সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৮.৪
৮.৪
২০শে মার্চ বসন্ত বিষুবের পর প্রতি বছরের মতো ক্যালকাটা পোর্ট ট্রাস্টের দুটি ড্রেজার এসে সাত দিন ধরে ত্রিবেণীর নদীগর্ভ থেকে পলিমাটি খুঁড়ে তুলল, সাতগাঁর রাস্তায় শুরু হলো ডাম্পার ট্রাকের আনাগোনা। প্রতি বছরের মতো গামা টানা গাড়িতে চিন্তামণিকে যুতে আদিরামবাটির সোম্বৎসরের গঙ্গামাটি আনতে গেল হুগলির পাড়ে। প্রথম দিন মাটি বোঝাই করে আনার পর দ্বিতীয় দিন দুপুরে গাড়িটা টানতে টানতে চিন্তামণি একা ফিরে এল। গামাকে পাওয়া গেল না।
সেই সময় নদীর পাড়ে বিশেষ কেউ ছিল না, গুটিকয় দিনমজুর মাটি কাটায় ব্যস্ত ছিল, কেউ কিছু দেখেনি। পরদিন দিনেমারডাঙা জুট মিলের জেটির নীচে পাইপে লটকানো একটি মৃতদেহের খোঁজ পাওয়া যায়। তার কাঁধের চামড়ায় বাঁক টানার দাগ, সেও ছিল জল বওয়ার ভারী। কিন্তু সে গামা নয়, কারণ তার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটি অটুট ছিল।
গামাকে আর পাওয়া গেল না। তার এই পরিণতি ঘিরে রহস্যের কিনারা হলো না। সারা জীবন ধরে প্রতিদিন দিনে কয়েকবার জোয়ারে ভাটায় যে মানুষটা নদী থেকে কলসিতে জল বাঁকে টেনেছে, সে সাঁতার জানত কি না এ নিয়ে কারোর স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সাঁতার জানলেও নদী ছেঁচে তোলা আঠালো কাদার চোরা ফাঁদে কোনো কাজে লাগত কি না জানার উপায় নেই। ড্রেজারে তোলা মাটির পাহাড় ডাম্পার ট্রাকে বোঝাই করে ছাড়িগঙ্গার খাতে ফেলার পরেও ওর আর কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। বিয়ের পর এই বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর থেকে সরোজা যাকে নীরব পশুর আনুগত্যে কাজ করতে দেখে আসছে, বসন্ত থেকে শুরু করে রামকানাই পর্যন্ত দু-দুটো প্ৰজন্ম যার কোলে পিঠে চড়ে বড়ো হয়েছে, গঙ্গারাম চক্রবর্তীর আমলের সেই মানুষটা এভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পরিবারের সকলে ওর সম্পর্কে কত কম জানে সেটা প্রথম উপলব্ধি হলো।
গামা ছিল দোখনো, সুন্দরবনের ভেতর কোনো বসতি থেকে এসেছিল মুখের ভেতর এক দূরারোগ্য পচনের ব্যাধি নিয়ে। গঙ্গারাম কবিরাজের চিকিৎসায় সেরে ওঠার পর আর ফিরে যায়নি। ওর তিনকুলে কেউ ছিল না, এমনকি গামা ওর পিতৃদত্ত নামও নয়। গঙ্গারাম ওকে বাড়ির নিত্যব্যবহার্য গঙ্গাজল ও মাটি বহনের জন্য ভারীর কাজে বহাল করেন, ওর অক্লান্ত আসুরিক শক্তি দেখে গামা পালোয়ান নামে সেকালের এক বিখ্যাত কুস্তিগীরের নামে ওর নতুন নামকরণ করেন। সাতগাঁর অন্যান্য ভারীদের মতো গামাকে কখনো কেউ নেশাভাঙ করতে দেখেনি, কোনো নারীর দিকে লুব্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে দেখেনি, কোনো জিনিসের প্রতি কখনো কোনো লোভ করতে দেখেনি। গামার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা নাকি ছোটোবেলাতেই নৌকায় বাঁশের চোচে আটকে কাটা পড়েছিল, পায়ে কখনো চটি বা জুতো গলায়নি সে। ওর পরনে শিষ্যবাড়ি থেকে আসা ধুতি হাঁটুর ওপর তুলে কৌপিনের মতো করে পরা, খুব শীত পড়লে তার ওপর একটা পাঁশুটে রঙের সুতির মেরজাই, গামছাটা র্যাপারের মতো মাথায় কাঁধে ফেলা, আর বৃষ্টি পড়লে বাঁশে বোনা নৌকার আকারের একটা বড়ো টোকা, যার দুপাশে বাঁকের ডান্ডাটা গলানোর মতো দুটো গর্ত ছিল। গামার মুখ-গহ্বরের সেই ব্যাধি সম্পূর্ণ সেরে গেলেও ঠোঁটের দুপাশে চামড়া গুটিয়ে গিয়েছিল, এবং সম্ভবত জিভেরও কিছু অংশ বাদ গিয়েছিল। ওর অস্পষ্ট, অনেকটা যেন গোঙানির মতো কন্ঠস্বর ছিল। কথা বিশেষ বলত না, হাসতও না তেমন। হাসলে মুখে বিচিত্র করুণ অভিব্যক্তি ফুটত, খুশি হলে ওর স্ফীত কপালের নীচে কুতকুতে চোখদুটো চিকচিক করে উঠত। গামার কখনো অসুখ করেছে, এমনকি সামান্য সর্দিকাশি হয়েছে বলেও কারোর মনে পড়ে না। ওর গায়ে সরষের তেল আর গঙ্গামাটি মেশা গন্ধ ছিল, দুই কাঁধের ওপর আড়াআড়ি ফ্যাকাশে খসখসে চামড়ায় আজীবন বাঁক টানার দাগ। তার ওপর দিয়ে পা ঝুলিয়ে ওর মাথায় জড়ানো গামছা আঁকড়ে ধরে পাড়া বেড়িয়েছে আদিরামবাটির ছোটোরা। গামার বয়স ঠিক কত হয়েছিল অনুমান করা শক্ত। নিঃসন্দেহে রামপ্রাণের থেকে কম নয়, যদিও ওর চেহারায় তার তেমন কোনো ছাপ পড়েনি।
দুদিন ধরে খোঁজাখুঁজির পরেও দেহ পাওয়া গেল না। গামা নদীর বুকে চোরা কাদায় ডুবে মারা গিয়েছে বলেই ধরে নেওয়া হলো। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে, গরু মহিষ দঁক কাদার ভেতরে গিঁথে মারা গিয়েছে। দেহ পাওয়া যায়নি, কখনো ড্রেজিং-এর সময়ে নদীতল থেকে উঠে এসেছে হাড়গোড়। ভেতরবাড়িতে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির নীচে যেখানে গামা শুতো, সেখানে ওর যৎসামান্য স্থাবর সম্পত্তি রাখা ছিল। তার ভেতর থেকে ওর অতীত সম্পর্কে কিছু জানা যায় কি না, ওর গ্রামে পরিবারের কেউ থেকে থাকলে খবর পাঠানো যায় কি না ভেবে খুঁজতে গেল বিশু। বাঁকুড়ার গামছার পুঁটলির ভেতর পাওয়া গেল একটি সাদা ঢোলা জোব্বার মতো পোশাক, যেটি বহুবার কাচার পর গঙ্গামাটির রং নিয়েছে, কয়েকটি পুঁতির মালা এবং একটি গোপীযন্ত্র।
সেই দেখে বামুনদি মাজায় হাত রেখে চোখ কপালে তুলে হায় হায় করে উঠল-
‘সর্ষের মধ্যে ভূত! এমনটা কেউ ভাবতে পেরেছিল!’
গামা যে সত্যিই ধর্মতলায় মাঝরাতে সাধন ভজন করা গুপ্ত গোষ্ঠীর সদস্য হতে পারে এমনটা কেউ কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। ওকে কেউ কস্মিনকালেও গান গাইতে, এমনকি গুনগুন করে সুর ভাঁজতেও শোনেনি। লাউয়ের খোলার ওই বিচিত্র তারযন্ত্রটি দেখে হেমন্ত এসে সেটি হাতে তুলে নিয়ে বাম বগলে চেপে ঝিনুকের তৈরি মেজরাব দিয়ে তারে আঘাত করতেই এক বিচিত্র ধ্বনি আদিরামবাটির ভেতর উঠোন থেকে ছড়িয়ে পড়ল ওষধিবাগানে, মন্দির চত্বর ছাড়িয়ে অদৃশ্য ঢেউয়ের মতো পৌঁছে গেল টোলের বাড়িতে। সেখানে মশাই জয়ন্তভট্টের ন্যায়মঞ্জুরীর টীকা রচনা করছিলেন, তিনি তড়িদাহতের মতো স্থির হয়ে গেলেন। এত বছর এই বাড়িতে থাকাকালীন এত জীবিত গামা কোনোদিন ছিল না। তার অদৃশ্য ছায়া যেন আদিরামবাটিকে গ্রাস করল। একমাস পর সরোজার ইচ্ছায় শান্তিস্বস্ত্যয়ন হলো, কাঙালি ভোজন করানো হলো। গামার ব্যবহৃত জামাকাপড় জিনিসপত্র, ওই পুঁতির মালা তারযন্ত্র সহ, ভাসিয়ে দেওয়া হলো সরস্বতীতে, যে নদীর জোয়ার-ভাটা ওর ধমনীর ভেতরে নিত্য প্রবাহিত ছিল। গামার অস্তিত্বের আর কোনো চিহ্নই রইল না। গামা রয়ে গেল পরিবারের স্মৃতিতে।
আর একটি গল্পকথার ভেতর।
*
গল্পটা প্রথম বাপ্পা প্রথম শোনে এক কালবৈশাখীর সন্ধ্যাবেলা। ঝড়ে কোথাও ইলেক্ট্রিকের তার ছিঁড়ে গিয়ে চারদিক অন্ধকার, বিশুকা তার উনত্রিশ দেবদেবীকে আরতি দেখিয়ে এসে বারান্দার সিঁড়িতে বসে বাপ্পা-তিতলিদের গল্প বলছিল। শিবুদাদু, বসন্তমামা আর গামা নিজেও উঠোনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিল। ঘরের মধ্যে গুমোট অন্ধকার আর বাইরে গল্পের টান, যে গল্প ওরা আগেও বহুবার শুনেছে। নিমগাছের মাথায় তারায় ভরা আকাশটাও গল্প শুনতে নেমে এসেছিল।
গল্প নয়, সত্যি — বিশুকা বলেছিল। এটা সত্যি যে গামা দোখনো, এবং সে সুন্দরবনের প্রত্যস্ত বসতি থেকে এসেছে। বহুকাল আগে আফ্রিকার হাবসি ক্রীতদাসেরা সেখানে নোনা জল ছেঁচে নুনের চাষ করত, ওদের বলা হতো মলঙ্গি। গামার পূর্বপুরুষেরা হাবসি মলঙ্গি ছিল। কিন্তু গামা যখন বড়ো হচ্ছে ততদিনে কোম্পানির লেঠেলরা নুনের চাষ বন্ধ করে দেয়। নুনের আড়ত কারখানা কুঠিবাড়িগুলোয় জঙ্গল ছেয়ে এসে বাঘের ডেরা হয়ে যায়। মলঙ্গিদের উত্তরসূরীরা জঙ্গলের মধ্যে খাঁড়িতে মাছ কাঁকড়া ধরা আর মধু সংগ্রহের কাজ করে, তাদের বলা হয় মউলে। গামা একবার ওদের সঙ্গে জঙ্গলে গিয়েছিল। সরু খাঁড়ির ভেতরে নৌকায় গামাকে একা রেখে মউলেদের দলটা বাদাবনের ভেতরে ঢুকল। সকলে ডাঙায় নামতে পারত না, গ্রামের গুণিনের তুকতাক ছিল, মন্ত্র পড়ে বনের মধ্যে মউলেদের চলার পথটা বাঘের থেকে সুরক্ষিত রাখত। কিন্তু ডিঙির ওপর একা গামার সেই রক্ষাকবচ ছিল না। সরু খাঁড়ি, দুপাশ থেকে গাছের ডালপালা ঘিরে এসে সবুজ গুহার মতো হয়েছে। তখন জোয়ার নেমে গিয়ে ভাটা পড়ে আসছে। বাদাবনের বায়েন গেঁয়ো ক্যাওড়া গাছের ধারালো শ্বাসমূলগুলো জেগে উঠেছে।
হঠাৎ গামা দেখল বিশ হাত দূরে হেঁতালের ঝোপের নীচে মূর্তিমান সুন্দরবনের কেঁদো, ওর দিকে চেয়ে আছে স্থির।
জন্ম থেকে মৃত্যু বাদাবনের মানুষ বাঘের নিশ্বাসের আওতায় বাঁচে, কিন্তু স্বচক্ষে বাঘ দেখে না বড়ো একটা কেউ। দেখতে চায়ও না, কারণ সেটাই সাধারণত হয় শেষ দেখা। এদিকে গামার হাত পা ঠান্ডা হয়ে পাথরের মতো হয়ে গিয়েছে, নড়াচড়ার শক্তিও নেই। আর থাকলেও কোথায়ই বা যাবে? নৌকার দুদিকে সরু জল আর নরম দঁক কাদায় শূলের মতো শ্বাসমূল, পালানো অসম্ভব।
সেটা টের পেয়েই বুঝি বাঘটা খুব ধীরে ধীরে হেঁতালের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে কাদার ওপর দিয়ে গুঁড়ি মেরে খাঁড়িতে নামল। ওর ইয়াব্বড় মাথাটা জলের ওপর ভাসিয়ে রেখে, পলকহীন চোখদুটো ডিঙির ওপর দু-পেয়েটার দিকে নিবদ্ধ রেখে, ভেসে ভেসে এগিয়ে আসতে লাগল।
গামার শিয়রে মৃত্যু, ভয়ে বুক ফাটে। মায়ের পেটের মধ্যে ফিরে যাওয়ার মতো ডিঙির খোলের ওপর বাঁশের চালি তুলে খোলের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে যেতে টের পেল নৌকাটা ঝাঁকি দিয়ে দুলে উঠেছে। নাকে এল বোটকা গন্ধ, পিঠে আছেঁচা ঠান্ডা জল, কুলকুল করে উরু ভিজছে উষ্ণ জলে। আর তখন চোখের ঠিক পাঁচ আঙুল ওপরে চালির ফাঁকে দেখে মূর্তিমান মৃত্যু নৌকায় চেপে বসেছে।
প্রকান্ড মদ্দা বাঘ, তার লেজটা গামার মুখের দিকে আর মাথাটা ওর পায়ের দিকে। গামা দমবন্ধ করে পড়ে আছে। কতক্ষণ কে জানে। জলের ছলাৎছল শব্দ থেমে গেছে, পাখির ডাক থেমে গেছে। এদিকে বাঘটা বসে সামনের দুটো থাবা দিয়ে বাখারির টুকরো সরাচ্ছে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তার লম্বা লেজটা চালির ফাঁক দিয়ে নেমে এসেছে খোলের ভেতর, গামার গালের ঠিক পাশে, এদিকে খরখরে জিভ দিয়ে ওর ডান পায়ের বুড়ো আঙুল চাটছে, শিকার বুঝি এরই মধ্যে মরে গিয়েছে। আর তারপরে আঙুলটা যেই কামড়ে ধরল অমনি গামা মরিয়া ছোবল দিয়ে দাঁতে চেপে ধরল ওর লেজটা, আঙুলে তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেই লেজের গোড়ার দিকে চিবিয়ে ছিঁড়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে নৌকাটা দুলে উঠল, ভয়ঙ্কর গর্জনে কেঁপে উঠল বাদাবন। আর কিছু মনে নেই গামার
জ্ঞান ফিরল যখন মৌলেরা ওকে নৌকায় শুইয়ে নিয়ে ফিরছে। পায়ের আঙুলটা প্রায় খসে গিয়ে ঝুলছে, মুখে বাঘের রক্তের নোনা স্বাদ। খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সোঁদরবনের গ্রামে গ্রামে মউলেদের পো মদ্দা বাঘের লেজ কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে। লোকে দল বেঁধে ওকে দেখতে এল, ওর মুখ থেকে কথা শুনতে এল। কিন্তু কথা বলবে কী, গামার তখন মুখ দেখানোর মতো অবস্থা নেই। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা বাদ গেল, গ্রাম্য ওঝার দেওয়া জড়িবুটি লাগিয়ে ক্ষতও ক্রমশ সারতে লাগল। কিন্তু দিন দুয়েকের মধ্যেই মুখের ভেতরটা ফুলে উঠল ঘায়ে। কথা বলা দূর, কিছু খেতেও পারে না। গামার মা কঞ্চির নলে শাকভাতের মাড় দেয়, তাতে নুনের ছিটে থাকলেও মুখের ভেতরটা আগুনের মতো জ্বলে।
এদিকে চারদিক থেকে খবর আসতে লাগল, একটা লেজকাটা বাঘকে দেখা যাচ্ছে ঝিঙেখালির জঙ্গলের ধারে, বসতির আশেপাশে। এক সপ্তাহের মধ্যে দু-দুটো মানুষ বাঘের পেটে গেল একজন কাঁকড়া ধরতে গিয়ে, আরেকজন বনে প্রাতঃকৃত্য করতে গিয়ে। গামার বীরত্বের খ্যাতি বদলে গেল কুখ্যাতিতে। বাঘ সে মারেনি, তার লেজ কামড়ে ছিঁড়ে খুঁতো করে দিয়েছে। বনের মধ্যে লেজকাটা বাঘ না পারে মশা মাছি তাড়াতে, না পারে একটু জিরোতে। মাদী বাঘেদের চোখে উপহাসের বস্তু হয়েছে। আর তাই ক্ষিপ্ত হিংস্র হয়ে উঠেছে। এখন সে কেবলই মানুষ মারতে থাকবে, যতদিন না ফের গামাকে নাগালে পায়।
সুন্দরবন ছেড়ে পালিয়ে আসা ছাড়া গামার আর কোনো উপায় ছিল না। ইতিমধ্যে মুখের ভেতর ঘা থেকে পচন শুরু হয়েছে, মুখমন্ডল ফুলে উঠে বীভৎস আকার নিয়েছে। শিশুরা ওকে দেখলে আতঙ্কে কেঁদে ওঠে, বড়োরা কুষ্ঠরোগ ভেবে সরে যায়। এদিকে প্রায় কোনোরকম খাদ্য গলাধঃকরণ করতে না পেরে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল। শেষকালে জমি বাঁধা রেখে কিছু টাকা জোগাড় করে গামা গোলপাতার নৌকায় চেপে চাঁদেরডাঙায় এসে নামল।
সেখানেই সাতগাঁর ধন্বন্তরী গঙ্গা কবিরাজের খোঁজ পায় সে।
*
বিশুকার মুখে গামার জীবনকাহিনি যতবার শুনেছে, প্রতিবার বাপ্পা আর তিতলি ওর কাছে গিয়ে জানতে চেয়েছে— ‘সত্যি? সত্যিই এমন হয়েছিল?’
গামা হাসত। ঠোঁটের চারপাশে কুঞ্চিত পেশি প্রসারিত করে সেই হাসিতে মুখে ফুটত করুণ যন্ত্রণার অভিব্যক্তি। তারপর বাপ্পারা ওর ডান পায়ের হারানো বুড়ো আঙুলের জায়গাটা দেখতে চাইত।
গামাকে বাড়ির বড়োরা যেমন নাম ধরে ডাকত, ওরাও তাই ডাকত, যেমন অ্যান্টনিকে চিন্তামণিকেও নাম ধরে ডাকত। দাদুর বয়সী’ মানুষটাকে কী বলে সম্বোধন করা উচিৎ সেটা বাপ্পাদের কেউ কখনো শেখায়নি।
গামাকে নিয়ে বিশুকার এই কাহিনির সত্যাসত্য লুকিয়েছিল গামার ওই করুণ হাসির আড়ালে। বসন্ত বিষুবের পর এক ফাল্গুনের দুপুরে গামার সঙ্গে সেটি কাদার গর্ভে হারিয়ে যায়, ঠিক যেমন এক মোগল সম্রাটকে একান্তে বলা গোপন সত্য— যা উনিশজন যাজকের প্রাণ বাঁচিয়েছিল – সঙ্গে নিয়ে রুয়ানো ডে ইনফান্টে কবরে যান।
মি’লেডি, গামাদের জীবনকাহিনি চিরকাল বলে এসেছে বিশুকারা। গামারা নীরবে শুনে এসেছে। কাহিনির ভেতর বীজের মতো লুকিয়ে থাকে যে সত্যি, যা মানুষ আজীবন আগলে রাখে নিজের ভেতর, মৃত্যুর পর অন্ত্যেষ্টির সময় সেও কি পুড়ে ছাই হয়ে যায়? কবরে অঙ্কুরিত হয়ে গাছ হয়ে ওঠে কি কখনো? কতটা দুঃসহ সেই সত্য বহনের ভার, যা কখনো জীবিত অবস্থাতেই ভেতরে ভেতরে শিকড় চারিয়ে দেয়, জীবনরস শুষে নিতে থাকে, তারপর কোনো একদিন মানুষটার বুক ফাটিয়ে বেরিয়ে আসে? আমরা জানিনা, মি’লেডি।
সাতগাঁর হাওয়াতাতি বিশুঠাকুর, ঊনত্রিশ দেবদেবীর সকালের পুজোপাঠ সেরে স্বহস্তে ভোগ রান্না করে খাইয়ে তাদের দিবানিদ্রার আয়োজন করে হরিহর আত্মা শিবু চক্কোত্তির সঙ্গে ছাড়িগঙ্গার ধারে গিয়ে গঞ্জিকা সেবন করে, ছিপ ফেলে বসে থাকে মাছের আশায়, যে মাছ তারা খায় না, বুক ভরে গাঁজার ধোঁয়া আর ফাতনার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে থাকতে টের পায় মাথার মধ্যে সাঁতার দিচ্ছে কাহিনির রঙীন মাছেরা।
প্রফুল্ল নিস্তরঙ্গ ছন্দে জীবন বয়ে চলে। কিন্তু সত্যের অসহনীয় বীজ কখনো ভেতরে শিকড় চারিয়ে দেয়, আর তারপর একদিন আচমকা ফেটে বেরোয়।
