Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৪.৯

৪.৯

ফাল্গুনের শেষে দখিনা বাতাস বইতে শুরু হবার দিন কয়েকের মধ্যেই খাঁচার ভেতরে অ্যান্টনি অস্থির হয়ে উঠল। চেনা গালিগুলো ছাড়াও অচেনা দুর্বোধ্য ভাষায় চেঁচামেচি শুরু করল কর্কশ গলায়। গন্ধকরঙা ঝুঁটিটা ফুলিয়ে খাঁচার বেত চিবিয়ে পাগলের মতো গোল হয়ে ঘুরে যেতে লাগল। খাওয়া বন্ধ করল, এমনকি সরোজা ওর প্রিয় প্রসাদী ডালিম দিলেও ঠোঁট দিয়ে টান মেরে খাঁচা থেকে ফেলে দিল। খবর পেয়ে রামপ্রাণ এসে খাঁচার বাইরে থেকে অ্যান্টনিকে পরীক্ষা করে ঘোলাটে চোখ আর জিভে পাংশু রঙ ছাড়া তেমন কোনো উপসর্গ খুঁজে পেলেন না।

এরই মধ্যে একদিন আলিসাহেব এলেন। শীত চলে গিয়েছে, হিমালয়ের ওপর দিকে বরফ গলতে শুরু হয়েছে, আলিসাহেব ঝোলাভর্তি বীজ আর শেকড়বাকড় নিয়ে এসে গাজির বাগানে উঠেছেন। রামপ্রাণের অনুরোধে আলিসাহেব অ্যান্টনিকে একবার দেখলেন। খাঁচাসমেত ওকে ওষধিবাগানে নিয়ে এল গামা। আলিসাহেব তাঁর কুয়াশা-জমানো দাড়ি নেড়ে অ্যান্টনিকে নম্র গলায় সম্বোধন করলেন–

‘আপনি কেমন আছেন, ভাইজান?’

তারপর জিভ দিয়ে টক-টক কিচ-কিচ করে, শিস দিয়ে বিচিত্র ভাষায় কথা বললেন। কয়েক পলকে অ্যান্টনি স্থির হয়ে গেল, মাথার ঝুঁটিটা নেমে এল ঘাড়ের ওপর, আলিসাহেব কাঁধের ঝোলা থেকে সরু লম্বা পাইনের বাদাম বের করে খাঁচার দরোজা খুলে মুঠি বাড়িয়ে ধরতেই সে পরম বাধ্যের মতো ঠোঁট দিয়ে খোলা ছাড়িয়ে খেতে লাগল। আলিসাহেব ওঁর লম্বা, লাল-নীল পাথর বসানো আংটিপরা আঙুল দিয়ে ওর গলার পালকে বিলি কাটতে লাগলেন। অ্যান্টনি চুপ করে আদর খেল, টুঁ শব্দটিও করল না।

‘খাঁচার দরজা খুলে ওকে এবার রিহা দিন ডাক্তারবাবু, আলিসাহেব বললেন। সূর্যাটানা চোখে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে রামপ্রাণের দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন ‘ভয় নেই, কোনো হাসাহ ঘটবে না।’

আলিসাহেবের প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায়ান্তর ছিল না, কারণ ক’দিন ধরে অ্যান্টনি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু কেউ ভাবেনি এতদিন গৃহপালিত থাকার পরেও সে উড়তে পারবে। খাঁচা থেকে বের হয়ে অবিশ্বস্ত ডানা ঝাপটিয়ে প্রথমে নাগকেশরের নীচু ডালে গিয়ে বসল। সেখান থেকে উড়ে এল উঠোনে, নিমগাছের মগডালে। উঁচু থেকে এদিক-ওদিক চাইল, বাড়ি বাগান মন্দির সব দেখল ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, তারপর অদ্ভুত সাবলীল আত্মবিশ্বাসের ভঙ্গিতে উড়ে গেল দক্ষিণে ছাড়িগঙ্গার দিকে।

‘এবার ও ঠিক সরস্বতীর পুরোনো খাত বরাবর উড়ে সাগরের দিকে চলে যাবে,’ বিশুকা বলল।

‘কিন্তু ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজে ওর দেশ, এখান থেকে অনেক দূরে,’ হেমন্ত বলল। ‘অতখানি পথ উড়ে যাবার মতো ওর ডানার জোর আছে কী?’

‘ও যে কোথায় যাবে তা কে বলতে পারে?’ বসস্ত বলল। ‘হয়তো লিসবনে ফিরে যাবে।’

মৃত্যুর পরেও বিগত জন্মভূমির টান মরে না। কাকাতুয়াটা যে হান্স অ্যান্টনির আত্মা এব্যাপারে কারোর মনেই সন্দেহ ছিল না। শূন্য খাঁচাটা রয়ে গেল ভাঁড়ার ঘরের ঢাকা বারান্দায়, সকলের ফিরে ফিরে মনে পড়তে লাগল সকাল বিকেল ওর ডাক, ওর বেসুরো আগমনী গান, ওর দিশি-বিলিতি গালি। অ্যান্টনির উড়ে চলে যাওয়াটা আত্মীয়বিয়োগের মতোই ভারি হয়ে উঠল। পরদিন সকালে স্নান করতে গিয়ে সরোজা শাকম্ভরী দেবীকে খবরটা দিলেন। দুপুরে রান্নার পাট চোকার পর এক ডুব দিয়ে আসতে গিয়ে জোয়ারে উত্তর এল কাশী থেকে

‘ও কোথাও যাবে না পরাণবউ, ও ঠিক ফিরে আসবে!’

তিনদিন পরে ফার্মেসিতে দুজন গ্রাম্য রোগী আলোচনা করছিল, আফিমের ক্ষেতে এক বিচিত্র উপদ্রব শুরু হয়েছে। দুজনেই ছাড়িগঙ্গার ওপারে থাকে, শীতের আগ দিয়ে উঁচু জমিতে আফিম বোনে। আফিমের চাষে লাভ আছে, কিন্তু ফসল তোলার সময়ে বিশেষ তদারকি লাগে। ফাল্গুন মাস পড়তেই ফুলে গুটি ধরেছে, কিন্তু কোথা থেকে একটা সাদা পাখি এসে ঠোঁট দিয়ে গুটিগুলো চিরে নষ্ট করছে। তাড়া করে গেলে মানুষের গলা নকল করে ভড়কে দেয়, এদিক ওদিক ছুটিয়ে মারে। খবরটা কানাকানি হয়ে শ্রীশবাবুর মারফৎ রামপ্রাণের কাছে পৌঁছল, ওঁর মনে একটা আবছা সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল। উড়ে যাবার পাঁচদিন পরে সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে অ্যান্টনি ফিরে এল। ওর সাদা পালক ধুলোয় ধূসর, কিন্তু মেজাজ আগের মতোই ফুরফুরে। রামপ্রাণ বুঝলেন তিনি ভুলে করেছিলেন; যে উপসর্গগুলো দেখে ভেবেছিলেন যৌন তাড়না, সে সবই আসলে আফিমখোরের লক্ষণ।

বাড়িতে ফিরেই নিমগাছের ডালে বসে অ্যান্টনি শাকম্ভরী দেবীর মতো ভঙ্গিতে ডাকাডাকি শুরু করল— ‘এই গামা, গামা! কানের মাথা খেয়েছিস? এই গামা! গামা!’

সরোজা ওর খাঁচাটা নিয়ে উঠোনে এসে দরজা খুলে উঁচু করে ধরতেই সে উড়ে এসে খাঁচার মাথায় বসল, বেতের গায়ে ঠোঁট মেজে নিল বার কয়েক, তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে ঢুকে গেল খাঁচার ভেতরে।

‘নেশা যায় না ম’লে!’ বামুনদি বলল। ‘ফিরিঙ্গিটার গানের গলার সুখ্যাত্ করে সকলে, কিন্তু তার যে এমন আফিঙের আঠা ছিল কে জানত?’

পরদিন থেকে সরোজা অ্যান্টনির খাবারে ভিজে ছোলা আর প্রসাদী কাটা ফলের সঙ্গে পোস্তবাটা দিতে শুরু করলেন, এবং তারপর থেকে ফাল্গুন মাস পড়লে নিয়ম করে খাঁচার দরজা খুলে দিতেন। প্রথম তিন বছর অ্যান্টনি পাঁচ-সাত দিন নিখোঁজ হয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসত। ক্রমশ খবরটা ছড়িয়ে যায়, চাষিরা গাছে মাছ-ধরা জাল টাঙিয়ে ফাঁদ পাততে শুরু করে। অ্যান্টনিও সতর্ক হয়ে যায়। চতুর্থ বছর থেকে আফিমে গুটি ধরার মরশুমে রোজ ভোরের আলো ফোটার আগে উড়ে যেত, সন্ধ্যার আগে যখন জালালি কবুতরেরা ফিরে আসে এল-ডোরাডোর দোতলার ব্যালকনিতে, তখন অ্যান্টনিও ফিরে আসত ঠোঁটের ওপর আফিমের রসের পুরু হলুদ আস্তরণ নিয়ে।

.

প্রথমবার অ্যান্টনি যেদিন ফিরল, সরোজা তুলসীতলায় প্রদীপ দেবার আগে আকাশে আলো থাকতে থাকতে নদীতে গেল পিসিশাশুড়িকে খবরটা দিতে। তখন ভাটা মরে জোয়ার আসব আসব করছে। দুহাতে জল সরিয়ে ডুব দিয়ে মনটাকে স্থির করতে না করতে কানে ভেসে এল শাকম্ভরী দেবীর কন্ঠ— ‘খবর দিতে এয়েছ? ও আমার জানা হয়ে গেছে, বাছা!’

বাপ্পারা যখন ছোটো, তখনও বাগানে বড়ো ইঁদারাটার গায়ে হেমন্তর কিশোর বয়সে বানানো সেই জোয়ার-ভাটার মিটারটা ছিল, ভেতর উঠোন থেকেও উঁকি দিয়ে ডায়ালের চিহ্ন পড়া যেত। জ্ঞান হবার পর থেকে বাপ্পা হেমন্তমামার উদ্ভাবনী প্রতিভার গল্প শুনে এসেছে মায়ের কাছে, কিন্তু ওকে কখনো ওই মিটারটার কাছে যেতে দেখেনি। বাপ্পা আর তিতলি যখন বড়ো হচ্ছে, দুজনে এড়ে বাছুরের মতো লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বাড়িময়, হেমন্ত ততদিনে পুরোদস্তুর ফোটোগ্রাফার। হয় সে ক্যামেরার ব্যাগ কাঁধে এদিক-ওদিক চলে যায়, নয়তো বাড়িতে থাকলে সারাদিন ডার্করুমে পড়ে থাকে। কখনো-সখনো কাঠের ভারি ট্রাইপড কাঁধে নিয়ে ওর সঙ্গী হয় গামা।

শীতের শুকনো পাতাঝরার মরশুমে সাতগাঁর প্রবীণেরা দেহ রাখেন। তার আগে হেমন্তর কাজের চাপ বেড়ে যায়। বিশুষ্ক ঘন বলিরেখাময় মুখের ছবিতে দক্ষিণের ঘরটা ভরে ওঠে। সারাদিন ঘরের দরজা-জানলা এঁটে হেমন্ত রক্তলাল বাবের প্রভায় সেলুলয়েডের ওপর আলোছায়ার কারিকুরি ধরে। বাইরে দিনের আলো কমে গিয়ে সন্ধ্যা নামে, চামচিকে ওড়ে আকাশে, পাতার আড়ালে আমের বোলে গুটি আসে।

বাপ্পা-তিতলির দক্ষিণের ঘরে ঢোকা নিষেধ। ওখানে দামি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ছাড়াও বিষাক্ত রাসায়নিক রয়েছে। হেমন্ত যখন দরজা খোলা রেখে প্রিন্টে তুলি ছোয়ানোর কাজ করে, ওরা চৌকাঠ থেকে উঁকি দিয়ে দেখে লাল ভিনিগারগন্ধী আলোয় টেবিলে বিচিত্র সব যন্ত্রপাতি— এনলার্জার, রিফ্লেক্টার, স্টপ-বাথ— মার্কারির বোতলের গায়ে মানুষের খুলি আর কাটাকুটি হাড়ের লেবেল সাঁটা। কালো ঘরটার দেয়ালে কোনাকুনি তারে ক্লিপ-আঁটা সারি সারি ফোটোগ্রাফ, সাদাকালো, উদাস কুঞ্চিত মুখ আর ফ্যালফেলে চোখের ছবি, টেবিল ফ্যানের হাওয়ায় পাক খেয়ে চলেছে অবিরাম।

ততদিনে বাপ্পা জেনেছে, খুলি আর হাড়ের কাটাকুটি চিহ্ন মানে হল মৃত্যু, আর ওই ছবিগুলোর বেশিরভাগ বৃদ্ধবৃদ্ধাই আর বেঁচে নেই। লাল-কালো ঘরটা বুঝি মৃত্যুপুরী। ছবির জন্মপুরীও।

মানুষ মরে যাবার আগে কীভাবে কাগজের ওপর সাদাকালো দ্বিমাত্রিক ছবি হয়ে যায় সেই নিয়ে বাপ্পার কৌতূহলের শেষ ছিল না। ক্যামেরার ভেতরে ঢুকে ঠিক কী ঘটে দেখার কোনো উপায় নেই। কিন্তু বাইরে খর দুপুরের তাপবাষ্পে যখন বিশ্বচরাচর দুলছে, উঠোনের নিমগাছে কাক ঠোঁট ফাঁক করে নিশ্চল, বন্ধ জানলার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে আসা আলোর রেখাগুলো রান-গো-স্ট্যাচু খেলছে ঠান্ডা লাল মেঝেয়, তখন দক্ষিণের ঘরে কালো ঘেরাটোপের ভেতর লাল আলোর বৃত্তে বসে একা একজন মানুষ রানিং সলিউশনে সেলুলয়েডে ধরা ভূতেদের একের পর এক ফুটিয়ে তুলছে সাদা কাগজের ওপর। বহু বছর পরে ছবিটা কল্পনা করে বাপ্পার অদ্ভুত রোমাঞ্চ হবে।

ক্বচিৎ হেমন্তমামা ওদের ডার্করুমে ঢুকতে দেয়। বাপ্পা ঢুকতে চাইলেও তিতলি যায় না। বেঞ্জিনের বাষ্প আর বিভিন্ন রাসায়নিকের গন্ধে ওর বমি পায়। একই কারণে ও প্লাসেবোর লোভে দাদুর চেম্বারে গেলেও ফার্মেসিঘরে কখনো ঢোকে না, আঙুলে নাক টিপে বারান্দা পার হয়ে যায়। শৈশবকাল থেকেই তিতলির ঘ্রাণশক্তি প্রখর। বাগানে ভামবেড়াল এলে গোবিন্দভোগ চালের মতো গন্ধ, বৃষ্টি আসার আগে টক টক মেঘের গন্ধ সবার আগে টের পায়। এমনকি মন্দিরে পোড়ামাটির গায়ে শুষে থাকা সূর্যের আলোর গন্ধ আর চাঁদের আলোর গন্ধও আলাদা আলাদা করে টের পায় বলে দাবী করে। বাপ্পার গায়ে হার্লের পোড়া তেলের মতো গন্ধের ভেতরে কলকাতার বিভিন্ন গন্ধগুলো ঠিক খুঁজে নিতে পারে। ওর এই অলৌকিক ঘ্রাণশক্তির জন্যেই বয়ঃসন্ধির ঠিক আগে এক বসন্তের শুরুতে বাতাসে ভাসমান অদৃশ্য পরাগকণা ওর ফুসফুসে ছোবল বসাবে। কিন্তু সে আরও কয়েক বছর পরে।

ফোটোগ্রাফির জাদুকরি নিয়ে ওদের, বিশেষ করে বাপ্পার, অদম্য কৌতূহল দেখে হেমন্ত একদিন জুতোর বাক্সে কালো জ্বলে-যাওয়া নেগেটিভ সেঁটে পিন-হোল ক্যামেরা বানিয়ে দিল। যেকোনো আলোর উৎসের সামনে এনে ধরলেই সেখানে বিভিন্ন জিনিসের ক্ষুদে, উলটোনো ছবি ফুটে ওঠে তা সে মোমবাতির শিখা হোক কিংবা জ্বলন্ত বালবের দীপ্যমান ক্রিমির মতো ফিলামেন্ট, কুয়োর কপিকল হোক বা আদিরাম মন্দিরের জাহাজের খোলের মতো চুড়ো, নিমের পাতার ঝিরিঝিরি আলোছায়া, সূর্যালোক পিঠে নিয়ে চিন্তামণি, লেজ নেড়ে নেড়ে মাছি তাড়াচ্ছে। আলো কীভাবে সরলরেখা ধরে চলে, কীভাবে বস্তুজগতকে উলটে দিয়ে তাকে সঙ্কুচিত করে একটি জুতোর বাক্সের ভেতরে ভরে দিতে পারে, সে নিয়ে বাপ্পার বিস্ময়ের অন্ত নেই।

*

মি’লেডি, সাত রাজপুত্রের ময়ুরপঙ্খী নাওয়ে চেপে রামচন্দ্রের প্রস্তর মূর্তি সাতগাঁয়ে আসার ঢের আগে এই জল-জোয়ারের দেশে রামের কাহিনি এসেছে। সুবিশাল ভারতভূমির বিভিন্ন দিক থেকে নদীনালায় ভেসে ভেসে এসেছে সে কাহিনি, রাজমহল পাহাড় পেরিয়ে গঙ্গা বেয়ে সেন রাজাদের রাজধানী নবদ্বীপ ছাড়িয়ে ফুলিয়ার মাটিতে এসে কৃত্তিবাস ওঝা নামে এক কবির ভিটেয় এসে পড়েছে। যেভাবে পাড় ভাঙে জোড়ে, এক নদীতে এসে মেশে ভিন নদীর জল, সেভাবেই বাল্মিকীর মহাকাব্য এই সুজলাং সুফলাং দেশে যেখানে বর্ষায় কুঁড়ের ভেতর কাঠের খুঁটিও সবুজ পল্লবিত হয়, পাখিদের পেটে পেটে বৃক্ষরাজি ছড়িয়ে যায় দূরদূরান্তে পুজোদালান থেকে চন্ডীমন্ডপে, নদীর ঘাট থেকে মন্দির চাতালে গ্রামবাংলার কথকঠাকুরদের অনর্গল কল্পনার ভিয়েনে যুগ যুগ ধরে শ্রোতাদের মনে অঙ্কুরিত পল্লবিত হয়ে চলেছে, ঠিক যেমনি ভাবে হনুমান সীতার সন্ধানে অশোক বনে গিয়ে জীবনে প্রথম বার গাছের পাকা আম আস্বাদন করে তার কয়েকটি আঁটি ছুঁড়ে দিয়েছে ভারতভূমির দিকে, যেভাবে এদেশে আম এসেছে, এবং হনুমানের মুখে পাকা আমের রস মাখামাখি দেখে সীতা মায়ের মতোই স্নেহের আঁচলে মুছিয়ে দিয়েছেন, তারপর সেই আঁচল পেতে বনতলে বসে স্বামী-দেওরের সংবাদ শুনেছেন, ওঠার পর শাড়ির পেছন দিকে আমের দাগ লেগেছে কি না দেখার জন্য প্রজাতির স্বভাবজ কৌতূহলে হনুমান ফিরে ফিরে তাকাতেই বিরক্ত হয়ে বলে উঠেছেন— ‘আ মোলো, মুখপোড়া মিন্‌সে!’ আর সেই থেকেই বিশ্বের সব হনুমানের মুখ পোড়া, আর বিশ্বের সব পুরুষ মিসের অদম্য আগ্রহ নারীর পশ্চাদ্দেশের প্রতি।

আদিরাম মন্দিরের চাতালে দশমীর পর থেকে ত্রিসন্ধ্যাব্যাপী রামকথার বচনে কথকঠাকুর যখন রসিয়ে রসিয়ে এই অংশটি বলেন, মাঠভর্তি শ্রোতা হেসে কুটিপাটি হয়, ছোটোরা এ-ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে, বুড়ি বিধবারা একগাল ফোকলা হাসিতে থানের আঁচল চাপা দেন। আবার যখন বলতে থাকেন, রামের অটল ভক্তি পরীক্ষা করার জন্য মা দুর্গা পুজোর একশো আট নীল পদ্ম থেকে একটি কীভাবে সরিয়ে নিলেন, এদিকে মাঠঘাট ঘুরেও কিছুতেই আর অমন একটি আফোটা নীল পদ্ম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এদিকে পুজোর নির্দিষ্ট লগ্ন পেরিয়ে যাচ্ছে, এবং যখন অধৈর্য রাম তাঁর নিজের পদ্মলোচন উপড়ে তোলার জন্য ধনুকে তীর সংযোগ করেছেন, তখন দমচাপা হাহাকার বয়ে যায় শ্রোতাদের মাঝে, যদিও পরক্ষণেই মা দুর্গা আবির্ভূতা হয়ে রামচন্দ্রের হাত চেপে ধরেন যখন, সমবেত স্বস্তির শ্বাসবায়ু বয়ে যায় মন্দির চাতালে।

রাত্রিবেলা সরোজার দুই পাশে শুয়ে তিতলি আর বাপ্পা যখন এই কাহিনিগুলো আবার শোনে, রামায়নের জগৎ ভরে ওঠে সাতগাঁর চেনা মানুষে আর স্থানে, ছাড়িগঙ্গার জলে ফুটে ওঠে রাশি রাশি রামচন্দ্রের নীল চোখ, তার ওপরে মেঘের ছায়া পড়ে, উড়ন্ত বকের ছায়া পড়ে, হনুমানের হাতে গন্ধমাদন হয়ে ওঠে বাগানের এক কোণে মাটির পাহাড়, যেটি দুর্গাপুজোর আগেই প্রায় অদৃশ্য, ছায়াঘন আমের বনে সিঁথির মতো পথ দিয়ে হেঁটে আসেন সন্ন্যাসীরূপী রাবণ, শিয়ালকাঁটায় ছাওয়া উঁচুনীচু জমিতে কিষ্কিন্ধানগরীর ধ্বংসাবশেষ … বলতে বলতে সরোজা কখন কীভাবে যে আদিরামবাটির অতীত দিনের গল্পে চলে যান, শুনে মনে হবে বুঝি জন্ম থেকেই তিনি এই বাড়িতেই থেকেছেন, ধর্মতলার প্রাচীন বটের মতো দেখেছেন সব কিছু, সব মানুষ আর ঘটনাবলী, এতটাই নিবিড় যে রামপ্রাণ তাঁর নিজের শৈশবে ঘটা কোনো কিছুর ভুল বিবরণ দিলে তৎক্ষণাৎ শুধরে দেন। ভরা নদীর জল যেভাবে মৃদু কুলকুল শব্দ করে চলে, রাতে বিছানায় শুয়ে সেভাবেই কথা বলে যান সরোজা, গলার স্বরে উচ্চাবচ জোয়ারভাটায় ঘাটের সিঁড়িতে ছলাৎছল হাই তুলে আদা-জিরাবাটাগন্ধী নদী যা পাতলা ঝোলের মতো, যার দুই বিশুষ্ক বুকের চরে মাথা রেখে বাপ্পা আর তিতলি আচ্ছন্ন তন্দ্রায় ভাসতে ভাসতে ডুবতে ডুবতে মাথার চুলে বিলি-কাটা আঙুলের আদর নিতে নিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে আর স্বপ্ন বদলাবদলি করে দেখে, সকালে যে যার মতো আলাদা বিছানায় জেগে উঠে মনেই করতে পারে না কে যে কার স্বপ্ন দেখেছে।

এরই মধ্যে এক সকালে বাপ্পা জেগে উঠে অনুভব করল গায়ে তিতলির বাহুর সূক্ষ্ম রোমের সুড়সুড়ি। দিদার বিছানাতেই শুয়ে আছে দুজনে, কিন্তু দিদা নেই। ঘরের দরজা জানলা সব বন্ধ, মশারি ফেলা, আর দরজায় চাবির ফুটো দিয়ে আলোর রশ্মি মশারির গায়ে পড়ে উলটো করে বুনে তুলেছে ক্ষুদে উঠোন, ততোধিক ক্ষুদে নিমগাছ, তার নীচে কুয়ো, কপিকল সবই উলটোনো সিল্যুয়েট। বন্ধ ঘরটা জাদুবলে হয়ে গিয়েছে এক মস্ত পিন-হোল ক্যামেরা, মশারির পর্দায় প্রতিফলিত বাইরের পৃথিবী। সেখানে চলেফিরে বেড়াচ্ছে মানুষজন, তুলসীতলায় দিদা, বাঁকে গঙ্গাজল বয়ে আনল গামা, নিমগাছের ডালে কাক এসে বসেছে, কপিকলে জল তুলছে বামুনদিদা— সবকিছু নিখুঁত জীবনানুগ কিন্তু ক্ষুদে, উলটোনো আর অলীক।

সেদিন, সোমবার, মাঝরাত থেকে শুরু হল বৃষ্টি। অঘ্রাণ শেষের বঙ্গোপসাগরীয় নিম্নচাপের বৃষ্টি, চলল টানা তিনদিন ধরে। তার আগের দিন দুপুর থেকেই ভাড়ারে মেঝের ফাটলে পিঁপড়ের সারি ডিম পিঠে নিয়ে চলেছে দেখেছেন সরোজা, বামুনদিকে বড়ির ডাল ভেজাতে নিষেধ করেছেন। বুধবার ভোরে বৃষ্টির ভেতর ভিজতে ভিজতে হার্লে চালিয়ে কোয়ার্সভিল থেকে ফিরে বসন্ত জানালো, চারটে আঠের মিনিটে তিন পাউন্ড ওজনের ছেলে হয়েছে নতুনবউয়ের।

সকালে নদীতে গিয়ে সরোজা শাকম্ভরী দেবীকে খবরটা জানাতে গেলেন, কিন্তু দুপুরের স্নানে গিয়েও তাঁর কোনো সাড়াশব্দ পেলেন না। জলের ওপর অবিরাম বৃষ্টির শব্দ শুনলেন কেবল। আরও কিছু নৈঃশব্দ্য শুনলেন। ভিজে কাপড়ে ভেতরবাড়িতে ফিরে দেখেন ছাঁচতলায় বামুনদি ঝিনুক দিয়ে একটা বড়ো কালবোশের আঁশ ছাড়াচ্ছে।

‘মাছটা এখনই নন্দর-মাকে ডেকে দিয়ে এস বামুনদি,’— সরোজা নির্দেশ দিল–‘আর রান্নাঘরে গোবরছড়া দাও!’

বামুনদি কিছু বুঝল না, গৃহকর্ত্রীর কথা অমান্য করল না। পরদিন দুপুরে কাশীর মুক্তিভবন থেকে টেলিগ্রাম এল। শাকম্ভরী দেবী সজ্ঞানে মোক্ষলাভ করেছেন, যথাবিহিত মর্যাদায় হরিশচন্দ্র ঘাটে তাঁর অন্তিম কার্য সম্পন্ন হয়েছে।

সেবার বঙ্গোপসাগরীয় নিম্নচাপের রেশ পাঁচদিন ধরে চলল। একতলার ঘরের দেয়াল ঘেমে উঠল, চুনকামের পোঁচের নীচে ফুটে উঠল শাকম্ভরী দেবীর বিচরণশীল হাতের ছাপ, মেঝে থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতায়, একটানা, স্থির আলোকচিত্রে গতির ছায়ার মতো।