Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৩.৫

৩.৫

খুব ছোটোবেলায় সকালে মায়ের বুড়িপিসিমাকে দর্শন দিয়ে দাদুর কোলে চেপে মন্দির পরিক্রমার সময় দেয়ালে প্যানেলে খোদাই নদীর খাতবদল, শেকল বাঁধা ক্রীতদাসের সারি, দূরবীন চোখে ফিরিঙ্গি সাহেব, বাদাবনের গন্ডার ও অন্যান্য দৃশ্য বাপ্পার স্মৃতিতে আঁকা হয়ে ছিল। পরে তিতলি বড়ো হতে বিশুকা যখন ওদের দুজনকে নিয়ে মন্দিরে যেত, তর্জনি তুলে প্যানেলগুলো দেখিয়ে তাদের কাহিনি ব্যাখ্যা করত, এক বিচিত্র দেজা ভ্যুর মতো অনুভূতি হতো বাপ্পার। মনে হতো এসবই সে চাক্ষুষ করেছে বহুকাল আগে তার জন্মেরও আগে, যখন এই পৃথিবী এক অন্যরকম আলোয় ভরেছিল।

মন্দিরের উঁচু চাতালে বাপ্পার কব্জি মুঠোয় ধরে আছে বিশুকা, অন্য হাতের বেড়ে চড়ে বসেছে তিতলি। তিতলির দুই পায়ে লাল হলুদ পশমী খরগোশ, যা হাঁটার জন্য নয়। তার কিছুকাল আগেই সে বারান্দায় বেতের দোলনা ছেড়েছে, কথা বলতে শুরু করেছে। দুধ আর জনসন বেবি পাউডারের গন্ধ-মাখা, ঘুমের- মধ্যে-দেয়ালা-করা সরোম মাংসপিন্ডটা একটু একটু করে একটা ক্ষুদে মানুষ হয়ে উঠেছে। চারপাশের বস্তুজগত আশ্চর্য সজীব ও সজ্ঞান। উঠোনে নিমগাছটার ছায়ার রঙ তেতো, বারান্দায় লোহার রেলিঙগুলো টক, বাতাসে অপদেবতাদের ফিসফাস আর ঘরের কোণে তাদের ছায়া দোলে। ওরা রান্নাঘরের চালে লতিয়ে ওঠা কুমড়োর পাতায় ছিট ছিট দাগ রেখে যায়। সেজন্য বাপ্পার হাতে লোহার বালা পরিয়ে দিয়েছে বামুনদি।

সিজারিয়ানের পর নতুনবউয়ের স্বাস্থ্য আর ফেরেনি। সারাদিন ধরে তিতলির দেখাশোনা করে মান্দাসী, কেবল ভাত খাওয়ানোর সময়টুকু ছাড়া। ওর জাতের ব্যাপারে সন্দেহ থাকায় নতুনবউ নিজেই সেই কাজটা করে।

অম্বুবাচির দিন সরোজা ওকে নদী থেকে তুলে বাড়িতে আনার তিনদিন পরেও কেউ মেয়েটাকে নিতে আসেনি। ওর স্মৃতি কিংবা বাক্‌শক্তি কোনোটাই ফেরেনি। রামপ্রাণ নদীপাড়ের বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা রোগীদের সাহায্যে খবরটা প্রচার করলেন, কিন্তু কোনো ফল হলো না। তখন হেমন্তকে দিয়ে মান্দাসীর ছবি তোলানো হলো, শিবুর ছাপাখানায় দুশোটি পোস্টার ছাপানো হলো। ওকে কবে কোথায় কী অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে, ওর চেহারার বর্ণনা, পায়ে পেতলের মকরমুখী মলের উল্লেখ (নিতম্বের নীচে ত্রিভুজাকার চিহ্নটির কথা লেখা হয়নি) এবং কেউ সন্ধান দিতে পারলে পুরস্কারের ঘোষণা সম্বলিত পোস্টার নিয়ে গামা নৌকা বেয়ে উজানে চলল। পথে গঙ্গার পাড়ে গ্রামে চন্ডীমন্ডপে হাটখোলায় দর্মার দেয়ালে গাছের গায়ে সেঁটে দিতে লাগল। অনেক বছর আগে সরোজা যেবার না জানিয়ে কলকাতায় গেল, রামপ্রাণের নির্দেশে এই নদীপথেই রাধানগর গিয়েছিল গামা। ইতিমধ্যে চরের ওপর অনেকগুলো নতুন গ্রাম গজিয়ে উঠেছে, গামা দেখল, পুরোনো গ্রামগুলোর চেহারাও কিছু কিছু বদলেছে। বদলায়নি কেবল হাটে মন্দিরে শীর্ণ, অনাহার পীড়িত মানুষের জটলা।

কিন্তু পুরস্কারের ঘোষণাতেও ফল হলো না। ইতিমধ্যে সরোজা দর্জি ডাকিরে মেয়েটির জন্য কয়েকটি ফ্রক বানিয়েছেন, ওর একটি নামও দিয়েছেন। কলার মান্দাসে ভেসে এসেছে তাই মান্দাসী। ওই নামে ডাকলে আজকাল সে সাড়াও দেয়। টোলের বাড়িতে ছাত্র পড়াতে বসে সেই ডাক কানে যেতে মশাই ভাগে বিশুর মারফৎ বলে পাঠালেন–মান্দাসী নামটি ব্যাকরণগতভাবে যেমন অশুদ্ধ ও অর্থহীন, গঙ্গায় উৎসর্গীকৃত অজ্ঞাতকুলশীলকে তুলে এনে বাড়িতে রাখাটাও তেমনই ঘোর অশাস্ত্রীয় কাজ। আশ্রিতটি অতএব অলীক, তার কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই।

স্মৃতি হারালেও যে জিনিসটি মান্দাসী হারায়নি তা হলো খিদে। ও ঠিক কতদিন জলে ছিল সেটা নিরূপণ করা যায়নি, কিন্তু মনে হলো যেন ওই সময়টায় অভুক্ত থাকাটা সুদে আসলে শোধ তুলে নিচ্ছে। পাহাড় পরিমাণ ভাত তরকারি নিমেষে কীভাবে যে ওই কঙ্কালসার দেহের মধ্যে হারিয়ে যায় সে এক রহস্য। এমনকি গামার বিখ্যাত ভোজনক্ষমতাও ওর কাছে নস্যি। অত্যধিক খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বে এই ভয়ে সরোজা যখন বামুনদিকে বিরত হতে ইশারা করে, দেখা যায় মান্দাসী চিন্তামণির জন্য ভিজানো ছোলা চুরি করছে, এমনকি ছাঁচতলার ধারে দেয়ালে কুলুঙ্গিতে রাখা তেঁতুলের গোলাও। যা কিছু মানুষের ভোজ্য সেসব ওর নাগাল থেকে সরিয়ে রাখার পর একদিন দুপুরে বামুনদি দেখল উঠোনে ইটের ফাঁকে আমরুল পাতা খুঁটে তুলে চিবোচ্ছে মান্দাসী। এইসব খাদ্য অখাদ্যের পুষ্টিগুণে এই বাড়িতে আসার সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই ওর চামড়ায় অনুজ্জ্বল মাটি-মাটি ভাবটা চলে গেল, চোখে আলো ফিরল। সরোজা মান্দাসীকে দিয়ে ফাইফরমাশ খাটাতে লাগলেন, বিশেষ করে তিতলিকে প্রতিপালনের নানান ছোটোখাটো কাজ অয়েলক্লথ ধোয়া, কাঁথা বালিশ রোদে দেওয়া, মালিশের তেল গরম করা, কাজলের ভূষোকালি তোলার জন্য বাগান থেকে ফনিমনসার পাতা তুলে আনা, নারকেল বালদোর আগুন করে হাতে পায়ে গরম সেঁক দেওয়া, এইসব। একদিন ভরদুপুরে সরোজা দেখলেন ভাঁড়ারের লাগোয়া ঢাকা বারান্দায় ঘুমন্ত শিশুর দোলনা দুলছে, মান্দাসী দেয়ালে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে অঘোরে ঘুমোচ্ছে, ওর অতিকায় চোখদুটোর পাতা আধখোলা, এদিকে যান্ত্রিক হাত নেড়ে দড়িতে টান দিয়ে চলেছে। আরেকদিন সন্ধার আগে গাঢ় আলোআঁধারিতে দেখেন সে ঘুমন্ত তিতলির মাথার ওপর শূন্যে ক্ষিপ্র হাত চালিয়ে কী যেন খামচে খামচে মুঠিতে ধরছে। কাছে গিয়ে মুঠি খুলিয়ে দেখলেন রক্ত। মশা মারছিল।

মান্দাসী ঠিক কবে থেকে একটু একটু কথা বলতে শুরু করল কেউ খেয়াল করেনি। ওর উচ্চারণে দোখনো টান ছিল, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ওর পেট থেকে অতীতের কথা বের করা গেল না। বামুনদির মন থেকে সন্দেহের কাটা যায়নি, হঠাৎ হঠাৎ সে মান্দাসীকে বিভিন্ন মুসলমানী নাম ধরে ডাকে, মান্দাসী আনমনে সাড়া দিয়ে ফেলে কি না পরখ করে। ওর চলাফেরা কাজের ভঙ্গি খুঁটিয়ে নজর করে। বাক্শক্তি ফিরলেও কথা বিশেষ বলে না মান্দাসী। মনে হয় যেন ঘুমের মধ্যে চলেফিরে বেড়াচ্ছে, বড়ো বড়ো চোখের পাতা পুরোপুরি বন্ধ হয় না কখনো।

দুটি জিনিসে ওর বিশেষ পারদর্শিতা দেখা গেল – আগুন আর কাদা। বর্ষার দিনে বামুনদি কিছুতেই যখন আধভেজা কয়লায় উনুন জ্বালাতে পারে না, মান্দাসীকে ডাক দেয়। দুটো পাটকাঠি আর একটা ঘুঁটের টুকরো দিয়ে চোখের নিমেষে ভিজে কয়লাতেও গনগনে আঁচ তুলে দিতে পারে সে। বাগানে নারকেলের বালদো থেকে কাঠি বের করে ঝাঁটা বাঁধে, সকালে উঠোনে ঝরা নিমপাতা ঝাঁট দিয়ে ফেলে। তারপর গঙ্গামাটি দিয়ে মেটেঘরের সিঁড়ি দাওয়ার উনুন ও দেয়ালের বাইরের দিকগুলো লেপে দেয়; শাকম্ভরী দেবী ওকে কোনোমতেই ওঁর ঘরের ভেতরে ঢুকতে দেন না। বেলা বাড়লে কখনো কাদামাটির তাল ময়দার মতো মেখে বাপ্পা আর তিতলির জন্য ছোটো ছোটো পুতুল গড়ে। সেই পুতুলদের কাঠির মতো সোজা হাত পা, মুখে কাদার গুলি টিপে বসানো চোখ, ঝাঁটার কাঁটা দিয়ে ছেঁড়া ঠোঁট অদ্ভুত জীবন্ত আর ভয়ঙ্করদর্শন। সেই মূর্তিগুলোকে এতটাই নিঃসঙ্গ দেখায়— বুঝি মহাসাগরের মাঝে নির্জন দ্বীপবাসীর দল, যাদের গল্প বাপ্পাকে বই থেকে পড়ে শোনায় শিউলি যে তাদের জন্য আবার মাটির হাঁস পাখি ঘোড়া বানিয়ে দেয় মান্দাসী। তারপর তাদের উঠোনে রোদে শুকিয়ে নিয়ে মেটেঘরের বাইরে উনুনে পুড়িয়ে লাল করে তোলে। সদ্য পোড়া মাটিতে দগদগে মাংসের লাল রঙ মন্দিরে লাইকেন-ছাওয়া প্যানেলের রঙের থেকে আলাদা। তাছাড়া মান্দাসীর গড়া মূর্তিগুলো মুক্ত, ত্রিমাত্রিক।

একদিন রান্নাঘরের পাট সেরে কুয়োয় জল নিতে এসে নিমগাছের নীচে পোড়ামাটির ছোটো ছোটো ঘোড়া দেখল বামুনদি। একটি ঘোড়া তুলে নিয়ে বাঁ হাতের তালুতে রেখে উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করল

‘হায় ভগবান! আমি ঠিক জানতুম!’

‘কী হয়েছে? কী হলো? বলি হলো টা কী?’ সকলে সমস্বরে বলল।

‘আমি ঠিক জানতুম গো! আমার সন্দে ভুল ছেল না!’ বলে বামুনদি দুলে দুলে ডান হাতে কপাল চাপড়াতে লাগল।

‘কী জানতিস সেটা আগে বলবে তো!’ সরোজা ধমক দিলেন।

বামুনদি মান্দাসীর দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল—‘এই মেয়েটা নেড়ি!’

মি’লেডি,— ‘নেড়ি’ বলতে বামুনদি সেদিন ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিল সেটা স্পষ্ট নয়। নেড়ি অর্থে মুসলমান, বৌদ্ধ কিংবা নীচু জাতের হিন্দু এই তিনটির যেকোনো একটি হতে পারে। দাক্ষিণাত্য থেকে সেন বংশীয়রা যখন বাংলায় এসে পাল রাজাদের হঠিয়ে শাসনক্ষমতা দখল করল, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর অত্যাচার, পীড়ন এমনকি হত্যাও শুরু হলো। বৌদ্ধরা মাথা মুন্ডন করত বলে তাদের বলা হতো নেড়ানেড়ির দল। এইসময়ে তারা আত্মগোপন করে, বিভিন্ন গুপ্ত ধর্ম ও তন্ত্রের আশ্রয় নেয়। বখতিয়ার খিলজি বাংলায় এসে সেনদের উৎপাটিত করার পর এই গোষ্ঠীর অনেকেই, এবং সেই সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদে নিপীড়িত অসংখ্য হিন্দুও, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

বেশ কিছুদিন ধরেই মান্দাসীর ছোটোখাটো আচার ব্যবহারে বামুনদির সন্দেহটা দানা বেঁধেছিল। মান্দাসীকে মশলা বেটে কলাপাতায় মুড়ে আনতে বললে পাতার নীচের দিকটা দিয়ে মোড়ে, ভাতের শানকিতে ব্যঞ্জন বেড়ে দিলে আগে অম্বল দিয়ে খায়, শেষে তেতো খায়। ওই পোড়ামাটির ঘোড়া দেখে সন্দেহের আর কিছু বাকি রইল না। ধর্মতলায় বটের নীচে ধর্মঠাকুরের থানে এইরকম মানতের ঘোড়া দেখা যায়, সকলেই জানে।

শোরগোল তুলে বাড়ি মাথায় করার পর সরোজার গম্ভীর মুখচ্ছবি দেখে বামুনদি আর কথা বাড়ানোর সাহস করল না, আপন মনে গজগজ করতে করতে পোড়া কয়লা কাদায় মেখে উঠোনের একধারে উবু হয়ে গুল দিতে বসল।

মুখ খুলল বিশু।—- ‘যে বাড়িতে ঠাকুরদেবতার বাস, সেখানে কী করে তুমি অমন জেদ ধরে মেয়েটাকে রেখেছ গো বৌদিদিমণি? তেনাদের বুঝি কোনো ইচ্ছে অনিচ্ছে নেই?’

‘কাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছের কথা বলছ বিশুঠাকুরপো?’ সরোজা বিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন— ‘মা গঙ্গা যদি ইচ্ছা করে থাকেন এ বাড়ির মেয়েকে তাঁর কোলে টেনে নেবেন, তাহলে তিনি এও ইচ্ছা করেছেন তাঁর কোল থেকে আরেকটা মেয়ে এখানে আশ্রয় পাবে!’

আদিরামবাটির সকল বয়স্কর হৃদয়ের গুপ্তকুঠুরিতে স্ফোটকের আকারের নৈঃশব্দ্য বুঝি নখে ফাটালেন সরোজা। বিশু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত, তারপর মাথা নীচু করে হনহনিয়ে হেঁটে ঢুকে গেল ঠাকুরবাড়িতে, তার পোষ্য উনত্রিশ দেবদেবীর ঘরে।

পরদিন সকালে শাকম্ভরী দেবী রামপ্রাণকে বললেন

‘আমার কাশী যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দে, পরাণ। ঢের বাঁচা হলো!’

সেদিনের পর আর মান্দাসী ঘোড়া গড়েনি। উনুন ধরাতে কিংবা জল টানতে ওর রান্নাঘরে পা রাখা বন্ধ হলো। সে যাত্রায় শাকম্ভরী দেবীর কাশী যাওয়া হলো না।

মান্দাসীর গড়া পোড়া মাটির ঘোড়া চার পা ছড়িয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু চলতে পারে না। চিন্তামণি বাপ্পাকে আর তিতলিকে পিঠে চাপিয়ে নিয়ে বাগানের বড়ো কুয়োটার চারিধারে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে চলে। রামপ্রাণ এক্কাগাড়িতে চেপে বাইরে রুগি দেখতে যাওয়া বন্ধ করার পর গাড়িটার ছাউনি কেদারা খুলে তক্তা বসিয়ে মালের গাড়ি হয়েছে। গামা সোম্বচ্ছরের জ্বালানি কাঠ আর গঙ্গামাটি চাপিয়ে আনে, দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের পর চালচিত্রের কাঠামো টেনে পুজোদালানে আনে।

সেই সময় বাপ্পার স্মৃতিতে এক সুবিশাল রহস্যময় পৃথিবীর নাম আদিরামবাটি। শীতের কুয়াশাঢাকা সকালে মান্দাসীর ফ্রক খামচে ধরে উঠোনের পশ্চিম কোণে মেটেঘরের দিকে হেঁটে যাওয়া যেন সেই পৃথিবীর সীমান্তপ্রদেশে যাত্রা। মেটেঘরের পেছনেই শুরু হচ্ছে সবুজ ছায়াঘেরা আমের বন। তার নীচে দিয়ে সিঁথির মতো পথ চলে গিয়েছে অজানার দিকে। কালকাসুন্দে আশশ্যাওড়ার ঝোপের একপাশে উঁচুনীচু শিয়ালকাঁটার বন, হলুদ ফুলের চারপাশে হলুদ প্রজাপতির ওড়াউড়ি। বড়ো হয়ে বাপ্পা জানতে পারবে ওইখানে পোঁতা আছে আদিরামবাটির কয়েক প্রজন্মের গর্ভফুল, এমনকি ওর নিজেরও গর্ভফুল। ওখানে শুয়ে আছে কয়েক প্রজন্মের মৃতজাতক— হয়তো প্রজন্মান্তরে জন্মাতে চাওয়া, জন্মাতে না-পারা, জরায়ুর ভেতর নাড়ির ফাঁস লেগে মৃত যে সে-ও।

.

রথীনের পদোন্নতি হয়েছে। আলিপুরদুয়ারে বড়ো কোয়ার্টার পেয়েছে, শিউলিদের সেখানে নিয়ে গিয়েছে। তিতলি হাঁটতে শেখার পর বাপ্পা যখন মায়ের সঙ্গে আলিপুরদুয়ার থেকে সাতগাঁয় আসে, ভাইবোন হাত ধরাধরি করে বড়োদের নজর এড়িয়ে আদিরামবাটির অচেনা জগত চিনতে শুরু করে। যেন দুই অভিযাত্রী, ইটবিছানো উঠোনে কুটিল সমুদ্রের ওপর পাড়ি জমিয়েছে। সেখানে বর্ষার পর নিমগাছের ছায়ারেখায় ঝিকিমিকি করে শ্যাওলা, ওষধিবাগানের টানা বাঁশের বেড়ার— যার গায়ে বর্ষার পর কমলা ছত্রাক গজায়, বাঁশের ফাটলে জমা জলে মশার ডিম খেতে আসে শামুক— ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের চুড়ো দেখে দিকনির্ণয় করে এগোলে প্রথমে পড়বে টোলের বাড়ি। প্রশস্ত উঠোনে কাঠের উঁচু পিঁড়িতে বসে মশাই, সামনে ঘাসের পাততাড়ি পেতে একদল টিকিধারী বালক দুলে দুলে একঘেয়ে স্বরে ন্যায়ের সূত্র আবৃত্তি করছে। ওদের পাশ দিয়ে আরও অনেক দূর হেঁটে গিয়ে গোয়ালঘরের চালাটা— যার ভেতরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঝিমোয় চিন্তামণি আর বসন্তমামার হার্লে ডেভিডসন— পেরোলে বাগান, তার মধ্যিখানে পাড়বিহীন বিশাল ইঁদারা। তার মুখে জাল আঁটা, ওপরে কপিকলের ফ্রেমে হেমত্তমামার জোয়ার-ভাটার মিটার। জালের ফাঁক দিয়ে নীচে উঁকি দিলে আরেকটা আকাশ দেখা যায়, আকাশের গায়ে মেঘ, উড়ন্ত পাখি দেখা যায়, জেটপ্লেন চলে যাবার পর রুপোলি রেখা দেখা যায়। ওই পাতালপুরীতে যক্ষ থাকে, বিশুকা বলেছে। দুরু দুরু বুকে বাপ্পা ঝুঁকে পড়ে মুখের দুপাশে দুহাত জড়ো করে চিৎকার করে ডাকে, সে সাড়া দেয়।

বাপ্পা!

বাআআআআ…

শোঁপোকা!

শোঁওওওও…

আতঙ্কে খুশিতে ঝলমল করে তিতলির মুখ। বাপ্পা ওর কনুই খামচে ধরে চোখ পাকিয়ে বলে— ‘গা ছুঁয়ে দিবি কাট কাউকে বলবি না!’

‘দিবি! দিবি!’ তিতলি বলে।

এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানের শেষ গন্তব্য বাগানের প্রান্তে ফার্মেসিবাড়ি। তার বারান্দায় বেঞ্চিতে সারি দিয়ে অপেক্ষমাণ রোগীরা। তাদের মুখাবয়ব ফটকের রাস্তার ধারে পোড়ো বাড়িগুলোর মতো, তাদের জীবনেতিহাস লেখা রয়েছে দাদুর চেম্বারে শেলফে কালো রেক্সিন-বাঁধানো খাতায়। স্বাধীন দুই শিশুকে হাত ধরাধরি করে হেঁটে আসতে দেখে তাদের গাল টিপে আদর করার জন্য কারোর হাত নিশপিশ করে। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি ছাড়াও রয়েছে জাতপাতের ভয়, মুখে কেবল বিচিত্র স্নেহসূচক শব্দ করে ওরা। দুজনে বারান্দা পার হয়ে চেম্বারে সবুজ পর্দা সরিয়ে ঢোকে। রামপ্রাণ একে একে ওদের দুজনকে হাঁটুর ওপর বসিয়ে ছদ্মগম্ভীর মুখে স্টেথোস্কোপ কানে গুঁজে বুক পিঠ পরীক্ষা করেন, ঘন ঘন মাথা নাড়েন। বাপ্পাও হাসি চেপে অপেক্ষা করে কখন দাদু বলবে

‘জিভটা দেখি!’ আর তারপর সবুজ রঙের শিশি খুলে জিভের ওপর নস্যির ডিবেয় টোকা মারার মতো করে ফেলবে চারটি করে গুলি। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার শেষে মশলাদ্বীপের বন্দরে এসে নাবিকেরা গভীর শ্বাস নেয়, বুকে ভরে ওঠে তাজা সুগন্ধী বাতাস, মুখের ভেতরটা শিরশিরে ঠান্ডা আর মিষ্টি প্লাসেবোর স্বাদে ভরে ওঠে।

এমনই আরেকটি গন্তব্য ওষধিবাগানের অন্যদিকে আদিরামের মন্দির আর ঠাকুরবাড়ি। সেখানেও দীর্ঘযাত্রার শেষে এলাচদানা পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে মুখের ভেতরে অমন ঠান্ডা অনুভূতি হয় না, চন্দন আর কর্পূরের গন্ধ পাওয়া যায়। তার আগে অবশ্যই ঠাকুরবাড়ির গ্যালারিতে উনত্রিশ জন দেবীদেবতা প্রত্যেককে জোড় হাত করে প্রণাম করতে হয়। তাঁদের কারোর বিস্ফারিত চোখ, কারোর হাতে বাঁশি, কমণ্ডলু, সাপ, পায়ের নীচে বাঘ, কুমীর, নাভিতে পদ্ম। বিশুকা চেনায়— ‘এই দেখ মা লক্ষ্মী, ইনি হলেন তারা, তাঁর পাশে নারায়ণ, এদিকে দেখ রাধা কৃষ্ণ যুগলে, দেখ জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রা, ওপরে দেখ পার্বতী মহাদেব, বিষ্ণু রয়েছেন, অন্নপূর্ণা, বিশালাক্ষী, বগলা…

আরেকটি বিশেষ আকর্ষণের জায়গা হলো বাগানে পুবদিকের কোণে মাটির পাহাড়, বিশুকা যাকে বলে গিরি গোবর্ধন। প্রতিবছর গ্রীষ্মের শুরুতে সেটি জেগে ওঠে, তারপর ক্রমশ ছোটো হতে হতে দুর্গাপুজোর পরে প্রায় মিলিয়ে যায়।

প্রতি বছর বসন্ত বিষুবের পর হুগলি নদী দিয়ে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের ড্রেজার আসে, ত্রিবেণীর কাছে নদীর খাত থেকে পলিমাটি তুলে পাড়ে জমা করে। সেই পাহাড় পরিমাণ মাটি ডাম্পার ট্রাকে বোঝাই করে ছাড়িগঙ্গার ঝিলে নিয়ে গিয়ে ফেলা হয়। তার আগে সাতগাঁইয়ারা যে-যার মতো সংগ্রহ করে নেয় সোম্বচ্ছরের ব্যবহার্য গঙ্গামাটি। এই সময়ে গামা মালটানা গাড়িতে চিন্তামণিকে জুতে নেয়, তিন- চার দিন ধরে সকাল বিকেল সেই বিশুদ্ধ আর্দ্র পলিমাটি বাগানের ধারে নির্দিষ্ট জায়গায় স্তূপাকারে জমা করে। ঠাকুরের নিত্যপুজো থেকে উনুন নিকোনো, বাসন মাজা, এমনকি শৌচের পর হাতে-মাটিতেও লাগে গঙ্গামাটি। এই মাটি দিয়েই মান্দাসী গড়ে পুতুল হাঁস পাখি ঘোড়া … না, ঘোড়া নয় আর! বর্ষার জল পড়লে মাটির ভেতর কতকালের ঘুমন্ত বীজগুলো জেগে ওঠে, অচেনা সবুজ আগাছায় ছেয়ে আসে গিরিগোবর্ধন। কিন্তু দুর্গাপুজোর সময়ে বাপ্পা যখন সাতগাঁয়ে আসে, ততদিনে পাহাড়টা যেন ভোজবাজিতে মিলিয়ে গিয়েছে। পুজোদালানে তখন দশভুজা মা দুর্গা, তাঁর ছেলেমেয়েরা, তাঁর বাহন সিংহ, আর মহিষাসুর।