সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৫.৪
৫.৪
এসবের মাঝেই পতিগৃহে এল আদরিণী।
সে রজস্বলা হবার পর কয়েক বছর কেটে গিয়েছে। রামদেবের সঙ্গে তার বিবাহের পরেই একের পর এক বিপর্যয় এসেছে আদিরামবাটিতে। কামানের গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আদিরামের মন্দির, রামাই পণ্ডিত খুন হয়েছেন। বাংলায় শুরু হয়েছে ইংরেজ কোম্পানির শাসন। ঘুঘুডাঙায় রামদেবের পরিণীতার কথা সকলে ভুলেই গিয়েছিল। রাজারামকে লেখা দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের পত্র পেয়ে স্মরণে এল। প্রবীণ ব্রাহ্মণ সংসারের মায়া কাটিয়ে এবার কাশীবাসী হতে যাচ্ছেন। তার আগে তাঁর গৃহে আদিরামবাটির গচ্ছিত স্ত্রীধন, রামদেবের ধর্মপত্নী ও স্বীয় কন্যা আদরিণীকে স্বামীগৃহে নিয়ে যাবার আয়োজন করা হোক, এটুকুই তাঁর প্রার্থনা। সেইসঙ্গে তাঁর ইচ্ছা, তাঁদের গৃহদেবতা নারায়ণশিলাও যদি মন্দির সংলগ্ন ঠাকুরবাড়িতে আশ্রয় পান, যেমনটা স্বর্গীয় রামাই পণ্ডিতমশাই তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিলেন।
দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের চিঠি আর সন্দেশের চ্যাঙারি নিয়ে ঘুঘুডাঙা থেকে এল নাপিত বউ। কিন্তু সেই সন্দেশের স্বাদ রামদেবের জিভে তেতো হয়ে উঠল যখন মেয়েমহল থেকে তার কানে খবর এল, আদরিণীর পায়ের সমস্যা সারেনি, বরং আরও জটিল হয়েছে। নাপিত বৌয়ের পেট থেকে এই কথাও বের হলো যে ওটি সাধারণ চোট-লাগা জনিত নয়। এ এক কঠিন দুরারোগ্য ব্যাধি, যার কবলে আদরিণীর মা-ও ক্রমশ চিরপঙ্গু হয়ে মারা যান।
‘পুরুত ঠাকুর পণ্ডিত মশাইকে ঠকিয়েছে, খুঁতো মেয়ে গছিয়ে দিয়েছে!’ সকলে একযোগে বলল।
রাজারামও তাতে সায় দিল। — ‘ও বউ আনার দরকার নেই, আমরা দেবুর আবার বিয়ে দেব।’
আদরিণীকে এবাড়িতে না-আনার প্রস্তাব দানা বেঁধে উঠতে বিরুদ্ধ স্বরটা অপ্রত্যাশিতভাবে এল রাজারামের স্ত্রী ভুবনেশ্বরীর দিক থেকে
‘ঠাকুর এক কথার মানুষ ছিলেন। উনি সগ্গে গ্যাছেন, আমরা ওনার কথা অছেদ্দা করতে পারিনে। পুরুত ঠাকুরের নারাণশিলা যদি এ বাড়িতে এসে দুবেলা ফুলজল পায়, ওনার মেয়েও দুটি অন্নজল পাবে। আর ঠাকুরপো চাইলে একটা কেন পাঁচটা বিয়ে করুন না। কে দোরে কাঁটা দিচ্ছে?’
শুভ দিন দেখে আদিরামবাটি থেকে পালকি পাঠানো হলো। তাতে নববধূর সঙ্গে রুপোর সিংহাসনে এল কষ্টিপাথরের শালগ্রাম, তার গায়ে সাদা পৈতের মতো শিরা। নাপিতবউ অতিরঞ্জন করেনি, আদরিণীকে পালকি থেকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে নামাতে হলো। কোমর থেকে সামনে ঝুঁকে, বাম হাতে হাঁটু খামচে ধরে দেহের উপরিভাগের ভার রেখে সে কোনোমতে গুরুজনদের একে একে প্রণাম করল। দেহবিকৃতির যন্ত্রণা ছাপিয়ে ওর সুন্দর ফুলের মতো মুখে ফুটে উঠল অমলিন হাসি। অনেকেই হতাশ্বাস চাপল, ভুবনেশ্বরী গোপনে চোখের জল মুছল। শুধু যার মধ্যে কোনোরকম হেলদোল দেখা গেল না সে হলো রামদেব।
ততদিনে সে তার বিবাহের যৌতুক হয়ে আসা এগারোটি প্রাচীন পুথির ভেতর ক্রমশ আবিষ্কার করতে শুরু করেছে আধোচেনা ভাষায় রচিত এক আশ্চর্য রহস্যময় জগৎ।
.
বাল্যকালে শাস্ত্রপাঠে মতি ছিল না রামদেবের। টোলের বাড়ি থেকেও রাখাল বালকদের সঙ্গে মিশে সাতগাঁর আশেপাশে বনেবাদাড়ে ঘুরে, আমগাছে উঠে আম পেড়ে, সরস্বতীতে সাঁতার কেটে, ছাড়িগঙ্গায় ডোঙা ভাসিয়ে, সুলতানি টাকশালের ধ্বংসস্তূপের আড়ালে গিয়ে গঞ্জিকা সেবন করে, এমনকি ধর্মতলায় গিয়ে আউলে- বাতুল-তান্ত্রিক সঙ্গ করে দিনযাপনেই রুচি ছিল তার। একবার তো সাধুদের সঙ্গে হিমালয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টাও করেছিল। এই বেয়াড়াপনার জন্য রামাই পণ্ডিত তাকে কঠোর শাস্তি দিতেন, অন্নজল বন্ধ করে দিতেন, পুথিশালার দরজায় কুলুপ এঁটে বন্দি করে রাখতেন, ওর মাথার শিখা কড়িকাঠের সঙ্গে বেঁধে পাণিনির ৩৯৫৯টি অষ্টাধ্যায়ী সূত্র মুখস্ত করাতেন।
অগ্রজ রাজারামের আচারনিষ্ঠা, শাস্ত্রচর্চায় আগ্রহ, অল্প বয়সে একের পর এক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ন্যায়রত্ন বিদ্যানিধি ইত্যাদি উপাধিলাভ, তর্কসভায় ক্ষুরধার তার্কিক হিসেবে খ্যাতির বিপরীতে রামদেবের সৃষ্টিছাড়া চরিত্রলক্ষণ প্রকট হয়ে ফুটে উঠতে লাগল।
ওই এগারোটি পুথি যে তার মধ্যে এমন এক পরিবর্তন আনবে সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। রামাই পণ্ডিত গত হবার পর রাজারাম টোলের আচার্য হয়েছে, সংসারের হাল ধরেছে। রামদেব পুথিশালার এক কোণে বসে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এগারোটি পুথি পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করে চলেছে। গদ্য ও পয়ার ছন্দে লেখা চম্পুগুলি সভাকাব্যর চর্চিত গিল্টি-করা জগৎ থেকে এতটাই আলাদা, এমন এক চেনা দৈনন্দিন আটপৌরে জীবনছন্দের কথা বলে যে এই বিষয় নিয়েও যে পুথি রচনা হতে পারে সেটা রামদেবের কাছে এক পরম বিস্ময়। সবচেয়ে আশ্চর্য যা, চম্পুগুলি গাঁথা হয়েছে মাটির খুব কাছাকাছি কোনো ভাষায়, যা খানিকটা কথ্য ভাষার মতোই কিন্তু আবার ঠিক বাংলা ভাষাও নয়।
হেঁয়ালির মতো সেই ভাষাটা সে একটু একটু করে বুঝতে শুরু করেছে যখন, তখনই আদরিণী স্বামীগৃহে এল। রামদেব তাকে বিবাহের দিন কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখেছে মশালের আলোয়— আলতায় রাঙানো ক্লান্ত মুখ, শোলার মুকুটে বাঁধানো, হাতে-ধরা জোড়া পানপাতা থেকে উঁকি দিচ্ছে দুটি উজ্জ্বল সন্ত্রস্ত চোখ। মনে হয় যেন কতকাল আগের, প্রায় পূর্বজন্মের ঘটনা।
এতকাল পরে সে এলই যখন, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এক পায়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে দেহটি সামনে বাঁকিয়ে দেয়াল ধরে ধরে চলে (যেভাবে বহুকাল পরে চলবে এই বাড়িরই এক মেয়ে, কিন্তু সে বৃদ্ধ বয়সে)। প্রতিটি পদক্ষেপে বুঝি যন্ত্রণায় দীর্ণ হতে থাকে। কিন্তু এসব নিয়েও আদরিণী কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ির প্রায় সকলের মন জয় করে নিল। তার চলচ্ছক্তির ঘাটতি সে পুষিয়ে দিতে লাগল আদিরামবাটির সকলের প্রতি, এমনকি পশুপাখিদেরও প্রতি, বিশেষ দৃষ্টি আর সহমর্মিতা দিয়ে। সকলকে সহজ আন্তরিকতায় বেঁধে ফেলল ঘুঘুডাঙার পুরুতবাড়ির মেয়েটা শীতের সকালে গোয়ালে গরুর জাবনা গরম করা হয়েছে কি না জেনে নেওয়া থেকে শুরু করে সেই মরমী দৃষ্টি তেঁতুলের বিচি ছাড়িয়ে রোদে দেওয়ায় বিস্তৃত হলো, যাতে বটঠাকুর রাজারাম যখন সেই বিচিগুলো সেদ্ধ করে ক্বাথ বের করে পুথির তালপাতায় প্রলেপ দেবার জন্য ব্যবহার করবেন তাতে যেন ঘুনপোকা না থাকে, আবার পুর্ণিমা অমাবস্যায় ভুবনেশ্বরীর হাঁটুতে বাতের বেদনার জন্য জড়িবুটির তেল তৈরি করিয়ে মালিশ চলল।
আদরিণী রোগমুক্ত হয়ে হৃতস্বাস্থ্য ফিরে পাবে, সেই প্রতীক্ষায় রামদেব দেহমিলন স্থগিত রেখেছিল। কিন্তু বছর ঘোরার আগে উত্তরোত্তর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে লাগল। রামদেব আজকাল আদরিণীকে নিয়ে ঘরে পুথিপাঠে মগ্ন হয়ে থাকে, সকালের দিকে ছাত্র পড়ানোর জন্য কেবল টোলের বাড়িতে যায়। কোমরের নীচ থেকে পায়ের পেশিগুলি ক্রমশ শিথিল নির্জীব হয়ে পড়ায় সে নিজেই স্ত্রীর শুশ্রষা করতে শুরু করল। বাড়ির দাসদাসীদের সাহায্যও প্রত্যাখ্যান করল।
এমন ঘটনা আগে কে কবে দেখেছে?
আত্মীয়স্বজনেরা ছিছিক্কার করতে লাগল।
এসব কি পুরুষ মানুষের কাজ? তারা বলল।
স্ত্রীর যে পাপ হচ্ছে তাতে অক্ষয় নরকবাস নিশ্চিত!
এবং এ জন্মেই তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে, সেটা তো চোখেই দেখা যাচ্ছে! রাজারাম ভাইয়ের ইচ্ছে-অনিচ্ছের তোয়াক্কা না করেই ওর আবার বিবাহ দেবার জন্য ঘটক ডেকে পাঠালেন। শুধু পুত্রলাভই তো নয়, দ্বিতীয় স্ত্রী ঘরে এলে তার হাতে আদরিণী যথোপযুক্ত সেবাও তো পাবে ওকে ডেকে বোঝাতে গেলেন সে কথা।
প্রতিবাদে রামদেব আদরিণীকে নিয়ে মূল বাড়ি ছেড়ে মেটেঘরে গিয়ে উঠল। পশ্চিম দিকে আমবনের ধারে নির্জন মেটেঘরটা রামাই পণ্ডিতের মৃত্যুর পর খালিই পড়ে ছিল। এই পৃথিবীর এক কোণে বসে দুটিমাত্র জিনিসের প্রতি বাকি জীবনটা নিবেদন করতে রামদেব মনে মনে প্ৰস্তুত বিকলাঙ্গ আদরিণী ও সেই এগারোটি পুথি।
.
প্রজাপতির ডানার মতো স্বচ্ছপ্রায় অতীব ভঙ্গুর তালপাতায় লেখা, পাতা উলটে পড়ার সময় জোরে শ্বাসত্যাগ করলেও ধুলো হয়ে ঝরে যাবে। প্রাণায়ামের শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ অভ্যাস করে রামদেব অটল মনঃসংযোগের শক্তি অর্জন করেছে। তমসাচ্ছন্ন আকাশে যেমত চন্দ্রোদয় ঘটে, ক্রমশ তার বোধের ভেতরে অস্পষ্ট ফুটে উঠছে চিত্রকল্পরাজি। প্রত্যক্ষ অর্থের আড়ালে আরও গভীর কিছু বলতে চাইছে বুঝি অজানা গোপন এক চর্যা, তার এযাবৎ জানা বৈদিক এমনকি বৌদ্ধ জ্ঞানতন্ত্রেরও বাইরের কিছু। এক আলোছায়াময় প্রান্তিক বিশ্বাসের সীমানা দৃষ্টির সীমায় ফুটে উঠলেও ভাষার অনুষঙ্গ রামদেবকে বারে বারে ফিরিয়ে দেয় রাখালদের সাহচর্যে তার সদ্য-ছেড়ে-আসা বেপরোয়া দিনযাপনের স্মৃতি, চিত্রকল্পের ডোঙায় চেপে সে পাড়ি জমায় ছাড়িগঙ্গার ওপারে ডোম বসতিতে, যেখানে ডোমনি শরের ঝুড়ি ও মোহজাল বোনে ব্রাহ্মণ কবিকে ঘিরে, কবি কুলত্যাগ করে পৈতে পুড়িয়ে গলায় হাড়ের মালা পরে ছাই মেখে শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়ায়, কামের শরে বিদ্ধ শিঙেল হরিণ আপন কস্তুরীর গন্ধে বাতুল যেন বা ঘাসজল খেতে ভুলে যায়, কবি নিজেকে বলে— ‘ওরে তুই বন ছেড়ে পালা! হরিণ মাটিতে খুরের আঘাতে নদীর ঢেউয়ের মতো ধ্বনি তুলে আরও গহীন আঁধার অরণ্যে গিয়ে ঢোকে, যেখানে পাতার ফাঁকে আসা চাকা-চাকা জ্যোৎস্না আর নৈঃশব্দ্য জমিয়ে সৃষ্ট বাঘিনী ওৎ পেতে আছে, যৌবনের মদমত্ত গতিতে শিকারি তাড়া করেছে শিকারকে, দুজনের দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছে, হরিণকে তাড়িয়ে নিয়ে জলের উদগ্র জিহ্বার মতো সরু ডাঙায় এনে ফেলেছে বাঘিনী, তিনদিকে জল একদিকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখব্যাদান থেকে লালা ঝরছে, এদিকে বাতাস বইছে জলত্বকে বীচি কেটে, বাঘিনী এই বুঝি ঝাঁপ দিল, সহসা হরিণ তার রাজসিক দেহখানি মুচড়ে শিঙের মুকুটে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ গিঁথে নিয়ে পিছনের একটি পা তুলল, আসন্ন মৃত্যুর আতঙ্কে উচ্ছ্রিত তার যৌনাঙ্গ, মদনরসক্ষরা, তপ্ত কস্তুরীর গন্ধ বাতাসে উড়ে এসে লাগল বাঘিনীর নাকে, তার নাসারন্ধ্র প্রসারিত হলো, শ্বাস দ্রুত হলো, খিদের চেয়েও গভীর জটিল প্রবৃত্তিতে আমূল বিদ্ধ হলো বাঘিনী, মাটিতে দেহটা গুটিয়ে ঝাঁপ দেবার বদলে শিথিল করে দিল সেই শিঙেল হরিণ রাজার প্রতি আমূল সমপর্ণের ভঙ্গিমায় …
আমবনের ধারে ঘর। দিনের বেশিরভাগ সময় ছায়াচ্ছন্ন থাকে। কুশের আসনে বসে চন্দনকাঠের রেহালের ওপর ঘাড় গুঁজে অক্ষর রাশির দিকে একটানা তাকিয়ে থাকতে থাকতে রামদেবের চোখের শিরা দপদপ করে। এক কোণে সবুজ ছায়ায় একটি তরুণী দেহ ক্ষয়ে যেতে থাকে অজানা রোগে। ক্রমশ আদরিণী বাক্শক্তি হারায়, তারপর খাদ্য গলাধঃকরণের ক্ষমতা হারায়, শ্বাস নেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। যে একাগ্রতা আর সতর্ক ধৈর্য সহকারে পুথিগুলি নাড়াচাড়া করে রামদেব, সেভাবেই স্ত্রীর সেবা করতে লাগল। সকালবেলায় টোলে ছাত্র পড়িয়ে পুথিশালায় ঢুকে চরক শুশ্রুত ঘেঁটে আমবনের থেকে বিবিধ জড়িবুটি এনে তেল প্রস্তুত করে আদরিণীর অঙ্গে মালিশ করে দিতে লাগল।
লজ্জায় আত্মগ্লানিতে মরে যেতে যেতে আদরিণী ক্ষীণ কণ্ঠে প্রতিবাদ জানায়- যে সেবা ওর নিজের দেবার কথা, তাই কী না সে পাচ্ছে, এ জন্য যে মরেও শান্তি হবে না। ফিসফিস করে জানতে চায় রামদেব ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছে কি না, নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখছে কি না।
দিন দিন যতই তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ক্ষয় হতে থাকে, ততই ক্রমশ সে রামদেবকে আর্দ্র মায়ার জালে বাঁধতে লাগল। কঙ্কালসার মুখে হাসিটা ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল। রামদেব এখন ওর নির্ভার ফাপা দেহটা কোলের ওপর তুলে বেড়ালছানাকে খাওয়ানোর মতো করে তরল খাদ্য দিতে থাকে, দিনের পর দিন এক বিচিত্র মাদক আতঙ্কে প্রত্যক্ষ করে চোখের সামনে কীভাবে একটি মনুষ্যদেহে নবযৌবনের উন্মেষ আর জরার অপ্রতিরোধ্য ক্ষয় ঘটছে, একই সঙ্গে ঘটছে, যেন এক অকল্পনীয় গ্রহে একসাথে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত ঘটছে। রামদেব উপলব্ধি করে, সৌন্দর্যের স্ফুরণের মধ্যেই সুপ্ত থাকে বিলুপ্তির বীজ।
আশ্বিনের গোড়ায় আদরিণীর অঙ্গে বিভিন্ন অস্থিতে গ্রন্থিগুলো বিশুষ্ক আড়ষ্ট হয়ে এল, ঘাড় ঘোরানোর শক্তিও হারালো সে। যেন কাঠের পুতুল, জীবন্ত, ধীর লয়ে শ্বাস নেয়, ক্ষীণ বিশুষ্ক পাতার খসখস শব্দের মতো কথা বলে, কথার ফাঁকে ফাঁকে স্বামীর মুখে শোনা পদ আওড়ায়—
‘নগর বাহিরিরে ডোম্বীর কুড়িআ, ছোই ছোই জাইসি বাহমণ নাড়িআ… এ জম্মে তোর হলো না! পরজন্মে তুল কপালি, ইউ ডোম্বী… তি অড়া চাপী দে অঙ্কমালী! তঁই বিণু খনহি ণ জীবমি!… এ জন্মে তো আর হলো না, তবু… সোনে ভরলী করুণা নাবী। গেলী জাম বহুড়ই কইসেঁ…’
রামদেব কান পেতে শুনতে শুনতে, যে নিবিড় একাগ্রতায় পুথির প্রতিটি স্তবক প্রতিটি যতিচিহ্ন বারে বারে পাঠ করে, সেভাবেই আদরিণীর সর্বাঙ্গ মালিশ করতে থাকে, হাড়ের কাঠামে শীর্ণ পেশির দড়িগুলোয় টান দেয়, মালসায় কাঠকয়লার আঁচে হাতের চেটো গরম করে দেহের প্রতিটি গ্রন্থি প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ভাঁজে রক্তসঞ্চালন ঘটাতে ঘটাতে ওর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর কণ্ঠস্বরে প্রশ্নমালাগুলো, রামদেবের প্রত্যুত্তরগুলো কখন যে দ্রুত শ্বাসপতন থেকে অবরুদ্ধ শীৎকার হয়ে ওঠে, কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে আর মেটেঘরের পেছনে আমের বনে ঝিঁঝিপোকাদের ধ্বনি গাঢ় হয়, ধিকিধিকি কামনার নিগড়ে বন্দি দুজনে কেউই টের পায় না।
এইসময় রামদেব ক্রমশ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, কখনো ছন্দোবদ্ধ কখনো আবার মুক্ত চরণে লেখা স্তবকগুলি সম্ভবত কোনো এক সময়ে গাওয়া হতো, পরে স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আলোআঁধারি ভাষার ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে যে জগত, সে যেন বিগত জন্মের স্মৃতি বলে মনে হয়। আদরিণীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কখনো নীচু স্বরে আবৃত্তি করে, স্তবকগুলিতে সুর দেবার চেষ্টা করে, দেখে ওর মুখের রেখায় ছন্দের ধ্বনি আর চিত্রকল্পগুলো কীভাবে বোধ ও দুর্বোধের মাঝে দোদুল্যমান বিস্ফার হয়ে ফোটে। দুপুরের একান্ত দাম্পত্য প্রহরগুলো কস্তুরীর গন্ধে আর জলে প্রতিফলিত শরতের আকাশের মতো আলোয় ভরে ওঠে, এই পশ্চিমের ঘরে, লোকজনদের গোচর থেকে দূরে। হোক না সে পঙ্গু ক্ষয়া বিকলাঙ্গ, রাতের অন্ধকারে গর্ভাধান-প্রশস্ত প্রহর ছাড়া স্বামী তার ধর্মপত্নীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সময় অতিবাহিত করছে, এর চেয়ে অস্বাভাবিক কীই বা হতে পারে!
পৌষের মাঝামাঝি সেটা ছিল আদিরামবাটিতে তার তৃতীয় শীত আদরিণী হামাগুড়ি দিয়ে এক হাত দূরত্ব চলার শক্তিটুকুও হারালো। নিরুপায় শয্যাতেই প্রাতঃকৃত্য করতে শুরু করল। খালপাড়ের এক মেথরানীকে নিয়োগ করা হলো তার ক্রমক্ষীয়মাণ পতঙ্গপ্রায় দেহের যৎসামান্য বর্জ্য নিয়ে যাবার জন্য। রামদেব কখনো তাকে দেখেনি। প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগে সে একটি মাটির মালসায় কলাপাতা চাপা দিয়ে একটি চালতা গাছের নীচে রেখে দিত, পাশে রাখত একটি কড়ি। সেখান থেকে সোজা নদীতে গিয়ে স্নানাহ্নিকের পর ফিরে এসে দেখত একটি নতুন মালসা রাখা আছে।
একদিন রামদেব তাকে দেখল। তখন বসন্তের শুরু, ভোর ফোটার আগের সজীব প্রহর, তখনও পাখপাখালি ডাকতে শুরু করেনি। পাতলা কুয়াশার চাঁদোয়া জড়িয়ে আছে আমের ডালে, পাতার ফাঁকে তখনও দুয়েকটি নিভু নিভু তারা। সদ্যস্নাত ত্বকে রামদেব অনুভব করছিল অতীব মৃদু বাতাস, গভীর শ্বাসের মতো, রাততাড়ুয়া বাতাসে ডালপালার ফাঁকে বইছে মুক্তোগুঁড়ো আলো। এই সময় প্রতিটি ঘনবস্তুর আকার দৃষ্টির ভেতর দিয়ে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠার আগে মানসপটে প্রতীয়মান হয়। রামদেব দেখল এক দীর্ঘাঙ্গিনী, খাটো শাড়ি হাঁটুর ওপরে জড়ানো, কৃষ্ণবর্ণ পায়ে পেতলের মল। কোমর বাঁকিয়ে সামনে ঝুঁকে নতুন মালসা রেখে কলাপাতা-চাপা-দেওয়া মালসাটি তুলে নিল, তারপর সেটি মাথায় তুলে নিয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে পায়ে-চলা পথ দিয়ে হেঁটে গেল বনের ভেতর। শুকনো আমপাতা বিছানো পথ, একটি পাতাও দলে যাবার শব্দ হলো না।
ক্ষণিকের সেই দৃশ্যটার কথা ভুলেই গিয়েছিল। তিন দিন পর টোলে কাব্যকৌমুদি পড়ানোর সময় আচমকাই ফিরে এল অনুপুস্খ স্মৃতি— কোমর বাঁকিয়ে নীচু হয়ে মালসা রাখা, কড়িটি তুলে নিয়ে কোমরে গোঁজার ছবি। সেদিন সন্ধ্যার সময়ে পুথিপাঠে আবার ফিরে এল। মনে পড়ল মালসা মাথায় নিয়ে হাতদুটি কোমরে রেখে হাঁটার ভঙ্গির মধ্যে এক হিলহিলে মুক্ত ছন্দ, পায়ে পেতলের মলে অশ্রুত নিক্কন, ঠিক যেমন নিজ কস্তুরীর গন্ধে মাতোয়ারা হরিণের বর্ণনার মতো। প্রথম প্রথম এই স্মৃতির ঝলকানি রামদেব বাধা দিতে লাগল, অশুচি অপরাধবোধে দীর্ণ হতে লাগল। নিজেকে বোঝাতে লাগল এ দৃষ্টিবিভ্রম বই কিছু নয়, জেগে-ওঠা প্রহরে শেষরাতের স্বপ্নছায়ার রেশ মাত্র। তারপর সে সেই স্মৃতির কাছে চেতনাকে সমর্পণ করল, তাকে অবাধে বইতে দিল সান্ধ্যভাষায় মায়াময় চরণগুলির ওপর দিয়ে, ঠিক যেভাবে বনতলে শীর্ণ ঝোরা বয় আর তার ওপরে সূর্যালোকের বিচূর্ণ প্রতিফলন ঝিরিঝিরি পাতার ওপরে স্পন্দমান হয়ে উঠে গভীর অর্থের জন্ম হয়।
আদরিণীর জীবনের শেষ দিনগুলোয় অনৈচ্ছিক পেশিক্রিয়ার এতটাই অবনতি হল যে এমনকি তরল খাবার গলাধঃকরণ ও খাদ্যনালী বেয়ে পাকস্থলীতে বহনের শক্তিও হারালো। গলা ভাত চটকে তাতে ঘি আর কাশীর চিনি মিশিয়ে লেই তৈরি করে দিতেন ভুবনেশ্বরী, রামদেব দুই আঙুলে তুলে ঠোঁট ফাঁক করে গুঁজে দিলেও নামত না। ইতিমধ্যে কশেরুকার দুই পাশ থেকে শুরু হয়ে সারা পিঠ জুড়ে ছেয়ে এল গোলাপি-কমলা স্ফোটকের প্রবাল।
ফাল্গুন চতুর্থীর রাতে মারা গেল আদরিণী। যদিও এই বিরল রোগ নির্ণয় হয়নি, মৃত্যুর প্রাথমিক কারণটি ছিল অনাহার। খাদ্যের অভাবে ক্ষীণ হয়ে-আসা দেহটি বিশুষ্ক পতঙ্গের মতো হয়ে গিয়েছিল, চামড়া-জড়ানো করোটির ন্যায় মুখে চোখদুটো ঠেলে উঠেছিল বিকট বিস্ফারে, প্রসারিত দাঁতের হাসিতে মুখমন্ডল দুভাগ হয়েছিল, ঠোঁট কিংবা চোখের পাতা ঢেকে দেবার কোনো উপায় ছিল না।
