Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৪.৪

৪.৪

রোজ সকালে বর্গিব্যাটারিতে গিয়ে কসরত করে হেমন্তর স্বাস্থ্য ফিরল, কাঁধ ও হাতের পেশি ফুলে উঠল, হাঁটাচলায় হাবেভাবে ফুটে উঠল এক নতুন আত্মপ্রত্যয়। সেবার ইংল্যান্ড থেকে ফিরে সুনির্মল দুর্গাপুজোয় এল ডোরাডোয় এসে হেমন্তর এই পরিবর্তন লক্ষ করে একটু অবাকই হলো।

‘কী ব্যাপার? তুমি আজকাল আর ও বাড়িতে আসছ না শুনলাম। লাইব্রেরিতে নতুন বই এসেছে দেখেছ?’

‘এখন বই পড়ে কাটানোর সময় নয়,’ হেমন্ত বলে। ‘যেকোনো সময় দেশের ডাক আসতে পারে, আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।’

‘কিন্তু ইংরেজরা তো চলে গেছে। দেশটা তো এখন স্বাধীন, নয় কি?’

‘এ মিথ্যে স্বাধীনতা!’ হেমন্ত ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে।

ওর দিকে কৌতূহলভরে তাকিয়ে সুনির্মল আন্দাজ পাবার চেষ্টা করে সেই ঝাঁঝের উৎস। এ যেন ঠিক আদিরামবাটির রক্তে বংশপরম্পরায় বয়ে চলা ব্রিটিশ বিরোধিতা নয়, আরও গভীর কিছু। তিনদিন পরে নবমীতে বাঁটুলের আখড়ায় হনুমান পুজো উপলক্ষ্যে প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে তার খানিকটা বুঝতে পারে সুনির্মল। কালো শর্টসের ওপর নতুন শ্যান্ডো গেঞ্জি পরে বৃদ্ধ বাঁটুল দি গ্রেট তাঁর ছেলেদের লাঠিখেলা ছোরাখেলা মোটর-ধরার খেলা পরিচালনা করলেন, এবং থেকে-থেকেই হাত মুঠি করে শূন্যে তুলে টার্কি মোরগের গলার মতো লোল পেশি কাঁপিয়ে কাঁপা কাপা গলায় শ্লোগান দিতে লাগলেন— ‘সুভাষ তুমি ফিরে এস!’

ছেলেরা সমস্বরে ধ্বনি তুলল–‘ফিরে এস! ফিরে এস!’

পরের দিন সুনির্মল হেমন্তকে জিজ্ঞেস করল একান্তে –‘সুভাষ ফিরে আসবেন তুমি বিশ্বাস কর?’

‘আলবাৎ ফিরে আসবেন!’ হেমন্ত উরু চাপড়ে বলে। ‘দেশের ডাক শুনে উনি না এসে পারবেন না। উনি কেবল উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন।’

‘সুভাষচন্দ্র বোসকে কমিউনিস্টরা কী বলে জানো?’ সুনির্মল জিজ্ঞেস করে, তারপর নিজেই উত্তরটা দেয়— ‘তোজোর কুকুর!’

হেমন্তর মুখের অভিব্যক্তি দেখে সঙ্গে সঙ্গে যোগ করে,— ‘না না, আমি অবশ্য অতটা মনে করি না।’

লন্ডনে থাকাকালীন ইন্ডিয়ান মজলিস নামে ভারতীয় ছাত্রদের একটি সংগঠনের সদস্য ছিল সুনির্মল। সেখানে ওরা কয়েকবার সুভাষচন্দ্রকে আমন্ত্রণ করে এনেছে। ওঁর দেশপ্রেম নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু ওঁর রাজনীতি কিংবা ইতিহাসচেতনা সুনির্মল সমর্থন করে না। লন্ডনে তিনটে বছর কাটিয়ে ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন সম্পর্কে ওর কী ধারণা হয়েছে সে ব্যাপারে একদিন হেমন্তকে বলল।

‘ওরা এদেশে এসে অনেক খারাপ কাজ করেছে, দেশটাকে লুঠ করেছে। কিন্তু যা যা করেছে খাতায় কলমে তার পাইপয়সা হিসেব আছে। লন্ডনে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে গিয়ে তুমি চাইলে সেসব নথিপত্র দেখতে পারো। তার আগে আমাদের দেশে শাসকেরা যতরকম কুকীর্তি করেছে তার কোনো রেকর্ড কিন্তু কোথাও নেই।’

‘তার কারণ ইংরেজরা হল দোকানদারের জাত!’ হেমন্ত বলে।

সুনির্মল মিষ্টি করে হাসে। বাবা তারিণীচরণের মতোই সুগঠিত মুখ চোখ আর নাকের চোখা গড়ন ওর।

‘দ্যাখ হেমন্ত, ইংরেজদের এ দেশ ছাড়তেই হতো, আজ না হোক কাল। ভা সে একদল বাঙালি ছেলেমেয়ে বোমা ছুঁড়ে ফাঁসি যাবার জন্যে নাকি মোহনদাস গান্ধীর সত্যাগ্রহের জন্যে হলো, সে বিতর্কে আমি যাচ্ছি না। উপনিবেশ হিসেবে এই দেশটা ওদের কাছে একটা পড়তি জমিদারি হয়ে উঠেছিল। শুধুই লোকসান, কোনো খদ্দের নেই। কিন্তু ওরা যাবার পর যে দেশটা আমরা পেলাম, এর জন্যে কি তোমার বনলতাপিসিরা প্রাণ বলিদান দিয়েছিলেন? সে কথা কখনো ভেবেছ? হ্যাঁ, আমি তোমার সঙ্গে একমত, এ মিথ্যে স্বাধীনতা! কিন্তু আমি এটা মানতে পারি না যে একজন মানুষ, তিনি যত বড়ো দেশপ্রেমিক বীরই হোন, একদিন এসে আমাদের হাতে প্রকৃত স্বাধীনতা তুলে দেবেন।

সুনির্মল থামে, পাঞ্জাবির পকেট থেকে দাড়ি-অলা নাবিকের ছবি আঁকা সিগারেটের টিন থেকে একটি বের করে ধরায়, তারপর এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলে— ‘সেই স্বাধীনতা আসতে হবে সম্পূর্ণ অন্য জায়গা থেকে।

‘কোন জায়গা থেকে?’ হেমন্ত জিজ্ঞেস করে।

অনেকদিন পরে সুনির্মল ওকে আবার সেদিন এল ডোরাডোর দোতলায় লাইব্রেরিতে নিয়ে গিয়ে দুটি বই হাতে তুলে দিল। একটি এডমন্ড বার্কের লেখা রিফ্লেকশনস অন দ্য রেভেলিউশান ইন ফ্রান্স; দ্বিতীয়টি একটি চটি পুস্তিকা, ধুসর মলাটে লাল কালিতে লেখা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। লেখক কার্ল মার্কস।

কালিপুজোর পর ভাইফোটার দিন আবার আদিরামবাটিতে এল সুনির্মল। এবার নিয়ে এল রজনী পাম দত্তের লেখা একটি বই – লেফট ন্যাশানালিজম ইন ইন্ডিয়া। ভেতরে স্বয়ং লেখকের সাক্ষর রয়েছে। হেমন্ত জানতে পারে, ইনি হলেন কমিউনিস্ট পার্টি অফ গ্রেট ব্রিটেনের জেনারেল সেক্রেটারি, লন্ডনে ইন্ডিয়ান মজলিসে নিয়মিত আসতেন।

‘সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলে না প্রকৃত স্বাধীনতা কোন জায়গা থেকে আসবে?’ সুনির্মল ডান হাত মুঠিবদ্ধ করে বাঁ হাতের তালুতে রেখে বলে,— ‘সেটা আসবে নীচের তলা থেকে, যখন শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হবে! ইতিহাস আমাদের সেটাই শেখায়।’

‘শ্রমিক?’ হেমন্ত অবাক হয়ে বলে।

‘হ্যাঁ, যাদের শৃঙ্খল ছাড়া আর কিছু হারাবার নেই।’

‘তুমি কি ক্রীতদাসদের কথা বলছ?’ হেমন্ত জিজ্ঞেস করে। ‘কিন্তু সেই প্রথা তো কবেই চুকে গেছে। তাদের বংশধরেরা খালপাড়ে দাসপাড়ায় থাকে, নৌকা বানায়।’

‘আরেকটু গভীরে গিয়ে দ্যাখ,’ সুনির্মল বলে। হেমন্তর কাঁধে হাত রেখে ওকে লাইব্রেরির বিশাল জানলার কাছে নিয়ে যায়। এখান থেকে ওষধিবাগানে ঝাঁকড়া নাগকেশর গাছটার পেছনে অনেক দূর অব্দি দেখা যায় বাড়ির পাঁচিলের ওপাশে পাকা পায়খানাঘর, কুয়ো, ঘন আমের বন আর তার নীচে দিয়ে পায়ে-চলা পথ গিয়েছে ছায়ার ভেতর। ‘দিনের বেলা প্রথম কার শ্রমের ওপর নির্ভর করে থাক সেটা ভাবো।’

হেমন্ত ভেবে পায় না।

‘মেথরানী!’ সুনির্মল বলে। ‘যে সকালবেলায় খাটা পায়খানায় মাটির মালসা পরিষ্কার করতে আসে। ওর কী হারাবার আছে ভেবেছ কখনো?’

হেমন্ত আবছা মনে করতে পারে দুয়েকবার খুব ভোরবেলায় আমের বনে ছায়া ছায়া মূর্তি দেখেছে, কিন্তু তাকে দেখতে ঠিক কেমন সে জানে না।

‘আর ওই মাটির মালসাগুলো? ওগুলো যারা বানায়?’ সুনির্মল বলে। ‘ওই কুমোরদের পুঁজি বলতে তো এক তাল মাটি আর একটা কাঠের চাক। কিংবা তাও নয়, একজোড়া হাত। ওদেরই বা কী হারাবার আছে? এবার ভাবো যে বস্তুটি ছাড়া আমাদের জীবন একদিনও চলে না, খাটা পায়খানায় ওই মাটির মালসা ভরে না। সেটা কী?’

‘খাদ্য!’ হেমন্ত বলে।

‘রাইট ইউ আর! আর খাদ্য ফলায় কারা? চাষি। সেই মানুষটা রোদে জলে এক হাঁটু কাদায় দাঁড়িয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে বছরভর। তার নিজের বউবাচ্চার পেট ভরানোর জন্য কতটুকু খাদ্য দরকার? তার অতিরিক্ত সে ফলায় কাদের জন্যে? তোমার জন্যে, আমার জন্যে। তাহলে এত ফলানোর পরেও তার বাচ্চাগুলো আধপেটা খেয়ে থাকে কেন? বলতে পারো কেন?’

হেমন্তর কাছে এর কোনো উত্তর নেই। সেদিকে দৃকপাত না করে সুনির্মল কথার ঝোঁকে বলে–

‘অথচ ওরাই কিন্তু দাসত্বের শিকল খসায় সবার শেষে!

‘সবার আগে খসায় কারা?’

সুনির্মল উত্তর না দিয়ে রহস্যময় হেসে হেমন্তর দিকে তাকায়। কোটের পকেট থেকে উইলস প্লেয়ার্স মিডিয়ামের টিন বের করে একটি হেমন্তর হাতে দেয়, আরেকটি নিজের ঠোঁটে গুঁজে অগ্নিসংযোগ করে।

আর ঠিক তক্ষুণি, যেন দৈব কাকতালে, হুগলির পাড়ের দিক থেকে পর পর পাটকলের সাইরেন বেজে উঠতে থাকে। কারখানায় শিফট বদল হচ্ছে।

*

মি’লেডি, সার্জেন-পাদরি রুয়ানো ডে ইনফান্টের সেই অপারেশানের পর হুগলি নদীর নবজীবন লাভ হলো। সেইসঙ্গে সরস্বতীর ধারে সাতগাঁ বন্দরের মৃত্যু ঘটল। ইতিমধ্যে জটিল ভ্রাতৃঘাতী প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর হিন্দুস্থানের মসনদে আসীন নতুন সম্রাট। সাতগাঁ বন্দরের পতনের ফলে মোগল কোষাগারের আয় হ্রাস পেয়েছিল। এবার বাংলায় পর্তুগীজদের দুর্বৃত্তপনার একের পর এক অভিযোগ এসে জমা পড়তে লাগল আগ্রায় শাহি দরবারে:

১- বন্দর-হুগলিতে একাধিপত্যের সুবাদে তারা দেশীয় বণিকদের থেকে জাহাজঘাটা ব্যবহারের জন্য চড়া শুল্ক আদায় করছে, এমনকি খোদ সম্রাটের বাণিজ্যপোতের ক্ষেত্রেও কোনোরকম রেয়াত করছে না।

২- পেদ্রো আলভারেজের উত্তরসূরিরা পুবের দেশে সেবাস্তিয়ান গনজালেজ টিবাও নামে এক নুনের ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজসে নিরীহ গ্রামবাসীদের অপহরণ ও ক্রীতদাস কেনাবেচার ব্যবসা ফেঁদেছে।

৩- বাংলার সুবেদার মারফত সম্রাটকে খাজনা পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ করেছে।

৪– পর্তুগীজ যাজকেরা স্থানীয় ধর্মাবলম্বীদের বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করছে।

সম্রাটের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। আগস্ট মাসের এক শনিবার ভোরবেলায় সাতগাঁর আকাশ কেঁপে উঠল কামানের বুম বুম শব্দে, মোগল নৌবহর বন্দর- হুগলিতে আক্রমণ হানল। গড়ের থেকে সোলদাদোরা কামান-বন্দুক বাগিয়ে যথাসাধ্য যুঝেছিল, কিন্তু জলে স্থলে শাহী সৈন্যদলের বিপুল সংখ্যার চাপে তা ধসে গেল অচিরেই। বর্ষার মেঘলা দিনের আলো ফুরোনোর আগেই পেদ্রো আলভারেজের সাধের কেল্লা নগর সব শুঁড়িয়ে মাটিতে মিশে দিল মোগলাই ফৌজ। তিনশোরও বেশি পর্তুগীজ বন্দুকবাজ ও সাধারণ নাগরিক হতাহত হলো, আরও দুশো জনকে –তাদের মধ্যে উনিশজন যাজক বন্দি করে আগ্রায় নিয়ে আসা হলো।

সেই দলে রুয়ানো ডে ইনফান্টেও ছিলেন। ইতিমধ্যে তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন, গেঁটে বাতে ক্লিষ্ট ও সম্পূর্ণ বধির এতটাই যে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনও আর শুনতে পাননা। কিন্তু তখনও নিরস্তর অনুসন্ধান করে চলেছেন সেই তত্ত্ব, যার মূল প্রতিপাদ্য হলো এই মহাবিশ্ব এক অনন্ত বিন্যাস, যা কুমড়ো থেকে শুরু করে বাতাবি লেবুর বিচিতে, শামুকে গুগলিতে জোঁকে, এবং গির্জার লাগোয়া তাঁর বাগানে বিবিধ আণুবীক্ষণিক প্রাণে নিরন্তর প্রতিভাত হয়ে চলেছে। উত্তর ভারতে এবার ছিল তাঁর দ্বিতীয় যাত্রা, কিন্তু প্রথমবারের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহিষে-টানা গাড়ির ওপর লোহার খাঁচায় এক ডজন পুরুষের সঙ্গে ঠাসাঠাসি হয়ে বন্যপ্রাণীর মতো যাচ্ছিলেন।

নতুন বাদশাহ যিনি নিজেকে দুনিয়ার অধিপতি নামে অভিহিত করেছেন— খ্রিস্টান যাজকদের প্রতি অতিমাত্রায় ক্রুদ্ধ ছিলেন। উনিশজন পাদরিকে হাতির পায়ের নীচে ফেলে মারার হুকুম দিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা আর সম্ভব হলো না। প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান অনুযায়ী মাটিতে উপুড় করে শোয়ানো, হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, সাদা জোব্বা পরা উনিশজন যাজকদের দেখে ঘাতক হাতিটির পা সরেনি। মাহুতের মরীয়া ডাঙসের গুঁতো খেয়েও সে অনড় থাকে, আকাশে শুঁড় তুলে বারে বারে বৃংহণ করতে থাকে। আরেকটি বিবরণ অনুসারে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার অব্যবহিত আগে রুয়ানো ডে ইনফান্টে সম্রাটের সঙ্গে একান্তে আলাপের অস্তিম ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। সম্রাট সম্মত হন। বহুকাল আগে যিনি ছুরি হাতে অস্ত্রোপচার করেছিলেন পাদশাহী জঘনে, যেখান থেকে উৎসারিত বর্তমান জাঁহাপনার বংশধারা, সেই শল্যবিদ-যাজকের সঙ্গে সম্রাটের ঠিক কী কথোপথন হয়েছিল জানা যায়নি, কিন্তু তিনি উনিশজন যাজককে নিঃশর্তে মুক্তি দেন।

মি’লেডি, এসবই ইতিহাসের উপচ্ছায়াময় অঞ্চল, লোককল্পনার উপাদানে গড়া। সত্য হলো, তামাম হিন্দুস্থানের দূরদর্শী শাসক বেয়াড়া পর্তুগীজদের চরম শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা আর সম্ভব ছিল না। সেই সময়ে এই বিশাল উপমহাদেশে ফিরিঙ্গি বণিকদের উপস্থিতি ততটাই বাস্তব যতটা মোগল শাসনব্যবস্থা। ওদের সমূলে তাড়ালে যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হতো, সেটা সামাল দেবার মতো সামর্থ্য মোগল কোষাগারের ছিল না। অতএব বছর দুয়েকের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে ফের জেগে উঠল বন্দর-হুগলি। তবে এবার আর কেল্লা নয়। স্থানীয় মানুষদের বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণও বন্ধ হলো। এবং বন্দর-হুগলির নতুন প্রশাসককে মুচলেকা দিতে হলো, জলদস্যু ও দাসব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক রাখবে না। সবচেয়ে বড়ো কথা, এই নতুন ফিনিক্সপ্রতিম নগরীতে পর্তুগীজেরা তাদের কর্তৃত্ব হারালো। ফরাসি, ওলন্দাজ, গ্রীক ও ইংরেজরা বাংলার এই জন্নত-এ-মুল্ক-এ এসে ঘাঁটি গাড়ল। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে ব্যবসায়িক চুক্তি হলো মোগল শাসকের। হুগলির বাণিজ্যপথে একচেটিয়া কায়েমি বন্দোবস্ত বিলোপ হলো, এই নদী হয়ে উঠল সকলের। কিছুকালের মধ্যেই ওলন্দাজ, দিনেমার ও ফরাসীরা ভাটির দিকে তাদের নিজস্ব গুদাম ও নগর গড়ে তুলবে।

জীবনের সায়াহ্নে এসে রুয়ানো ডে ইনফান্টের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেল, তিনি তা সামলে উঠতে পারলেন না। নভেম্বরের এক হিমেল সন্ধ্যায় তিনি কবরে গেলেন, সঙ্গে নিয়ে গেলেন সম্রাটকে একাস্তে বলা সেই গোপন সত্য, যা দিয়ে বন্দি স্বদেশবাসীদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। তাঁকে তাঁর কটেজের লাগোয়া বাগানে গোর দেওয়া হলো, সেইসব বিরল গাছপালার মাঝে যা তিনি নিজে হাতে লাগিয়েছিলেন।

রুয়ানোর মৃত্যুর পর অগস্টিনীয় গির্জা ও সংলগ্ন যাজকাবাসটি ক্রমশ আরও পোড়ো হয়ে পড়ে। মোগলদের কামানের গোলায় গির্জাটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। কয়েক বছর পর সেটি মেরামত শুরু হয়। এজন্য গোয়ার স্থপতিরা ম্যাঙ্গালোরের পোড়ামাটির টালি নিয়ে আসে। কিন্তু পুরোনো টালির সঙ্গে নতুনগুলি ঠিকমতো খাপ খায়নি, জোরে হাওয়া উঠলে টালিগুলো কেঁপে কেঁপে উঠে বেড়ালের কান্নার মতো ধ্বনি বহুদুর থেকে শোনা যায়।

*

দুশো বছর পরে ম্যাওবেড়ালের গির্জার ধ্বনির সঙ্গে যোগ হয় হুগলির পাড় বরাবর পাটকলের সাইরেন। খাদ্যশস্য গুদামজাত করে রপ্তানি থেকে শুরু করে যুদ্ধে বালির বস্তার প্রয়োজনে পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা গগনচুম্বী হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ এসে পাটকলে শ্রমিক হয়ে যোগ দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিবাসী শ্রমিকের ঢেউ এসে ফুলে ফেঁপে উঠেছে কারখানার লাগোয়া লেবার লাইন ওরফে মজদুর মহল্লা।

‘সবার আগে জেগে উঠবে ওরা!’ উইল্স প্লেয়ার্সে টান দিয়ে সুনির্মল বলল। ‘ওরা নিজেদের গাঁ-ঘর জোতজমি কালচার সবকিছু ছেড়ে এসেছে। ওদের জীবন জড়িয়ে গিয়েছে কতগুলো ইস্পাতের মেশিনের সঙ্গে। যেমন ক্রীতদাসের ছিল জাহাজের বাঁশি, ঠিক তেমন ওরাও জাগে ঘুমোয় মিলের সাইরেনের শব্দে। একদিন ওরা যদি মনস্থির করে সাইরেনের শব্দে আর জেগে উঠবে না, মিলের গেটে গিয়ে লাইন দেবে না, তাহলেই এই গোটা ইকোনমিক সিস্টেমটা তাসের কেল্লার মতো ভেঙে পড়বে। শুধু ওদের একটা জিনিস বোঝাতে হবে, একটা মন্ত্র শেখাতে হবে।

‘কী সেই মন্ত্র?’ আঙুলের ফাঁকে না-জ্বলা সিগারটেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে হেমন্ত জিজ্ঞেস করে।

‘ওয়ার্কার্স অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ইউনাইট…’ সুনির্মল আওড়ায়।

‘ইউ হ্যাভ নাথিং টু লুজ বাট ইয়োর চেইন্স!’ হেমন্ত বলে ওঠে।

‘হিয়ার! হিয়ার!’ এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে সুনির্মল বলে।