সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৮.৫
৮.৫
গামা হারিয়ে যাবার পর যেদিন সিঁড়ির নীচে ওর পুটলির মধ্যে গুপিযন্ত্রটা আবিষ্কার করে হেমন্ত কৌতূহলবশে হাতে নিয়ে কিছু না ভেবেই পিড়িং পিড়িং করে বাজালো, অস্পৃশ্য ধ্বনির তরঙ্গ ছড়িয়ে গেল আদিরামবাটিতে। টোলের বাড়িতে মশাইয়ের কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই তিনি আচমকা কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেলেন, হাত থেকে ছিটকে পড়ল ন্যায়মঞ্জরীর পুথি। তিনি শয্যা নিলেন। ভাইপো রামপ্রাণ এসে নাড়ি পরীক্ষা করে ভালো বুঝলেন না।
গঙ্গারামের মৃত্যুর কিছুকাল পরে ইংরেজ সরকার সাতগাঁর পুরোনো ক্ষত নিরাময়ের উদ্দেশ্যে পণ্ডিত রামরাম শাস্ত্রীমশাইকে ধ্রুপদী জ্ঞানচর্চায় অবদানের জন্য সোনার পদক দিতে চায়। মশাই প্রত্যাখ্যান করে চিঠি লেখেন— ‘ভিনদেশী শাসক বলপূর্বক দেশের যেকোনো নাগরিকের হাতে হাতকড়া পরাতে পারে বটে, কিন্তু বিদ্বানের গলায় পদক ঝোলানোর অধিকার কেউ তাদের দেয়নি।’
ইদানীং বেশ কিছুকাল ধরেই শাস্ত্রীমশাই তাঁর সেই আগের ব্রাহ্মণ্য তেজ হারিয়ে ফেলছিলেন, জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে এসেছিল। আগের মতো আদিরামবাটিতে তাঁর দৃপ্ত খড়মের শব্দ শোনা যেত না। টোলের বাড়ি থেকে বিশেষ বের হতেন না। কেবল পিতৃপক্ষে তর্পণের ক’টা দিন পাল্কি চেপে সরস্বতীর ঘাটে যেতেন। গুটিকয় বিদ্যার্থীকে কখনো-সখনো বেদান্তের দুরূহ সূত্র ব্যাখ্যা করে বোঝাতেন, ক্বচিৎ সমাজের লোকজন কোনো জটিল পারিবারিক বিষয়ে পরামর্শ নিতে এলে শাস্ত্রীয় বিধান দিতেন।
সপ্তাহে তিনদিন উপবাস করতেন মশাই। অন্য দিনগুলোয় দিনে একবার তাঁর প্রসারিত ডান হাতের তালুতে যতটা অন্ন ধরে ঠিক ততটাই খেতেন। গঙ্গাজল ছাড়া কিছু পান করতেন না, কখনো আলু টমেটো কিংবা লঙ্কা দাঁতে কাটতেন না, কারণ সেসব ফিরিঙ্গিরা কালাপানির ওপার থেকে এনেছিল। হিমালয়ের সৈন্ধব লবণ ছাড়া অন্য কোনো লবণ এবং কখনো শর্করা জিভে স্পর্শ করেননি, কারণ দুফে সাহেবের চিনিকলে পশুর হাড়ের কয়লা দিয়ে চিনি পরিশোধন হয় তিনি জানতেন। ইদানীং তিনি বিশেষ কথা বলতেন না, যেটুকু যা বলতেন মূলত সংস্কৃতে। ফলে বাড়িতে তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো তেমন কেউ ছিল না।
সম্প্রতি শাস্ত্রীমশাই প্রাচীন পুথিপত্র ঘেঁটে প্রমাণ করার চেষ্টায় ছিলেন যে সাতগাঁর পশ্চিম তীরে প্রবাহিত নদীটিই ঋগবেদে কথিত সেই সরস্বতী, যার মূল ধারাকে বিধর্মীদের দেশ আফগানিস্তানে বইয়ে দেবার তত্ত্বটা আসলে ইংরেজদের ষড়যন্ত্র। এই বিষয়ে তিনি হিন্দু মহাসভার সদস্যদের লম্বা লম্বা পত্র লিখছিলেন।
মশাইয়ের জীবনের শেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ছেদ পড়ল। তিনি শয্যা নিলেন। সম্প্রতি স্নায়বিক বৈকল্যের কারণে তাঁর মাথাটা সর্বক্ষণ দুদিকে নড়ত–যে ব্যাধিটি শেষের দিকে তাঁর দিদি শাকম্ভরীরও হয়েছিল – পুজোয় বা ধ্যানে বসলেও মাথার পেছনে কাঠবেড়ালির লেজের মতো মোটা শিখাটি ক্ষান্তিহীন নড়ে যেত। দেখলে মনে হবে যেন তিনি নীরবে বলে চলেছেন— ‘না-না-না-না-না’।
‘পারকিনসন্স আর অন্যান্য বয়সজনিত সমস্যাগুলো আছেই, এছাড়া ঘন ঘন নিরম্বু উপবাস আর সুষম খাদ্যের অভাবে দেহযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়েছে,’ রামপ্রাণ বললেন। তিনি হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিতে চাইলে মশাই রাজি হলেন না, মধুর সঙ্গে মকরধ্বজ মেড়ে দেওয়া হলো। তাঁর শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে লাগল। তিনদিন পর নাড়ির ক্ষীণ গতি দেখে রামপ্রাণ বাড়ির সকলকে ডেকে মশাইয়ের ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর অন্তর্জলীযাত্রার ব্যবস্থা করতে বললেন।
বাইশে চৈত্র দখিনা মৌসম বইতে শুরু হবার দিন অপরাহ্ণ তিনটে একুশ মিনিটে মাহেন্দ্রযোগ শুরু হবার ঠিক আগে মশাইকে ঘাটে নিয়ে যাবার জন্য চৌকি নামানো হলো। তার আগে তিনি তাঁর ভাগনে বিশুর সঙ্গে একান্তে কথা বলার জন্য অন্যদের ঘরের বাইরে যেতে বললেন।
টোলের বাড়িতে মশাইয়ের প্রায় আসবাবহীন পুবের ঘরে ওঁকে পালঙ্ক থেকে মেঝেয় নামিয়ে কাঠির মাদুরে শোয়ানো হয়েছে। ওঁর কপালে বাহুতে টাটকা চন্দনের তিলক কাটা হয়েছে, বিশুই কেটে দিয়েছে। মাথার পাশে গেরুয়া কাপড়ে বাঁধানো গীতা, বহু ব্যবহারে জীর্ণ। তার ওপর আদিরাম মন্দিরে বিগ্রহের পায়ের পাতা থেকে তুলে আনা তিনটি নীল অপরাজিতা। উঁচু ঘন ভুরুর নীচে কোটরস্থিত চোখদুটোয় আলো স্তিমিত হয়ে এসেছে, মুখের পেশি লোল হয়ে এসে উঁচু নাকটা জেগে আছে যেন খড়গের মতো, ঠোঁট দুটো নড়ে চলেছে।
বিশীর্ণ ডান হাতটা সামান্য তুলে উনি ইশারায় কাছে ডাকেন, বিশু উবু হয়ে ঝুঁকে ঠোঁটের ওপরে কান পেতে শোনে–
ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো স্মর কৃতং স্মর…
যেন কুয়োর অতল থেকে উঠে আসা ক্ষীণ এক কন্ঠস্বর, ছেঁড়া ছেঁড়া বাক্যে বহুকাল আগের এক ভোরের কথা বলে, যেদিন একটি নীলসাদা তিনচাকার গাড়ি চালিয়ে এসেছিল দুই ফিরিঙ্গি সন্ন্যাসিনী। একজন তরুণী অন্যজন মধ্যবয়স্কা, তাদেরও পরনে সাদা গাউন আর মাথায় নীল ঘোমটার মতো। গাড়িটি ছিল সিস্টার্স দ্য ক্লুনি কনভেন্ট বেকারির। ভোরবেলায় ওই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে সন্ন্যাসিনীরা মঠ পরিচালিত বিভিন্ন অনাথাশ্রম ও হসপিসে টাটকা পাউরুটি বিলি করত।
তখন সবে আলো ফুটব ফুটব করছে, পথে জনমনিষ্যি নেই। সাতগাঁর বামুনপাড়ায় ইটবাঁধানো গলি দিয়ে খর্থর করে চাকা গাড়িটা আদিরামবাটির সদর দরজায় এসে থামল। ইতিমধ্যে ভেতর উঠোনে নিমগাছে প্রথম কাক ডেকে ওঠার আগেই মশাই প্রাতঃকৃত্য সেরে আসন কোষাকুষি নিয়ে নদীর ঘাটে গিয়ে আহ্নিকের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। তিনি দরজায় এসে দাঁড়াতে বয়স্কা সন্ন্যাসিনীটি ভাঙা ভাঙা বাংলায় জানালেন, তাঁরা একান্তে কথা বলতে চান। একটি বিশেষ বার্তা ও একটি অতীব মূল্যবান সম্পদ দিতে চান।
মশাই বিষ্মিত হলেন, কিন্তু মুখে কিছু বললেন না। ওঁদের সদর থেকে ডেকে নিলেন বাগানের এপাশে ফার্মেসিবাড়ির বারান্দায়, গঙ্গারাম চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর রামপ্রাণ যেখানে বসতে শুরু করেছে। তরুণী সন্ন্যাসিনীটি গাড়ির বাক্স থেকে একটি বেতের ব্রেড বাস্কেট তুলে নিয়ে ওঁদের পিছু পিছু এল। বারান্দায় এসে বাস্কেটের ডালা খুলে ধরতে ফিকে আলোয় মশাই দেখলেন সাদা তোয়ালে মোড়া একটি ঘুমন্ত শিশু, সদ্য সেঁকে-আসা পাউরুটির মতোই তুলতুলে বাদামি। বয়স্কা সন্ন্যাসিনীটি তার গাউনের পকেট থেকে বের করে দিলেন একটি চিঠি, ভাঁজ খুলতেই মশাই হস্তাক্ষর চিনতে পারলেন।
দিদি কাত্যায়নীর কন্যা বনলতা ওঁকে কলকাতা থেকে চিঠি লিখত। জীবনের অর্থ কী সে জানতে চাইত; নারীর আত্মা নেই এ কথা মনু কোথায় লিখে গিয়েছেন জানতে চাইত; আত্মা যদি নাই থাকে তাহলে মৃত্যুর পর নারীর কী ঘটে, এব্যাপারে শাস্ত্র কী বলে, জানতে চাইত; নিষ্কাম কর্মের ব্যাপারে বেদান্তের ব্যাখ্যা জানতে চাইত। মশাই কখনো সেসব চিঠির উত্তর দেননি।
এই চিঠিটি তিনি দেখলেন। চোখ তুলে শিশুটিকে একবার দেখলেন। তারপর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন প্রবীণা সন্ন্যাসিনীটির মুখে, যাঁর চোখে গোল রুপোলি ফ্রেমের চশমা, বাম চিবুকে একটি বড়ো আঁচিলে সোনালি রোম।
সন্ন্যাসিনী থেমে থেমে বললেন সেই দুঃস্বপ্নের রাতের কথা, যখন কলকাতা থেকে ইংরেজ পুলিশ এসে কোয়ার্সভিল ঘিরে ফেলেছিল। ভোর ফোটার আগে, আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের ডেরায় হানা দেবার আগে, বনলতা শিশুটিকে আঁচলে জড়িয়ে কোমরে লুকিয়ে নিয়ে পূণ্যার্থীর ছদ্মবেশে পেতলের কলসি কাঁখে গঙ্গাস্নানে যাবার অছিলায় পালিয়ে এসে কড়া নেড়েছিল মঠের দরজায়। শিশুটিকে এবং এই চিঠিটি যথাস্থানে পৌঁছে দেবার জন্য গচ্ছিত রেখে যায় সে। ও দুটি জিনিস গ্রহণ না করে মঠের প্রধানা সন্ন্যাসিনীর কোনো উপায় ছিল না, তার কারণ সাক্ষাৎ মৃত্যু ওকে যে ধাওয়া করছে সেটা ওর চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল।
সেটা চিঠিতে ওর হাতের লেখাতেও স্পষ্ট– অসংলগ্ন, প্রায় যতিচিহ্নহীন, যার সঠিক ব্যবহার সে জানত, যা মশাই ওকে রজস্বলা হবার আগে শিখিয়েছিলেন। ব্রেড বাস্কেটের ভেতর শিশুটির দিকে আর দৃকপাত না করে তিনি দ্রুত চিঠিটিতে চোখ বোলালেন, কোথাও অনুশোচনা কিংবা ক্ষমা চাওয়ার কথা লেখা আছে কি না দেখলেন।
নেই। বনলতা কেবল শিশুটির জন্মের কথা লিখেছে। কোন পরিস্থিতির ভেতর তাকে এই পথ বেছে নিতে হয়েছে সে কথা লিখেছে। আত্মাবিহীন এক তুচ্ছ নারীর জীবন যদি দেশমাতাকে শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য কোনো কাজে লাগে সেজন্য, যে পুরুষেরা সে কাজে নিজেদের উৎসর্গ করে আগুনঝরা পথে হেঁটেছে তাদের পাশে থেকে, অতুল দাস নামে তাদেরই একজনকে বিবাহ করেছে সে। তার সন্তান গর্ভে ধারণ করেছে, যাতে ইংরেজ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে আরও কিছুদিন ওরা বেঁচে থাকতে পারে, আরও কিছু কাজ করে যেতে পারে। লিখেছে—
তবু শেষপর্যন্ত এই দুঃখ নিয়ে চললাম যে আমার আর শহীদ হওয়া হলো না আমার জীবনটা একটা অনুজ্জ্বল কাহিনি হয়েই থেকে গেল শেষপর্যন্ত। তুচ্ছ বিস্মৃত, আর এখন আমি যখন পেছনে ফিরে এই জীবনটার দিকে তাকাই তখন মনে হয় সেই তো বিয়ে করলাম স্বামীসেবা করলাম সন্তানধারণ করলাম নারীর জন্য মনু যা যা বলে গিয়েছেন সেই সবই তো করলাম। তবু এটুকু সান্ত্বনা যে এসবই আমি করেছি একটি বড়ো লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে যেখানে আমি কোনোদিন পৌঁছতে পারব না।
রাত এখনও অন্ধকারে ঢাকা শিগগিরই একটা নতুন দিন জেগে উঠবে, আমার এই শিশু সন্তানের জন্য নতুন কিছু নিয়েই সে আসবে আমি নিশ্চিত করেই জানি। কেবল আমি তখন তার পাশে থাকব না কিন্তু সেজন্য আমার একটুও আর দুঃখ নেই। আমার কেবল দুঃখ এরপর থেকে আদিরামবাটির কোনো মেয়ের পক্ষে বদ্ধ অন্ধকার গন্ডির থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে শিক্ষার আলো পাওয়া আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেল সেটা আমি জানি। আর এবার আমায় সেই পথে যেতে হবে যেখানে আমি ওকে নিয়ে যেতে পারিনা তাই নিরাপদ হাতে গচ্ছিত রেখে গেলাম। আমি ওর নাম রেখেছি অভিমন্যু। ওর বাবা যা পারল না, তেত্রিশ কোটি দেশবাসীকে যে চক্রব্যূহের ভেতর পুরে রেখেছে রক্তচোষা ইংরেজ শাসকেরা আমি আশা রাখি একদিন ঠিক ও সেটা ভেঙে ফেলতে পারবে।
পড়তে পড়তে কলকাতা থেকে লেখা চিঠিতে বনলতার মনের বিচিত্র গতিপ্রকৃতি, যার উত্তর তিনি কোনোদিন দেননি, মশাইয়ের কাছে স্পষ্ট প্রতীয়মান হল। তিনি চিঠিটি ভাঁজ করে বয়স্কা সন্ন্যাসিনীর হাতে ফেরত দিলেন। এবং দুই ফিরিঙ্গিনীর উৎকণ্ঠাভরা চাহনির সামনে তাই করলেন, যা তিনি এগারো দিন আগে করেছিলেন, যখন মন্দিরে নিয়মিত মাটির পাত্রের যোগান দেয় যে রঘু কুমোর সে এসে ওঁকে চুপি চুপি বলেছিল—
‘হুগলির খালে কাল থেকে এটা মড়া ভাসছে গো ঠাউরমশাই! মেয়েমানুষের মড়া! দেখে যেন মনে হয় সে এবাড়ির কেউ!’
মশাই রঘুর মুখের সামনে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
‘ও কার সন্তান তার কী ঠিক আছে?’ বাস্কেটের দিকে না তাকিয়ে মশাই বললেন। ‘কোন গর্ভে জাত, কোন বীজ!’
‘মৃত্যুর ছায়ায় দাঁড়িয়ে কেউ মিথ্যা বলে না, বয়স্কা সন্ন্যাসিনী বললেন। ‘তাছাড়া সে কলকাতার নামী কলেজে বিদ্যা লাভ করেছে, কী লিখছে সে জানত।’
‘এই যদি তার পরিণতি হয় তাহলে সেই বিদ্যা অর্জন করে কী লাভ?’ মশাই বিরক্ত স্বরে বললেন।
ইতিমধ্যে শিশুটি জেগে উঠেছে, কাদতে শুরু করেছে। বাগানে সবে দুটি- তিনটি পাখি ডাকতে শুরু করেছে তখন, সেই পলকা প্রহরে নবজাতকের কান্নার ধ্বনি বিচিত্র তীক্ষ্ণতায় বাজতে লাগল। তরুণী সন্ন্যাসিনী ব্রেড বাস্কেটটি বাঁ হাতে তুলে দোলাতে লাগল, ডান হাতে ওর মুখের সামনে একটি সবুজ অ্যাগট পুথির জপমালা ঝাঁকিয়ে শব্দ করতে লাগল। শিশুর কান্না সামান্য স্তিমিত হলো, থামল না। ক্ষুদে হাত তুলে সে চকচকে রুপোর ক্রুশটি ধরার চেষ্টা করতে লাগল।
সকাল হচ্ছে, বাড়ির লোকজন এবার জেগে উঠবে। অবিচলিত মশাই ফার্মেসির বারান্দা থেকে নেমে সদর দরজার দিকে এগোতে লাগলেন, ইঙ্গিতটা স্পষ্ট।
‘আমাদের ধর্মে উচ্চ বর্ণের কোনো মেয়ে যদি নীচু বর্ণের কোনো পুরুষকে বিবাহ করে তাকে অনুলোম বিবাহ বলে,’ মশাই বললেন। ‘সেই বিবাহে জাতক অপবিত্র। এই বাড়িতে শ্রীরামচন্দ্র আছেন, এখানে আমরা তাকে আশ্রয় দিতে পারি না।’
‘আমি তোমাদের ধর্ম বেশি কিছু জানি না পণ্ডিত, কিন্তু রামায়ণের কাহিনি কিছু জানি, বয়স্কা সন্ন্যাসিনী দরজার সামনে এসে বললেন; নিষ্ফল প্রচেষ্টার শ্রমে তাঁর মুখে লাল আভা ফুটেছে। ‘রামও বনে জন্ম লব-কুশকে স্বীকার করেছিল। কিন্তু এই নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে তর্ক করব না। কঠিন সময়ে জন্মেছে এই শিশু, তার মা তোমার পরিবারের মেয়ে, তাকে বাড়িতে নিতে তোমার ধর্মে বাধা আছে। কিন্তু আমার ধর্ম ঈশ্বরের সৃষ্টি সব শিশুকে আশ্রয় দিতে আমায় আদেশ দেয়। আচ্ছা, তাই হোক। আমি ওকে কনভেন্টে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। দেখা যাক প্ৰভু ওর জন্যে কোন পথ তৈরি করে রেখেছেন।’
*
চৈত্রের প্রথম বাণিজ্যবায়ুতে হু হু পাতাঝরার বিকেলে মশাইকে সরস্বতীর ধারে অন্তর্জলিযাত্রায় নিয়ে যাবার পর সেদিনই সূর্য ডোবার আগে তিনি দেহত্যাগ করলেন। তখন মরা নদীতে ভাটা চলেছে, খাতের প্রায় মাঝামাঝি কাদার ওপর দেহের উপরিভাগ দুদিক থেকে হাতের বেড় দিয়ে ধরে রেখে কোমর থেকে পা পর্যন্ত কোনোক্রমে জলে ভেজানো হলো। হাঁটুডোবা কাদায় দাঁড়িয়ে তিনদিক থেকে ঘিরে রইল শ্মশানযাত্রীরা, রামপ্রাণ নাড়ি ধরে রইলেন, বিশু ঠাকুর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে কান পেতে অপেক্ষা করতে লাগল প্রাণবায়ু নির্গত হবার ধ্বনির জন্য। সেই দুপুর থেকে এভাবে থাকার পর সে মশাইয়ের প্রতিটি ক্ষীণ শ্বাসঘাত, প্রতিটি অন্তিম ধ্বনির উচ্চাবচতা বুঝতে পারছিল। ঠোঁট নড়া থেমে গিয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুর চিরচেনা
ঘর্ঘর ধ্বনির সঙ্গে জড়িয়ে উদগত হচ্ছিল সেই কটি চরণ
যদি তু গতিবিহীনং তারয়েঃ পাপীনং মাং
যদি তু গতিবিহীনং তারয়েঃ পাপীনং মাং…
সুরধুনি মুনিকন্যে তারয়েঃ পূণ্যবন্তং
স তরতি নিজ পুণ্যেইস্-তত্র কিং তে মহত্ত্বম্
যদি তু গতিবিহীনং তারয়েঃ পাপিনং মাং
তদি হ তব মহত্ত্বং তন্মহত্ত্বং মহত্ত্ব
নাড়ির স্পন্দন থেমে যাবার মুহূর্তে দ্বিধায় বিস্ফারিত চোখদুটো নিবদ্ধ হলো নদীর ওপারে, নিষ্পত্র শিরীষের ডালপালায় কাটাকুটি অতিকায় লাল থালার মতো সূর্যটার দিকে। পরাণ ডাক্তার তর্জনী ছুঁইয়ে দুই চোখের পাতা নামিয়ে দিলেন। তারপরেও মশাইয়ের মণির ভেতরে রয়ে গেল একটি দৃশ্যের রেশ—নবজাতকের মুখের ওপর একটি সবুজ পুঁতির জপমালা, ঝুমঝুমির মতো বেজে চলেছে, শিশুটির ক্ষুদে হাত ধরতে চাইছে রুপোর ক্রুশটি।
