Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৫.৩

৫.৩

বেপরোয়া তরুণ নবাব সিরাজ, আলিবর্দি খাঁর নাতি। কলকাতায় হানা দিয়ে সে ইংরেজগুলোকে কচুকাটা করেছে, ওদের মাটির গড় গুঁড়িয়ে দিয়েছে, কোম্পানির কর্তারা জাহাজে উঠে চম্পট দিয়েছে সাগরের দিকে এই সংবাদে ফিরিঙ্গিডাঙায় লোকজন পথে নেমে উৎসব করেছে, কোয়ার্সভিলে ফরাসীরা চীনা হাউইবাজি পুড়িয়েছে। তার যে এভাবে খেসারত দিতে হবে কেউ ভাবতে পারেনি।

ইংরেজ কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমেছিল। সর্বত্র ওরা একচেটিয়া কারবার কায়েম করতে চায়, চাষিদের জোর করে আফিম নীলের চাষে বাধ্য করে। বৃদ্ধ আলিবর্দি খাঁর অকর্মণ্যতায় লোকে ক্রমশই নবাবী শাসনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তেইশ বছরের সিরাজ মসনদে বসেই কলকাতা আক্রমণের ছক কষল, হুগলি নদীতে শুরু হলো নবাবী নৌবহরের আনাগোনা। বাংলা থেকে ইংরেজদের উৎখাত করতে অন্যান্য ফিরিঙ্গি বণিকদের থেকে অর্থ অস্ত্র আদায় চলল।

সিরাজের ওপর ফিরিঙ্গিডাঙার খুব যে আস্থা ছিল তা নয়। কিন্তু যখন খবর এল নবাবী ফৌজ ইংরেজ কোম্পানিকে তার ডেরায় গিয়ে পর্যুদস্ত করেছে, উৎসবে মেতে উঠেছিল সাতগাঁবাসী। তারা জানত না, সুদূর প্রুশিয়ার সীমান্তে তখন ইংরেজদের সঙ্গে ফরাসীদের যুদ্ধ চলেছে, এবং কোয়ার্সভিলকে এজন্য খেসারত দিতে হবে। আর তাই এক বসন্তের অপরাহ্ণে যখন উপর্যুপরি কামানের ধ্বনিতে চারদিক কেঁপে উঠল, বারুদগন্ধী ধোঁয়ায় আকাশ ছাইল, কেউ ভাবতে পারেনি ঠিক কী ঘটছে।

ব্রিটিশ নৌবাহিনির দুটি জাহাজ থেকে কোয়ার্সভিলে গড়ের দিকে তাক করে গোলাবর্ষণ শুরু হলো সন্ধ্যার আগেই। ঘাটে ফরাসীদের জাহাজগুলো একে একে ডুবিয়ে দেওয়া হলো। রাত বাড়তে মাস্কেটধারী লালফৌজ ডাঙায় নেমে বিধ্বস্ত গড়ের ভেতর ঢুকে পড়ল, শহর জুটে শুরু হলো লুটপাঠ, অগ্নিসংযোগ। সেই আগুনের আভায় গলানো সোনার মতো হয়ে উঠল হুগলির জল। ফ্যাক্টরদের দল চারটি কোষায় সোনাদানা নিয়ে ত্রিবেণীর দিকে পালাচ্ছিল, কামান দেগে ডুবিয়ে দেওয়া হলো।

এই সময়েই একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট ৪২ পাউন্ডের গোলা এসে লাগে আদিরামের মন্দিরে।

*

মি’লেডি, দেড়শো বছর ধরে আদিরামের মন্দির ছিল সাতগাঁর ব্রাহ্মণদের যশ ও গৌরবের সৌধ। দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থী আসত। যাজক সেবাস্তিয়ান মানরিক মন্দিরগাত্রে পুরাণ মহাকাব্যের চিত্ররূপ দেখে বলেছেন— ‘নকল ইতিহাস’ (‘ফসো হিস্তোরিয়াস’)। তবু তিনি এর অপরূপ সুষমায় মুগ্ধ না হয়ে পারেননি। ইটিনেরারিও দে লা মিসিয়ন্স ওরিয়েস্তালেস দেল পাত্রে মানরিক বইতে একটি অনুচ্ছেদ জুড়ে রয়েছে আদিরাম মন্দিরের স্থাপত্যশৈলির বর্ণনা। সেই গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখতে রামাই পণ্ডিত পুথি সংগ্রহের অভিযানে নামলেন, রাঢ় বাংলার দুষ্প্রাপ্য পুথিপত্রে ভরে তুললেন টোলের বাড়ির পুথিশালা। ব্রিটিশ নেভির গানবোট থেকে ছোড়া গোলাটা মন্দিরে না লেগে তাঁর বুকে এসে লাগলে এর চেয়ে বেশি আঘাত পেতেন না। সবচেয়ে বেদনার যেটা, গোষ্ঠীপতিরা কেউ কেউ এই দুর্ঘটনাকে রামাই পণ্ডিতের দর্পের পরিণাম বলে ব্যখ্যা করল।

চৈত্রের সেই অপরাহ্ণের পরে-পরেই এমন দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে এল বাংলা ভাগ্যাকাশে, আদিরাম মন্দিরে গোলাবর্ষণকে নিছক দুর্ঘটনা রূপে দেখার কোনো উপায় রইল না। তিন মাসের মধ্যে ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভের নেতৃত্বে রণতরী হুগলি দিয়ে পাল তুলে গেল মুর্শিদাবাদের দিকে। ডাঙা দিয়েও কুচকাওয়াজ করে গেল কোম্পানির ফৌজ। পলাশীর আমবাগানে পর্যুদস্ত হলো নবাবের বাহিনি, দেশে ইংরেজ শাসনের সূচনা হলো।

রামাই পণ্ডিত মন্দির মেরামতের কাজে হাত দিলেন। যে সূত্রধরের নির্দেশে কারিগরেরা মন্দির নির্মাণ করেছিল, বিষ্ণুপুরে লোক পাঠিয়ে অনেক সন্ধান করেও তার বংশধরদের খোঁজ পাওয়া গেল না। বর্গি হামলায় তারা দেশ ছেড়েছে। মন্দিরের গঠনশৈলীর মূল নকশার ধারণা ছাড়া টাল-খেয়ে-যাওয়া উপরিভাগ সিধে করার উপায় ছিল না। দেয়ালে ফাটল চুন সুরকি পাটের ফেঁসো ও চিটে গুড়ের মিশ্রণে মেরামত করা হলো, খসে পড়া প্যানেলগুলি বদলানো হলো। নবাবের পতনে মুর্শিদাবাদে কর্মহীন হয়ে পড়েছিল হাতির দাঁতের শিল্পীরা। তারা এসে ছাঁচের বদলে মাটির ইট পুড়িয়ে খোদাই করে তুলল অতীব সূক্ষ্ম কারুকাজ। দুশো বছরের পুরোনো মধ্যযুগের চিত্ররীতির পাশাপাশি মন্দিরগাত্রে ঠাঁই পেল বাংলায় ঔপনিবেশিক যুগের দৃশ্যাবলী, যা এই কারিগরেরা এর আগে হাতির দাঁতের ওপর ফুটিয়ে তুলেছে।

দেড় বছর ধরে সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ হবার পরে মন্দির তার আগের চেহারায় ফিরল না। নতুন রিলিফগুলি যে কেবল ঢের সূক্ষ্ম ও সুচারু, বদলে- যেতে-থাকা বিশ্বের ছবি ফুটিয়ে তোলে তাই নয়, পুরোনো চিত্রাবলীর কালানুক্রমিক শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ খেঁটে গেল, পুরাণ আর ফিরিঙ্গি যুগ, মঙ্গলকাব্যের শিকারপদ্ধতি আর একালের বন্দুক ও নৌকার শৈলী মিলেমিশে পোড়ামাটির ওপর যেন এক কল্পনার হিস্টিরিয়ার সৃষ্টি হলো ইতিহাসের বিকারগ্রস্ত চিত্ররূপ। রামাই পণ্ডিতের নির্দেশে পূর্ব দিকের দেয়ালে, যেখানে গোলাটি এসে লেগেছিল, শুধুমাত্র গর্ত মেরামত করা হল। খসে-পড়া প্যানেলের জায়গায় বোবা, কারুকাজহীন টালি গেঁথে রাখা হলো, পরবর্তী প্রজন্ম যাতে কখনো ইংরেজদের দুষ্কর্মের কাহিনি বিস্মৃত না হয়।

তিথি দেখে ঘটা করে শান্তিস্বস্ত্যয়ন যজ্ঞ হলো, নবদ্বীপের বিশিষ্ট পণ্ডিতেরা এলেন। পুরীর শঙ্করাচার্যকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি নিজে এলেন না, গোবর্ধন মঠের প্রধান মোহান্তকে পাঠালেন। মোহান্তের বারো জন অনুচরের দলে ছিলেন মনোহর জানা নামে এক বাঙালি, তাঁর ডান পায়ে বিশাল গোদ। তিনদিন ব্যাপী পূজা যজ্ঞাদি শেষ হবার পর অতিথি অভ্যাগতরা বিদায় নেবার আগে রামাই পণ্ডিতের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করলেন মনোহর।

‘আপনি চৈতন্য গৌরাঙ্গ চখরা নামক পুথিটি সন্ধান করছেন আমি শুনেছি।’ মনোহর জানা বললেন। ‘আপনি কি সেই পুথির কোনো প্রতিলিপি পেয়েছেন?’

‘না, পাইনি।’ রামাই পণ্ডিত বললেন। ‘সেই পুথির কোনো প্রতিলিপি নেই বলেই জানি।’

‘আমিও তাই জানি,’ মনোহর বললেন। ‘পুথিটি আমি দেখেছি।’

‘আপনি দেখেছেন? আপনি ওড়িয়া ভাষা পড়তে জানেন?’ রামাই উৎসুক হয়ে উঠলেন।

হেসে ওঠেন মনোহর।— ‘এতকাল গোবর্ধন মঠে আছি, ওড়িয়া লিখতে পড়তে না জানলে চলে? তবে পুথিটি কিন্তু ওড়িয়া ভাষায় লেখা নয়। ওটি মাগধী প্রাকৃতে লেখা।’

‘তাই নাকি? কিন্তু আমি যে শুনেছি চৈতন্য গৌরাঙ্গ চখরার রচয়িতা বৈষ্ণবদাস?’

‘ঠিকই শুনেছেন, ওঁর নিবাস ছিল ওদন্তপুরী।’ মনোহর বলেন। ‘মহাপ্রভুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যে কয়জন ওঁর বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী ছিল বৈষ্ণবদাস তাদেরই একজন। একটি সিন্দুকের ভেতরে লুকিয়ে থেকে তিনি মহাপ্রভুর হত্যার দৃশ্য দেখেছেন।

রামাই শিউরে ওঠেন। ‘সিন্দুকের ভেতর?’

‘হ্যাঁ, তার কারণ ওরা বৈষ্ণবদাসকেও খুঁজছিল। মনোহর রামাই পণ্ডিতের চোখে মুখে উদগ্র কৌতূহল লক্ষ করেন।— ‘দিনটা ছিল আষাঢ়ের পূর্ণিমা, সকাল থেকেই আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমেছিল। দুপুরের ভোগের পর জগন্নাথ মন্দিরের মূল ফটকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাকশালের ছ জন দ্বারপাল মহাপ্রভু ও তাঁর তিন শিষ্য স্বরূপ দামোদর, গদাধর পণ্ডিত ও গোবিন্দকে পিছমোড়া করে গরুড় স্তম্ভের পেছনে নিয়ে যাচ্ছে দেখেছিলেন বৈষ্ণবদাস। কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টির শব্দে কিছু শুনতে পাননি। রাত্রি তৃতীয় যামে বৃষ্টি থামে, আকাশ পরিষ্কার হয়ে ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ভেসে যেতে থাকে চারদিক। বৈষ্ণবদাস সিন্দুক থেকে বেরিয়ে এসে দেখেন চারটি মৃতদেহ পাথরের ওপর শোয়ানো।’

‘তার মধ্যে মহাপ্রভুর দেহও ছিল?’

‘তার মধ্যে মহাপ্রভুর দেহও ছিল।’ মনোহরের কন্ঠস্বর ভারি হয়ে আসে। ‘চারজনকেই গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনজনের চোখে মুখে তীব্র আতঙ্কের ছাপ, জিভ বেরিয়ে এসেছে। কেবল মহাপ্রভুর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি গভীর নিদ্রা গিয়েছেন। চারজনেরই কপালে ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে কুঁদে তোলা তৃতীয় নয়ন থেকে রক্ত ঝরে শুকিয়ে গিয়েছে।’

‘হা ঈশ্বর! তারপর?’

‘কাছেই কোথাও শাবলের আঘাতে মন্দিরের চাতালে পাথর খুড়ে তোলা হচ্ছিল, বৈষ্ণবদাস সচকিত হয়ে ফের সেই সিন্দুকে লুকোলেন। দেহগুলো তুলে নিয়ে গেল ওরা। সকালে আলো ফুটলে মন্দিরের ফটক খুলে দেওয়া হলো, দর্শনার্থীতে ভরে উঠতে লাগল চাতাল, বৈষ্ণবদাস সিন্দুক থেকে বেরিয়ে সেই ভিড়ে মিশে গেলেন। শত শত মানুষের পায়ের নীচে কোথায় যে হারিয়ে গেল নৃশংসতম অপরাধের চিহ্ন, খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

রামাই পণ্ডিতের মুখের অভিব্যক্তি দেখে উনি কিছু বলে ওঠার আগেই মনোহর বললেন— ‘চৈতন্য গৌরাঙ্গ চখরা বর্তমানে যার কাছে রক্ষিত আছে সে আমার বিশেষ পরিচিত। উপযুক্ত অর্থমূল্যে সে পুথিটি হস্তান্তর করতে প্রস্তুত। একটিই শর্ত, তার নাম ধাম গোপন রাখতে হবে।’

‘ওটি আমার চাই!’ রামাই পণ্ডিত বললেন। ‘এজন্য যেকোনো মূল্য দিতে আমি প্রস্তুত।’

শাস্তিস্বস্ত্যয়নের তিন দিন পর অভ্যাগতরা একে একে বিদায় নিলে বুধবার ভোরের আলো ফোটার আগেই রামাই পণ্ডিত মনোহর জানার সঙ্গে রাঢ়দেশে যাত্রা করলেন। আগের রাতে তাঁর জ্যেষ্ঠ্যপুত্র রাজারামের স্ত্রী ভুবনেশ্বরী পথের জন্য শুকনো খাবার, তৈজস, চকমকি পাথর ইত্যাদি গুছিয়ে দিল।

‘ওই গোদ-অলা মিনসেটাকে দেখে মন আমার কু গাইছে,’ ভুবনেশ্বরী একান্তে রাজারামকে বলল। ‘ঠাকুরের সঙ্গে কাউকে পাঠানো যায় না?’

‘যত্তসব মেয়েলি সন্দ!’ রাজারাম ঠোঁট উলটে বলল। ‘ঠাকুর এতকাল একাই হাট-মাঠ চষে বেড়িয়েছেন, সকলে মান্যি করে। কার সাধ্যি ওঁর ক্ষতি করবে?’

পিতার অনুপস্থিতিতে বড়ো ছেলে রাজারাম চতুষ্পাঠী ও পূজা অর্চনার দায়িত্ব নিল। শনিবার সকালে মন্দিরে গিয়ে আদিরামের বিগ্রহের পায়ের কাছে একখণ্ড কাগজ দেখতে পেল, তাতে বাংলায় লেখা—

সাতগাঁর চক্রবর্ত্তী কুলচুড়ামণি পরমপূজ্য বিদ্যানিধি শ্রীযুক্ত রামতনু শাস্ত্রী আরামবাগ হইতে তিন ক্রোশ উত্তরে দ্বারকেশ্বর নদীর তীরে ভগ বিষ্ণু মন্দিরের প্রাঙ্গণে নিমবৃক্ষের নীচে সমাধিস্থ হইয়াছেন।

কাগজের টুকরো মন্দিরে কীভাবে এল কেউ জানে না। ওই গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লেখা বার্তায় অশুভের ছায়া দেখতে পেল রাজারাম। সেদিনই দুপুরের আগে একটি ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে আট জন গোষ্ঠীপুরুষের সঙ্গে চলল ইংরেজদের বানানো নতুন মোরাম বিছানো পথ ধরে। সন্ধ্যায় আরামবাগে পৌঁছে দলটি বৈষ্ণব ধর্মশালায় এসে উঠল। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, জনৈক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত দুদিন আগে এই ধর্মশালায় এসে এক রাত্রি বাস করেন, এবং তাঁর সঙ্গে অনুচরটির শ্লীপদ ছিল। দ্বিতীয় দিন দুজন পাগড়িধারী ওঁদের সঙ্গে যোগ দেয়, এবং ওঁরা চলে যান। ওই দুজনকে দেখে মনে হয়েছিল বণিক, শ্লীপদ ব্যক্তিটির পরিচিত।

পরদিন আলো ফুটতেই রাজারামরা বার্তা নির্দেশিত পথে শহর ছাড়িয়ে তিন ক্রোশ উত্তরে দ্বারকেশ্বরের ধারে সেই পরিত্যক্ত মন্দিরটি খুঁজে পেল। তার উঠোনে নিমগাছ ছিল, গাছের গোড়ায় রামাই পণ্ডিতের খড়ম দুটি রাখা ছিল। তিন হাত মাটি খুঁড়ে তাঁর দেহটি পাওয়া যায়, গলায় উড়নির ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরনের ধুতিটি ছাড়া সঙ্গে আর কিচ্ছুটি নেই না কোনো পুথি, না সেই ফিরোজা রঙের রেশমি বটুয়া, যার মধ্যে তিনি মোহর রাখতেন।

তখন বাংলা জুড়ে ঠগীদের ঘোর প্রাদুর্ভাব, মি’লেডি। এবং এটিও যে ঠগীদের কাজ নয় এমন ভাবার কোনো কারণ ছিল না। শুধু ওঁর কপালে কোনো ধারালো অস্ত্রে খোদাই করা ক্ষত ছিল। শুষ্ক কাঁকরে মাটিতে রক্ত শুষে গিয়ে চোখের আকারের তিলকচিহ্ন ফুটেছে।

*

মি’লেডি, তখন সদ্য সুবে বাংলার দেওয়ানি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে এসেছে। নৈরাজ্য নেমেছে ডিহি বাংলায়। পুরোনো কাজি দারোগাদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে কোম্পানির বেতনভুক তহশিলদারেরা, এদিকে বাজার ছেয়ে গিয়েছে নানান মুদ্ৰায়। কড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন এককের তামার পয়সা, মোগল টঙ্কা থেকে সাতগাঁর টাকশালের ছাপ মারা সুলতানি মোহর, লোহা-পেতল মেশানো চাকতি থেকে উজিরের সিক্কা, হিস্পানি ডলার, মলাক্কার মিয়াম, ভেনিসের ডুকাট, ইংরেজি ক্রাউন, আর্কটের রুপী . কী নেই। কিন্তু তাই দিয়ে কিনবেটা কি, বাজার থেকে তাঁতবস্ত্র যে উধাও! জন কোম্পানির চড়া রপ্তানি শুল্ক আর একচেটিয়া নীতির সাঁড়াশি চাপে বাংলার তাঁতিদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। ফরাসী ও ওলন্দাজ ফ্যাক্টরদের সঙ্গে লুকিয়ে কারবার করছিল যারা, তাদের ধরে প্রকাশ্য রাজপথে বেত্রাঘাত করল কোম্পানির সান্ত্রীরা, তাঁতগুলো ভেঙে দেওয়া হলো, কারোর এমনকি বুড়ো আঙুলও কেটে নেওয়া হলো। আতঙ্কের আবহে অনেকেই মাকু ছেড়ে লাঙল ধরল, আফিম আর নীলের কারখানায় মজুরি নিল। সরস্বতীর দুই পাড় জুড়ে বিস্তীর্ণ সরস ফুটি কার্পাসের ক্ষেতগুলোয় ছেয়ে এল নীল আর আফিমের চাষ, জলের ধারে বাঁশের মাচায় সকালে সন্ধ্যায় সুতোকাটুনি মেয়ের দল মিলিয়ে গেল গল্পকথার কিন্নরীদের মতো।

প্রতি বছর শীতের শুরুতে ধর্মতলায় বটের নীচে বিভিন্ন ধরনের সাধুসন্ন্যাসীর দল আসে। হিমালয়ের সাধু, এসময়ে ওদের গুহাগুলো বরফে ঢেকে যায়। বাংলার গ্রামেগঞ্জেও বছরের মেলাপার্বণের মরশুম। সাধু সন্ত পীর ফকির দরবেশদের আনাগোনা চলে শীতকালভর। কখনো দল বেঁধে, কখনো একা, গান গেয়ে ভিক্ষে করে দোরে দোরে ঘুরে আখড়া খানকার জন্য চাঁদা তোলে কেউ কেউ।

বাংলার দেওয়ানি পেয়ে খাজনা আদায়ে বাধা পড়ছে ছুতোয় এইভাবে চাঁদা তোলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ছাইমাখা অর্ধনগ্ন গঞ্জিকাসেবী জটাজুটধারী চালচুলোহীন পুরুষের দল, আইনের চোখে সন্দেহভাজন; কোথাও কোথাও তাদের ধরে কয়েদখানায় পোরা হতে লাগল। সন্ন্যাসীর দল গেল ক্ষেপে। ধর্মতলায় খবর এল, বেতোরের কাছে গ্রামে তহশীলদারের পেয়াদাদের ত্রিশূল দিয়ে আক্রমণ করেছে ওরা, ধুনির চিমটে দিয়ে একজনের চোখ উপড়ে নিয়েছে।

প্রত্যাঘাত এল উর্দিধারীদের থেকে, চারজন নাগা সাধুকে বেয়োনেটের খোঁচায় মেরে তাদের দেহগুলো গঞ্জের হাটে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো কসাইখানার পশুর মতো। বীভৎস সংবাদটা ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো।

ধর্মভীরু গ্রামের মানুষের চোখে সন্ন্যাসী দরবেশরা অজর অবধ্য, অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। তারা হিমালয়ের গুহায় শুধুমাত্র ছাই মেখে বাস করে, হিংস্র বন্য জন্তু বশ করে মন্ত্রবলে, আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটে, কেউ শীর্ষাসনে কেউ বা এক পায়ে ভর দিয়ে, কেউ গাছের ডালে কিংবা দেহ অকল্পনীয় বেঁকিয়ে গিট পাকিয়ে বছরের পর বছর কাটায়, বায়ু থেকে খাদ্য গ্রহণ করে, পায়ুদ্বার দিয়ে অস্ত্রাশয় বের করে নদীর জলে ধৌতি করে। এই ঐশী শক্তিধরদের এভাবে হত্যা করায় ক্ষোভের সঞ্চার হলো।

মি’লেডি, কয়েকশো বছর ধরে যে গ্রামবাংলার জীবনছন্দ প্রবাহিত হয়েছে শান্ত নির্দিষ্ট ধারায়, বখতিয়ার খিলজি আসার পর সুলতানি শাসন থেকে শুরু করে মোগল সুবা ও নবাবী আমল, তারপর পর্তুগীজ ও অন্যান্য ফিরিঙ্গিরা এসে ঘাঁটি গাড়ার পরেও অটুট থেকেছে সেই ধারা। সেই বাংলার বুকে নেমে এসেছে কোম্পানি শাসনের অভূতপূর্ব করাল ছায়া। কোম্পানির জুলুমে লোকে বীতশ্রদ্ধ হয়েই ছিল, সাধু ফকিরের দল গ্রামে গ্রামে ঘুরে হতাশা আর ক্ষোভের চাপা আগুনে ইন্ধন দিতে লাগল। কাজ-হারানো বৃত্তিজীবীর ছোটো ছোটো দল তৈরি হলো, দা সড়কি কাস্তে বল্লমে সজ্জিত হয়ে উঠল। ধর্মতলায় খবর এসে পৌঁছল, ফকির সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে লোকে কোম্পানির খাজনাবাহী গাড়ি লুঠ করেছে। গাড়িগুলো জেলা সদরের কাছারি লাগোয়া তোষাখানায় যাচ্ছিল।