগান, সেই নদীর ধার পর্যন্ত বিস্তৃত। এত কাল ধরে বিভিন্ন সময়ে আদিরামবাটি আড়ে বহরে বেড়েছে, নতুন কোঠাবাড়ি উঠেছে, কিন্তু উঠোনের প্রান্তে মেটেঘরটি অক্ষত রেখে দেওয়া হয়েছে। দুটি প্রজন্ম ধরে ওটি ব্যবহৃত হয়েছে আঁতুড়ঘর হিসেবে। অন্যান্য সময়ে সোম্বচ্ছরের জ্বালানি কাঠ, রান্নাঘরের ঘুঁটে, বাগানের সরঞ্জাম ও ডেয়ো- ঢাকনা ডাই করা থাকে। দাওয়ায় রাখা থাকে পাল্কিটা, বিগত দুশো বছর ধরে একাধিকবার বেত ও কাঠ বদলানো হলেও একই আছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই গামার তদারকিতে মেটেঘরের আবর্জনা সরিয়ে, গোবরামাটি দিয়ে নিকিয়ে বাসযোগ্য করে তোলা হলো। শুক্রবার শাকম্ভরী দেবীকে নিয়ে পালকি আমবনের ভেতর পায়ে-চলা পথ ধরে খিড়কি দিয়ে ফিরল, সদর দরজা দিয়ে নয়। এভাবেই অন্তর্জলী ফেরত শাকম্ভরী দেবী ঘরেও-না বাইরেও-না, শাস্ত্রবিধি ও মানবিকতার মধ্যবর্তী এক অস্পষ্ট স্থানে বাস করতে শুরু করলেন।
.
মেটেঘরে শেষবার আঁতুড় হয়েছিল বাপ্পার জন্মের সময়ে। পরিবারের বুড়ি দাই এসে প্রসব করান। তেসরা নভেম্বর সোমবার, রাত ১টা ৫৫ মিনিট গতে, বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসারে ১৬ই কার্ত্তিক রবিবার, যেহেতু বাংলা রীতিতে দিন শুরু হয় ভোর থেকে। জন্মের বিধিবদ্ধ পঞ্জীকরণ হয়নি, তবে মশাই কোষ্ঠীবিচার করেছিলেন। জ্যোতিষ গণনা অনুযায়ী তখন যোগী লগ্ন, বৃহস্পতি রাহুর দশায়। চিকিৎসকের গণনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের এগারো দিন আগে। সেজন্য পরিকল্পনামাফিক শিউলিকে কলকাতায়, অন্তত পক্ষে সাত মাইল দূরে কোয়ার্সভিলে হাসপাতালে অত রাতে নিয়ে যাওয়া যায়নি। আচমকা তীব্র প্রসববেদনা শুরু হয় এবং জল ভাঙে। বাধ্য হয়ে রামপ্রাণ বাড়িতেই প্রসবের সিদ্ধান্ত নেন। মেটেঘরে পরিবারের অনেকেই, এমনকি শিউলি নিজেও, প্রথম আলো দেখেছে। দেখিয়েছিলেন যে দাই, তাঁকেই ডেকে আনা হলো খালপারের বস্তি থেকে।
বড়ো হয়ে নিজের জন্মবৃত্তান্ত দিদা সরোজার মুখে বাপ্পা এতবার শুনেছে যে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলে সে আজও স্পষ্ট দেখতে পায় নির্জন মেটেঘরটা, ভেতরবাড়ির উঠোন থেকে ভাঙা টালি-বিছানো পথ গিয়ে উঠেছে দাওয়ায়, ঘরের ভেতর শুকনো কাঠের গন্ধ, বাইরে কার্তিকের হিম ঝরছে নিমগাছের মাথায়, একদল ঘোমটা-পরা নারী দাওয়ার সামনে জটলা করেছে, গামা লণ্ঠন হাতে আমবনের ভেতর সুঁড়িপথ দিয়ে নিয়ে আসছে দাইবুড়িকে। দাইবুড়ির বয়সের গাছপাথর নেই, দেহে তেমন বার্ধক্যের চিহ্নও নেই।
বাপ্পা তাঁর নাম জানার চেষ্টা করেনি। জরায়ুর অন্ধকার থেকে আলোয় আনলেন যিনি, কী তাঁর নাম, তাঁকে দেখতে কেমন ছিল, জানা যায়নি, মি’লেডি। গর্ভে থাকাকালীন গলায় নাভিরজ্জু জড়িয়ে গিয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, অক্সিজেনের অভাবে নবজাত দেহ নীল হয়েছিল। কিন্তু সে বেঁচে ছিল, এবং সেই বার্তা উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করেছিল। সেই ধ্বনি অন্ধকার উঠোনে ছড়িয়ে যেতে দাওয়ায় অপেক্ষমাণারা দরজায় এসে ভেতরে উঁকি দিলেন। গলায় জড়ানো নাভিরজ্জুর পাক খুলে দাই বাঁশের চোঁচ দিয়ে–যেটি তিনি বনপথ দিয়ে আসার সময় খোঁপায় গোঁজা ছোট্ট হাসুলি দিয়ে কেটে নিয়েছিলেন– নাড়ি কেটে গিঁট বেঁধে দিলেন। তারপর চালের বাতায় ঝুলন্ত নতুন ৭০ ওয়াটের বালবের আলোয় তুলে ধরে সবকিছু যথাস্থানে আছে কি না পরীক্ষা করলেন। ডান বাহুতে রেখে বাঁ হাতের কব্জি ঘুরিয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছে বললেন–
‘পুত হয়েছেন গো!’
জিভের নীচে গলন্ত জেলসিমিয়াম ৩০-র গুলির স্বাদের ভেতর আচ্ছন্ন শিউলির কানে পৌঁছল সেই বার্তা। তীক্ষ্ণ কান্নার ধ্বনি শুনতে শুনতে ফের অচৈতন্য হয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে দাই গর্ভফুলটি কচুপাতায় মুড়ে লণ্ঠন ও শাবল হাতে মেটেঘরের পেছনে ঝোপঝাড়ের মধ্যে গেলেন, লোকাচার মেনে শেয়ালের শেষ প্রহর ঘোষণার আগে, ভোরের প্রথম পাখি ডেকে ওঠার আগে মাটিতে দেড় হাত গর্ত খুঁড়ে পুঁতে দিলেন। যদি মৃতজাতক হতো, যেমন কখনো সখনো হয়, তাহলে গর্তটি গভীর হতো কেবল। ঘন শিয়ালকাঁটায় ছাওয়া ওই জায়গাটায় কেউ মাড়ায় না, বুভুক্ষু শ্বাপদেরাও না। শরতকালে শিয়ালকাটায় হলুদ ফুল ফোটে, হলুদ প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়।
ইতিমধ্যে সদ্যোজাতের কান্না থেমেছে, দেহের নীলাভা মিলিয়ে গিয়েছে কিন্তু গলা থেকে বুক পর্যন্ত আড়াআড়ি ফুটে রয়েছে নাভিরজ্জুর কালচে সবুজ দাগ। সেটি দেখে সরোজা ও বামুনদি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। দুজনের একই সঙ্গে মনে পড়ল মাস দুই আগের কথা। শিউলির তখন সাত মাসের গর্ভ। সকালবেলায় সরোজা উঠোনে তুলসীমঞ্চে গোবরছড়া দিচ্ছেন, বামুনদি কুয়ো থেকে জল তুলে পাট শাক ধুচ্ছে। শাকম্ভরী দেবী বাসি কাপড়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বামুনদিকে উদ্দেশ্য করে বললেন
‘পরাণবউকে বলিস ওর মেয়েটা যেন শরীরের যত্নআত্তি করে। ওর পেটে গঙ্গা পণ্ডিত আসছেন।’
শাকম্ভরী সরোজাকে পরাণবউ বলে ডাকতেন, কিন্তু সে কলকাতায় পাগলরামের বাড়িতে যাবার পর সরাসরি কথা বলতেন না। জানা গেল, ভোররাতে উনি গঙ্গারাম চক্রবর্তীকে স্বপ্নে দেখেছেন: দূর গ্রামে রুগি দেখে এসে কুয়োতলায় দাঁড়িয়েছেন ওঁর গঙ্গাকাকা, বগলে ছাতা, হাতে ওষুধের বাক্স, পায়ে পুরু ধুলো লেগে আছে। দিনটা ছিল শুক্লপক্ষের শুভ তৃতীয়া। ব্রাহ্মণের পৈতের মতো বুকে নাভিরজ্জুর ফাসের ওই দাগটি যে গঙ্গারাম চক্রবর্তীর ফিরে আসার প্রত্যক্ষ প্রমাণ এ ব্যাপারে কারোর মনে আর সংশয় রইল না।
চৌঠা নভেম্বর সকালে রামপ্রাণ বসন্তের হাত দিয়ে কোয়ার্সভিল পোস্টাপিস থেকে টেলিগ্রাম পাঠালেন দিনহাটায় জামাতার ঠিকানায়।
BOY BORN LAST NIGHT AT HOME. ALL WELL.
সন্ধ্যার আগেই উত্তর এল —
REACHING TOMORROW. WILL NAME HIM BAPPADITYA.
মি’লেডি, এই ঝটিতি নামকরণের পেছনে এক গূঢ় কারণ রয়েছে। আদিরামবাটির আঁতুড়ে দাইয়ের হাতে শিশুর জন্মের অব্যবহিত পরে, বিশেষ করে পুরুষ শিশুর জন্মের পরে, অকালমৃত্যুর নিয়তি এড়াতে কখনো এক বিচিত্র পালা রচিত হতো, রথীন সেটা শিউলির মুখে শুনেছে। জটিল প্রসবের পর দাই শিশুটিকে ছিনিয়ে নিয়ে ছল করত যেন সেটি তার নিজের। পরিবারের নারীরা দরাদরি করে তাকে কড়ি দিয়ে কিনে নিত। সেইমতো শিশুটির নামকরণ হতো তিনকড়ি, পাঁচকড়ি কিংবা সাতকড়ি। কড়ি গুনে নিয়ে দাই শিশুটিকে মায়ের হাতে ধরিয়ে দিত। এভাবে জন্মসূত্রে পাওয়া নিয়তির অভিশাপ খণ্ডন হলো বলে মনে করা হতো। শিশুটি আমৃত্যু তার নামের মধ্যে বয়ে নিয়ে চলত সূতিকাগৃহের পালাকাহিনি।
মি’লেডি, মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে তেমন কিছু হতো না। তবে যাতে মৃত্যু না কুনজর দেয় সেজন্য তাদের কুৎসিত নাম দেওয়া হতো, যেমন–খেঁদি, পুঁটি, ঢেঁপি ইত্যাদি, অর্থাৎ কী না খুঁতযুক্ত। ছেলেদের ক্ষেত্রেও হেগো, গুয়ে, পচা যাতে মৃত্যু এসে না ছোঁয়। এমনকি ভূতো, যা মৃত্যুর অতীত।
শ্বশুরবাড়ির কেউ মৃত্যুকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ নাকি মধ্যমা, মি’লেডি? ― দেখাতে পারার আগেই রথীন্দ্রনাথ পুত্রের নামকরণ করল। রাজস্থানের রাজপুত্র বাপ্পাদিত্য অবনীন্দ্রনাথের রাজকাহিনিতে অমর হয়েছেন। পাঁচমাস পরে অন্নপ্রাশনের পর মশাইয়ের লেখা ঠিকুজিতে এই নামটিই বহাল হলো।
