সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ২.৯
২.৯
পশ্চিমের মেটেঘরে এতবার আঁতুড় হয়েছে, ঘরটাকে যেন দিবারাত্র ঘিরে থাকে এক অতীন্দ্রিয় আলো। উঠোনের প্রান্তে ভেতরবাড়ির পাঁচিলের গায়ে মনে অন্য এক জগত, বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই অথচ যেন শত আলোকবর্ষ দূরে। দাওয়ার একপাশে সাবেকি পালকির কুঠরিটার ভেতরে বছরে দুবার গঙ্গার মেয়ে ধুলো বাচ্চা বিয়োয়। ছানাগুলো চোখ ফোটার পর প্রথম আলো দেখে, যেমন দেখেছে এই বাড়ির একাধিক প্রজন্ম: নিমের ডাল বেয়ে নামা পাতলা ঝিরিঝিরি আলো, পেছনে আমের বনে গাঢ় সবুজ রসের মতো আলো, সেই আলোয় বাখারির গরাদ দেওয়া গবাক্ষ, মেটে দেয়ালে গোবরমাটি লেপা হাতের ছোপ, গোবরাটের ছাঁদ, চালের বাতার বুনোট, দ্যাবা পৃথিবীর প্রথম ভৌত রূপ। মেটেঘরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য জন্মের অনুষঙ্গ শাকম্ভরী দেবী ঘাট থেকে ফিরে আসার পর বদলে গেল। ঘরটা জড়িয়ে গেল মৃত্যুর সঙ্গে, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষার সঙ্গে। তবু পাল্কির কুঠুরিতে ধুলোর বাচ্চা বিয়োনো অব্যাহত ছিল। তিন-চারটি ছানা, চোখ ফুটলে ওরা গুটিসুটি মেরে ঘুমোয় দাওয়ার কোণে খোঁড়া উনুনের খোঁদলে। আঁতুড়ের কালে গরম জল আর সেঁকের জন্য উনুনটা ব্যবহার হতো।
ত্রিবেণীতে গঙ্গা মুক্তবেণি হয়ে সাতগাঁর দুই পাশ দিয়ে বইছে। শীতের সকালে দুদিক থেকে কুয়াশা উঠে এসে জনপদটিকে মশারির মতো ঢেকে দেয়। বেলা আটটা-নটা পর্যন্ত চলে, দশ হাত দূরেও কিছু দেখা যায় না। কিছুকাল আগেই দাদুর কোলে চড়ে বাপ্পার আদিরামবাটিতে ঘোরার কাল শেষ হয়েছে। একা একা হাঁটতে শিখেছে। কুয়াশাঢাকা উঠোনে ঝুপসি নিমগাছটার নীচ দিয়ে সে হেঁটে চলেছে একটি মেয়ের ফ্রকের হেম ধরে। মেয়েটির আবলুশ-কালো হাতে ধরা গোলাপী জীবন্ত মাংসপিন্ড, যাকে বাপ্পা শুঁয়োপোকা বলে ডাকে। শিশির-ভেজা উঠোনে ইটের ওপর অসংখ্য পায়ের ছাপ, এদিকে সেদিক চলে গিয়েছে তার মধ্যে চেনা যায় দিদার পা, লম্বা লক্ষ্মীর আলপনার মতো, বামুনদির পা, বেঁটে মোটা, ধুলোর পা ছোটো গোলাকার, গামার পা কাদা-লাগা, ডান পায়ের ছাপে বুড়ো আঙুলটা নেই। তারই মাঝে টাটকা ছাপ পড়ছে দুটি পা বড়ো, দুটি পা ক্ষুদে। ওরা হেঁটে এসে মেটেঘরের দাওয়ায় ওঠে।
উনুনের ধারে দেয়ালে কুলুঙ্গি, তাতে জং-ধরা টিনের লম্ফ আর দেশলাই, বাক্সের গায়ে লাল হলুদ হরতন চিড়েতন। গলায় দড়ি-বাঁধা নীল কেরোসিনের শিশি ঝুলছে। মাটির দেয়াল স্থানে স্থানে খসে গিয়ে ভেতরে পাটকাঠির বেড়া বেরিয়ে পড়েছে। মেয়েটি উবু হয়ে বসে ঘুমন্ত শুঁয়োপোকাকে উরুর ওপর রাখলো, নারকেলের শুকনো বালদো ভেঙে উনুনে গুঁজে দিয়ে জ্বাললো। নারকেলপাতার ধোঁয়া কুয়াশায় মিশছে, নীলাভ আগুনের শিখা দুলছে, দুহাতের তালুতে তাপ নিয়ে সে একবার শুঁয়োপোকার আরেকবার বাপ্পার উন্মুক্ত হাতে পায়ে দিচ্ছে। সেই ওম নিতে নিতে ধোঁয়ার মিষ্টির গন্ধের ভেতর ওর গায়ে ঘেঁষে এসে বাপ্পা দেখছে ঘন কালো হাতটা শুঁয়োপোকার ত্বকের ওপর ছোঁয়াতেই সেখানটা ফ্যাকাসে গোলাপি থেকে লাল হয়ে উঠছে। ঘুমের রেশমগুটির ভেতর নড়ে উঠছে শুঁয়োপোকা, হাত পা নড়ছে, চোখ মেলছে। ইতিমধ্যে ধোঁয়াশার লতানে কুণ্ডলী ফুঁড়ে রোদ আসছে নিমের জানলা দিয়ে। আরেকটা নতুন দিন শুরু হচ্ছে। দেয়ালের ফাটলে পাটকাঠির ফাঁকে আরশোলাগুলো জেগে উঠছে ধোঁয়ায়, বাইরে বেরিয়ে এসে ফরফর করে উড়ছে। এদিকে কোত্থেকে ধুলো এসে জুটেছে, শিকারের লোভে ওৎ পেতে রয়েছে।
কাল ঠিক ধুলোর গুয়ে আরশোলার ডানা দেখতে পাবে বাপ্পা, আর ওর মনে পড়বে আজকের এই সকালটার কথা। মনে হবে যেন কত যুগ আগে, বিগত কোনো জন্মের সকাল। কিছুকাল আগে সে নিজে শুঁয়োপোকার এই অসহায় কালটা ছেড়ে এসেছে। শুঁয়োপোকার মাথাটা টমেটোর মতো নরম আর সারা গায়ে সূক্ষ্ম রোম, সে সারাদিন ঘুমোয়, শামুকের মতো ঠোঁট দিয়ে তরল খাদ্য শুষে নেয় আর দেহের বিভিন্ন ফুটো দিয়ে বর্জ্য ত্যাগ করে, সে ঘুমের মধ্যে দেয়ালা করে, অন্ধ বেড়ালছানার গলায় কাদে, হাসে, প্রেতেদের সঙ্গে কথা বলে। অপদেবতাদের হাওয়া যাতে না লাগে তাই সন্ধ্যার আগে তুলসীতলায় প্রদীপ দেবার সময় শাঁখ বাজানোর সময় তাকে খোলা আকাশের নীচে বের করা হয় না, তার হাতে সারাক্ষণ পরিয়ে রাখা হয় লোহার বালা, কপালে কাজলের টিপ, যে কাজল তৈরি করে বাপ্পার দিদা, প্রদীপের শিখার ওপর ফনিমনসার পাতায় ভুষোকালি তুলে ঘি মাখিয়ে, আর নরম সুতির কাঁথায় ফোড় তুলে বোনে লাল নীল হলুদ মাছ গাছ পাখি, আর বেতের দোলনায় দড়ি লাগিয়ে টেনে টেনে দোল দেয়, শুঁয়োপোকার মাথার নীচে গুঁজে দেয় সরষেদানা-ভরা বালিশ, ওকে অনাবৃত উরুর ওপর রেখে গায়ে ডলে দেয় মেথি পোড়ানো তিলের তেল, আর ঠিক যেভাবে পোটোদাদু কাদার দুর্গাঠাকুর গড়ে, সেভাবেই দুই আঙুল দিয়ে তার চোখ টানা টানা আর নাক চিবুক সরু টিকালো করে তোলে।
টোকো দুধ আর জনসন বেবি পাউডারের গন্ধে ম’ম জীবন্ত মাংসপিন্ড ঘিরে বড়োদের আদিখ্যেতায় বাপ্পার গা-বমি দেয়। শুধু শীত সকালে মেটেঘরের দাওয়ায় নারকেলপাতার আগুনে তাপ নেবার সময়টা ওকে টানে। কালো রঙের চুপচাপ মেয়েটা যখন হাতের চেটোয় আগুনের তাপ নিয়ে চেপে ধরে শুঁয়োপোকার ফর্সা ত্বকে, বাপ্পা দেখতে চায় ওর হাতের কালো রঙ চুঁইয়ে ছুপিয়ে যায় কি না।
মেয়েটার নাম মান্দাসী।
.
অম্বুবাচির দিন মান্দাসীকে যখন কলার ভেলা থেকে নামিয়ে বাড়িতে তুলে কুয়োতলার ধারে এনে শোয়ানো হলো, গোটা পাড়া ভেঙে পড়ল উঠোনে। তখনও প্রায় অচৈতন্য মেয়েটার কঙ্কালসার দেহ, কাঠকয়লার মতো ত্বক, সরু মুখে অতিকায় দুটো চোখ আর মাটিমাখা ঘন চুলের রাশি দেখে মনে হলো ওর কুমারী দেহে যৌবন আসছে মরুভূমির পলকা বর্ষার মতো। ওর পরনে ছিল একটা শেমিজ, ওর দেহের অনুপাতে কয়েক সাইজ বড়ো, যার রঙ কোনোকালে হয়তো নীল ছিল। ডান পায়ে একটি পেতলের মকরমুখী মল ছাড়া গায়ে আর কিছু ছিল না।
উঠোনে ভিড় দেখে অ্যান্টনি ডেকে চলেছিল–‘কে এল দ্যাখ! কে এল দ্যাখ!’
রামপ্রাণ চেম্বার ছেড়ে এসে ওর দেহের অনাবৃত অংশে কোথাও সাপে কাটার চিহ্ন খুঁজে পেলেন না। এরপর ওকে কুয়োতলার পেছনে ছাড়া ঘরে নিয়ে গিয়ে সরোজা, বামুনদি আর ঠিকে ঝি নন্দর-মা মিলে ওর শেমিজ খোলার চেষ্টা করতে যেতেই বিশাল দুটো চোখ বিস্ফারিত করে ঠোঁট টিপে জান্তব শব্দ করতে লাগল মেয়েটা। শেষকালে ওকে মাটিতে শুইয়ে বামুনদি হাঁটু চেপে ধরল, নন্দর-মা কাঁধ চেপে ধরল, সরোজা শেমিজটা টেনে তুলে খুলে দিলেন। ওর কৃষ্ণবর্ণ তলপেটে থেকে দুই পায়ের ফাঁকে ঘন কেশদাম, স্তনে লালচে বেগুনি বৃন্তদুটো যেন কোনো আদিবাসী টোটেমের চোখের মতো। কিন্তু সারা দেহে কোথাও কোনো ক্ষতচিহ্ন নেই। এরপর নন্দর-মা সাঁড়াশির মতো আঙুলে খপ করে ওর চোয়াল চেপে ধরতেই সে মুখ খুলল, দেখা গেল জিভটা স্বস্থানেই আছে। সেই ফাঁকে ওর লজ্জাচিহ্ন ঢেকে পরাণ ডাক্তারকে ছাড়াঘরে ডেকে আনা হলো। তিনি আরেকবার খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে বললেন
‘বুকে শ্লেষ্মা জমেছে, এছাড়া চোখে জিভে কৃমির লক্ষ্মণ স্পষ্ট। দুটোই জলে থেকে এসেছে। আর কোনো সমস্যা তো দেখছি না। হয়তো সাপে কেটেছিল, কিন্তু যেভাবেই হোক সেই দাগ মিলিয়ে গিয়েছে।
বেশিরভাগ সাপ বিষধর নয়, তবু সাপে কাটলে মানুষ তীব্র আতঙ্কে সংজ্ঞা হারায়। অর্ধাহার অপুষ্টিতে ওঝা ডেকে ঝাড়ফুঁকের পরেও সংজ্ঞা ফেরে না, কিংবা অল্প বিষক্রিয়ায় অচেতন হয়ে পড়ে। তখন মরে গিয়েছে ধরে নিয়ে লৌকিক রীতি মেনে দেহ সৎকার না করে কলার ভেলায় চাপিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। প্রচলিত লোকবিশ্বাস, লোককথার লখিন্দরের মতো দেবতার কৃপায় প্রাণ ফিরে পেয়ে ফিরে আসবে। কেউ কেউ যে ফিরেও আসে না এমনটা নয়।
এক্ষেত্রে মনে হলো বিষক্রিয়ায় মেয়েটা স্মৃতিভ্রষ্ট হয়েছে, কিংবা বাক্শক্তি হারিয়েছে। অথবা দুটোই ঘটেছে একসঙ্গে। বার বার অনেক ভাবে চেষ্টা করেও মেয়েটার গলা থেকে একটিও স্বর বের করা গেল না। কিন্তু বামুনদি এক বাটি গরম দুধ এনে দিতে এক চুমুকে পান করল সে।
‘যতদিন না ও নিজের গাঁয়ের নাম বলতে পারে, ততদিন এখানেই রাখব,— ‘ সরোজা বলল। ‘আর যদি ওর বাড়ির লোক খুঁজতে খুঁজতে এদিকে আসে তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল।’
‘আর যদি এর কোনোটাই না হয়?’ বামুনদি সন্দেহের সুরে বলল।
‘তাহলে ও এই বাড়িতেই থাকবে।’
সরোজার এই সিদ্ধান্ত কানে যেতে শাকম্ভরী দেবী থেকে শুরু করে বিশুঠাকুর সকলে হাঁ হাঁ করে উঠল। কোথাকার কোন অজাত কুজাতের মেয়ে তার ঠিকঠিকানা নেই, সে কী না এই ঠাকুর-দেবতার ভিটেয় থাকবে? এ কতো বড়ো অনাচার! তাঁরা কুপিত হবেন না?
‘ঠাকুর-দেবতার ভিটেয় ঠাঁই না পেলে কোথায় পাবে শুনি?’ সরোজা যুক্তি শানালো। ‘জাতধম্মো যাই হোক, ও তো পাপহারিণী গঙ্গার জলে ভেসে এসেছে, নতুন জীবন পেয়েছে।’
সবার মনে সন্দেহের কাঁটা খচখচ করতে লাগল। মেয়েটার শরীরে যে কোথাও সাপে কাটার চিহ্ন নেই শুধু তাই নয়, সেদিন ঘাটে সরোজা ছাড়া দ্বিতীয় কেউ ছিল না। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়েছিল। গামাকে দিয়ে লোকজন ডাকিয়ে আনার পর কলার ভেলাটিও আর দেখতে পাওয়া যায়নি। ভেসে গিয়েছিল সেটি। কিন্তু এইসব খুঁটিনাটি নিয়ে সরোজাকে জেরা করার ধক কারোর ছিল না। তার আরেকটি কারণ মেয়েটিকে বাড়িতে রাখার ব্যাপারে পরাণ ডাক্তারের সমর্থন ছিল। যে মানুষটি প্রতিবাদ করতে পারতেন, প্রয়োজনে পরাণের চোখে চোখ রেখে ঝগড়া করতে পারতেন, সেই শাকম্ভরী দেবী অন্তর্জলীযাত্রা থেকে ফিরে এসে পূর্বের ছায়াবৎ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি কেবল মাথা নেড়ে হাহুতাশ করতে লাগলেন, মনে করাতে লাগলেন সেই দিনটির কথা, যেদিন সরোজা কলকাতায় পাগলরামকাকার বাড়িতে গিয়েছিল।
আর এইসব যাবতীয় হতাশ্বাস ফিসফিসানি ছিছিক্কারে কর্ণপাত না করে সরোজা বামুনদির সাহায্য নিয়ে কুয়ো থেকে ঘড়া ঘড়া জল তুলিয়ে কার্বোলিক সাবানে ধুঁধুঁলের ছোবড়া ঘষে মেয়েটার গা থেকে এতদিনের জমা ময়লা কাদা তুলল। আর তখনই দেখা গেল ওর উরুর পেছন দিকে ডান পাছার ভাঁজের ঠিক তিন আঙুল নীচে একটা ত্রিভূজাকার দাগ, যা ঠিক জরুলও নয় আবার উল্কিও নয়।
