সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৭.৭
৭.৭
সেবার শ্রাবণ মাসে দুবার অমাবস্যা হলো। দ্বিতীয় অমাবস্যার দিন বিকেলে গুঁফো গোঁসাই খবর আনলো ডোঙা শর্মাকে সাপে কেটেছে! খবরটা শোনা মাত্র প্রথমেই গঙ্গারামের মনে পড়ল গুরুদেবের সম্পর্কে প্রচলিত গুজব: প্রতি শুক্লা দ্বাদশীর রাতে কাটুনিডাঙায় এক নাগিনীর সঙ্গে তিনি মিলিত হতে যান। কিন্তু সেদিন অমাবস্যা। ওরা বর্গিব্যাটারিতে ছুটে গিয়ে দেখল, বারুদঘরের মেঝেয় মাদুরের ওপর ডোঙা শর্মাকে শোয়ানো হয়েছে। এক পৃথুলকায় লোক তাঁর মাথার কাছে বসে উড়নি দিয়ে মুখে বাতাস করছে আর নিজের চোখ মুছছে। লোকটিকে ওরা আগে দেখেছে— ধর্মতলার গোবর্ধন ময়রা, গুরুদেবের জন্য নিয়মিত বাঁশের চ্যাঙারিতে মন্ডা আর চাল কাঁচকলার সিধে আনে।
ছেলের দল দেখে ডুকরে কেঁদে উঠল গোবর্ধন—
‘এ কী সব্বোনাশ হল গো… তোমাদের গুরুদেবকে কালকেউটে কেটেছে!’
ডোঙার চক্ষু রক্তবর্ণ, ঠোঁটের দুপাশে কষ বেয়ে ফেনা উঠছে, কিন্তু চৈতন্য হারাননি। দেখে চিনতে পারেন, সামান্য হাসেনও। ওঁর ডান পায়ের জঙ্ঘার ঠিক নীচে দুটি স্পষ্ট ছিদ্র। ইতিমধ্যেই পা-টা কালচে নীল হয়ে উঠেছে; বিষধর সাপ সন্দেহ নেই। জানা গেল, ঘটনাটি ঘটেছে আগের দিন রাতে, এবং ইতিমধ্যে গোবর্ধন ক্যাওটপাড়া থেকে হাত-চালা ওঝা ডেকে এনেছিল। কিন্তু তার ঝাড়ফুঁকে ফল হয়নি। শিরার ভেতরে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে, একে একে দেহের বিভিন্ন অঙ্গগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত যত বাড়ে, পায়ের কালচে বেগনি রঙটা সারা দেহে ছড়িয়ে যেতে থাকে। বাইরে ঝুপ ঝুপ করে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে যায়, বারুদঘরের পেছনে ভাঙা ইটের স্তূপে বাবলার ঝোপের মাথায় একটি-দুটি নক্ষত্র ওঠে।
বাকিরা চলে যায়, গঙ্গা আর গুঁফো থেকে যায়। আর থাকে গোবর্ধন। মুমূর্ষুর ঠোঁটের ফাঁকে আঁজলা করে ফোঁটা ফোঁটা গঙ্গাজল দিতে থাকে সে।
ধমনীবাহিত বিষে ফুসফুস আচ্ছন্ন হয়ে এলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় ডোঙা শর্মার। ওরা অসহায় চেয়ে দেখে, জল থেকে তোলা মাছের মতো ধড়ফড় করছেন। ঠোঁটদুটো ফাঁক হয়ে এসেছে, কালো কুচকুচে জিভটা স্ফীত হয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চোখ খোলা, বিস্ফারিত, কিন্তু সে চোখে দৃষ্টি অন্তর্হিত। কাধের উড়নিটা মুখে চেপে আবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে দেয় গোবর্ধন।
বাইরে ভিজে মাটিতে ছপছপ পদশব্দ, দরজায় এসে দাঁড়ালেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। তাঁর সাদা গোঁফদাড়ি, সাদা টুপি, পরনে ফকিরের ঢোলা জোব্বা প্রদীপের– আলো প্রতিফলিত হয়ে ক্ষণিকে ঘরটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
‘আলিসাহেব!’ গোবর্ধন বিহ্বল বিস্ময়ে বলে ওঠে।
আলিসাহেব তাকান, ঠোঁটে হাসি ফোটে কী না গোঁফদাড়ির আড়ালে বোঝা যায় না। ডোঙা শর্মার পায়ের কাছে বসে প্রদীপটা হাতে তুলে নিয়ে খুঁটিয়ে ক্ষত নিরীক্ষণ করেন, চোখ জিভ পরীক্ষা করেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়েন।
‘এঁকে যিনি কেটেছেন, তাঁর বিষ ছাড়ানোর দাওয়াই আমার ঝুলিতে নেই। তিনি এই অঞ্চলের নন, দূরের কোনো দেশ থেকে জাহাজের খোলের মধ্যে এসেছেন।’
গোবর্ধন ডুকরে কেঁদে ওঠে। আলি সাহেব ওর কাঁধটা চেপে ধরেন, ওঁর লম্বা বিশুষ্ক আঙুলে বিচিত্র ধাতুর আঙটি চিকচিক করে প্রদীপের আলোয়।
‘কান্না থামাও গোবর্ধন। বাইরে থেকে দুটো গোল পাথরের টুকরো খুঁজে এনে দাও। এ বিষ আমি নামাতে পারি না, কিন্তু কষ্ট থেকে রিহা দিতে পারি।’
গুঁফো বাইরে থেকে দুটি মসৃণ পাথরখন্ড নিয়ে আসে, আলিসাহেব একটি কাপড়ের বটুয়া থেকে শুকনো কমলাভ ছত্রাক বের করে তাতে ডলে গুঁড়ো করেন, অচৈতন্য ডোঙা শর্মার ঠেলে-ওঠা কালো জিভ আঙুলে সরিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে ঢেলে দেন। তারপর একটি জালালি কবুতরের পালক বের করে ডোঙা শর্মার বুকের ওপর, কপালে বুলিয়ে দিতে দিতে চোখ বন্ধ করে মন্ত্রোচ্চারণের মতো বিড়বিড় করেন, ফুঁ দিতে থাকেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ডোঙা শর্মার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে, স্ফীত জিভটা মুখগহ্বরে ঢুকে গিয়ে ঠোঁট বন্ধ হয়। চোখের পাতা নেমে আসে।
‘এবারে ইনি সাফা মন নিয়ে কোনো ব্যথা না পেয়ে যে জমিন ওঁর ঈশ্বর সাজিয়ে রেখেছেন সেখানে চলে যাবেন। আজ রাতের মধ্যে আর কিছু হবে না।’
এই বলে আলিসাহেব যেভাবে এসেছিলেন, সেভাবেই আচমকা চলে গেলেন। ঘরের মধ্যে ক্ষীণ কাঠবাদামের গন্ধ আর ডোঙা শর্মার ঠোঁটের চারপাশে ওই দাওয়াইয়ের গুঁড়ো না থাকলে মনে হতো বুঝি স্বপ্ন। কেউই ওঁকে ডাকেনি, অথচ কীভাবে চলে এলেন কেউ জানল না। শুরু হল অপেক্ষার রাত। মৃত্যুপথযাত্রীকে ঘিরে বসে রইল ওরা তিনজন। বাইরে সজীব সজল পৃথিবী চঞ্চল হয়ে ওঠে। রাতচরা পাখির ডাক, গাছের সড়সড় শব্দ, কীটপতঙ্গের ধ্বনিতে মিশে যেতে থাকে গোবর্ধনের একটানা ঝিমধরা কন্ঠস্বর।
*
গাজির বাগানে একবার শাক-কন্দর সন্ধানে ঢুকে মসজিদের ধ্বংসস্তূপে আলিসাহেবকে প্রার্থনারত দেখে গোবর্ধন ভেবেছিল কোনো ফরিস্তা, ভেবেছিল দৃষ্টিবিভ্রম। কিন্তু আশ্রমের সেই বিভীষিকার রাতে সে যখন ডুমুর গাছে পিছমোড়া হয়ে বাঁধা, নগ্ন, ছেলেরা ছাউনির ভেতর অঘোরে ঘুমোচ্ছে, তিনি এলেন। একটিও কথা না বলে তিনি ওর হাতের বাঁধন খুলে দিলেন, জালালি কবুতরের পালক ছোয়ালেন ওর ভয়ে পাথর, কালসিটে-পড়া, প্রস্রাবের গন্ধে ভরা দেহে। গোবর্ধন দেহে বল ফিরে পেল, আশ্রমের চৌহদ্দি ছেড়ে নদীর ধারে এসে পাড় বরাবর ছুটতে শুরু করল দক্ষিণের দিকে। চষা মাঠ খাল ছাড়িয়ে, অন্ধকারে চিকচিকে হাঁটু-ডোবা দঁক কাদা পার হয়ে, পোড়ো ইমারতের সারি জাহাজঘাটা টাকশালের ধ্বংসাবশেষ ছাড়িয়ে অবশেষে পথ খুঁজে পেল। সেই পথ, যে পথ দিয়ে সে এসেছিল। আর এক মুহূর্ত এ দেশে নয়— গোবর্ধন ভাবল— এবার গ্রামে ফিরে যাবে। সেইমতো রাত্রির শেষ যামে অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে একটা মোড়ে এসে পড়ল। এখানে রাস্তাটা চিরে দুভাগ হয়েছে, মধ্যিখানে জমাট ছায়া যেন পাহাড়ের মতো।
পুব আকাশে ভোরের আলো সবে ফুটছে, গোবর্ধন দেখল এক অবিশ্বাস্য মহীরুহ। প্রাগৈতিহাসিক বটবৃক্ষ, তার বিসর্পিল ঝুরিগুলো মাটিতে শিকড় চারিয়ে দিয়ে আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় মেতেছে। চারদিকে লম্বা ডালপালা নীচু হয়ে ভূমির সমান্তরালে ছড়িয়ে গিয়েছে, কিছু কিছু বেঁকে নেমে এসে মাটি ছুঁয়েছে। গোবর্ধন নীচু হয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে রাতচরা পশুর মতো নতুন দিনের আলো থেকে পালিয়ে, লজ্জা ভয় গ্লানি থেকে পালিয়ে, গাছের ঘন ছায়ার ভেতর ঢুকল। এতটা পথ আসার পর দেহে যেটুকু বল এসেছিল সবই নিঙড়ে ঝরে গিয়েছে। বটের নীচে গভীর আঁধার গলিঘুঁজি, আস্ত একটা পল্টন এসে লুকোলেও বাইরে থেকে টের পাওয়ার উপায় নেই। গোবর্ধন ক্রমশ সেঁধিয়ে এল তার আর্দ্র সজীব কেন্দ্রে— পরম আশ্বাসের মতো অন্ধকার আর একটা ক্ষীণ অবিরল শব্দে তার বুকে ঢেঁকির পাড় ক্রমশ শান্ত হয়ে এল। মাথার ওপর পাখির ডানার ঝটপটানি, কাছেই কোথাও জলের ফিফিস্ ধ্বনি।
গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে উবু হয়ে বসে চোখ লেগে গিয়েছিল। আলো ফুটে যেতে হাজার হাজার গাঙশালিখের ডাকে ধড়মড়িয়ে জেগে উঠল গোবর্ধন। সবুজ পাতার চাঁদোয়ায় দপদপ করছে সূর্যের রশ্মি, গাছের মোটা ডালগুলোয় পাখির গুয়ের সাদা ছিছিট্ দাগ। জলের শব্দ অনুসরণ করে তার উৎস খুঁজতে গিয়ে পোড়ামাটির বেদি দেখল। মাঝখানে কচ্ছপের আকারের পাথর, তাকে ঘিরে পাহারা দিচ্ছে বিভিন্ন আকারের পোড়ামাটির ঘোড়া। চারিদিকে শিকড়ের ঝালরে বাঁধা গুচ্ছ গুচ্ছ ক্ষুদে ঘোড়া। বেদির কয়েক হাত পেছনে ভূমির ক্ষত থেকে উৎসারিত ক্ষীণ জলধারা, পুরু পচা পাতার ওপর দিয়ে ফিফিস্ করে বয়ে চলেছে। গোবর্ধন জানু পেতে বসে নীচু হয়ে আঁজলাভরে পান করল, ঠান্ডা মিঠে জল, দেহের ক্লেদ ধুলো, বেদির ওপর দেখল কাঁচা বটের পাতায় এলাচদানা। তুলে নিয়ে পিঁপড়ে ঝেড়ে ফেলে মুখে পুরতেই মিষ্টি রসে মুখ ভরে উঠল। গত রাতের পর এই প্রথম ফের খুব কান্না পেল গোবর্ধনের
সূর্য খানিক উঠেছে, পথের মোড় থেকে পুরুষের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল। ওরা গোয়ালার দল, ছাড়িগঙ্গার গ্রাম থেকে ঘড়াভর্তি দুধ নৌকায় চাপিয়ে নিয়ে এসে জড়ো হচ্ছে। এখান থেকে কাঁধে বাঁক চাপিয়ে ফিরিঙ্গিডাঙার দিকে যাবে, তার আগে কচি বটের পাতায় পেতলের ঘড়াগুলোর মুখ বেঁধে নিচ্ছে যাতে দুধ চলকে না পড়ে, ঝোরা থেকে জল তুলে দুধে মেশাচ্ছে। গাছের আড়াল থেকে গোবর্ধন সব দেখল, ফিরিঙ্গিডাঙার সাহেব-মেমদের নিয়ে ওদের রঙ্গরসিকতা শুনল আড়ি পেতে।
দলটা চলে যাবার পর বাইরে রোদের তেজ বাড়ল, গাছের মাথায় হাওয়ার ঝিরিঝিরি শব্দ, চারদিকে ঠাঠা রোদ্দুরে তাপবাষ্পে দুলছে সবকিছু। কিন্তু গাছের অন্দরে স্নিগ্ধ, ছায়াময়, পথের ষাঁড় আর কুকুর এসে আশ্রয় নিল। ক্রমশ দিন ফুরিয়ে আসার কালে গাছের উঁচু শিখরে অস্ত সূর্যের লালচে আলো এসে জড়ালো, গাঙশালিখেরা নদীর পাড় থেকে ফিরে আসতে লাগল ঝাঁক বেঁধে, আকাশে উড়াল দিল বাদুড়েরা। গুঁড়ির কোটর ছেড়ে বাইরে এসে গোবর্ধন যে পথে গোয়ালারা গিয়েছে সেই পথ ধরল। পোর্তোহাটা ওলন্দাজডাঙা দিনেমারডাঙা ছাড়িয়ে চাদেরডাঙায় গিয়েছে পথ, ওখানে তার স্বজাতিরা থাকে।
চাঁদেরডাঙায় গিয়ে গোবর্ধন টের পেল ওড়িয়াটোলায় ইতিমধ্যে খবরটা রটে গিয়েছে।
‘তুই আমাদের জাতের মুখ পুড়িয়েছিস! এখানে তোর কোনো ঠাঁই হবে না! দুই খুঁচি চিঁড়ে আর একটা পুরোনো ধুতি দিয়ে বলল কোয়ার্সভিলের সেই ভিস্তিওয়ালা বাণেশ্বর। ‘তুই দেশে ফিরে যা, গোবর্ধন!’
কিন্তু জলেশ্বরে ফিরে যাবার মতো দেহে মনে শক্তি গোবর্ধনের ছিল না। রাত নামলে সে ফিরে এল সেই বটগাছের আশ্রয়ে, গুঁড়ির কোটরে।
ইতিমধ্যে সে জেনেছে এই জায়গাটার নাম ধর্মতলা। কচ্ছপাকৃতি দেবতাটির নাম ধর্মঠাকুর, খালধারে মুচি মেথর কামার কুমোরদের দ্বারা পূজিত। তাদের আনা চিনির ডেলা থানের পিঁপড়েদের সঙ্গে ভাগ করে খেয়ে, সারাদিন গাছের ছায়ায় লুকিয়ে থেকে, অন্ধকার নামলে কটকি ভারি ভিস্তিওয়ালাদের পাড়ায় গিয়ে দুমুঠো অন্ন ভিক্ষা করে, ভুলেও সাতগাঁয়ের পথ না মাড়িয়ে চার-চারটি দিন পার করে দিল গোবর্ধন।
পঞ্চম দিন মধ্যরাতে ঘুম ভাঙল তারবাদ্যের ধ্বনিতে। চোখ মেলে দেখল, জ্যোৎস্না চুঁইয়ে এসে বৃক্ষতল অদ্ভুত সজীব হয়ে আছে। ঝুরির গহীন থেকে ভেসে আসছে একতারার ধ্বনি, ঝিমধরা গান। গাছের ব্যাপ্ত চাঁদোয়ার মাঝে একস্থানে গোলাকৃতি ফাঁক, বনের মধ্যে বজ্রপাতে যেমন হয়। ওপরে খোলা আকাশ, নীচে ঘন ফার্নের বিছানা। সেখানে জড়ো হয়েছে একদল নারীপুরুষ, তাদের পরনে জোব্বার আদলে ঢোলা পোশাক নীলে ছোপানো, যা চাঁদের প্রভায় মনে হয় বুঝি কালো। সকলেরই মাথা কামানো। তারা এলিয়ে রয়েছে মাটিতে, পরস্পরকে জড়িয়ে, কেউ একা। কেউ কেউ সুরের তালে দেহের উপরিভাগ দোলাচ্ছে, কখনো দাঁড়িয়ে উঠে দুদিকে হাত ছড়িয়ে ঘুরে চলেছে। ওরা যে প্রেত নয় সেটা গোবর্ধন বুঝতে পারে— সদ্য কামানো মাথায় অনাবৃত চামড়া মুখমন্ডলের তুলনায় ফিকে, চেহারাগুলোও রোগা, শিরাওঠা। এক নারী, গলায় আঁটোসাঁটো কড়ির মালা, নাচের ভঙ্গিতে মুখটা আকাশে তুলে চাঁদের আলো শুষে নিচ্ছে, যেন বুকের ভেতর থেকে নিঙড়ে তুলে আনছে এমন কোনো গভীর অনুভূতি যা গোবর্ধনের অচেনা, যা সে এর আগে কখনো দেখেনি।
ক্রমশ ওই খোলা অঞ্চলটা ছেড়ে গাছের ছায়ায় চোখ সয়ে আসতে দেখতে পায় এমন দৃশ্য যা সে কখনো কল্পনাও করেনি— আরও অনেক নারী পুরুষ, ঢোলা পোশাক কোমরের ওপরে তোলা, খুলে ফেলা, পরস্পরে গা ঘষাঘষি করছে যেন চকমকি পাথর, যেন শঙ্খলাগা সাপ, যেন কেন, খিপ্র বেড়ালের মতো উপগত কিংবা মুখে মুখ, যৌনাঙ্গে মুখ, স্থির। ধরাশায়ী চিৎ পুরুষের ওপর নারী, কোমরের দুদিকে উরু গিঁথে বসেছে। চকিতে গোবর্ধনকে দেখে বল্লমের মতো দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই ওর সর্বাঙ্গে কাটা দিয়ে উঠল, আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল। আর সেই নারী শীৎকার করে উঠে এলিয়ে পড়ল পুরুষটির বুকের ওপর। গোবর্ধনের দিকে তাকিয়ে রইল কিন্তু চোখের আলো সম্পূর্ণ নিভে গেল। যেন ওর আর কোনো অস্তিত্বই নেই।
গাঙশালিখের কোলাহল আর তিরতিরে জলের আশ্বাসধ্বনিতে ভোর ফোটে। কোটরের ভেতরে গুটিশুটি জেগে উঠে গোবর্ধন বুঝতে পারে না রাতের দৃশ্য সত্যি না কি স্বপ্ন। নাকি এ খিদের সঙ্গে মেশা গাজার পাতার বিভ্রম? আগে চোখে পড়েনি, কোটরের মধ্যে দেখে ভাঙা ডিমের খোলা, পাখির হাড়গোড়। নির্ঘাৎ কোনো শ্বাপদের বাসা! ভেবে ফেলা মাত্রই শুকনো পাতায় মচমচ পায়ের শব্দ শোনে গোবর্ধন। লাফ দিয়ে নেমে পালাতে যাবে, সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি— সাদা চুল-দাড়ি, সাদা জোব্বা। তার উদ্ধারকর্তা।
ঠোঁটে তর্জনি ছুঁইয়ে আলিসাহেব দুচোখে উজ্জ্বল হাসেন, ইশারায় ডেকে নেন বটের চৌহদ্দি ছেড়ে সরস্বতীর পাড়ে। শুকনো খাতে বালি ধূ ধূ করছে, আলিসাহেব হাঁটেন যেন পলকা বাতাসের মতো। চরের মাঝে পোড়ো পরিত্যক্ত সান্তা আনার কাছে এসে ওরা থামে। বোটটার মাস্তুল ভেঙে পড়েছে সেই কবে, কাঠের গায়ে জাহাজি ক্রিমির গর্তে ঝাঁঝরা, নির্ঘাৎ জলচর সাপ ও সরিসৃপের বাস। সেসবের পরোয়া না করে আলিসাহেব পরনের জোব্বাটা ভাঁজ করে কোমরে গিঁট বেঁধে উঠে পড়েন, গোবর্ধনকেও টেনে তুলে নেন। খোলের ভেতরে কমলা সবুজ ছোপ-লাগা বার্নাকলে ছাওয়া মোটা লোহার শিকল, বেড়ি, হাতল-অলা সিল, লোহার চাদরের অতিকায় পেটাই-করা কড়াই রয়েছে।
আলিসাহেবের নির্দেশে কড়াইটা ধর্মতলায় টেনে নিয়ে এল দুজনে, জলে ভেসে আসা পোড়া কাঠ জড়ো করে আনল গোবর্ধন, এবং সকালে গোয়ালারা নৌকায় দুধ টেনে এনে ঘড়াভর্তি দুধ গরমে ছিন্ন হবার আগে, ফেলে দেবার আগে, ভিক্ষে মেগে নিল।
টোপরের আকারের ক্ষীরের মন্ডা, অক্ষয়তৃতীয়ার আগে ওদের গ্রামের দোকানে বানানো হতো। পূর্ণিমা তিথিতে ভক্তের দল এসে মন্ডা পেয়ে চিনি-গুড়ের কদমা এলাচদানা ছেড়ে সেই মন্ডা কিনে পুজো চড়াল ধর্মঠাকুরের থানে। তিন দিনের মধ্যেই কড়ি দিয়ে গোয়ালাদের দুধের দাম মিটিয়ে দিল গোবর্ধন। বাকি অর্থে দোকানের সরঞ্জাম কিনল, একটি নতুন ধুতি আর উড়নি কিনল, তামাক কিনল।
*
ভোরের আলো ফোটার আগে অচৈতন্য ডোঙা শর্মার গলা দিয়ে স্বর বের হতে লাগল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। গঙ্গারাম ও গুঁফো নীচু হয়ে কান পেতে শোনে— মৃত্যুর আগে অন্তিম ঘড়ঘড় নয়, খুব ক্ষীণ, যেন প্রাণের অতল থেকে বের হচ্ছে ধ্বনি:
ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো স্মর কৃতং স্মর
ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো স্মরো কৃতং স্মর
মিইয়ে আসা প্রদীপের সলতেটা উসকে দেয় গোবর্ধন। ওরা দেখে মুমুর্ষুর ঠোঁট খোলা— নড়ছে না, কিন্তু কথাগুলো স্পষ্ট নির্গত হচ্ছে। শুনতে শুনতে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে গঙ্গা ও গুঁফো একসঙ্গে উচ্চারণ করতে শুরু করে—
বায়ুনিলমমৃতমথেদং ভষ্মাস্তাং শরীরম
ওঁ ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো স্মর কৃতং স্মর
আমার প্রাণবায়ু অমৃত অনিলে মিলিত হোক, আমার এই স্থূল শরীর ভষ্মীভূত হোক, হে আমার মন, স্মরণীয়কে স্মরণ করো, জীবনে যা কিছু করেছ স্মরণ করো, স্মরণীয়কে স্মরণ করো, যা কিছু করেছ স্মরণ করো…
.
‘কার পাপে?’ নিষ্কম্প্র ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বের হয় ধ্বনি, চৈতন্যধারা। ‘কার পাপে?’
জীবনে প্রথম গুরুর আদেশ অমান্য করল ডোঙা শর্মা। তৎক্ষণাৎ ফিরে গেল না সে। আশ্রমে নুটু হারীতদের মুখোমুখি হবার ভয়টা ছিলই, তার থেকেও গভীর অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ বন্ধ দরজার ওপাশে ফিসফিসে নারীকণ্ঠ, নুপুরের নিক্কণ। বুকের মধ্যে বান ডেকেছিল। ডোঙাটা খুলে কিছু দূরে জলভ্যারেন্ডার ঝোপের ভেতরে ঢুকে অপেক্ষা করছিল। তখন সকালের আলো ফুটছে, পানকৌড়িগুলো গাছ থেকে জলে নেমে এসেছে, ভ্যারেন্ডার বেগনি ফোটা ফুলের ওপর বিনবিন করছে ভোমরা। ডালপাতার ফাঁক দিয়ে জলের ধারে একেনে কুঁড়েটা স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু দুহাত দূর থেকেও ডোঙা শর্মাকে দেখা যায় না।
দরজার পাশে ঠেস দিয়ে রাখা খড়ম দুটো নেই। দরজা খুলে যায়, কাপড়ের বোঝা হাতে নিয়ে বের হয়ে আসেন এক কৃষ্ণকায় নারী। মাথায় চুড়ো করে গিট বাধা চুল, লালপেড়ে সাদা শাড়ি হাঁটুর ওপরে তোলা, উরুর পেশি দেখা যাচ্ছে। খালে নেমে এসে কাপড়গুলো জলে ভিজিয়ে একখন্ড পাথরে আছড়াতে শুরু করে দেন। সেই শব্দে পানকৌড়িরা জল থেকে ডানা ঝেড়ে ওঠে, নারীর নাকে লাল কাচের নাকছাবি চিকচিক করে সূর্যের আলোয়। কিন্তু ওই দেহটির মধ্যে কী এমন অমোঘ রহস্য রয়েছে সেটা ডোঙা শর্মা বুঝতে পারে না।
যতক্ষণ না তিনি কাচা কাপড়গুলো পাথরের ওপর স্তূপ করে রেখে স্নানে নামেন। প্রথমে আবক্ষ জলে সূর্যের দিকে ফিরে দুহাত জড়ো করেন, ভিজে ত্বকে রোদ ঝলকায়। তারপর হাতদুটো সামনে প্রসারিত করে বিচিত্র সাবলীলতায় দেহটা ভাসিয়ে দেন— পিঠ ধনুকের মতো বাঁকা, মাথায় চুড়ো করা খোপা ভেজে না, পা দুটো পেছন দিকে ছুঁড়ে বৃত্তাকারে সাঁতার দেন, পায়ের পাতাদুটো চিকচিক করে।
পানকৌড়িদের মাঝে কিছুক্ষণ সাঁতার দেবার পর আবক্ষ জলে দাঁড়িয়ে চুলের গিঁট খুলে কাঁধের চারপাশে ছড়িয়ে দিয়ে ডুব দিলেন। তারপর ডাঙায় উঠলেন। ভিজে শাদা শাড়ি ঘন বাদামি ত্বকে চেপে বসেছে, উজ্জ্বল আলোয় ডোঙা স্পষ্ট দেখতে পায় সবকিছু। গামছার ফাস খুলে প্রথমে অনাবৃত করলেন বুক, ত্রস্ত কালো বৃত্ত দুদিকে অপাঙ্গে চেয়ে আছে। মুখমন্ডল আকাশে তুলে ভিজে গামছাটা পাকিয়ে নিয়ে হাত দুটো পিছনে নিয়ে গিয়ে দ্রুত, অবিকল ধুনুরির মতো চুলের জল ঝাড়তে লাগলেন। ঠাস ঠাস চুল ঝাড়ার ধ্বনি, বাতাসে ছড়িয়ে যাওয়া জলকণার মেঘে আশ্চর্য রামধনু, বুক দুটি কেঁপে উঠে উড়াল দেবার আগে ডানা ঝাপটাচ্ছে।
চোখ পুড়ে গেল ডোঙা শর্মার। লজ্জা আর মুগ্ধ আবেশের ভেতর আবিষ্কার করল গুরুদেবের কাব্যরসের ব্যাখ্যার প্রাণভোমরা, কোন অমোঘ রহস্য যার প্রভাবে বুনোরাম পণ্ডিত শত শত বছর আগে রচিত পদাবলীতে প্রাণ সঞ্চার করেন, উপমা চিত্রকল্প বাস্তবের থেকেও জীবন্ত হয়ে ওঠে, যাপিত সত্যের থেকেও সত্য, কল্পনার প্রতিটি স্পন্দন জাগ্রত চৈতন্যের থেকেও স্নায়বিক।
কিন্তু গুরুপত্নীর দিকে লালসার দৃষ্টি ঘোর পাপ, অজাচারের মতোই। এই নারী গুরুদেবের পত্নী নন, সাধনসঙ্গিনী তো বটেই। দাঁড় টেনে ফেরার সময় দীর্ণ হয়েছিল ডোঙা শৰ্মা – মাথার মধ্যে রামধনু, জালালি কবুতরের উড়াল, ঠাস ঠাস চুলঝাড়ার শব্দ চপেটাঘাতের মতো গালে এসে পড়ছে।
*
‘ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো স্মর কৃতং স্মর…’ সর্পদংশনে নীল ঠোঁটের ফাক দিয়ে বের হয় স্বর।— ‘আমি দীর্ণ হচ্ছি, আমার ভেতরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবশ হয়ে আসছে একে একে, বিষের জ্বালায় আমার ভেতরে সবকিছু পুড়ে যাচ্ছে… আহ! এবার শেষ হোক! বায়ুনিলমমৃতমথেদং ভষ্মাতাং শরীরম!’
.
মনে হয়েছিল বিশ্ব সংসার বুঝি রসাতলে যেতে বসেছে। পরে সবার মনে পড়বে, সেদিন সকালটা শুরু হয়েছিল পাখির কলকাকলি ছাড়াই। আকাশে মেঘ ছিল, কিন্তু দুপুর নাগাদ এমন কালো করে এল মনে হবে বুঝি সন্ধ্যা নেমেছে। ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলল, শাঁখ বেজে উঠল। তারপরে শুরু হলো শতাব্দীর বিধ্বংসী ঝড়। যেন ব্রহ্মপ্রলয়, চতুর্যুগের অবসান বয়ে নিয়ে এসেছে। পৃথিবীতে পাপ তো আর কম জমে ওঠেনি। আদিরাম মন্দিরে তাক করে কামান দেগেছিল এক বেপরোয়া ইংরেজ, দেশে ফিরে ভোঁতা কাগজ-কাটা ছুরি দিয়ে নিজের গলার নলি কেটে তার মূল্য চুকিয়েছে। কিন্তু সেখানেই তো শেষ নয়। ব্রাহ্মণ রাজার ঘাড়ে জোচ্চুরির দায় চাপিয়ে বিচিত্র নতুন আইনে ফাঁসির সাজা দিয়েছে। এরপর দলে দলে কলকাতা শহর ছেড়েছে ধর্মভীরু মানুষ, যেভাবে ডুবন্ত জাহাজ ছাড়ে ইঁদুরের পাল। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়, সেখানে শুরুও নয়। সেই যবে এক ফিরিঙ্গি যাজক-শল্যবিদ নদীর খাত বদলে দিয়ে সুপ্রাচীন বন্দর নগরীর মৃত্যু ঘটালো, সেই অভিশাপ লাগল ডিহি বাংলায়। সেই পাপের ধারা বয়ে নিয়ে এরপর মৎস্যভূমির বিখ্যাত ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান পোড়ো ধ্বংসস্তূপের মাঝে গুরুকুল গড়বে, তার ব্রাহ্মণ শিষ্যদের অব্রাহ্মণের হাতে রান্না ভাত খাইয়ে জাত নষ্ট করবে, এবং নিজে অস্পৃশ্য মেথরানির সঙ্গে শোবে… পাপ! পাপের বোঝায় জর্জরিত পৃথিবী!
সরস্বতীর ধারে পোড়ো ইমারতগুলোর ভেতর দিয়ে শোঁ শোঁ হাওয়ার ধনিতে ভেসে আসা এইসব কথায় দীর্ণ হচ্ছে যখন সাতগাঁবাসীরা, ততক্ষণে প্রলয়ঙ্কর ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেল সব কিছু। প্রবল জলোচ্ছ্বাস কোটালের বানের সঙ্গে আঁতাত করল, সরস্বতী পুরোনো খাত ভাসালো, নতুন খাত ধরে বইতে শুরু হলো।
বন্দর হুগলিতে ম্যাওবেড়ালের গির্জা আবারও ক্ষতিগ্রস্থ হল। যাজকাবাসের লাগোয়া বেকারির চুল্লি থেকে ফুলকি উড়ে উঁচু কাঠের কড়িগুলোয় আগুন লাগল, ছাদ ধ্বসে পড়ল। তার নীচে চাপা পড়ে জলে ভিজে নষ্ট হয়ে গেল ক্রিশ্চানদের জন্মমৃত্যুর পুরোনো নথি। মৎস্যভূমিতে ফিরিঙ্গি উপনিবেশের অতীত ইতিহাস হারিয়ে গেল চিরতরে। টানা তিনদিন বিরামহীন বৃষ্টিপাত হলো, আকাশ থেকে ফের অঝোর নদী নামল শিবের জটামুক্ত ভাগীরথীর মতো। পৌরাণিক প্লাবনের মাঝে সাতগাঁর মৎস্যভূমি বুঝি শুধু জেগে আছে। বৃষ্টিপাতের একটানা ধ্বনির ভেতর শোনা গেল কেবল পুরোনো ঘরবাড়ি পতনের শব্দ। জাহাজাঘাটার দিকটায় কত যে বাড়ি ভেঙে পড়ল কে তার হিসেব রাখে। পথে একটাও মানুষ নেই, একটা কুকুরও নেই, শুধু থেকে থেকে আকুল শাঁখের ধ্বনি বেজে ওঠে। আদিরামবাটির পুথিশালে একদিকের বরগা খসে পড়ে অনেক পুরোনো পুথি নষ্ট হলো। কিন্তু আদিরামের মন্দিরে নতুন করে কোনো ক্ষতি হলো না। ধর্মতলায় বটের বেশ কিছু পুরোনো ডাল ভেঙে পড়ল, কিন্তু মূল অংশে কিছু হলো না, ধর্মঠাকুরের বেদি অটুট রইল।
ঝড় মিটে যাবার পর শরতে সূর্যের তাপ বাড়তে শুরু হলো গুটি বসন্তের মারী। প্রথমে শুরু হলো কুমোরদের বসতিতে, তারপর ক্রমশ অন্ত্যজদের পাড়া ছেড়ে হানা দিল সাতগাঁর অলিতে গলিতে, এমনকি ফিরিঙ্গিডাঙাতেও। তার পিছু পিছু এল এশিয়াটিক কলেরা। আদিরামবাটিতে বিপর্যয়ের ছায়া পড়ল, কলেরা রাজারামের স্ত্রী ভুবনেশ্বরীকে নিল।
প্রলয়ঙ্কর ঝড়ের পর সকলেই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত, সকলেই জীবন পুনর্নির্মাণে ব্যস্ত, ঘরছাড়া। কলঙ্কলাগা পণ্ডিতের কথা ভাবার মতো কেউ ছিল না।
না মি’লেডি, কেউ ছিল। ডোঙা শর্মা শেষদিন পর্যন্ত তার গুরুকে পরিত্যাগ করেনি। তার আগে গুটি বসন্তের মড়ক সেই ডোম রমণীকে ছুঁয়েছে, গাজির বাগানেও এসে পৌঁছেছে। ইতিমধ্যে সে বুনোরামের সঙ্গে আশ্রমের মেরামত-করা ছাউনিতে থাকতে শুরু করেছে। কোয়ার্সভিলের সরকারি অঁস্পেত্য-দ্য-লা-সঁতে মহামারী রোধ করতে কার্টুনিডাঙার বসতিগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছিল, নারীর দল ছড়িয়ে পড়েছিল যেদিকে পারে।
ডোঙা শর্মা বুনোরামের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করে আনে। কিন্তু ছাউনির আড়ালে গুরুদেব ও তাঁর সঙ্গিনীকে চোখের দেখা দেখার উপায় নেই। বাইরে চাল আনাজের পুঁটুলি নামিয়ে রেখে ডোঙা ডাকে–
‘গুরুদেব! গুরুদেব!’
তারপর সে চলে যায়। মাঝে মাঝে হোগলার বেড়ার ওপাশে মলের নিক্কন শোনা যায়, মাঝে মাঝে শোনা যায় বুনোরামের ক্ষীণ কন্ঠস্বর–
‘চলে যাও ত্রৈলোক্যনাথ, এদিকে এসো না।’
কিন্তু তবু সে আসে, আদেশ অমান্য করেই আসে। প্রতিবার ফিরে এসে দেখে খাদ্য গ্রহণ করেছেন গুরুদেব।
একদিন আর কন্ঠস্বর নয়, দেখল পাথরের চাটানের ওপর— ‘পতিত গুরু পাপে বাসা’ লেখাটির নীচে কাঁপা হস্তাক্ষর–
আর এসো না। চলে যাও।।
পরদিন এসে দেখে আগের দিন রেখে যাওয়া পুঁটলিটা ছিঁড়ে পড়ে রয়েছে ঘাসের ওপর। এক ঝাঁক জালালি কবুতর চালের দানা খুঁটে খাচ্ছে, যজ্ঞিডুমুর গাছটার মাথায় এসে বসেছে দুটো শকুন।
কোয়ার্সভিল থেকে অস্পেত্য-দ্য-লা-সঁতের দল নৌকায় চেপে এসে ছাউনিটা পুড়িয়ে দেবার পর কিন্তু ছাইয়ের ভেতর একটিই পুরুষ কঙ্কালের অবশেষ পাওয়া গিয়েছিল।
*
ফজরের প্রহরে ডোঙা শর্মা মারা গেলেন। মৃত্যুকালে তাঁর চোখদুটো বিস্ফারিত। আঙুল দিয়ে চোখের পাতা বন্ধ করে দেবার সময়ে গঙ্গারামের মনে হলো ঠেলে-ওঠা মণিতে রামধনুর গুঁড়ো লেগে আছে।
অন্তিমকালে বার বার তিনি নশ্বর দেহ ভস্মীভূত করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সর্পদংশনে মৃত্যু, গোবর্ধন কিংবা গঙ্গারামেরা প্রাণে ধরে সেটা করতে পারল না। চাল কলা ধূপ এনে তালের ডোঙাটিকে সাজালো ওরা, মৃতদেহ ঘাসের মাদুরে মুড়ে দিল, গঙ্গাজলের কুঁজো দিল দীর্ঘ যাত্রাপথের জন্য। গোবর্ধন জেলেপাড়া থেকে খ্যাপলা জাল এনে বাখারি দিয়ে ছইয়ের মতো করে দিল, যাতে কাক শকুনে ঠুকরোতে না পারে, যাতে প্রাণের সঞ্চার হলে–যদি হয়–তিনি যেন তাঁর অবিকৃত দেহটি ফিরে পান। ভোরের আগে ঘুমন্ত নদী, বুক জলে নেমে ওরা ঠেলে দিলে ডোঙাটিকে। তখন সবে ভাটা পড়ছে, পুবের আকাশ ফর্সা হতে কিছু দেরি আছে। ত্রৈলোক্যনাথ শর্মার দেহ নিয়ে তালের ডোঙা ভেসে গেল, যেদিক থেকে এসেছিল সেইদিকে।
