সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৪.২
৪.২
বাল্যকালে হামজা নামে দিনেমারডাঙার এক দশাসই কাবুলিকে ঘুষি মেরে জখম করেছিল বাঁটুল গোঁসাই। ভয় ছিল হামজা একদিন ঠিক প্রতিশোধ নিতে আসবে। কিন্তু হামজা আর আসেনি, তার বদলে পাটকলবস্তি থেকে ভেসে এল নানা গুজব। কেউ বলল, বাঁটুলের ঘুষিতে পুরুষত্ব হারিয়ে সে মনের দুঃখে কাবুলে ফিরে গেছে, কেউ আবার বলল হামজা ছিল রাশিয়ান গুপ্তচর, পুলিশের জালে ধরা পড়ে বাঁটুলের বাবা গুঁফো গোঁসাইয়ের সঙ্গে একই জেলকুঠুরিতে বন্দি আছে। এদিকে বাঁটুলের সাতগাঁয়ে নাম হয়ে গেল কাবুলি-খেদা। এবং সেই দিনটির প্রতীক্ষায় প্রতিদিন দেহচর্চা করে করে বছর দুয়েকের মধ্যেই ওর দেহের গঠনে বিচিত্র বিপ্লব ঘটল: উপরিভাগ – অর্থাৎ বুকের ছাতি, কাঁধ ও হাতের বাইসেপ ট্রাইসেপ – আশ্চর্য স্ফীত কঠিন হয়ে উঠল, এদিকে কোমর থেকে পায়ের দিকটা আগের মতোই শীর্ণ রয়ে গেল। এবং ওর চার ফুট সাড়ে সাত ইঞ্চি দেহের উচ্চতা আর এক চুলও বাড়ল না। বাঁটুলকে দেখলে মন হয় বুঝি দেহের নীচের অংশ থেকে সমস্ত মাংস খুবলে নিয়ে ওর বুক কাঁধ ও হাতের পেশি গড়া হয়েছে, এবং সামঞ্জস্যহীন ভাৱে মাধ্যাকর্ষণের টানে আর লম্বা হতে পারছে না।
তার এই আশ্চর্য দেহটি নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না বাঁটুল। প্রথম দিকে পাড়াপড়শিরা বাগানের কলাটা মুলোটা দিয়ে সাহায্য করত ( এলাকায় হামজার যে এত খাতক ছিল কেই বা জানত!), কিন্তু ক্রমশ যখন বোঝা গেল সেই কাবুলি আর আসবে না তারাও মুখ ফিরিয়ে নিল। এই সময়ে ডকবাজারে আনাগোনা শুরু করে বাঁটুল। সেখানে রোজ সকালে ছাড়িগঙ্গার ওপার থেকে হাটুরেরা নৌকায় চাল ডাল আনাজপাতি চাপিয়ে নিয়ে আসে। কখনো সখনও নৌকা থেকে ডাঙায় কারবারিদের দোকানে গুদামে ভারি মোট টানার কাজ করে সে। তাতে যা সামান্য রোজগার হয়, ওর বিপুল খিদে মেটে না। কখনো চাষিরা ফেরার পথে অবিক্রীত শাকসব্জি বাঁটুলকে দিয়ে যায়, ছ্যাকরা গাড়ির কোচোয়ানেরা ঘোড়ার ভিজানো ছোলা দেয়। বাঁটুলও বাজারে বেচাকেনায় সজাগ দৃষ্টি রাখে, কেউ জোচ্চুরি করছে কি না নজর রাখে। একদিন এক চালের ব্যাপারি ফাঁপা বাটখারা দিয়ে খদ্দেরদের ঠকাচ্ছিল, জানাজানি হতে বাঁটুল এসে কুড়ি বস্তা চাল সমেত আস্ত একটা নৌকা টেনে ঘাটের একেবারে ওপরের সিঁড়িতে তুলে দিল। কাবুলি-খেদা বাঁটুল হয়ে উঠল ডকবাজারের পালোয়ান।
কিন্তু খেতাবে কি আর পেট ভরে। বাঁটুলের বিধবা মা একটি ছাগী পুষে তার দুধ বেচে সামান্য কিছু আয় করতেন। কিছু ফিল্মের টুকরো আর প্রোজেক্টারের অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ পুলিশের নজর এড়িয়ে বাড়িতে রয়ে গিয়েছিল। একটি কাঠের বাক্সের গায়ে চারটি চোখ রাখার চোঙ লাগিয়ে, ভেতরে কেরোসিন লন্ঠন রেখে বাঁটুল একটি বায়োস্কোপ বানিয়ে নিল। ডকবাজারে সে একটি করে ফুটো পয়সা নিয়ে খরিদ্দার ব্যাপারিদের ছায়াছবি দেখায়। সেলুলয়েড ফিল্মের কাটা টুকরোয় স্প্রকেটের ছিদ্রে সুতো বেঁধে নিজের রুচি মতো ছবি সাজিয়ে মালা গেঁথে দেন বাঁটুলের মা, বাঁটুল বায়োস্কোপ বাক্সের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেলায় দেখা কথকদের বাচনভঙ্গি নকল করে ছবির ক্রম অনুসারে ইতিহাস, পুরাণ, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিজের কল্পনা মিশিয়ে আউড়ে চলে। দর্শকেরা মূলত ছোটো ছেলেছোকরার দল, তারা বাক্সের খোপে চোখ এঁটে মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে বায়োস্কোপ দেখে। তার আগে একটি ফুটো পয়সা বাঁটুলের হাতে সরু কঞ্চির ডগায় গলিয়ে দিতে হয়, এবং এক পয়সা পরিমাণ ছায়াছবি দেখা হলেই পশ্চাদ্দেশে এসে লাগে সেই কঞ্চির খোঁচা।
বাঁটুলের বায়োস্কোপ থেকে সামান্য দূরে, ডকবাজারের সামনে লাল সুরকির রাস্তায় শালপাতার দোনায় ছাগলের দুধ বেচতেন বাঁটুলের মা। কাঁচা ছাগলের দুধের যৌনবলবর্ধক গুণ সবারই জানা, সারা দিনের বেচাকেনার শেষে ব্যাপারি-মহাজনেরা কেউ কেউ তিন পয়সায় এক দোনা দুধ পান করে কাটুনিডাঙার পথ ধরত। এক শীতের শেষ বিকেলে যখন দোকানে ঝাঁপ পড়ছে, নৌকাগুলো ঘাট থেকে ছেড়ে যাচ্ছে একে একে, চাষিরা ঝড়তি-পড়তি মালে জলের দর হাঁকছে, বাঁটুলের মায়ের ছাগীটি পথে ছড়ানো নিজেরই দুধে ভেজা কাঁচা শালপাতা চিবুচ্ছে, দূরে রাস্তায় দেখা গেল লাল ধুলোর মেঘ। চোখের নিমেষে মেঘটা ধেয়ে এল আর তার আড়ালে শোনা যেতে লাগল পীপ-পীপ ধ্বনি। একটি মোটরগাড়ি ছুটে আসছে। পথের মানুষ সতর্ক হয়ে সরে গেল রাস্তার ধারে। কিন্তু হায়, ছাগীটা ওই সিঁদুরে মেঘ দেখে ভাবল বুঝি চরুয়ারা মাঠ থেকে ফিরছে, আর ঐ ধ্বনিটা তার গত শীতে হারিয়ে যাওয়া মা-হারা ছানাটির ডাক। শূন্যে লাফ দিয়ে উঠে সে ব্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা করে কাতর ডেকে উঠল একবার, আর বাঁটুলের মা তার গলার দড়িটা চেপে ধরার আগেই তীর বেগে ছুটে গেল। পরক্ষণেই ধুপ করে একটা শব্দ, ক্যাচ করে ব্রেক টেপার আওয়াজ, সুরকির ওপর চাকার রবারে ঘষটানি। ধুলো থিতোলে দেখা গেল একটি মাখন-রঙা রোলস রয়েস ফ্যানটম ৩, ধুলোস্নান করে উঠেছে। গাড়ির ভেতর স্টিয়ারিঙে বসে তারিণীচরণ, এছাড়া আরও তিনজন পুরুষ। সকলেরই পরনে খাকি পোশাক, মাথায় সোলা টুপি, দুজনের হাতে পাখি-মারা বন্দুক। গাড়ির সামনে ঘাড় মটকে পড়ে আছে ছাগীটা, মৃত, এক ফোঁটা রক্ত ঝরেনি কিন্তু বাঁট থেকে দুধ চুঁইয়ে পড়ে রাস্তা ভিজে যাচ্ছে।
কলকাতা থেকে চার ইয়ার দোস্ত ছাড়িগঙ্গার শরবনে পাখি শিকারে গিয়েছিল। একটা কাদাখোঁচাও মারতে পারেনি কিন্তু দুই বোতল হুইস্কি খতম করেছে। তাদের তিক্ত নেশাচ্ছন্ন মেজাজ বিগড়ে গেল মৃত ছাগী কোলে নিয়ে বিধবা নারীর বুক চাপড়ে বিলাপ দেখে। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটিকে ঘিরে ভিড় জমে গেল।
‘ছাগীটাকে মেরে বুড়ির পেটের ভাত মারলে গো বাবু!’ জনতা বলল।
তারিণী জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে তিরিশটি টাকা বাড়িয়ে দিতে ওরা আরও টাকা দাবি করল।
‘ওটার গায়ে দশ সের মাংসও হবে না। একটা মরা ছাগীর জন্য ওই তিরিশ টাকা ঢের বেশি!’ তারিণী মাছি তাড়ানোর মতো করে দশ টাকার নোট তিনটি নাড়াতে লাগল।
ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল বাঁটুল, রাগে কাঁধের পেশি ফুলে উঠেছে। কোমরে হাত রেখে তারিণীর চোখে চোখ রেখে বলল—
‘মশকরা করছ নাকি গো সায়েব? তোমার এই তেলের গাড়ি ধাক্কা মারার আগে ছাগীটা মরা ছিল? ওর গায়ে ক’সের মাংস আছে সেই দিয়ে দরদাম হবে না, ও বেঁচে থাকলে আরও কত বছর ধরে কত সের দুধ দিত সেই দিয়ে হিসেব কষতে হবে!’
উত্তপ্ত তর্কাতর্কি শুরু হলো, গাড়ির ভেতর অন্য তিনজন পুরুষও তাতে যোগ দিল। এদিকে মহাজনেরা ছাগিটির দেহের মাংস, চামড়া ও সম্ভাব্য দুধ এবং সন্তানাদির মূল্য ধরে ধরে জটিল হিসেব নিকেশ শুরু করে দিল। ইত্যবসরে তারিণীচরণ স্টিয়ারিঙে বসে গাড়ির ইঞ্জিন চালু করতেই বাঁটুল লাফ দিয়ে পেছনে গিয়ে গাড়ির রিয়ারগার্ড চেপে ধরল, ক্ষুব্ধ জনতাও গাড়ির গায়ে দমাদম মুঠোর আঘাত শুরু করে দিল। তারিণী ভয় পেয়ে গিয়ে অ্যাকসিলারেটারে চাপ দিতে রোলস রয়েসের ইঞ্জিন প্রবল গোঁ গোঁ শব্দে আস্ফালন করতে লাগল, বনবন করে চাকা ঘুরে উঠল, ধুলো উড়ল, কিন্তু গাড়ি এক ইঞ্চিও নড়ল না।
এই ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা থেকে তারিণীচরণকে উদ্ধার করলেন শ্রীশবাবু, আদিরামবাটির ফার্মেসির কম্পাউন্ডার। ‘আরে এ যে আমাদের জামাই বাবাজীবন গো!’ বলে তিনি জনে জনে বোঝাতে লাগলেন। পাগলরাম চক্রবর্তীর জামাই, তার মানে হল গঙ্গারাম চক্রবর্তীর বাড়ির জামাই, অর্থাৎ কিনা গোটা সাতগাঁয়ের জামাই।
যেকোনো জটলার মেজাজমর্জি পদ্মপাতায় শিশিরবিন্দুর মতোই। তাছাড়া বাঁটুলের মনে পড়ল ওর বাবার অবর্তমানে গঙ্গারাম চক্রবর্তীর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার কথা। ওই তিরিশটি টাকা নিয়েই তারিণীচরণকে ছেড়ে দেওয়া হলো। এই ঘটনার বিবরণ রাধারাণীর কানে পৌঁছতে উনি লোক মারফৎ বাঁটুলের বিধবা মায়ের হাতে পাঠালেন তিনশত টাকা, একটি দুধেল গাইয়ের দাম।
তবে এই অযাচিত সৌভাগ্যকেও ছাপিয়ে গেল বাঁটুলের খ্যাতি। একা খালি হাতে চলন্ত মোটরগাড়ি ধরে রাখার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ চন্ডীমন্ডপের রোয়াকে দাবা-পাশার আসরে, কাটুনিডাঙার ঘাটে কান-ফেরতা হতে হতে ফিরিঙ্গিডাঙাতেও ছড়িয়ে পড়ল, তাতে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হলো। ধর্মতলায় গাঁজা-সিদ্ধির ঠেকে কেউ দাবী করল তারিণীর এক ইয়ারদোস্ত নাকি বচসার মাঝে বাঁটুলের দিকে বন্দুক তাক করে গুলিও ছুঁড়েছিল, সেটি ওর ইস্পাতকঠিন বুকের ছাতিতে লেগে ছিটকে যায়। আরেকজন পালটা দাবি করল, গুলি বুকে এসে লাগার আগেই বাঁটুল ফুঁ দিয়ে গুলির মুখ ঘুরিয়ে দেয়, এবং সেটি গাড়ির বনেট ফুটো করে দেয়। সত্যি যাই হোক, বাঁটুলের মতো শক্তিধর যে গোটা মৎস্যভূমিতে এর আগে কখনো জন্মায়নি, এটা সকলে এক বাক্যে মেনে নিল। কাবুলি-খেদা বাঁটুল থেকে ওর নাম হয়ে গেল মোটর-ধরা বাঁটুল। এবং, বাঁটুল দি গ্রেট।
.
হেমন্ত যখন বর্গিব্যাটারির ব্যায়ামাগারে ভর্তি হতে গেল, ততদিনে বাঁটুল দি গ্রেট বৃদ্ধ হয়েছেন। কালো শর্টসের ওপর শ্যান্ডো গেঞ্জিতে আঁটা তাঁর দেহের পেশি শিথিল হয়েছে, চলাফেরার সময় হাতের লোল বাইসেপ মোরগের গলার চামড়ার মতো ঝোলে। গেঁটে বাতের জন্য বিশেষ হাঁটাচলা করতে পারেন না আর, বর্গিব্যাটারির সামনে ঘাসজমিতে ভাঙা ইটের পাঁজায় বসে নির্দেশ দেন, সঠিক অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে দেন হাতের লম্বা কঞ্চি ছুঁইয়ে (সেই কঞ্চি, যেটি দিয়ে তিনি একদা বায়োস্কোপের দর্শকদের পশ্চাদ্দেশে খোঁচা দিয়ে ফুটো পয়সা গেঁথে তুলতেন)। বাইশ জন বালক কিশোর বাঁটুলের আখড়ায় লাঠি খেলা, জিমনাস্টিক্স, কুস্তি ও ভারোত্তোলন অভ্যাস করে। বর্গিব্যাটারির ঝোপজঙ্গল সাফ করে তৈরি হয়েছে ব্যায়ামাগার, কামানের গোলা দিয়ে বানানো ডাম্ববেল বারবেল ও অন্যান্য সরঞ্জাম রাখা থাকে বারুদঘরে।
প্রতিবছর দুর্গানবমীর দিন ধুমধাম করে হনুমান পুজো করেন বাঁটুল দি গ্রেট। সেদিন ওঁর আখড়ার ছেলেদের ব্যায়ামের প্রদর্শনী দেখতে সরস্বতীর পাড়ে বর্গিব্যাটারির সামনে জড়ো হয় সাতগাঁর ছেলেবুড়োর দল। লাল ল্যাঙট পরে গায়ে গর্জন তেল মেখে বিভিন্ন রকমের কসরৎ দেখায় বাঁটুল বাহিনী। কেন্দ্রীয় আকর্ষণ হলো মোটর-ধরার খেলা, অনেককাল আগে ডকবাজারে বাঁটুল দি গ্রেটের সেই বিখ্যাত কীর্তির পুনর্নির্মাণ। এই সময়ে পুজো উপলক্ষ্যে রাধারাণীরা সপরিবারে এল- ডোরাডোয় এসে থাকেন, ওঁদের সেই রোলস রয়েসটি চালক সমেত ধার দেন। ইঞ্জিন চালু করে অ্যাকসিলারেটার চেপে ধরার পরেও যদি কোনো ছেলে গাড়িটাকে থামিয়ে রাখতে পারে, বাঁটুল তাদের একটি করে স্বস্তিকা-আঁকা ইস্পাতের বালা পুরস্কার দেন। ওই বালা কব্জিতে পরে থাকলে সাতগাঁইয়াদের কাছে বিশেষ সম্ভ্রম জোটে, অনেকটা মধ্যযুগে ইউরোপে নাইটদের মতো। তার অন্যতম কারণ রোলস রয়েস মোটরগাড়ি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতীক, তার বনেটে ডানা-অলা পরীটি কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের চুড়ায় পরীর ছোটো বোন।
কিছুকাল হলো দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাতগাঁবাসীর মনোভাব বদলায়নি। এদিকে রাধারাণীদের ফ্যানটম থ্রি মডেলের রোলস রয়েসটি ক্রমশ জরাগ্রস্ত হয়েছে, সাতগাঁয়ে স্বস্তিকা-আঁকা বালা পরা ছেলেদের সংখ্যা বেড়েছে, তাদের কেউ কেউ যুবক হয়ে প্রৌঢ়ত্বের দিকেও পা বাড়িয়েছে। বাঁটুল দি গ্রেটও ইদানীং গেঁটে বাতে জর্জরিত। কিন্তু তাঁর তেজ কমেনি। ইংরেজদের কারাগারে পিতার মৃত্যু তিনি ভুলতে পারেননি, ভুলতে পারেননি দেশ স্বাধীন হবার পর নতুন শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা। এখনও নিয়মিত অনুশীলনের আগে ছেলেদের গা গরম করে তোলার জন্য তিনি ভাঙা ইটের পাঁজায় উঠে দাঁড়িয়ে শ্যান্ডো গেঞ্জি- পরা বুক ফুলিয়ে হাতের কঞ্চিটি তুলে তাঁর বিশিষ্ট বাচনভঙ্গিতে বলেন কীভাবে বাংলার আগুনখোর বিপ্লবীদের বলিদান আত্মসাৎ করল দিল্লির নেতারা, নেপোয় দই মারল, তাদের কেউ বা পরে স্যুটবুট কেউ বা পরে খাদি, তারা কখন যে গ্রেপ্তারবরণ করে জেলে গিয়ে রাজবন্দি হয়ে রাজার হালে থাকে, এদিকে গুঁফো গোঁসাইরা পচে মরে, আবার চোখের নিমেষে কখন যে খোশ মেজাজে ভাইসরাইনের আঁচলের তলায় গিয়ে খিলখিল করে হেসে লুটোয়, শিমলায় টি-পার্টিতে যায়, ল্যাঙট পরে লন্ডনে যায়, এদিকে দেশের সেপাইদের খেপায় ভিনদেশে গিয়ে সাদা আদমিদের হয়ে লড়তে, মরতে, আর নিজে বড়োলোক মিলমালিকের ডেরায় বসে চরকা কাটে কাটুনি মেয়েছেলের মতো, আর চায়ে-ডোবানো বিস্কুটের মতো দেশটাকে দু-টুকরো করে, দেশটাকে বিলিয়ে দেয় ভুঁড়ো জোতদার গমচাষিদের, যারা কিনা দেশ চালানোর নামে কেবল দুধসাদা গদিতে লুটোপুটি খায়, পাগড়ি তুলে মাথা চুলকোয় আর বাতকর্ম করে, আর এদের হাতে দেশটা উচ্ছন্নে যাওয়া থেকে উদ্ধার করতে পারেন একজনই, বাঁটুল হাতের কঞ্চিটি বাতাসে ঘুরিয়ে বলে ওঠেন— ‘কে তিনি? তিনি কে?’
ছেলের দল গলার শির ফুলিয়ে সমস্বরে বলে— ‘তিনি আমাদের নেতাজি!’
‘তিনি কী করছেন?’
‘তিনি তাঁর ফৌজ সাজাচ্ছেন! অস্ত্র শানাচ্ছেন!’
‘তিনি কী করবেন?’
‘তিনি এইসব লোভী ভুঁড়ো জোচ্চোর জোতদারদের হাত থেকে দেশটাকে উদ্ধার করবেন! তিনি আমাদের সত্যিকারের স্বাধীনতা দেবেন!’
‘তার বদলে আমাদের কী দিতে হবে?’
‘আমাদের রক্ত দিতে হবে, বল দিতে হবে! যুদ্ধের জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে!’
বাঁটুল দি গ্রেটের আখড়ায় হেমন্ত নাম লেখাল প্রকৃত স্বাধীনতা লাভের জন্য নয়, তার মজ্জার ভেতরে অবিরাম কামনার ঘুনপোকাগুলোকে শায়েস্তা করতে। শরীরচর্চার অঙ্গ হিসেবে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালনের শিক্ষা দেন বাঁটুল। কীভাবে ওজ ধরে রেখে বীর্যবান হয়ে ওঠা যায়, ঔরস ও বীর্যের মধ্যে তফাৎ কী, ক’বিন্দু বীর্য কত পরিমাণ রক্তের সমান, কোন কোন অভ্যাস ও খাদ্য কঠোরভাবে বর্জনীয়, সেসবের উপদেশ দেন।
সেই তালিকার শীর্ষে চা পান। ‘মনে রাখবে,’ বাঁটুল বলেন–‘ইংরেজরা আমাদের চায়ের অভ্যাস ধরিয়েছিল যাতে নেটিভদের রক্ত জলের মতো তরল হয়। ওরা নিজেরা গরু শুয়োর খায়, চা ওদের ক্ষেত্রে রক্তশুদ্ধির কাজ করে। কিন্তু চা পানে আমাদের রক্ত জল হয়, ঘুমের ভেতর নিঃসাড়ে তার পতন ঘটে।’
আখড়ার নিয়মাবলী হেমন্ত অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে লাগল। দুবলা ঘরকুনো ছেলেটার এই চারিত্রিক পরিবর্তন দেখে সরোজা খুশি হলো, ওর চাহিদা মাফিক খাদ্য বানিয়ে দিতে লাগল প্রোটিনের জন্য সজনে পাতার ঝোল, কল বেরোনো ছোলা মটর, লৌহের জন্য থোড়ের ছেঁচকি, কাঁচকলা সেদ্ধ, এবং প্রতিদিন ভোরবেলা আখড়ায় যাবার আগে ভাতের ফ্যানে ফোটানো পুইপাতার বলবর্ধক পানীয়। স্বাস্থ্যোদ্ধারের এই বিচিত্র ফর্দ দেখে রামপ্রাণ বিচলিত হল, বাটুলের রাজনীতি জানার পর কিছুটা উদ্বিগ্নও হল।
সরোজা আশ্বস্ত করে।–‘ইংরেজরা তো দেশ ছেড়ে গেছে। আর ভয়টা কীসের!’
একদিন আখড়ায় কসরতের শেষে বাটুল হেমন্তকে আলাদা করে ডেকে নিল। বারুদঘরের পেছনে ইঁটপাথরের স্তূপের ভেতর সরু সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে পাতালঘর, ভেতরে রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বলছে। সেখানে মন্দিরের মতো করে সাজিয়ে তুলেছেন বাঁটুল। হনুমানের মূর্তি ছাড়াও দেয়ালে অনেকগুলি ছবি সাঁটা। প্রদীপের আলোয় মিলিটারি উর্দি-পরা নেতাজীকে চিনতে পারে হেমন্ত। আরও কয়েকজন তরুণ ও দুজন তরুণীর ছাপানো ফোটোগ্রাফ, তাদের কারোর ছবি মৃত অবস্থায় তোলা চোখ খোলা, নাকের নীচে রক্তের দাগ। খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় ছবিগুলি বহু পুরোনো পোস্টার, হলদে হয়ে এসেছে। নীচে লাল স্টেনসিলে লেখা:
MOST WANTED! MOST WANTED! MOST WANTED!
একটি ছবির দিকে তর্জনি নির্দেশ করে বাঁটুল জিজ্ঞেস করেন—
‘এঁকে চেনো?’
এক ছিপছিপে তরুণীর ঝাপসা ছাপা ছবি। তার দুটি বেণি কাঁধের দুপাশে ফেলা, চিবুকে বিষণ্ণ ডৌল, দু চোখের ভারি পাতাদুটো দেখে মনে হয় যেন সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে।
‘ইনি হলেন বনলতা,’ বাঁটুল বলেন। ‘ইনি সম্পর্কে তোমার পিসি হন।’
এই পিসির কোনো ছবি হেমন্ত এর আগে দেখেনি। আদিরামবাটিতে বনলতা এক মানুষপ্রমাণ নৈঃশব্দ্য, চাপা ফিসফাস দিয়ে ঘেরা। ছোটোবেলা থেকে তার কিছু কিছু কানে এসেছে দাদা বসন্তর মারফৎ। এই ব্যাপারে বিশুকাকেও কখনো কিছু জিজ্ঞেস করতে তার সাহস হয়নি। প্রতি বছর আদিরামবাটিতে একটি আচার পালন হতে দেখে আসছে হেমন্ত পিতৃপক্ষ পড়ার আগে পূর্ণিমার দিন বাড়ির কেউ কখনো গঙ্গাস্নানে যায় না, গামাও গঙ্গাজল আনতে যায় না। ওইদিন কোনো বাড়ির রান্নাঘরে উনুনে আগুন জ্বলে না। অনবগাহন এবং অরন্ধন পালন হয়।
