Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৮.৩

৮.৩

এই সময়কালটা বাপ্পার জীবনে যেন একটা ক্যালাইডোস্কোপ। ঘন ঘন বিন্যাস বদলে যাচ্ছে, যার অনেক কিছুই সে বুঝতে পারছে না, অবাক বিহ্বল চোখে কেবল দেখে যাচ্ছে। রঘুনাথপুর থেকে তড়িঘড়ি কলকাতায় আসার পর কয়েকদিন সাতগাঁয় কাটিয়ে রথীনের নির্দেশমতো মা-ছেলে ফিরে এল কলুটোলা লেনে। ঠিক হলো, আগামী শিক্ষাবর্ষে কলকাতার ভালো সরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নেবে বাপ্পা। প্রতি সপ্তাহান্তে রথীন কলকাতায় এসে থাকবে।

সেবার বুস্টার টিকার জ্বরের পর বাপ্পার আর তড়কার প্রকোপ হয়নি, ইতিমধ্যে একটু বড়োও হয়েছে সে। রবিবারগুলোয় ওদের কলুটোলা লেনের বাসা ফের ভরে ওঠে আড্ডায় হাসিতে গানে রঙ্গরসিকতায়; ছেড়ে-আসা, কোনোদিন-ফিরতে-না- পারা এক দেশের স্মৃতি মলিন দোমড়ানো তাসের মতো অবিরাম হাত-ফেরতা হয়ে চলায়।

এবং সুখাদ্যের সুঘ্রাণে: মধ্য কলকাতার তিনটি বাজার ছুঁড়ে আনা নানান ধরণের মাছ, আর অবশ্যই শিলচর কিংবা গৌহাটি হয়ে বিমানে উড়ে আসা কাঁচা সিদল।

উত্তরপূর্ব ভারত জুড়ে চিনির বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবসা আরও বিস্তৃত হয়েছে। কলকাতায় কাজেকর্মে সে মাসে দু-তিনবার করে আসে, কখনো কলুটোলা লেনে কখনো দমদমে ওর দাদা খোকার বাসায় রাত্রিবাস করে। যাতায়াতের সুবিধার জন্য কলুটোলা লেনেই বেশি থাকে। রথীনের থেকে ন’দিনের ছোটো চিনি বিবাহ করেনি, কিন্তু ওর চিকন কালো চুল, মসৃণ হলদেটে ত্বক আর মেদহীন মোঙ্গোলয়েড ধাঁচের চেহারার জন্য বয়স যে হচ্ছে সেটা দেখলে বোঝা যায় না।

ছোটোবেলায় সিলেট ছেড়ে এসে সে শিলঙে থাকতে শুরু করেছে যখন, তার কিছুদিনের মধ্যেই এই শৈল শহর তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারালো। একদা নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার এজেন্সির হেডকোয়ার্টারের সর্বত্র পড়ন্ত, ক্ষয়াটে ঔপনিবেশিক অতীতের আলো। কলকাতায় এসে চিনি এককালের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানীর সাহেবপাড়ায় ঘুরে সেই আলোটাকে খোঁজে। প্রথম যৌবনে রথীন যখন এই শহরে এসে পায়ের নীচে মাটি আঁকড়ে ধরার কঠিন লড়াই করছে, তখন অবরে সবরে চিনি এলে দুই ভাই ছুটির দিনে পার্ক স্ট্রিটে এ-মাথা থেকে ও-মাথা হেঁটে বেড়াতো। গ্র্যান্ড হোটেলের নীচে বিপণিগুলোয় থরে থরে সাজানো মহার্ঘ্য্য সামগ্ৰী দেখত, আর নিজেদের এক রঙীন অবিশ্বাস্য ভবিষ্যৎ জীবনের কল্পনা বিনিময় করত। রবিবারে রাসেল স্ট্রিটে সাহেববাড়ির আসবাবপত্রের নিলাম দেখতে যেত ওরা। পকেটে কিছু পয়সা থাকলে কখনো ফ্লুরিজ কিংবা ফার্পোতে প্রাতরাশ করতে যেত। রেসের মাঠেও গিয়েছে এক-দুবার।

এতদিনে ওদের সেই ভবিষ্যতের কল্পনা কিছু পরিমাণে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এখানে চিনি ট্যাক্সিতে ছাড়া যাতায়াত করে না, ক্লায়েন্টের সঙ্গে পার্ক স্ট্রিটে মোকাম্বো কিংবা ট্রিংকাজ-এ লাঞ্চ করে, চৌরঙ্গিতে জে এস মহম্মদালি থেকে স্যুট বানায়। এখন কলকাতায় এলে, সপ্তাহান্তে রথীন এসে পড়লে, ওরা চারজনে ট্যাক্সি চেপে ডিনার করতে যায় চীনা রেস্তোরাঁয়। তার আগে কোনো কোনো দিন বাপ্পাকে নিয়ে গ্লোব কিংবা মেট্রো সিনেমা হলে ইংরিজি ছবি দেখতে যায়; জঙ্গলে অ্যাডভেঞ্চারের ছবি, বিজলি কিংবা ছবিঘরে উত্তম-সুচিত্রা জুটির বাংলা ছবি, হাসির ছবি, পারিবারিক ছবি। কখনো আবার বাপ্পাকে রেখে ওরা তিনজনে থিয়েটার দেখতে যায় বিশ্বরূপায়, সারকারিনায়।

বাপ্পার ভালো লাগে রঙীন ইংরিজি ছবি, যখন বাবা আর চিনিকাকার মাঝে বসে নরম গদি-আঁটা সিটে প্রায় ডুবে গিয়েছে, গোড়ালি-ডোবা নরম কার্পেট থেকে কয়েক ইঞ্চি ওপরে পা, বাতাসে মৃদু পারফিউমের গন্ধ, মৃদু যন্ত্রসঙ্গীত, যখন বিশাল প্রেক্ষাগৃহে আলোগুলো খুব ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে, আর সাগরতটে ঢেউয়ের মতো মেরুন পর্দাটা উঠে যেতে থাকে ওপরে। তারপরেই পর্দায় বিশাল সিংহ হাই তুলে গর্জন করে ওঠে, ছবি শুরু হয়ে যায়, প্রেক্ষাগৃহের পেছনদিক থেকে অন্ধকারে আলোর রশ্মি সারি সারি মাথার ওপর দিয়ে আছড়ে পড়ে পর্দায়। সেই আলোকরশ্মিতে কখনো একটি উজ্জ্বল পোকা, কখনো ধোঁয়ার কুন্ডলী ভাসে, আর হলভর্তি মানুষগুলো যেন জাদুবলে কালো জমাট জল, সেখানে মাছধরা নৌকার মতো টর্চের আলোর বৃত্ত সরে যায়। বাপ্পার মনে পড়ে হেমন্তমামার দেওয়া সেই পিনহোল ক্যামেরাটার কথা, মনে পড়ে ভিজে নিম্নচাপের সকালে দরজা-জানলা বন্ধ ঘরে দিদার বিছানায় মশারির গায়ে প্রতিফলিত আদিরামবাটির ভেতর উঠোন, কুয়ো নিমগাছ সমেত। সিনেমা শেষ হয়ে যাবার পরেও, প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে বাধ্যতামূলক কমলা রঙের ফ্যান্টা খাবার পরেও, আশ্চর্য দৃশ্যমালা মাথার ভেতরে চলতে থাকে, চলতেই থাকে।

সিনেমার টিকিটগুলো বাবা চিনিকাকার কাছ থেকে নিয়ে জমিয়ে রাখে সে, যেন ওরই মধ্যে আছে সেইসব স্বপ্নসম্ভব ছবিগুলোর প্রাণভোমরা। সাতগাঁয় গিয়ে তিতলিকে গল্প বলে: আঁটো কোট আর ঢোলা পালুন পরা এক ভবঘুরের গল্প, আফ্রিকার জঙ্গলে বন্য জিরাফ জেব্রা ধরার গল্প, এলসা নামে এক সিংহীর ছানাকে পুষে তাকে বড়ো করে জঙ্গলে ছেড়ে আসার গল্প, এমনকি যিশু খ্রিস্টের ক্রুশে বিদ্ধ হবার গল্পও। শেষ গল্পটা অবশ্য তিতলি বাপ্পার থেকে আরও বিশদে জেনে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। তাছাড়া বাপ্পা দিদার মতো করে গল্প বলতে পারে না, চলমান দৃশ্যগুলোর বিবরণ দিয়ে চলে শুধু। তাতে গতি থাকে না, ঘটনার পারম্পর্য থাকে না।

দুর্গাদশমীর পরদিন থেকে মন্দিরের চাতালে রামকথা শুরু হলো। কথকঠাকুর এবার কিস্কিন্ধ্যাপর্ব থেকে বলছেন। তাঁর কথকতার যে অংশগুলো বাপ্পা তিতলি বুঝতে পারে না সেগুলো রাত্রিবেলা সরোজা ওদের মতো করে বুঝিয়ে দেন। একমাত্র কানাইয়ের গল্প শোনায় কোনো আগ্রহ নেই। কোনো ব্যাপারেই তার কোনো ধৈর্য নেই, মনস্থির করে কিছু শুনতে পারে না। ইস্কুলে যেতে শুরু করেছে, কিন্তু এখনও গুছিয়ে কথা বলতে পারে না। বাপ্পা আর তিতলিই কেবল মন্দির চাতালে রামকথা শোনে, তারপর দিদার কাছে রাত্রিবেলা খাবার পর গল্পের পেটের ভেতরের গল্প শোনে, শুনতে শুনতে দিদার দুপাশে হলুদ-জিরা-মেথিগন্ধী ওমের ভেতর ঘুমিয়ে পড়ে, সকালে জেগেও ওঠে দুজনে একই বিছানায়।

সরোজা উঠে গিয়েছে কখন, মশারিটা ফেলা রয়েছে। অগ্রহায়ণের সকালের হিম-হিম ঠান্ডা, কিন্তু শীতকাল নয় তাই ঘরের জানলা দরজা ভেজানো নেই, বাইরে উজ্জ্বল সূর্যালোক নিমগাছের পাতায় চিকচিক করছে কিন্তু মশারির গায়ে পিনহোল ক্যামেরার সিল্যুয়েট নেই। কেবল মশারির ভেতর একজোড়া লার্ভার মতো দুই বালক-বালিকা, জৈব রূপান্তরে প্রজাপতি হয়ে ওঠার জন্য অস্থির, তৎপর। তাদের মাটি বালি দিয়ে গড়া ঝুলনের ক্ষুদ্রায়তন জগতে খড়ির নদী, দেশলাই বাক্সের রেলগাড়ি, পোর্সেলিনের গির্জার মাঝেও লুকিয়ে থাকে বিষকেন্নো, কাঠপিঁপড়ে। ইতিমধ্যে তাদের মুখমন্ডল থেকে শৈশবকালীন চর্বি ঝরে গিয়ে ফুটে উঠছে বিশিষ্ট পারিবারিক আদল, বাপ্পার থুতনিতে ভাঁজ আর তিতলির জোড়া ভ্রু টিকোলো নাক, যেন সময়ের অদৃশ্য আঙুল তেলমালিশের মতো করে ফুটিয়ে তুলছে। দেহত্বকে পীচফলের মতো রোঁয়াগুলো চলে গিয়েছে, কিন্তু এখনও অঙ্গের ভাঁজে রোমের উদগম হয়নি। বাপ্পা এখনও তিতলিকে একান্তে শুঁয়োপোকা বলেই ডাকে আর তিতলি এখনও ওর প্রখর ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে বাপ্পার গায়ে কলকাতার গন্ধ খোঁজে, ওর গলায় বুকে মিলিয়ে-যেতে-থাকা নীলচে জন্মদাগের পৈতেরেখায় তর্জনি বোলায়, সরোজার দুপাশে শুয়ে তার দুই বিশুষ্ক স্তনে মাথা রেখে কিছুকাল আগেও খেলাচ্ছলে তিতলি তার দিঠানের স্তন চুষেছে, অনেকক্ষণ টিপলে ঘন ক্ষীরের মতো দুধ বেরোতে দেখেছে বাপ্পা রামসীতার বনবাসের কাহিনি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপ্ন দেখে, দুজনে একই স্বপ্ন, দুজনে ভিন্ন স্বপ্ন, জেগে উঠে বাপ্পা ওর স্বপ্নদৃশ্যগুলো যেন সিনেমার টিকিটে বন্দি আলোর প্রাণভোমরার মতো হাতের মুঠিতে খামচে রাখলে তিতলি সেটা ছিনিয়ে নিতে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেভাবে ইস্কুলে একদিন সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বর্ষা চৌহানের ওপর, আর দুজনে গা জড়াজড়ি গুঁতোগুঁতি করতে করতে ভুলে যায় কী জন্যে মারামারিটা শুরু হয়েছিল। শরত সকালের হিমে একে অপরের গায়ে ওমের ভিন্নতায়, ত্বকের ওপর ত্বকের সূক্ষ্ম রোমের ঘষা লেগে যেন বা স্ট্যাটিকের মৃদু বিদ্যুতস্পৃষ্ট হবার মতো একটা শিহরণ, এক অচেনা নতুন অনুভূতি প্রলম্বিত করার বাসনায় কখনো তিতলি বাপ্পার দেহভারের নীচে নুন-ছিটানো কেঁচোর মতো কিলবিল করে উঠে পিছলে ওর ওপরে চড়ে বসে আর বাপ্পার মাথার পেছনে রাখা ডান হাতের মুঠির ভেতর যা কিছু অদৃশ্য গোপন খুলে নিয়ে হস্তগত করার চেষ্টায় ওর আঙুলে কামড় বসাতে যেতেই কানে আসে নতুনবউয়ের কন্ঠস্বর—

‘এসব কী হচ্ছে? থামো! বন্ধ করো শিগগিরই!’

ওরা দুজনে খেলা থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, দরজার চৌকাঠে কোমরে দুহাত রেখে নতুনবউ, সূর্যালোকিত উঠোন নিমগাছ সব ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে।

‘বেড়ালছানার মতো কামড়াকামড়ি করে খেলার বয়স তোমাদের আর নেই। তিতলি, এক্ষুনি উঠে এসে হাতমুখ ধুয়ে হোমওয়ার্ক নিয়ে বোসো। ওর না হয় ইস্কুলের পাঠ নেই, কিন্তু তোমার? নাকি বাবাকে বলে ইস্কুল ছাড়িয়ে দিই? কাল থেকে বামুনদিদার সঙ্গে হেঁসেলে গিয়ে ঢোকো?’

.

অনেকদিন পরে সেদিন দুপুরবেলায় নতুনবউ তিতলিকে ধরে চান করাতে নিয়ে গেল। দুর্গাপুজোর ছুটি পড়ার পর থেকেই সারাদিন মেয়েটা বাপ্পার সঙ্গে খোঁটা-ছাড়া বাছুরের মতো টোটো করে উঠোনে বাগানে ঘুরে বেড়ায়, ধুলো মাখে, কুলুঙ্গিতে সিন্দুকে ঢুকে লুকোচুরি খেলা করে। গায়ে সাবান পড়ে না, মাথায় ঠিকমত তেল পড়ে না। এদিকে রামকানাই হবার পর সেই যে নতুনবউয়ের স্বাস্থ্য ভেঙেছে, আর ঠিক হয়নি। কোমরে ব্যথা, মিগ্রেন, বুক জ্বালা ইত্যাদি নানান ছোটোখাটো উপসর্গ লেগেই থাকে। সেইসঙ্গে রয়েছে অবসাদ। শ্বশুরের চিকিৎসায় তার ভরসা নেই, অথচ বসন্ত কিছুতেই বাবার অনুমতি ছাড়া বাইরের ডাক্তার দেখাবে না। বাজারে পাওয়া যায় এমন সাধারণ ওষুধ আর দাদা অলোকের এনে দেওয়া নানান ধরনের বিলিতি সাপ্লিমেন্টে নতুনবউয়ের ঘরের তাক ভরে ওঠে। ইদানীং নাওয়া খাওয়া আর বিশেষ প্রয়োজনটুকু ছাড়া ঘরের বাইরে তেমন বেরোয় না সে। মায়ের মৃত্যুর পর শেষ কবে যে কৃষ্ণনগরে বাপের বাড়ি গিয়েছে, কবে যে আদিরামবাটি থেকে বেরিয়েছে, বসন্তর হার্লের পেছনে বসে কোয়ার্সভিলে সিনেমা দেখতে গিয়েছে, মনে পড়ে না। সারাদিন রেডিওয় বাজে একা মোর গানের তরী ভাসিয়েছিলাম নয়ন জলে, এমন দিন কি হবে মা, সংসারে যদি নাহি পাই সাড়া, কিংবা উঠ গো ভারতলক্ষ্মী। কিন্তু রোজ সকালবেলায় তার ৩৫৩টি পুতুল ঝাড়াপৌঁছা করে ফের সাজিয়ে রাখার পর আর কিছু করে ওঠার মতো, ছেলেমেয়েদের দিকে নজর দেবার মতো দেহেমনে আর শক্তি থাকে না।

তাই সকালে শাশুড়ির ঘরে বাপ্পা আর তিতলিকে বেড়ালছানার মতো কামড়াকামড়ি করতে দেখে মেজাজ হারানোর সঙ্গে একটু অপরাধবোধই ছিল। আর সেজন্য সেদিন দুপুরে মেয়েকে নিজে হাতে চান করাতে নিয়ে গেল। চানঘরে ঢুকে ওর বাসি ফ্রক টেনে খুলতে খুলতে গজগজ করতে লাগল, সারাদিন ক্যাওটপাড়ার ছানাগুলোর মতো ওই ছেলেটার সঙ্গে টো টো করে বনেবাদাড়ে ঘুরে চেহারার কি ছিরি হয়েছে, আর ক’দিন বাদেই শীত পড়লে প্যারিস থেকে মামাতো ভাইবোনেরা আসবে, তারা ফিরেও তাকাবে না ওর দিকে…

চৌবাচ্চার ধারে দাঁড়িয়ে হাতদুটো বুকের কাছে জড়ো করে তিতলি জিজ্ঞেস করে,— ‘ওই ছেলেটা কে, মা?’

‘ওই ছেলেটা কে তুমি জানো না?’ নতুনবউ মগে করে ওর মাথায় জল ঢেলে ধুধুলের ছোবড়ায় সাবান মাখাতে মাখাতে বলে।

‘ও ছেলে নয়, ওর নাম বাপ্পা!’

‘চুপ কর তুই!’ নতুনবউ তিতলির গলায় পিঠে ছোবড়া ঘষতে থাকে। এরপর তোর গায়ে পোকা হবে চিন্তামণির মতো। সিস্টার আনা মারিয়া ইস্কুল থেকে রাস্টিকেট করে দেবে!’

‘সিস্টার আনা মারিয়া একটা শোয়েৎ!’ তিতলি চোখ কুঁচকে বন্ধ করে বলে। ‘কী?’

‘শোয়েৎ! পেঁচা! পেঁচা নয়, পেঁচি!’

‘ছি ছি! এসব খারাপ কথা শেখার জন্যে তোর বাবা এত টাকা মাইনে দিয়ে ওই ইস্কুলে পড়াচ্ছে?’ সাবান মাখা হাতে তিতলির গালে চাঁটি মারে নতুনবউ— ‘মা গো, তোর গা থেকে কী আলকাতরা বেরোচ্ছে চোখ খুলে একবার দ্যাখ! ধুলো বেড়ালটাও তোর মতো এত নোংরা নয়।’

‘ধুলো কখনোই নোংরা নয়, মা! আ ক্যাট ইজ আ সেলফ-ক্লিনিং অ্যানিম্যাল, মিস স্বপ্না বলেছে।’

‘কে মিস স্বপ্না?’

‘আমাদের বায়োলজি মিস।’

তিতলির পিঠ গলা পা ঘষার পর এবার নতুনবউয়ের হাতের ছোবড়া সরে আসে ওর বুকে পেটে পায়ের মাঝখানে, আর চানঘরে এসে ফ্রক টেনে খোলার পর তিতলির মধ্যে প্রথমবার চকিত লজ্জার যে আড়ষ্টতা নতুনবউয়ের নজর এড়ায়নি, এখন ওর ত্বকে স্পর্শকাতর অঞ্চল পরিষ্কার করতে গিয়ে গর্ভধারিণীর আঙুল ফের টের পেতে থাকে সেই একই লজ্জার কম্পন। এবং ক্রমশ ওর অস্থির অভিযোগের গজগজানি বদলে যেতে থাকে অন্যরকম উৎকণ্ঠায়, মাতৃত্বের কর্তব্যবোধে, তিতলিকে সে মনে করায়, যেমন তার নিজের ছোটোবেলায় তার মা তাকে মনে করিয়েছিল, নারী হয়ে জন্মে নিজের প্রতি, নিজের দেহের প্রতি বিশেষ দায়দায়িত্বের কথা, সেই দেহ যাতে কোনোভাবে কোনো দুষ্ট পুরুষের হাতে লাঞ্ছিত না হয় সে ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকার কথা, তার কারণ শিগগিরই তিতলি একজন পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠতে চলেছে, তার দেহের ভেতরে বাইরে পরিবর্তন আসতে চলেছে।

বন্ধ চানঘরে শ্যাওলায় পিছল মেঝেয় নগ্ন দাঁড়িয়ে ভিজে ত্বকে কর্কশ ছোবড়ার ঘর্ষণ অনুভব করতে করতে চৌবাচ্চায় ধরা ঠান্ডা জলের স্পর্শে রোমাঞ্চিত তিতলি ছটফট করতে পারে না কারণ তাহলেই পা পিছলোবে, চোখ খুলতে পারে না কারণ তাহলেই চোখে সাবান জল ঢুকে যাবে। ওর বন্ধ চোখের পাতায় ঝিলমিল করে যে আলো, সেটি ছাতের কাছে ঘুলঘুলি দিয়ে ঢোকা সূর্যের রশ্মি চৌবাচ্চার জলে পড়ে সিলিঙে প্রতিফলিত। প্রতিবার নতুনবউ নীল প্লাস্টিকের মগটা ডুবিয়ে জল নেবার পর ক্যালাইডোস্কোপের মতো আলোর প্রতিবিম্ব চুর চুর হয়ে ভেঙে পড়ছে, আবার কেঁপে কেঁপে জুড়ে আসতে চাইছে। তিতলির মনে পড়ে যাচ্ছে তোলাঘরের দেয়ালে ঠিক এইরকম দপদপে আলো দেখে বাপ্পাদাদার ফিটের ব্যামো হয়েছিল। কিন্তু সেদিন সিন্দুকের ভেতর থেকে সতীর তেলাকুচো-লাল শাড়ি গায়ে জড়ানোর কথা মনে করতে পারে না, কারণ তখনও ওর মা নীচু ষড়যন্ত্রের মতো স্বরে বলে চলেছে, আর জলের শব্দের ভেতর তিতলি শুনতে পাচ্ছে কথাগুলো, মাথার ভেতরে একটা অস্পষ্ট কুয়াশার ভেতর, কীভাবে পুরুষের অভিসন্ধিমূলক আঙুল তার দেহ ছুঁতে চাইবে, চিমটি কাটতে চাইবে, আদর করতে চাইবে, টিপে দিতে, গুঁজে দিতে চাইবে, এবং তখন সেই পুরুষের কন্ঠস্বর যত মিষ্টি স্নেহপ্রবণই হোক না কেন, সে যত নিকটজনই হোক না কেন, এমনকি সেই পুরুষটি যদি বাবাও হয়, তিতলিকে বুঝতে হবে পুরুষের আঙুলের ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভাষা, বুঝতে হবে কখন সরে যেতে হবে, কখন প্রত্যাঘাত করতে হবে, জানতে হবে নিজের দেহের অনুপ্রবেশপ্রবণ অঞ্চলগুলো। এবং এই সতর্কবাণী বলতে বলতে নতুনবউ তিতলির গা থেকে সমস্ত সাবানের ফেনা ধুয়ে মুছিয়ে দিতে দিতে দেহের বিভিন্ন স্থানে গামছা ছুঁইয়ে চিহ্নিত করছিল, অবিকল যেভাবে ওর ক্লাস টিচার মিস রুবি গোমস হোমটাস্কের কপিতে ভুল বানানে ভুল যতি চিহ্নে লাল পেন দিয়ে দেগে দেন, এবং অবশেষে চোখ খোলার পর সিলিঙের দিকে তাকিয়ে তিতলি দেখল চুর চুর আলোর প্রতিবিম্বগুলো ক্রমশ জুড়ে আসছে, একটা আয়তক্ষেত্রের আকার নিচ্ছে, কারণ চৌবাচ্চার জলতলও ক্রমশ স্থির হয়ে আসছে, আর ওর মাথার মধ্যে একটা অস্পষ্ট দপদপে আশঙ্কা ক্রমশ দানা বেঁধে উঠল, একটি অদৃশ্য হাতের আকার নিল। রাগে আত্মগ্লানিতে তিতলির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, নীচের ঠোঁটের ওপর চেপে বসল ওপর পাটির নতুন ওঠা দাঁত।

সেদিন সন্ধ্যার আগে আর খুলল না।

তিনদিন ধরে কথকঠাকুর সীতার অপহরণপর্ব থেকে বলছেন। লক্ষ্মণকে সুর্পনখার প্রেমনিবেদন, তরোয়াল দিয়ে নাক কেটে সুর্পনখার শাস্তিদান, খোনা গলায় নাক-কাটা সুর্পনখার দাদার কাছে গিয়ে নালিশ, বনের মধ্যে সোনার হরিণ এসে সীতার মনোহরণ, সীতার অনুনয়ে তাকে শিকার করতে লক্ষণের যাত্রা—এসব কখনো পয়ারে, কখনো তাঁর নিজের মতো ব্যাখ্যা করে, গান করে, অভিনয় করে দেখাচ্ছেন। মন্দিরের চাতালে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে, তার নীচে চৌকির ওপরে তিনি বসেছেন হারমোনিয়াম নিয়ে। একটি বালবে আলো জ্বলছে, শ্যামাপোকার উপদ্রব এড়াতে বালবের চারপাশে কেসুত গাছের ডাল ঝোলানো হয়েছে। তার পাতার ফাঁক দিয়ে অদ্ভুত আলোছায়া সৃষ্টি হয়েছে মাটিতে বসা শ্রোতাদের ওপর। বিভিন্ন বয়সের প্রায় পঞ্চাশজন পুরুষ নারী শিশু, জ্ঞাতিগুষ্টি ছাড়াও আশেপাশের দুচারজন উৎসুক প্রতিবেশীও আছে। সামনের দিকে বসেছে ছোটোরা, একদিকে বিধবাদের দল, তাদের মাথায় সাদা আঁচল, অনেকেরই মাথায় সুতির র‍্যাপার ফেলা। হেমন্তের সন্ধ্যার কাকচক্ষু আকাশ থেকে হিম ঝরছে।

তিতলি বাপ্পার সঙ্গে চৌকির ডান দিকে প্রথম সারিতে বসেছে, গত দুদিন ধরে ঠিক যেখানে তারা বসছে, আরও কয়েকটি ছোটো ছেলেমেয়ের সঙ্গে। এদিকে ডালপাতার ফাঁক দিয়ে আসা আলো শ্রোতাদের মুখে আলোছায়ায় বিস্ময় আর মুগ্ধতার অভিব্যক্তি বুনছে— কখনো রঙ্গ, কখনো উত্তেজনা, কখনো বা বিষাদ। লক্ষ্মণকে রাক্ষসীর প্রেম নিবেদন ও তারপর নাক কাটার বিবরণে হাসির রোল উঠছে, হেসে গড়িয়ে পড়ছে ছোটোরা, বড়োরা কেউ কেউ পেটে হাত চেপে হাসছে। কিন্তু আবার যখন সূর্পনখা দাদা রাবণের কাছে গিয়ে নাক কাটা যাবার অপমান যন্ত্রণা বিলাপের সুরে ব্যাখ্যা করছেন, সমব্যথী দুঃখের ভার চেপে বসছে শ্রোতাদের বুকে, বৃদ্ধারা কেউ কেউ চোখের জল ধরে রাখতে না-পেরে আঁচলে চোখ মুছছেন। আবার হারমোনিয়ামে রিড টিপে ধ্বনির আবহ সৃষ্টি করে বনের মধ্যে সোনার হরিণ ঘুরে বেড়ানোর বর্ণনা দিচ্ছেন যখন, যেন সত্যিই এক মায়ামৃগ নেমে এসেছে মন্দির চাতালে। দ্বাদশীর জ্যোৎস্না আদিরাম মন্দিরের গায়ে পড়ে পোড়ামাটির প্যানেলগুলো আশ্চর্য সজীব হয়ে উঠেছে। এদিকে কেসুতের ডালপাতার ফাঁক দিয়ে আসা আলো আর কিষ্কিন্ধ্যার বনে মহীরুহের পত্রপল্লবের ফাঁক দিয়ে আসা আলো মিশে যাচ্ছে যখন রাবণ সন্ন্যাসী সেজে বনের মধ্যে রামের পাতার কুটিরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, লক্ষ্মণের গন্ডির ঠিক বাইরে। আর ঠিক তখনই তিতলি ওর পিঠের কাছে অনুভব করে সেই অদৃশ্য হাতটা, যা বিগত দুই সন্ধ্যা ধরে তার পিছু নিয়েছে, হাতের সন্তর্পণ আঙুল, যা ঘাড়ের কাছ থেকে পিঠের ডানার হাড় বরাবর নেমে এসে ওর বাহুর নীচ দিয়ে প্রায় শামুকের মতো খুব ধীরে ধীরে ওর অপুষ্ট বুকের দিকে এগোচ্ছে, কখনো তিনটি আঙুল কখনো একটি, ঘুমন্ত বৃত্তের ওপর ছুঁয়ে যাচ্ছে আলতো করে, তারপর নীচের দিকে নেমে পাঁজরের হাড়ের ওপর দিয়ে ক্রমশ চলে যাচ্ছে পিঠের দিকে, যখন লক্ষ্মণকে প্রলুব্ধ করে সেই সোনার হরিণটা চলে গিয়েছে গহীন বনে, কথক ঠাকুর বলছেন, যেখান থেকে সীতার চিৎকার শোনা যায় না, তার কারণ সে লক্ষ্মণরেখার বাইরে আসতেই রাবণ কমন্ডুলু হাতে সন্ন্যাসীর ভেক ছেড়ে এবার স্বরূপ ধরেছে। ততক্ষণে সেই অদৃশ্য হাত, সেই ত্রস্ত আঙুল তিতলির পিঠের দিকে ফিরে গিয়েছে ফের, কশেরুকা বেয়ে নীচের দিকে নামছে, আর বিগত দুদিন সন্ধ্যার অস্বস্তি মেশা কৌতূহল ছাপিয়ে ওর ভেতরে জমে উঠছে এক তীব্র বিবমিষা আর ক্রোধ, রাবণের পুষ্পক রথ কিষ্কিন্ধ্যার বন ছেড়ে সীতাকে নিয়ে আকাশে উড়ে পড়েছে ততক্ষণে, আর তিতলির মনে পড়ে যাচ্ছে দুপুরে চানঘরে মায়ের কথাগুলো নয়, অনেকদিন আগে বাবা আর বাপ্পাদাদার সঙ্গে এক সন্ধ্যা হয় হয় প্রহরে কেরেস্তান গোরস্তানে এক সাহেবের ভূত দেখার কথা, মনে পড়ে যাচ্ছে তার ব্রিচেসের ফাঁক দিয়ে দুঃখী গোলাপি অঙ্গ, যা সে এক হাতে খামচে ধরে বুঝি টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছিল, মনে পড়ে যাচ্ছে তেকোনা টুপির ছায়ায় তার মরীয়া যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ, আর সেই ফাঁকে, ওর ফ্রক আর ইজেরের ফাঁকে সেই অদৃশ্য অনুপ্রবেশকারী হাতটা নিতম্বের দুই গোলার্ধের মাঝে সেঁধিয়ে যাবার মুহূর্তে তিতলি ঝটকা দিয়ে উঠে অন্ধ আক্রোশে পিছনে ঘুরে কামড়ে ধরল সেই শিরা-ওঠা, ঘামে আর্দ্র, তাগা-বাঁধা কব্জিটা, যা সংক্রামক জীবাণুর মতো ওর নিজের দেহ ঘিরে সব সুখানুভূতিগুলোকে, এমনকি বাপ্পাদাদার গায়ে গা ঘষার রোমাঞ্চিত বৈদ্যুতিক অনুভূতিগুলোকেও, বিষিয়ে দিচ্ছিল।

সীতা অপহরণের রুদ্ধশ্বাস কথকতার ভেতর এতটাই ডুবে গিয়েছিল শ্রোতারা—তখন রাবণ আকাশে উদ্যত তরোয়াল হাতে গরুড়ের সঙ্গে লড়াই করছেন- —যে সকলে প্রথমে ভাবল ওই কানফাটানো আর্তনাদটা বুঝি ডানা কাটা পাখির কন্ঠ থেকে আসছে। এমনকি কথকঠাকুরও থেমে গিয়ে হারমোনিয়ামের রিড চেপে ধরে ভাবলেন বুঝি সত্যিই তাঁর বচন সূক্ষ্মদেহ ধারণ করেছে, যতক্ষণ না চৌকির ডানদিকে আলোছায়ায় চোখে পড়ল যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে এক ক্ষয়াটে চেহারার বিরলকেশ মাঝবয়সি পুরুষ, আর তার ডান হাতের কব্জিটা কামড়ে ধরেছে তিতলি।

দুজন লাগল তিতলির বজ্র চোয়াল থেকে ওকে ছাড়াতে। দেখা গেল তিতলির নীচের ঠোঁটটা অস্বাভাবিক ফোলা আর রক্ত ঝরছে। ওকে আলোর নীচে এনে বিশু ভালো করে পরীক্ষা করে যখন দেখল রক্ত ওর নিজের নয়, ওই কামড়ে ধরা কব্জির, ততক্ষণে হুটোপাটির মধ্যে লোকটা সরে পড়েছে, অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল সে এক তিন রাত্তিরের জ্ঞাতিবাড়ির আত্মীয়, পুজোর সময় বেড়াতে এসেছিল। ওকে আর কখনো সাতগাঁয় দেখা যায়নি।

ভীমরুলে কামড়ানোর মতো তিতলির ফোলা ঠোঁট আর বন্য বিড়ালির মতো চাহনি দেখে কেউ আর ওকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করেনি। ঠোঁটের ওই ফোলাটা যে দুপুরে চানের পর থেকে একটানা দাঁত চেপে রাখার জন্য, ইতিমধ্যে ও যে কিছু দাঁতে কাটেনি, সেটা পুজোয় বাড়ি ভর্তি লোকজনের মধ্যে কেউ আর খেয়াল করেনি।

পরদিন সকালে ঠোঁটের ফোলা ভাবটা কেটে গেল, চোখে বন্য বেড়ালের চাহনিটা রয়ে গেল। ঠিক কী ঘটেছিল সেই ব্যাপারে কাউকেই কিছু বলল না তিতলি, বাপ্পাকেও না।

বাপ্পা ক্রমশ অস্পষ্টভাবে ওর নিজের মতো করে বুঝতে পারছিল, ঘাসের চাঙড় বালি দেশলাই বাক্সের রেলগাড়ি আর পোর্সেলিনের গির্জার ওই ঝুলনের মৎস্যভূমিটা বানানো, অস্তিত্বহীন। সাতগাঁয় ওর যে আরেকটা আমি থাকে বলে সে আজন্ম জেনে এসেছে, সেও আসলে অলীক, কিষ্কিন্ধ্যার বনে মায়ামৃগের মতো। কথকঠাকুরের হারমোনিয়ামের রিডের ধ্বনিতে তার খুরের শব্দ মিলিয়ে যায়। ওরা দুজনে ক্রমশ দুই আলাদা জগতে ভেসে ভেসে সরে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে একদিন তিতলি জিজ্ঞেস করল—

‘পিসাইকে পোস্টকার্ডের দেশের জমিদার কেন বলে রে, বাপ্পাদাদা?’

সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে মাকে তিতলির প্রশ্নটা করল বাপ্পা।

‘কেন বলে, মা? পোস্টকার্ডের দেশের জমিদার কী?’

‘কিছু না, ঘুমো এখন।’ আলো নিভিয়ে দিয়ে শিউলি বলল।

*

আলো নিভিয়ে দিয়ে বিছানায় শুয়েও আজকাল শিউলির ঘুম আসে না। সেটা টের পায় বাপ্পা, শ্বাসপতনের ধ্বনি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। সাতগাঁয়ে থাকলে সেই ধ্বনিতে ঝিঁঝির তান এসে মেশে, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠলে অন্ধকারের মধ্যেও বাপ্পা বুঝতে পারে সে কলকাতায় আছে নাকি সাতগাঁয়। সাতগাঁয় রাতে অন্ধকার আর নৈঃশব্দ্যে গাঢ় ওমের মতো, যা কলকাতায় নেই।

শিউলির ব্যাধির উপসর্গগুলো প্রথমে দেখা দিল হজমের গোলমাল আর অম্লশূলের রূপে, যা বিয়ের আগে রথীনের ছিল, কমিউনিস্ট পর্বে হেমন্তরও হয়েছিল। দুবারই রামপ্রাণ চিকিৎসা করে সারিয়েছিলেন। কিন্তু শিউলির ক্ষেত্রে তাঁর ওষুধ বিশেষ কার্যকর হলো না। রঘুনাথপুরে গভীর উৎকণ্ঠার দিনগুলোয় অনিদ্রার সঙ্গে যে হজমের গোলমাল শুরু হয়েছিল, সেসব চলতে লাগল। কলুটোলা লেনে খাবার টেবিলের লাগোয়া শেলফে, অ্যান্টাসিড, অ্যাকোয়াটাইকোসিস আর হজমি আরকের শিশি বোতল জমল। মাঝরাতে বুকজ্বালায় জেগে উঠে ছটফট করে শিউলি, কখনো বাথরুম থেকে বমি করার শব্দ আসে।

খুব ছোটোবেলায় একবার মাকে ওরা কাঁচা সিদলের গন্ধ শুঁকিয়েছিল। বাথরুমের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে ওই ব্যাকুল অসহায় শব্দে ছোট্ট বাপ্পার মনে হয়েছিল মা বুঝি মারা যাচ্ছে। তারপর থেকে শব্দটা শুনলেই মনে সেই আতঙ্কটা ফিরে আসে।

আতঙ্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিভ্রান্তি। ওদের তিনজনের জীবনে ঘটে চলা অনেক ঘটনার কার্যকারণ কিছু বুঝে উঠতে পারে না। বাপ্পাকে কিছু বলা বা বোঝানো হয় না। অদৃশ্য অশ্রুত একটা উৎকণ্ঠার ভার বয়ে আনে কেবল। যেমন আনতো রঘুনাথপুরের বাংলোয় রাতবিরেতের টেলিফোন। সেই টেলিফোন ধরা বাপ্পার জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল, লাইনের অপর প্রান্তে কে কথা বলছে, কী বলছে, ওর জানার কোনো উপায় ছিল না। কেবল শুনতে পেত লাইনের এপারে বাবার কন্ঠস্বর কখনো উত্তেজিত, কখনো বরফশীতল। আর সেই কঠোর দুর্বোধ্য অভিব্যক্তি, যা সারা সন্ধ্যা হুইস্কির গ্লাস হাতে বন্ধ দরজার ওপাশে কাটানোর পরেও রাতে খাবার টেবিলে মুখে এঁটে বসে থাকত।

কলুটোলা লেনে বাথরুম আদিরামবাটির চানঘরের মতো বড়ো নয় বটে কিন্তু এক কোণে বেসিন আছে, তার ওপরে আয়না। আজকাল ডিঙি মেরে দাঁড়ালে নিজের মুখ দেখতে পায় সে। বেসিনের ওপর নীল প্লাস্টিকের খোপ-কাটা তাক, সেখানে দাঁত মাজার পেস্ট, ব্রাশ আর সপ্তাহান্তে রথীনের টুথব্রাশ ও দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম থাকে। একদিন নিজের মসৃণ রোমহীন গালে, ঠোঁটের ওপর বুরুশ দিয়ে সাবান বুলিয়ে সেফটি রেজার টানল বাপ্পা, যদি তাড়াতাড়ি দাড়ি ওঠে, যদি সে তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যায়। তাহলেই ওর চোখের কানের আড়ালে ঠিক কী ঘটে চলেছে বুঝতে পারবে, এই অপ্রতিভ বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি পাবে।

‘পোস্টকার্ডের দেশের জমিদার’ কথাটার মানে কি সেটা মাকে জিজ্ঞেস করেও জানা যায়নি। কিন্তু বাবা-মায়ের বিয়ের আগে সিলেট থেকে আসা সেই রহস্যময় পোস্টকার্ডের কথা সে একাধিকবার শুনেছে। খোকাজেঠু বলেছিল, যে ভটচাজ- ঠাকুরের হস্তাক্ষর ওতে ছিল, তিনি পোস্টকার্ডটা সিলেট থেকে কলকাতার ঠিকানায় আসার অনেক আগেই মারা যান। তাহলে কি বাবাদের ছেড়ে-আসা দেশটা ভূতপ্রেত দত্যিদানোর হয়ে পড়েছে?— ‘ইস্টবেঙ্গল’ নামে দেশ, যেখান থেকে পোস্টকার্ডটা এসেছিল, সেই দেশটাই তো ভূত হয়ে গিয়েছে। বাপ্পার ভূগোল বইয়ে তার কোনো অস্তিত্ব নেই আর। সিলেট শহর যে দেশে সেই দেশটার নাম ইস্ট পাকিস্তান। সিঁড়ি- ভাঙা অঙ্কের মতো করে বুঝতে চেষ্টা করে বাপ্পা:

ভারত ÷ ২ = ভারত + পাকিস্তান

অতএব, পাকিস্তান = ওয়েস্ট পাকিস্তান + ইস্ট বেঙ্গল = ওয়েস্ট পাকিস্তান + ইস্ট পাকিস্তান

অতএব, সিলেট ÷ (ভারত + পাকিস্তান) = গৌহাটি + শিলং = গৌহাটি + কলকাতা + শিলং = কলকাতা + শিলং

অতএব, ইস্ট বেঙ্গল – ইস্ট পাকিস্তান = পোস্টকার্ডের দেশ

এক জটিল সমীকরণের ভেতর দিয়ে চলেছে ঠাঁইনাড়া জীবন। যতদিন না সে বাসযোগ্য কোনো জায়গায় বদলি হয়ে থিতু হচ্ছে, এবং বাপ্পা-শিউলিদের তার কাছে এনে রাখতে পারছে, ততদিন ওরা সাতগাঁয় গিয়ে থাকবে এ ব্যাপারে রথীনের সায় নেই। দমদমে খোকাদের ভাড়াবাড়িতে গিয়ে থাকা যায়, কিন্তু সেটা দুজনেরই মনঃপুত নয়। রথীন চায় শিউলিরা কলুটোলা লেনের বাসায় থাকুক, বাপ্পা কলকাতার কোনো ভালো সরকারি স্কুলে ভর্তি হোক, সে নিজে কলকাতার উপকণ্ঠে বদলি নিয়ে চলে আসার চেষ্টা করবে।

কিন্তু এই শেষ পরিকল্পনাটি কার্যকর করা যে ততটা সহজ নয় সেটা রথীন কিছুদিন রাইটার্স বিল্ডিঙে ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা করেই বুঝেছে, বিশেষত রঘুনাথপুরে ওই ঠিকাদারের সঙ্গে সংঘাতের পর। এবং শিউলিকে মুখ ফুটে কিছু না বললেও সে বুঝেছে।

*

পুজোর পর থেকে বাপ্পাকে নিয়ে শিউলি কলুটোলা লেনে এসে থাকে, সপ্তাহান্তে রথীন এসে ওদের সঙ্গে কাটায়। ইতিমধ্যে ভূটান সীমান্তে চামুর্চি নামে সেই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ওকে মালদায় বদলি করা হয়েছে। শুক্রবার রাতের ট্রেনে চেপে ভোরবেলায় কলকাতায় আসে, আবার রবিবারে রাতের ট্রেনে ফেরে। এইসময় চিনিও শিলং থেকে ব্যবসার কাজে এসে ওঠে।

শীত আসছে, কলকাতা সেজে উঠছে উৎসবের মেজাজে, পার্ক স্ট্রিটে ক্রিসমাসের রঙীন আলো আর হগ মার্কেটের বাতাস ম ম করছে নাহুম ইম্পিরিয়ালের প্লাম কেকের গন্ধে। শনিবারে রথীন এলে চিনি ওদের চায়না টাউনে চীনা রেস্তোরাঁয় নিয়ে যায়। সেখানে চিকেন মাটন ছাড়াও হাঁস, শুয়োর, গরু ও নানা ধরনের সামুদ্রিক জীবের মাংস পাওয়া যায়। মাটন ছাড়া শিউলি আর কোনো পশুপাখির মাংস ছোঁয় না, কিন্তু বাপ্পার পছন্দ টেবিলের ওপর কাঠকয়লার আগুনে ধূমায়িত চিমনি সুপ, ক্ষুদে ভ্যানিটি ব্যাগের আকারের ডাম্পলিং, চীনা লণ্ঠনের মৃদু লাল আলো, অচেনা শসের গন্ধ।

ওদের মধ্যে চিনিকাকাই একমাত্র চপস্টিক দিয়ে খেতে পারে। দুটো কাঠির ফাকে নুডল কিংবা মাংসের টুকরো তোলে যখন, মনে হবে যেন মাছরাঙার ঠোঁটে ধরা মাছ ছটফট করছে। কিশোর বয়স থেকেই শিলঙের সাহেবিয়ানা আর বিভিন্ন জনজাতির মিশ্র সংস্কৃতিতে বড়ো হয়ে ওঠা চিনি তার জনজাতি বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে নানান বিচিত্র খাদ্য খাওয়ার অভিজ্ঞতা বলে—নানান ধরনের পশুর মাংস, বন্য ছত্রাক আর ভূত জোলাকিয়া মিশিয়ে আচারের মতো জারানো, কাঠের ধোঁয়ায় শুকোনো, রক্তের পুডিং, বাঁশের খোলের ভেতর পুরে পোড়ানো মাংস, নানা ধরনের পোকা উচ্চিংড়ে শুক্রকীট ভাজা…

বহুকাল পরে বাপ্পার মনে পড়বে সেইসব সন্ধ্যাগুলো, চোখ বন্ধ করলে সে স্পষ্ট দেখতে পাবে: লাল আলোছায়ায় টেবিলের একদিকে বসেছে বাবা আর চিনিকাকা, অন্যদিকে সে আর মা। টেবিলের মাঝখানে ঝুলছে ড্রাগন-আঁকা গোল কাগজের লন্ঠন, আলোর বৃত্তে চিনেমাটির প্লেটে বাটিতে খাবার থেকে ভাপ উঠছে।

লন্ঠনের ওপাশ থেকে শিউলির দিকে তাকিয়ে বিচিত্র সব প্রাণীর মাংসের ততোধিক বিচিত্র রন্ধনপ্রণালী রসিয়ে রসিয়ে বলছে চিনি। সাতগাঁর কনৌজিয়া ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে খাওয়া থামিয়ে চোখ গোল গোল করে শুনছে। মাঝে মাঝে যেন শিউরে উঠছে।

‘অমন করে তাকাচ্ছ কেন?’ চিনি বলছে। ‘আমি সর্বভুক!’

শিউলি এক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করছে, তারপরে বলছে

‘হুম। আকাশে মাটিতে জলে যা কিছু চলে ফিরে উড়ে বেড়ায় সবই বোধহয় তুমি খেতে পার?’

‘পারি তো!’ চিনি বলছে।

বাপ্পা দেখছে, লাল আলোয় চিনিকাকার সরু চোখ, ঠোঁটদুটো তৈলাক্ত সসে চিকচিক করছে।

ফুটন্ত চিমনি সুপের ভেতর থেকে চিনিকাকা চপস্টিক দিয়ে শিকার করে আনছে চিংড়ি, ছোট্ট কামড় দিয়ে তার আস্বাদ নিয়ে সেটি টেবিলের ওপ্রান্ত থেকে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরছে। বাপ্পা ইতস্তত করছে, অন্যের মুখের এঁটো খেলে মা কী বলবে?

কিন্তু ওই সাদা কমলাভ চিংড়ি, গায়ে লাল জরির মতো শিরা উপশিরা, তার লোভ বাপ্পা সামলাতে পারে না।

*

রঘুনাথপুর থেকেই বাবা-মায়ের মধ্যে কখনো সোচ্চারে কখনো নিরুচ্চারে মনান্তর হয়ে চলেছে সেটা টের পাচ্ছিল। একদিন রাতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে শুনতে পেল চাপা কান্নার শব্দ। সপ্তাহের মাঝামাঝি কোনো একটা দিন, কলুটোলা লেনের বাসায় ওরা দুটিমাত্র প্রাণী। স্তব্ধ অন্ধকারে সেই কান্নার শব্দ শুনে খুব ভয় পেয়ে গেল বাপ্পা।

‘কী হয়েছে মা?’

৩৯৬ / সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা

‘ও কিছু না, তুই ঘুমো। রাতে খাবার আগে ওষুধটা খেতে ভুলে গিয়েছিলাম তাই বুকে জ্বালা করছে।’

কিছুক্ষণ পরে বাথরুমে বমির শব্দ।

আরেকদিন শোবার ঘরে বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে বাপ্পা শুনতে পেল বাবা- মায়ের বিরল কথা কাটাকাটি। খুব নীচু কিন্তু উত্তেজিত স্বরে কথা বলছিল ওরা, বিষয়টা যে চিনিকাকাকে কেন্দ্র করে সেটা আন্দাজ করতে পারছিল। আগের সপ্তাহেই চিনিকাকা শিলং থেকে এসে ছিল। রবিবার রাতে বাবা মালদা ফিরে যাবার পরেও একদিন কোনো ক্লায়েন্টের পার্টিতে গিয়ে অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় দমদমে খোকার বাসায় না ফিরে কলুটোলা লেনে রাত্রিবাস করেছিল।

‘ও আমার মায়ের পেটের ভাইয়ের মতোই, ওকে আমি ফেলে দিতে পারি না!’ বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে বাবার ছেঁড়া ছেঁড়া কন্ঠস্বর। ‘আমরা একসঙ্গে বড়ো হয়েছি, সেই অতীতটাকে বদলানো যায় না!’

‘আমি যে মিথ্যেবাদী এই অভিযোগ জীবনে এর আগে কেউ করেনি!’ মায়ের বুজে আসা গলা শুনল বাপ্পা।

‘আমি এমন কথা একবারও বলিনি!’

চাপা কান্নার শব্দ।

‘যে কথা আমি বলিনি সে কথা আমার মুখে বসানোর চেষ্টা কোরো না শিউলি!’

আরেকদিন রবিবার–সেটা এই কথা কাটাকাটির আগে নাকি পরে বাপ্পা আর মনে করতে পারবে না–কলুটোলা লেনের বাসায় সিলেটি গুষ্টির জমায়েত। কিছু একটা আনতে রান্নাঘরে গিয়ে বাপ্পা দেখল, মা আর চিনিকাকা যেন ধ্বস্তাধস্তি করছে। চিনিকাকা বাঁ হাতে মায়ের কাধ আঁকড়ে ধরে কিছু একটা খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, আর মা ওর কব্জি খামচে ধরে বাধা দিচ্ছে। দেখে বাপ্পার কিছু মনে হয়নি, কারণ বাবার পরিবারের সকলের মধ্যে সারাক্ষণ পরস্পরে এই ছোঁয়া, জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া কিংবা ছদ্ম মারামারির অঙ্গভঙ্গি খুব স্বাভাবিক।

সাতগাঁয়ে ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক। সেখানে বাপ্পা পা ছুঁয়ে প্রণাম আর মাথায় হাত রাখা ছাড়া বড়োদের কখনো পরস্পরকে ছুঁতে দেখেনি, এবং ছোটো থেকে বড়ো হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারে অনুশাসন মনে করিয়ে দিয়েছিল নতুনবউ, যেদিন বাপ্পা আর তিতলি খেলাচ্ছলে মারামারি করছিল দিদার বিছানায়।

সেই রবিবার রান্নাঘরে মায়ের মুখে হাসি ছিল না, লালচে আভা আর নাকের চারপাশে ঘামের বিন্দু চিকচিক করছিল।

আরেকদিন ভরা আড্ডার মাঝে দুপুরবেলায় শিউলি হঠাৎ বাপ্পাকে নিয়ে সাতগাঁয় রওনা দিল। সেদিন, রবিবার, পথঘাট ফাঁকা, অনেককাল আগের সেইসব শীতের ভোরগুলোর মতোই। দোকানপাট বন্ধ, শহরতলীর নিত্যযাত্রীদের ভিড় না থাকায় কলকাতা যেন এলিয়ে আছে, নিজের ভেতরে নিজে সেঁধিয়ে আছে। হাওড়া স্টেশনেও সেদিন ট্রেন কম।

বন্দর হুগলিতে নেমে ছোটো রেল ধরার জন্য শিউলি আর দৌড়য়নি। ফুটব্রিজের সিঁড়ি ভেঙে উঠে হাঁফাতে লাগল। সাতগাঁয় ট্রেন থেকে নেমে বাইরে আসার সময় এ. সি. ঘোষাল, টি.সি. টিকিট দেখতে চাইল না। এক অদ্ভুত ব্যাকুল চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকালো, বাপ্পা লক্ষ করল। আদিরামবাটি যাওয়ার পথে ভাড়ার পালকিতে মুখোমুখি বসে নরম কনে-দেখা আলোয় তখন শিমুলের

সারির পেছনে কমলা বলের মতো সূর্যটা অস্ত যাচ্ছে বাপ্পা মায়ের মুখে, চোখের নীচে এই প্রথম লক্ষ করল একটা অন্যরকম ছায়া। রেলের কয়লার গুঁড়োর নীচে চামড়ায় ফুটেছিল সেই ছায়াটা।

এ. সি. ঘোষাল, টি.সি. কি ডাক্তাররা পরীক্ষা করে রোগনির্ণয় করার আগেই টের পেয়েছিল? পরে অনেক ভেবেও বাপ্পা জানতে পারেনি। রবিবারে কলুটোলা লেনের আড্ডাগুলো আর কখনো আগের মতো হয়নি।