Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৭.৪

৭.৪

রেভারেন্ড বিল সাহেবের কথা যে মিথ্যা ছিল না, সেটা দিনেমারডাঙার মিশন হাউসে গিয়ে মালুম হলো গঙ্গারামের। হলুদ কাগজে মোড়া ডাচ কোকো তো আছেই, এছাড়াও সাহেবের নির্দেশে ব্রাহ্মণ পাচক সুমিষ্ট দুধে কোকোর গুঁড়ো মিশিয়ে সাদা পোর্সেলিনের পিরিচে পরিবেশন করে। অপূর্ব তার স্বাদ, নিষিদ্ধ হবার সুবাদে আরও উপাদেয় হয়ে ওঠে। মিশন হাউসে আসাটা বাড়িতে গোপন রেখেছে গঙ্গারাম। সাহেবের দুই যমজ পুত্র পিটার আর জনের সঙ্গেও ভাব জমেছে। ওরা কিছুটা ছোটো, প্রায় পাগলরামের বয়সী। ওদের সঙ্গে খেলা করতে গিয়ে ভাষার বাধা টের পাওয়া যায়। পিটার ও জন বাংলা একেবারেই জানে না, গঙ্গারামও ইংরেজি জানে না। কিন্তু ইংল্যান্ড থেকে আনা নানান বিচিত্র খেলনা আর মূর্তিতে সাজানো ঘরে ইশারায় খেলা চলে দিব্যি।

এত খেলনার মধ্যেও গঙ্গারামকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে একতলায় বড়ো ইস্পাতের কল, যাকে লোকে বলে ফিরিঙ্গি সাহেবের ঠাকুর। সেই ঠাকুরের তিন পা, এক হাত, কাগজের ভোগ চড়ানো হয়। তার চোয়ালে সাজানো দাঁতগুলো একেকটি ছাপা অক্ষর, উলটোনো, প্রতিটি আলাদা আলাদা করে খোলা যায়, বসানো যায়। দুজন লোক সিসের অক্ষর সাজিয়ে ছাপাই কলের হাঁ-মুখে ভরে দেয় আর কাগজে ছাপ তোলে। এক পাশে টেবিল চেয়ার পেতে বসে সারাদিন কাটান বিল সাহেব, লাল পেনসিল দিয়ে ছাপা কাগজে দাগ কাটেন, লাল খেরোর খাতায় খাগের কলম দিয়ে খসখস করে লিখে চলেন। সাহেবসুবো ও নেটিভ ভদ্রলোকেরা বিল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে আসে।

গঙ্গারাম ছোটো ভাইকেও মিশনে হাউসে নিয়ে যেতে শুরু করেছে। ইদানীং পাগলরাম খানিকটা সামলে উঠেছে, দুটি-চারটি করে শব্দ বলছে বটে তবে বাক্যে সাজিয়ে কথা বলতে গেলে জিভ আড়ষ্ট হয়ে আসে। আরেকটি বিচিত্র প্রবণতা ইদানীং দেখা যাচ্ছে—খেলনা হাতে পেলেই তৎক্ষণাৎ সেটি ভেঙে ছিঁড়ে কেলে পাগলরাম। ভেঙে না ফেলা পর্যন্ত বুঝি তার শাস্তি নেই, তা সে কাঠের রথ হোক কিংবা তুলোর টিয়াপাখি। পাখি পড়ানোর মতো করে গঙ্গারামের বারণ সত্ত্বেও মিশন হাউসে এসে একদিন খেলাচ্ছলে একটি দম-দেওয়া ভাল্লুক ভেঙে ফেলল। পিটার- জন অবশ্য এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করেনি।

পাগলরামের ধ্বংসাত্মক মনোবৃত্তির আরেকটি দিক হলো কোনো খেলনা, বিশেষত কোনো খেলনার কলকব্জা খুলে ভেঙে অংশগুলো আলাদা করে ফেলার পরেই সেটি সম্পর্কে উৎসাহ হারিয়ে ফেলা। সেটা বুঝতে পেরেছে পিটার ও জন, গঙ্গারাম ভাইকে নিয়ে এলেই সব রকমের কলের খেলনা লুকিয়ে রাখে। যথারীতি যে খেলনা পাগলরামকে অমোঘ আকর্ষণ করতে লাগল, সেটি হলো একতলায় ওই ছাপার কল। সেটি ভেঙে ফেলার কোনো উপায় নেই, দূর থেকে কেবল দেখতে পায়। কাছে যাবার কিংবা স্পর্শ করার অনুমতি নেই।

সাহেবের কাছে প্রায়ই এক দশাসই চেহারার নেটিভ ভদ্রলোক আসেন। তাঁর গোল গোল উজ্জ্বল চোখ, স্ফীত চোখের পাতায় যেন আবুলি জড়িয়ে আছে, ঘাড় অব্দি তেল চুকচুকে বাবরি চুলে শামলা আঁটা, পরনে ঢোলা ফারসি কুর্তা। কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রঙ তাঁর। বিকেলের দিকে তাঁর সাদা ময়ূরপঙ্খী বজরা মিশন হাউসের ঘাটে এসে লাগে। দাঁড়িদের পরনে কুর্তা-পাজামাও ধবধবে সাদা, মাথায় লাল পাগড়ি, লাল কোমরবন্ধ।

একদিন গঙ্গারামকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকলেন। মিষ্টি হেসে ভারি গলায় বললেন,

‘ডাচ কোকো দেখি তোমার বড্ড প্রিয়? ওই বস্তুটি কী দিয়ে তৈরি হয় জান কি, খোকা?’

গঙ্গারাম মাথা নাড়ে, জানে না। এ ব্যাপারটা কখনো ভাবেওনি। অজানা অপবিত্র অখাদ্য? গঙ্গারামের বুক কেঁপে ওঠে। ওর মুখ দেখে বিল সাহেব হাতে বরাভয়ের মুদ্রা করে মুচকি হাসেন। ভদ্রলোকটিও সশব্দে হেসে ওঠেন।

‘আরে না না, তোমার জাত যাবার মতো কিছু ওতে নেই! নামেই ডাচ কোকো, ও এক ধরনের বাদাম যা অ্যামাজনের জঙ্গলে হয়। ওলন্দাজদের সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্কই নেই।’

‘অ্যামাজন তাহলে কোথায়?’ গঙ্গারাম জিজ্ঞেস করে।

‘সে অনেক দূরে, দক্ষিণ আমেরিকায়। বলতে পার পৃথিবীর অন্য পারে।’ লোকটি বলেন।

‘এই জেস্টুটিকে কি তুমি চিন, গঙ্গারাম?’ ওঁকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন রেভারেন্ড বিল। গঙ্গারাম মাথা নাড়ে। সাহেব বলেন

‘চিনবে, একদিন অবশ্য চিনবে। তোমার মতোই ইনিও এক রাম। তবে আমি এনাকে ব্যাটারিং র‍্যাম বলে ডাকি।’

এই বলে দুজনেই উচ্চকিত হেসে ওঠেন। হাসি থামিয়ে বিল সাহেব বলেন—- ‘ব্যাটারিং র‍্যামের মতো ইনিও হিন্দু ধর্মের গড়ের দরজা ভাঙছেন। এই বাংলায় এনার মতো মহান জেন্টু আর দ্বিতীয়টি দেখি নাই।’

ব্যাটারিং রাম মহাশয় মাথাটা ওপর দিকে তুলে ভারি চিবুক কাঁপিয়ে সলজ্জ হেসে ওঠেন। রেভারেন্ড বিলের দিকে নির্দেশ করে গঙ্গারামকে বলেন—

‘আর এই সাহেবের থেকে মহান ইংরেজ এই বাংলায় আর আসেনি। ইনি যে কর্মকান্ড এখানে ফেঁদেছেন সে জন্য তোমাদের প্রজন্ম তো বটেই, তার পরেও অনেক প্রজন্ম ওঁকে মনে রাখবে।’

‘প্রভূত হইল, এবার থাউক!’ বিল সাহেব অস্বস্তির হাসি হেসে গঙ্গারামের দিকে ফিরে বলেন—’বর্তমানে আমরা দুই মহান পুরুষ এমন এক গুরুতর কার্য করিছি যা দেখলে শিশুও হাস্য করবে। আমরা একে অপরের ভাষায় কথা বলছি!’

এবং এর ফলে সেই ভাষাটি স্বচ্ছন্দে আয়ত্ত করার বদলে নিজের ভাষাটি ভুলতে বসিয়াছি,’ ভদ্রলোক বলেন। দুজনে আবার হাস্য করে ওঠেন।

‘আপনি কখনো অ্যামাজনে গিয়েছেন, সাহেব?’ গঙ্গারাম একদিন জিজ্ঞেস করে রেভারেন্ড বিলকে।

‘কদাপি না।’

‘অ্যামাজন কি আপনার দেশের কাছে নয়?’

‘না হে’ বিল সাহেব বলেন। ‘সে আরও অনেক পশ্চিমে, অ্যাটলান্টিক নামে এক সাগরের অন্য পারে।’

‘আপনার কোনোদিন অ্যামাজনে যেতে ইচ্ছে করে না?’

রেভারেন্ড বিল মাথা নাড়েন।— ‘ইচ্ছে করলেও আমি সেখানে যেতে পারব না। আমি এই হুগলির পশ্চিম পারে ফিরিঙ্গিডাঙার এলাকার বাইরেই পা রাখতে পারিনা। তাহলে কোম্পানির পুলিশ আমায় গ্রেপ্তার করে ইংল্যান্ডের জাহাজে তুলে দেবে।’

‘কেন?’ গঙ্গারাম বিষ্মিত হয়। ‘আপনি কি কোনো অপরাধ করেছেন?’

‘করেছি তো!’ বিল সাহেব মলিন হাসেন। ‘আমি আমার ঈশ্বরের বাণী এই দেশের মানুষের মাঝে প্রচার করার অপরাধ করেছি।’

গঙ্গারামের মুখে বিভ্রান্তির ছায়া দেখে রেভারেন্ড বিল বলেন,— ‘সে কথা একদিন তোমায় সবিস্তারে বলব। তবে আমার বয়স যখন তোমার মতো আমি যেখানে যাবার সত্যিই স্বপ্ন দেখতাম, সে হলো আফ্রিকা।’

‘আফ্রিকার জঙ্গলে কি কোকো ফলে?’

‘না, কিন্তু নানান বন্য প্রাণী আছে যা পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।’

‘তাহলে আপনি সেখানে গেলেন না কেন?’ গঙ্গারাম জিজ্ঞেস করে।

রেভারেন্ড বিল হাসেন।— ‘আমার বাবা ছিলেন চর্মকার, আমি লিখতে পড়তে পারার আগে ওই কাজ শিখেছি। ছোটোবেলায় আমি চর্ম দিয়ে পৃথিবীর মতো আকারের একটি…একটি…’ দুটি হাত শূন্যে বর্তুলাকার করে ব্যাটারিং রামের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করেন— ‘গ্লোবকে বাংলায় কী বলা হবে, রাম?’ ব্যাটারিং রাম গালে হাত রেখে এক মুহূর্ত ভেবে বলেন—‘ভূগোলক।’

‘ভূগোলক বানিয়েছিলাম, সেখানে নানান দেশ আর মহাদেশগুলো সাদা আর কালো রঙ করেছিলাম।’

‘সাদা আর কালো রঙের পৃথিবী?’ গঙ্গারাম বলে।

‘হ্যাঁ, তবে শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী অনুযায়ী নয়। পৃথিবীতে কোন্ কোন্ অঞ্চলে মানুষ প্রভু যিশুর ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে সেই অনুসারে, যেমনটা আমার ইস্কুলের বইতে লেখা ছিল। তার মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশটা ছিল ঘন কালো, তাই সেখানে প্রভুর বাণী প্রচার করতে যেতে চেয়েছিলাম। সেই উদ্দেশ্যে আমি আমার গ্রামে ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটিতে যাজক হবার প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করি। যেদিন প্রাচ্যে আসার মতো যথেষ্ট অর্থ যোগাড় হলো, ততদিনে আমি ক্যাথিকে বিবাহ করেছি। জন আর পিটারের জন্মের পর ক্যাথির শরীর ভালো যাচ্ছিল না, অবসাদের অসুখে ভুগছিল। ডাক্তারেরা বলল ওকে প্রচুর রোদ হাওয়ার দেশে নিয়ে যেতে পারলে স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। তাই আমি আগের পরিকল্পনা বদলে চলে এলাম এই বাংলায়, যার বিখ্যাত মৌসুমী বায়ুর কথা আমি শুনেছি। ঠিক করলাম কলকাতাকে কেন্দ্র করেই প্রভুর বাণী প্রচারের কাজে নামব। ‘

‘কিন্তু আপনি তো দিনেমারডাঙায় চলে এলেন,’ ব্যাটারিং রাম বলেন।

‘হ্যাঁ। কেপ পেরোনোর সময় আমাদের জাহাজটা সাইক্লোনের মুখে পড়ল, ক্যাথির অবসাদের অসুখ আরও বাড়ল। কলকাতায় এসে জানতে পারলাম আমি ওই শহরে থেকে কাজ করতে পারব না। কারণ আমার কাছে অনুমতিপত্র নেই।

‘কিন্তু আপনি তো একজন ব্রিটিশ নাগরিক, নয় কি?’ ব্যাটারিং রাম বলেন। ‘অবশ্যই, কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিকেরও এদেশে কোম্পানির এলাকায় কাজ করতে গেলে অনুমতিপত্র লাগে।’

‘ধর্মপ্রচার করতে গেলেও লাগে?’ ব্যাটারিং রামের ভ্রূ কুঞ্চিত হয়।

‘বিশেষ করে ধর্মপ্রচার করতে গেলেই লাগে। তুমি তো জানো রাম, বাংলার দেওয়ানি হাতে পাবার পর এসব ব্যাপারে কোম্পানি কতখানি স্পর্শ…স্পর্শ…

‘স্পর্শকাতর?’

‘হ্যাঁ, স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছে। কোম্পানির অফিসারদের অদক্ষ লোভী আচরণে এদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। ধর্মপ্রচারের ফলে লোকের সেই ক্ষোভ আরও বেড়ে যাক কোনোমতেই ওরা চায় না। তবে সেটি একমাত্র কারণ নয়। আমরা ব্যাপটিস্টরা চিরকাল চার্চ অফ ইংল্যান্ডের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে এসেছি। আমাকে তাই ওরা কলকাতার জাহাজঘাটায় নামতে দিল না। ভাগ্যক্রমে জাহাজে দিনেমারডাঙার এক ফ্যাক্টরের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল, সে আমায় এখানে জমি দিয়ে মিশন গড়তে সাহায্য করল। তিন বছর ধরে এই চ্যাপেল আর ছাপাখানাটা গড়ে তুলেছি। সবই ঈশ্বরের অপার করুণা। সেটা না হলে, তোমার মতো মানুষের সমর্থন না পেলে এতগুলো ভাষায় বাইবেল অনুবাদের কাজটা হতো না। তোমায় বলা হয়নি রাম, গত মাসে আমরা পাঁচশত হ্যান্ডবিল বিভিন্ন হাটে খেয়াঘাটে দেয়ালে সেঁটেছি, সাধারণ মানুষের মাঝে বিলি করেছি।’

‘তাতে সাড়া কেমন মিলল?’ ব্যাটারিং রাম জিজ্ঞেস করেন।

‘খুব ভালো সেটা বলতে পারি নে,’ রেভারেন্ড বিল মলিন হাসেন। ‘অল্প কজন গ্রামবাসীই ছাপা অক্ষর পড়তে পারে, যদিও প্রভু যিশুর কাঠছাপাই ছবিটি দেখে তারা চিনতে পারে। ওরা প্রচারপত্রের কাগজ ছিঁড়ে কান খোঁচাইবার শলাকা বানায়, শিশুরা উৎসাহভরে ডাচ কোকোর টুকরো গ্রহণ করে বটে কিন্তু প্রচারপত্র দিয়ে নৌকা বানিয়ে খালের জলে ভাসায়।’

ব্যাটারিং রাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হাসেন, গঙ্গারামের দিকে ফিরে বলেন—

‘বুঝলে হে গঙ্গারাম, এই খ্রিস্টান সাহেব ঈশ্বরের ত্রিত্বে বিশ্বাস করেন। তিন ঈশ্বর। মোছলমানেরা বিশ্বাস করে ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। আর এই বাংলায় লক্ষকোটি মানুষ শত শত ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। এত রকম জাতের দেবদেবী, যাদের শাস্ত্রে পুরাণে কোথাও কোনো অস্তিত্বই নেই।’

বাস্তবে রেভারেন্ড বিলের যে ঈশ্বরে প্রগাঢ় বিশ্বাস, যাকে তিনি সর্বক্ষণ ভজনা করেন, তাঁর একটি হাত তিনটি পা ও এক বিপুল চোয়াল, ৪৮৮টি সিসের দাঁত রয়েছে।

*

ডাক্তারের পরামর্শ মেনে ভারতে এসেও ক্যাথির স্বাস্থ্য ফেরেনি। এখানে সুমিষ্ট বাতাস বয়, কিন্তু সেই বাতাসে বয়ে আসে পোড়া মনুষ্যদেহের গন্ধ, নদীর ধারে মিশন হাউসের জানলা দিয়ে ঢোকে। পোড়া গন্ধ শুধু যে মৃত মনুষ্যদেহের এমনও নয়। এদেশে আসার আগে সতীদাহ ব্যাপারটা সম্পর্কে রেভারেন্ড বিলের কোনো ধারণাই ছিল না। মৃত স্বামীর চিতায় সদ্যবিধবা, প্রায়শই অনাথ এবং তরুণী স্ত্রীকে জোর করে পুড়িয়ে মারার সঙ্গে মধ্যযুগে ইউরোপে ডাইনি হত্যার তফাৎ নেই। সেই তুলনা টেনে, স্বচক্ষে দেখা ও লোকমুখে শোনা সতীদাহের বিশদ বর্ণনা দিয়ে এই বর্বর রীতি আইন করে নিষিদ্ধ করার আর্জি জানিয়ে কলকাতায় গভর্নর জেনারেলের দপ্তরে, লন্ডনে বিভিন্ন সংবাদপত্রে, এমনকি ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি কমিটির ইভ্যানজেলিকাল মিনিস্টারকেও দীর্ঘ পত্র লিখতে লাগলেন রেভারেন্ড বিল। ইংল্যান্ডে সেসময় মুক্তচিন্তার সুপবন বইছে, সাগরপারের উপনিবেশগুলোয় শুধুমাত্র কোম্পানির মুনাফাকে পাখির চোখ না করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণচিত্তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। ইতিমধ্যেই দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়েছে। বিলিতি সুপবন কলকাতার নেটিভ বাবুসমাজের বৈঠকখানাতেও বইতে শুরু হয়েছে। তারা নিজেদের জেন্টলম্যান-এর ছাঁচে গড়ে তুলছে, সমাজ পরিবর্তনে ব্রতী হয়েছে। লন্ডনে ও কলকাতায় দুই লিবেরাল শক্তির মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত সতীদাহ নিষিদ্ধ করে আইন পাশ হল।

কিন্তু এত কিছু করেও বিল সাহেবের কপালে ভবঘুরের তকমা ঘুচল না, ভেগ্রান্ট ইউরোপিয়ানের তালিকা থেকে নাম কাটা গেল না। মাথার ওপর খাঁড়ার মতো ঝুলে রইল উৎখাত হবার ভয়। এদিকে সতীদাহ নিবারণী আইন পাশ হবার পর যতটা না লাগু হল, আইন ভঙ্গ হতে লাগল তার চেয়ে ঢের বেশি। সনাতন হিন্দু সমাজের রীতিনীতিতে কোম্পানি নাক গলাতে শুরু করেছে; বিধবারা স্বেচ্ছায় স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিচ্ছে, যতটা না অক্ষয় স্বর্গলাভের বাসনায় ততটাই এই বিলিতি আইনের প্রতিবাদে এমনটা প্রচার হতে লাগল।

দিনেমার-ফরাসী-ওলন্দাজ শাসিত ফিরিঙ্গিডাঙায় থাকলে রেভারেন্ড বিলের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা নেই, কিন্তু ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে নেটিভদের এলাকায় পা রাখলেই হেনস্থার শিকার হচ্ছিলেন। গ্রামের পথে পাদরির এক্কা দেখলেই সাবর্ণ পুরুষেরা একজোট হয়ে টিটকিরি গালাগালির বান ছোটায়। তাতে বিল সাহেবের প্রাকৃত বাংলা শব্দের ভান্ডার বৃদ্ধি পায়, কিন্তু ধর্মান্তরিতের সংখ্যা আর বাড়ে না। কখনো-কখনো ক্ষিপ্ত লোকেরা গাড়ি তাক করে কাদা গোবরের তাল ছোঁড়ে। নোনাপুকুর গ্রামে স্থানীয় জমিদারের উসকানিতে একদল চাষাড়ে লোক কাস্তে দিয়ে তার ঘোড়ার লেজ কেটে দিল।

এসব করেও রেভারেন্ড বিলকে দমানো গেল না। কিন্তু নদীর মলয় বাতাসে জ্যাস্ত মনুষ্যপোড়া গন্ধ, জান্তব আর্তনাদ চাপা দেওয়া খোল-কর্তাল-হরিধ্বনি ক্যাথির বালিশ-চাপা কর্ণকুহরে ঢুকে স্নায়ুবৈকল্য ঘটাল। মাঝেমাঝেই তাঁর হিস্টিরিয়ার উন্মাদনা শুরু হয়। মধ্যরাতে রাতপোশাক পরে ঘর থেকে ছুটে ছাতে এসে চিৎকার করেন, নিজের মাথার চুল ছেঁড়েন, যা কিছু ভঙ্গুর হাতের নাগালে পান মাটিতে আছড়ে ভেঙে ফেলেন। মরফিন দিয়ে তাঁকে শাস্ত করার চেষ্টা করেন রেভারেন্ড বিল।

পিটার ও জনের ওপর মায়ের এই আচরণের প্রভাব পড়ছিল। বিদেশবিভূঁইয়ে আত্মীয় পরিজন থেকে দূরে দুই সদ্য বালকের জীবন নিঃসঙ্গ দুর্বিসহ হয়ে উঠছে, সেটা টের পাচ্ছিলেন বিল। কিন্তু এসব প্রতিকুলতায় দমে যাবার বদলে ফল হল উলটো, দ্বিগুণ উদ্যমে তিনি কাজ করে যেতে লাগলেন—ছাপার কাজ, প্রচারের কাজ। এবং বিধর্মীদের বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে নামলেন। সতীদাহ থেকে শুরু করে ঘাট-মার্ডার, শিশুকন্যা হত্যা থেকে মানত করে নরবলি, হুগলির মোহনায় শিশু সন্তানকে ছুঁড়ে দেবার ঘটনাবলীর বিপুল বিভীষিকার দলিল নির্মাণ করতে শুরু করলেন। প্রতিটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ যতদূর সম্ভব অনুপুঙ্খতায় (তাঁর স্বচক্ষে দেখা, গাছের উঁচু ডালে রেখে দেওয়া কাকে-ঠোকরানো পিঁপড়েয়-কাটা এক মেয়ে শিশুর মৃতদেহের বর্ণনা লিখেছিলেন তিন পাতা জুড়ে) উৎকণ্ঠামিশ্রিত কল্পনায় ছুপিয়ে লিখতে লাগলেন। নিয়মিত কিস্তির আকারে স্বদেশে উচ্চতম মহলে পাঠাতে লাগলেন কঠোর হাতে দমন করার আর্জিসহ। ‘তার কারণ নেটিভদের মধ্যে এইসব পেগান প্রথা যতদিন না নির্মূল হয় ততদিন প্রভু যিশুর মাহাত্ম্য প্রচার নিরর্থক, ইয়োর এক্সেলেন্সি, বিশেষত এই সমাজের নারীদের দশা নরকবাসের চেয়েও নিকৃষ্ট, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীরা স্ব-ইচ্ছায় স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় প্রবেশ করেন অমরত্বের লোভে নয়, নিত্যকার ইহজীবন যাপনের থেকে আগুনে পুড়ে মৃত্যুও সহজ বলে।’

এক বৈশাখের তপ্ত দিনে খবর এল, সাতগাঁর বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ পরিবারে দিন কয়েক আগে একটি সতীদাহ ঘটেছে। সেখানে ছুটে গেলেন, এবং যথারীতি প্ৰাচীন মন্দির সংলগ্ন সেই গৃহে প্রবেশাধিকার পেলেন না রেভারেন্ড বিল। ওঁর মুখের ওপর বাড়ির লোকেরা দরজা বন্ধ করে দিল, প্রতিবেশীরা মুখে কুলুপ আঁটল, গালিগালাজও করল। ফেরার সময় আকাশ কালো করে এল। কালবৈশাখি ঝড়ের কবলে পড়ে আমবাগানে আশ্রয় নিলেন। ঝড় থামলে বাগানের ভেতর দিয়ে পোর্তোহাটার দিকে যাবার সময় দেখলেন তিন বালক, দুজনের মুন্ডিত মস্তক, ঝড়ে খসে পড়া আম কুড়োচ্ছে।