Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৯.৯

৯.৯

হেমন্তের মাঝামাঝি তেড়েফুঁড়ে জ্বর এল শার্লের। তিন দিন তিন রাত এক দন্ডও ওর বিছানার পাশ ছেড়ে উঠল না গাঙী। নিরন্তর সেবা করল, জ্বরের তীব্রতা বাড়লে আড়ত থেকে বরফ এনে মাথার শীতল পটি দিল। বিকারের ঘোরের মধ্যে শার্ল দেখে, ওর কপালে রাখা গাঙীর ঠান্ডা হাতের আবলুশ রং গড়িয়ে নেমে ছুপিয়ে যাচ্ছে ওর নিজের ফ্যাকফেকে সাদা ত্বক, প্রতিটি রোমকূপের ভেতর দিয়ে অন্তরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে গাঙীর ঝিমধরা স্বর।

আমায় তোর দেশে নিয়ে চল্, সাহেব।

ওরে মদালসা, এই সুখের সাম্রাজ্য ছেড়ে তুই কোথায় যাবি? তোর প্রিয় তেঁতুলগাছেদের ছেড়ে?

আমি তোর বাজার করে আনব, খাবার বানাবো, কাপড় কাচব…

তুই কি পাগল হলি? ওই রাক্ষুসে শহরে বারোমাস বৃষ্টি পড়ে, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, বাতাস ধোঁয়ায় কালো, ঘোড়ার গুয়ের গন্ধে ভারি হয়ে আছে…

তালপাতার পাখার হাওয়ায় ভাসে আচ্ছন্ন শার্লের কন্ঠস্বর। ভিজে খসখসের গন্ধ। মাথার ভেতরে বিজবিজ করে কথামালা।

হাতের চেয়েও তন্বী দুই পা, উদার নিতম্ব গুরুভারা শ্বেতাঙ্গীদেরও ঈর্ষা জাগায়…অন্ধকারের গর্ভ থেকে হুঁকোর কলকেয় ফুঁ দিতে দিতে ভেসে আসছে যে মুখ, আদিম গুহাচিত্র, ভেলভেট চোখের মণি ত্বকের রঙের চেয়েও গাঢ়, আতপ্ত হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেই সজীব উরুর নদী, নিতম্বে দেগে দেওয়া ত্রিভুজে তর্জনি ছোঁয়ালে লি লি করে ওঠে কাঁকড়াবিছের মতো…

রাতের অন্ধকারে ঘরের কোণে পাহারায় জেগে থাকে অতিকায় চোখজোড়া, বন্য কুকুরের চোখের মতো ধকধক করে সবজেটে আলো। – আমায় তোর দেশে নিয়ে চল, সাহেব!

মধ্যরাতে দেয়ালের ওপাশ থেকে গাঙীর মুত্রত্যাগের ধ্বনি, ঝিঁঝির কলতানে মিশে যাচ্ছে নুপুর নিক্কন, গ্রীষ্মের দাউ দাউ দুপুর, ভিজে খসখসের ছায়ায় লম্বা ছুরি দিয়ে আনারস কাটছে। আতঙ্কে হিম শার্ল দেখে ওর বুক থেকে কলজে উপড়ে এনে ফালাফালা করে কাটছে গাঙী।

দমবন্ধ হয়ে ঘুম ভেঙে যায়, দেখে বারান্দার কোণে ওর চামড়ার বুটজোড়া সাজিয়ে বসেছে গাঙী, মাথার খোলা চুল, পরনে সুতোটি নেই, আগুন জ্বলছে, ছুরি, সিঁদুর মাখানো কড়ি, পোড়ামাটির ঘোড়া…

.

সেরে ওঠার পর–দেহ তখনও দুর্বল–প্রথমেই চুপিসারে গিয়ে ছুরিটা বাগানে তেঁতুল গাছের নীচে পুঁতে দিয়ে এল। মৌসম ঘুরছে, গাঙ্গেয় সমভূমিতে বইছে উত্তুরে হাওয়া। কুয়াশার ভোর রাতে বিছানায় গাভীর ওম থেকে নিজেকে ছিন্ন করে বাংলোর খিড়কি দরজা দিয়ে তিনকড়ির ঘাটে গেল।

ঘাটের মাথায় দৈত্যাকার বট ঝুঁকে নেমেছে, ঝুরিগুলো জল চুম্বন করছে। রাত থেকেই অপেক্ষায় ছিল ডিঙি। (এই ঘাট থেকেই অনেক বছর পরে এক বাঙালি যুবক এমনই এক ভোরে ইংরেজ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালাবে।)

গাঙী যখন জাগল, ততক্ষণে শার্লের ডিঙিটা ভাটার টানে তরতরিয়ে চলে গিয়েছে অনেক দূর, কলকাতার জাহাজঘাটা বেশি দূরে নয়। বিছানার চাদর খামচে দেহে জড়িয়ে নিয়ে সে ছুটে বেরোলো নদীর পাড়ে। শূন্য ঘাট, ঝাপসা ধূসর বটের ডালে কাকেরা ডানা থেকে আঠালো কুয়াশা ঝাড়ছে।

জলের ধারে নেমে এসে চিৎকার করে উঠল গাঙী—

‘ঠগ! কুত্তির বাচ্চা! ফিরে আয়! আমায় নিয়ে চল!’

নদীর কুয়াশা পেশল হাতে ওর মুখ চেপে ধরল। তবুও বিকট জান্তব ফুসফুস- ছেঁড়া চিৎকারটা থামল না। ছেঁড়া ছেঁড়া শব্দগুলো জলের ওপর ভাসতে লাগল ধুনে-ওঠা তুলোর মতো, ভেসে ভেসে চলল শার্লের ডিঙির পথে।

আলো ফুটলে পারানি মাঝি এসে দেখল কাদার ওপর অচৈতন্য পড়ে আছে এক কাদারঙের মেয়ে–নগ্ন, চোখ খোলা, মুখ দিয়ে গাজলা বেরোচ্ছে।