সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৪.৩
৪.৩
রোগা অপুষ্টিপীড়িত মেয়েটাকে এ বাড়িতে আনার পর ওর চোখের ভারি পাতার নীচে এক অদ্ভুত আলো দেখেছিলেন গঙ্গারাম। ওঁর মনে পড়ে গিয়েছিল রুয়ানো ডে ইনফান্টের আঁকা গ্রামবাংলার একটি নামহীন ঔষধিলতার কথা, বনেবাদাড়ে অনেক খুঁজেও যেটি কেউ কখনো পায়নি। তাই ঠাকুরবাড়িতে লক্ষ্মীদেবীর বিগ্রহ থাকায় যখন কাত্যায়নীর মেয়ে কমলার নাম বদলানোর প্রয়োজন হয়, তিনি ওর নাম রাখেন বনলতা।
প্রথম থেকেই পড়ালেখায় বনলতার বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। ছোটোভাই বিশুর সঙ্গে টোলের বাড়িতে গিয়ে মামা শাস্ত্রীমশাইয়ের কাছে বাংলা ও সংস্কৃত নির্ভুল পড়তে লিখতে শিখে গিয়েছিল দশ বছর বয়সেই। কিন্তু রজস্বলা হবার পর মশাই ভাগ্নিকে আর টোলের চৌহদ্দি মাড়াতে দেননি। শাস্ত্রে নিষেধ ছিল, তাছাড়া আবাসিক বিদ্যার্থীরা ছিল। বিশু লুকিয়ে চুরিয়ে এদিক-ওদিক থেকে দিদিকে বইপত্র এনে দিত, তার মধ্যে রাজমোহন চ্যাটার্জির লেখা নভেলও ছিল। বিশু নিজে যদিও সেসব পাতা উলটেও দেখত না। পুথিচর্চা ছেড়ে ততদিনে ওর মন গিয়ে পড়েছে পুজোআচ্চার দিকে।
কলকাতা থেকে অবরে সবরে সাতগাঁয় এলে রাধারাণীর চোখে পড়ত বনলতার এই লেখাপড়ায় আগ্রহ। গঙ্গারামের কাছে একবার অনুযোগ করেছিলেন— ‘কত বিখ্যাত পণ্ডিতের জন্ম এই বাড়িতে। কিন্তু মেয়েদের এ কী ছায়ার জীবন, জ্যাঠামশাই?’
গঙ্গারাম কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি, কিন্তু রাধারাণী বনলতাকে কলকাতায় নিজের কাছে রেখে লেখাপড়া করানোর প্রস্তাব দিলে তিনি অসম্মতিও ব্যক্ত করেননি। তার কিছুকাল পরেই তিনি গ্রেপ্তার হলেন, এবং ফোর্ট উইলিয়ামে তিন রাত কাটিয়ে ফিরে আসার মাসখানেকের মধ্যেই মারা গেলেন। রাধারাণী বনলতার মামা ও অভিভাবক শাস্ত্রীমশাইয়ের কাছে ফের একবার প্রস্তাব নিয়ে যান, গঙ্গারামের যে এব্যাপারে অসম্মতি ছিল না সেটাও জানান। স্বাভাবিকভাবেই মশাইয়ের মন সায় দেয়নি, কিন্তু পরলোকগত কাকার মনোভাব জেনে তিনি আর বাধা দেননি।
জন ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের গড়া এশিয়ার প্রাচীনতম মেয়েদের ইস্কুলে ভর্তি হল বনলতা, যেখানে এককালে রাধারাণী নিজেও পড়েছেন। বাগবাজার থেকে হেদুয়ায় মেয়ের আসা-যাওয়ার জন্য পাগলরাম একটি চেরি রঙের ব্রুহাম কিনেছিলেন। ইতিমধ্যে বাড়িতে মোটরগাড়ি এসেছে, কিন্তু রাধারাণী ব্রুহাম ও তার কাঠিয়াওয়াড়ি ঘোড়াটিকে বাতিল করেননি। সেই ব্রুহাম আবার পথে নামলো। ম্যাট্রিকে ভালোভাবে উত্তীর্ণ হবার পর একই চৌহদ্দির ভেতর বেথুন কলেজে ভর্তি হয়ে বনলতা ব্রুহাম ছেড়ে ট্রামে চড়ে যাতায়াত করতে লাগল। সেই খবর যখন গঙ্গার জোয়ারে ভেসে ভেসে পল্লবিত হয়ে সাতগাঁর ঘাটে গিয়ে পৌঁছল হাড়-হাভাতে কাত্যায়নীর ঝি পাম্প জুতো পরে, শাড়ির ওপর ব্লাউজ, ব্লাউজের নীচে বুক-আঁটুনি বেঁধে কলকেতার রাস্তায় একা একা ট্রামে চড়ে গড়গড়িয়ে কলেজ যাচ্ছে!–আট-রাত্তির দশ-রাত্তিরের জ্ঞাতিগুষ্ঠীরা ছিছিক্কার করতে লাগল, শাকম্ভরী কানে আঙুল দিলেন।
বনলতার মনের ভেতরে ঠিক কী ঘটছিল তার কিছু ঝলক কখনো সখনো এসে পৌঁছত মশাইয়ের কাছে। মামামশাইকে মাঝে মাঝে চিঠি লিখত সে, তাতে অদ্ভুত সব প্রশ্ন থাকত। একবার লিখল— ‘আত্মার যদি পুনর্জন্মই হবে, তাহলে বছরের পর বছর পিতৃতর্পণের সময়ে তিল গঙ্গাজল দেওয়া হয় কাকে? আর পিতৃপুরুষের আত্মা যে হিন্দু হয়েই জন্মান এটাই বা কীভাবে নিশ্চিত হয়ে জানা যায়?’
মশাই কোনো উত্তর দেননি। কাউকেই চিঠির কথা জানাননি। বনলতা যে ওঁকে কলকাতা থেকে চিঠি লিখত, সে কথা জানা যায় অনেককাল পরে, ওঁর মৃত্যুর পর। সেই চিঠিগুলি যদিও ওঁকে লেখা, ভাষার অন্তরঙ্গ স্বর দেখে মনে হবে যেন সে লিখছে গঙ্গারাম চক্রবর্তীকে। অ্যাক্রয়েড ঘোষ যেমন দূরের সত্তার সঙ্গে বার্তাবিনিময় করতেন, সেভাবেই চিঠিগুলি যেন মৃতের সঙ্গে অলীক কথোপকথন। আরেকবার সে লিখল— ‘স্বদেশ কী? সে কি কোনো সীমানানির্দিষ্ট ভূমি? ভূমিতে নারীর তো কোনো অধিকার নেই। তাহলে স্বদেশ কি শুধু পুরুষের? নারীর কি কোনো স্বদেশভূমি নেই?’
যথারীতি মশাই কোনো উত্তর দেননি। এবং একদিন চিঠি আসা বন্ধ হলো।
বনলতা কী পোশাক পরে কলেজে যেত, এই নিয়ে জল্পনায় সাতগাঁর মেয়েমহল এক গাল মাছি হলো যখন চাউর হলো সেই পোষাকের আড়ালে সে কী কী লুকিয়ে নিয়ে বাইরে আসত : কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরি থেকে সোডিয়াম হাইড্রোক্লোরাইড আর অ্যামোনিয়া, যা বোমা প্রস্তুত করতে লাগে। ইতিমধ্যে একটি বিপ্লবী দলে যোগ দিয়েছে সে। ইংরেজ বিরোধী ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যেতে খবরটা বোমার মতোই ফাটল। বনলতা তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে।
.
ততদিনে সাতগাঁর মৎস্যভূমিতে হুগলির পাড় বরাবর ওলন্দাজ পর্তুগিজ আর্মানি দিনেমারদের ঘাঁটিগুলো ইংরেজ শাসনাধীন হয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র কোয়ার্সভিল ও চাঁদেরডাঙার শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের শহর তখনও ফরাসীদের দখলে, সেখানে ফ্রান্সের আইন চলে। তবু তার মধ্যেও ব্রিটিশ শাসিত করিডোর ছিল মার্টিন্স কোম্পানির ছোটো রেলের লাইন ও রেল স্টেশন। এক রবিবার দুপুরে সেখান থেকে সন্দেহজনক এক যুবককে গ্রেপ্তার করল ইংরেজ পুলিশ।
কিছুকাল ধরে একটি পরিবার চাঁদেরডাঙায় একটি একতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাস করছিল। এক অল্পবয়েসি দম্পতি, তাদের একটি শিশু সন্তান এবং পুরুষটির এক বয়স্ক কাকা, যাঁর একটি পা বিকল, ক্রাচ নিয়ে চলাফেরা করেন। মেয়েটির ভাই কলকাতা থেকে নিয়মিত এসে ওদের কাছে থাকত। এক রবিবার সে চাদেরডাঙা স্টেশনে ধরা পড়ায় জানা গেল পুরো ব্যাপারটাই সাজানো, ইংরেজ পুলিশের খাতায় ছেলেটি মোস্ট ওয়ান্টেড টেররিস্ট। গোয়েন্দারা ওকে লালবাজারে নিয়ে এসে গোপন তথ্য বের করল। সেই রাতেই একটি বিশেষ ট্রেনে বন্দর-হুগলি থেকে কোয়ার্সভিল-চাঁদেরডাঙা এল কলকাতা পুলিশের একটি দল। তার আগে হেডকোয়ার্টার থেকে স্থানীয় গভর্নরের অফিসে যোগাযোগ করে ফরাসী উপনিবেশে হানা দেবার প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেওয়া হলো। হুগলি নদীর কাছে গলির ভেতর একতলা বাড়িটি ঘিরে ফেলল ওরা। ফরাসী ফৌজদারি আইনে যেহেতু কোনো বসতি অঞ্চলে রাত্রিবেলা হানা দেওয়া বিধিবহির্ভূত, তাই ভোর পর্যন্ত চলল অপেক্ষা। আলো ফুটতেই চারদিক থেকে শুরু হলো গুলিবৃষ্টি। আধঘন্টার মধ্যেই বাড়িটার সদর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পাওয়া গেল দুটি পুরুষের মৃতদেহ, তাদের একজন অতুল দাস, অপরজন চিন্ময় বাগচী। চিন্ময় ধরেছিল বয়স্ক কাকার ছদ্মবেশ, সাদা পরচুলা আর ম্যাচলক রাইফেলের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি ক্রাচ। কিন্তু নারী ও শিশুটিকে খুঁজে পাওয়া গেল না।
পরদিন সকালে পুলিশ এসে কড়া নাড়ল আদিরামবাটিতে, এবং একই সময়ে কলকাতায় আদিরাম প্রেসের বাড়িতে। সেখানে তল্লাসি চালিয়ে বেথুন কলেজের আইডেন্টিটি কার্ড পাওয়া গেল। সেই কার্ড থেকে বনলতা মুখার্জির ছবিটি বড়ো করে MOST WANTED পোস্টার ছাপানো হলো, সন্ধান দিতে পারলে ১০০০/- টাকা নগদ অর্থ মূল্যের পুরস্কার ঘোষণা সংবলিত সেই পোস্টারে ছেয়ে গেল সাতগাঁ ও আশেপাশের ফিরিঙ্গিডাঙার দেয়াল। আদিরামবাটির সদর দরজার পাশেও সাঁটা হলো সেই পোস্টার।
যে ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে জাতক্রোধ কয়েক প্রজন্ম ধরে পরিবারের রক্তে প্রবাহিত, আদিরামের মন্দিরে কামানের গোলার আঘাত থেকে শুরু হয়ে যা গঙ্গারামের গ্রেপ্তার পর্ব পর্যন্ত চলেছে, সেই অমিত শক্তিধরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নেমেছে এই বাড়িরই এক মেয়ে। কিন্তু সেজন্য কাউকে প্রকাশ্যে অন্তত গর্ব করতে দেখা গেল না। অন্দরমহলে নারীর নিয়তিনির্দিষ্ট চৌহদ্দি ছেড়ে বাইরে বেরোনো এবং কলকাতায় যাওয়ার ভয়ঙ্কর পরিণতি হিসেবে দেখা হলো গোটা ঘটনাটা। এবং ইংরেজ পুলিশ যে শেষপর্যন্ত আদিরামবাটিতে পা রাখতে পারল, বাঘ যেভাবে প্রস্রাব ছিটিয়ে নিজের এলাকা চিহ্নিত করে সেভাবেই ফরাসী শাসিত চাঁদেরডাঙার উপচ্ছায়ায় থাকা সাতগাঁর দেয়ালে পোস্টার সেঁটে ব্রিটিশ সরকার তার এক্তিয়ারভুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করল, সেজন্য বনলতাকেই দোষী করা হলো। সদর দরজার পাশে সাঁটা পোস্টারটা ছিঁড়ে ফেলার সাহস হলো না কারোরই। সাতগাঁর অলিতে গলিতে অদ্ভুতদর্শন ভিখারি, ভবঘুরে ও ফেরিওয়ালা দেখা যেতে লাগল। তাদের মধ্যে কারা যে পুলিশের গুপ্তচর সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই।
চাঁদেরডাঙায় হানাদারির পরদিন জেলেপাড়ার দুই মাছমারা হুগলির খালে রাতের জোয়ারে জাল ফেলে এক নারীর লাশ পেল। তার গলায় শাড়ির ফাঁস জড়িয়ে বাঁধা কাসার দশসেরি ঘড়া। এসব ক্ষেত্রে যা কর্তব্য ওরা তাই করল: ঘড়াটি খুলে নিয়ে মৃতদেহটিকে ডুবিয়ে দিল জলের দেশে, যে দেশ সে স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিল। পরদিন দুপুর নাগাদ সেটি ফুলে ভেসে ওঠে, এবং খালের দোরানিয়া স্রোতে চলাচল করতে করতে কখনো কাটুনিডাঙায় জলের ওপর বাঁশের খোঁটায় আটকায়, কখনো পুর্ণিমার কোটালে ভেসে আসে সরস্বতীর খাতে। স্নানের ঘাট থেকে দেখা যায় সনাতনের ঘোলে ঘুরে চলেছে গলিত মনুষ্যদেহ, ওপরে এক জোড়া দাঁড়কাক।
পিতৃপক্ষ শুরুর আগের দিন পুর্ণিমার চাঁদ উঠল মেঘের আড়ালে। সেদিন আদিরামবাটিতে কেউ গঙ্গাস্নানে গেল না, রান্নাঘরে উনুন জ্বলল না। অনবগাহন ও অরন্ধন শোকের অভূতপূর্ব আচার পালন হল নৈঃশব্দ্য আর ভয়ের আবহে। বাড়ির পুরুষেরা সেবার পক্ষকাল ধরে পিতৃতর্পণ করল বাগানে বড়ো ইঁদারার জলে।
