Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১০.৩

১০.৩

শাকম্ভরী দেবীকে নিয়ে কাশীর ট্রেনটা প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাবার পর স্টেশনের শেষপ্রান্তে অন্ধকারের ভেতর দপদপ করছিল লাল সবুজ সিগন্যালের আলো। রনোমামার আনা পশমী শালটা কুড়িয়ে নিয়ে ওই দিকে ছুটে অন্ধকারে মিশে গিয়েছিল ভিখারি ছেলেটা। কার্তিক মাস পড়লে সাতগাঁয় সব বাড়ির ছাতে টাঙানো হয় যে আকাশপ্রদীপ, রেলওয়ে সিগন্যালের মতো তারা পিতৃপুরুষের আত্মাদের দ্যুলোকের দিকে ফিরতি যাত্রায় পথ চিনে যেতে সাহায্য করে। এই সময়ে তাঁরা নীচের আকাশে নেমে আসেন। সন্ধ্যার বাতাসে তাঁদের হিমেল শ্বাস, বাতাসে নাগকেশরের গন্ধে মেশে এক অন্যরকম ব্যাকুলতা। রাত্রিগুলো বিস্ফারিত হয়। এই সময়ে বিশুকা তোলাঘরের হার্মাদি সিন্দুক থেকে বের করে আনে মহিষের শিঙের জাহাজী লণ্ঠন, আমের লম্বা লগিটার মাথায় ঝুলিয়ে খাড়া করে দেয় ছাতে চিলঘরের গায়ে।

.

গোধূলি আলোয় বিশুকা ছাতের আলশেয় উঠে আকাশলন্ঠন জ্বালাচ্ছে। মাথার ওপর ব্যাপ্ত আকাশে একটি দুটি করে তারা ফুটছে। হাওয়ায় বিশুকার ধুতি উড়ছে জাহাজের পালের মতো, আমপাড়ার লগিটা যেন মাস্তুল। সরস্বতীর দিকে থেকে একটি দিকভ্রষ্ট বক হুগলির দিকে উড়ে গেল।

কতদিন উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখা এই ছবিটা বাপ্পার মনে ভেসে উঠল যেদিন, সেপ্টেম্বরের এক রবিবারের বিকেলে, টেলিফোনে খবর এল দিদা স্নান করতে গিয়ে ডুবে গিয়েছে। সেদিন কৌশিকী অমাবস্যা, কালো রাত নামল সাতগাঁয়।

অনেকদিন ধরে রাধানগর থেকে জলে-জলে বার্তা আসছিল–বহুকাল আগে হারিয়ে যাওয়া কন্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছিল। তারপর একদিন মনুখুড়োই এসে হাজির হলেন। দেড়দিন পরে ভাটায় জেগে ওঠা চরে সরোজার দেহ পাওয়া গেল: চিৎ হয়ে শোয়া, চুলে জড়িয়েছে কচুরিপানা। বহুকাল আগে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার সময় রামপ্রাণ যে দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন অবিকল সেইরকম।

ক্রমশ স্পষ্ট হলো নিছক দুর্ঘটনা এটি নয়; এ একপ্রকার ইচ্ছামৃত্যু। সরোজা জলে ডুব দিয়ে আর ওঠেননি। তার আগে বঙ্গোপসাগরীয় নিম্নচাপে তিনদিন টানা বৃষ্টি হয়েছিল, ভাদ্রের নদী ফুলে উঠেছিল, ভেসে যেতে কোনো বাধা ছিল না। সেদিন অন্যান্য দিনের থেকে দেরি করে ঘাটে গিয়েছিলেন সরোজা। ততক্ষণে তাঁর স্নানের সাথি গঙ্গাজলেরা বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। তার আগে ঠাকুরবাড়িতে ভোগ নিবেদন ও বাড়ির সকলের খাওয়া হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। তিনদিন বৃষ্টির পর খটখটে রোদ উঠেছিল সেদিন। বামুনদির সঙ্গে হাত লাগিয়ে ভাঁড়ারের মাচা থেকে সোম্বচ্ছরের বড়ি আমসত্ত্ব নামিয়ে উঠোনে রোদে দিয়েছিলেন সরোজা। কদিন ধরে হেমন্ত ঘাড়ে ব্যথা হচ্ছে বলছিল, ওর মাথার বালিশটা রোদে দিয়েছিলেন। নিবারণকে দিয়ে পার্বণের নারকেল ছুলিয়ে রেখেছিলেন, আকাশপ্রদীপের জন্য রেড়ির তেল আনিয়ে রেখেছিলেন। এইসব করতে দুপুর গড়িয়েছিল। তারপর ঘাটে গেলেন। এবং ডুব দিয়ে আর উঠলেন না।

এ দুর্ঘটনা হতেই পারে না। বামুনদি জানালো, তার আগে পূর্ণিমার থেকে চোদ্দ দিন ধরে একটি বিশেষ ব্রত পালন করছিলেন সরোজা, কঠোর উপবাসের ভেতর শুধুমাত্র আদিরামের চরণামৃত পান করছিলেন। পূর্ণিমার দিন মন্দিরের থেকে আনা চোদ্দ চামচ চরণামৃত দিয়ে শুরু হয়ে চাঁদের ক্ষয়ের সঙ্গে প্রতিদিন এক চামচ করে কমতে কমতে কৌশিকী অমবস্যার দিন শেষ এক চামচ পান করেছিলেন। গোটা একটি পক্ষকালে আর কোনো খাদ্য মুখে তোলেননি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাড়ির আর কেউ সেটা লক্ষই করেনি, সরোজার স্বাস্থ্যেও কোনোরকম প্রভাব চোখে পড়েনি। মৃত্যুর পরে লোকজন বলাবলি করতে লাগল, শেষের দিকে ওঁর কাজের উদ্দীপনা যেন বেড়ে গিয়েছিল, ত্বকে একটা অন্যরকম ঔজ্জ্বল্য ফুটেছিল। কিছুকাল আগে থেকেই নিজের মূল্যবান বলতে যা কিছু সেসব লোকজনের মধ্যে বিলিবন্টন করছিলেন। ভালো শাড়ি আর গয়নাগুলো দিয়ে দিয়েছিলেন শিউলিকে আর নতুনবউকে, তিতলির জন্য, প্রিয় তুষের শালটা দিয়েছিলেন বামুনদিকে।

‘আমায় যে বড়ো দিয়ে দিচ্ছ, শীতকাল এলে তুমি কি পরবে গো বৌমণি?’ বামুনদি বলেছিল।

‘শীতকাল অব্দি থাকি তবে তো পরব!’ সরোজা বলেছিলেন।

‘ও মা গো, এ কী অলুক্ষুণে কথা!’

‘অনেক তো হলো, এবার ভালোয় ভালোয় শাঁখাসিঁদূর নিয়ে চলে গেলেই হয়।’ সরোজা নাকি বলেছিলেন।

রামপ্রাণ কি কিছু বুঝেছিলেন? প্রায় অর্ধ শতক একসঙ্গে ঘর করার পর তাঁর কি কিছু বলার মতো ছিল না? শিউলির প্রাণঘাতী ব্যাধির আগাম খবরটা সম্ভবত সরোজাই প্রথম জেনেছিলেন, পরীক্ষায় ধরা পড়ারও আগে। প্রাণের চেয়ে প্রিয় মেয়ের ওপর অনিবার্য মৃত্যুর ছায়া দেখেছিলেন তিনি, কঠিন কৌশিকী উপবাসের সংকল্প ব্রত শুরু করেছিলেন। শেষ দিন সরস্বতীর ঘাটে ডুব দিলেন, আর উঠলেন না।

সাতগাঁয় পুরুষেরা সাধারণত পুরুষ হয়েই পুনর্জন্ম নেয়। মৎস্যভূমির প্রতি জন্মান্তরের টান তাদের ফিরিয়ে আনে। কখনো কেউ কেউ কাশীতে যায় জীবনচক্র থেকে মুক্তিলাভের জন্য। কিছু কিছু বিরল ক্ষেত্রে মানবেতর জন্মও ঘটে। যেমনটা ঘটেছে পায়খানার কুয়োর ব্যাঙেদের ক্ষেত্রে, ছুঁচুপেত্নির শাপে। কোনো কোনো পাতক শরৎকালের শ্যামাপোকা হয়ে জন্মায়, একটি রাত্রি তাদের আয়ুষ্কাল। কিন্তু এখানে নারীরা মানুষ হিসেবেও ফের জন্মাতে পারে, কিংবা পশুপাখি কীটপতঙ্গ হিসেবে, এমনকি বস্তু হিসেবেও–রান্নাঘরের শিলনোড়া, বগি থালা, এমনকি নারকেল কুরানি হয়ে ফিরে আসার ঘটনাও ঘটেছে।

কৌশিকী অমাবস্যার দিন সরস্বতীর জলে ডুব দিয়ে, জলের ভেতর দূরগামী কন্ঠস্বর হয়ে গলে মিশে গিয়ে এই স্বেচ্ছামৃত্যু তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় মেয়েকে, এই সরস্বতী নদীকে, এই পৃথিবী গ্রহকে আরও কিছু বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখার জন্য সংকল্প ব্রত ছিল কি না জানা যায়নি।

সরোজা কি জীবনচক্র থেকে চিরমুক্তি চেয়েছিলেন? প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে রামপ্রাণের সঙ্গে বিবাহের দিনে জন্মজন্মান্তরের বন্ধনের যে মন্ত্রোচ্চারণ করেছিলেন, সেই মন্ত্র সত্যি করে তুলতে পরের পর জন্মে হয়তো ওঁরা বিবাহ বন্ধনে কাটাতে পারতেন, একের পর এক সন্তানের জন্ম দিয়ে বাংলার সবকটি ঋতুর নামে, সব কটি ফুলের নামেও, তাদের নাম রাখতে পারতেন।

দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে আসা রোগীদের কাছে পরাণ ডাক্তার যে সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী হয়ে পড়েছিলেন, তার পেছনে সরোজার বিশাল ভূমিকা ছিল। রোগীরা অনেকেই ছিল গরীব চাষী, পয়সা কিংবা কড়ি দিয়ে ওষুধের দাম মেটাতে পারত না। তার বদলে তারা গাছের প্রথম ফল, গরুর প্রথম দুধ উপঢৌকন দিত। বাপ্পা আর তিতলিকে সেইসব দিনগুলোর গল্প বলেছেন সরোজা। বসন্ত তখন কোলের শিশু, হেমন্ত আর শিউলির তখনও জন্ম হয়নি। গভীর রাতে ছাড়িগঙ্গার চরগ্রামে সংকটাপন্ন রোগীর আত্মীয়রা নৌকা নিয়ে মশাল হাতে পরাণ ডাক্তারকে নিয়ে যেতে এসেছে। মালকোচা মেরে ধুতি পরা ষন্ডা গোছের চাষাভুষোর দল, হাতে লম্বা লাঠি, পায়ে হাঁটু অব্দি কাদা, মশালের আলোয় বোঝা যায় না তারা সত্যিই গ্রামের চাষি নাকি ডাকাত। এদিকে ওষুধের বাক্স নিয়ে মানুষটা তো চলে গেল ওদের সঙ্গে। শিশু কোলে নিয়ে সারারাত ঠায় অপেক্ষায় বসে আছে সরোজা, দু চোখের পাতা এক করতে পারছে না। সকাল বেলায় ফিরল নৌকাভর্তি ডাব নারকেল আর কলার কাঁদি নিয়ে। রোগী বেঁচে গিয়েছে। সারারাত জেগে বাড়িতে ফিরে একটুও না জিরিয়েই ফের রোগী দেখতে চলে গেল ফার্মেসিবাড়িতে। সকলে পরাণ ডাক্তারের আশ্চর্য জীবনীশক্তি আর কর্মনিষ্ঠা দেখে ধন্যি ধন্যি করত। যা কেউ জানতে পারত না, তা হলো পরাণবউও বাড়িতে সারারাত জেগে বসেছিল, এবং সকালবেলায় যথারীতি নিত্যকার সংসারের কাজে গিয়ে ঢুকেছে।

ষোল বছর বয়সে বিয়ে হয়ে আদিরামবাটিতে আসার সময় যেমন ছিপছিপে পাতলা গড়ন ছিল সরোজার, তিনটি সন্তানের জন্ম দেবার পরেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেরকমই ছিল— মাথায় একটিও চুল পাকেনি, একটিও দাঁত পড়েনি, সূচে সুতো পরানোর জন্য কোনোদিন চশমার প্রয়োজন হয়নি। রাধানগরের দাইবুড়ির পরামর্শে ছোটোবেলায় হেমন্তর ক্ষতের টোটকার কথা জানতে পেরে রামপ্রাণ যখন কটু কথা শুনিয়েছিল— ‘গঙ্গা কবিরাজের ভিটেয় এমন মূর্খামির চাষ হবে কে জানত!’— তখন সরোজা উত্তর দিয়েছিল:

‘তোমায় আর আমাকে কখনো চিকিৎসা করতে হবে না, ডাক্তারবাবু! তোমার ওষুধ এক ফোটাও পেটে পড়বে না, আমি ড্যাঙ ড্যাঙ করে চলে যাব!’

সরোজা কথা রেখেছিলেন। কোনোদিন তিনি অসুস্থ হননি, কোনোদিন কেউ এমনকি তাঁকে হাঁচতে, কাশতে কিংবা মামুলি অসুখেও ভুগতে দেখেনি।

.

মৃত্যুশোক আর দুশ্চিন্তার কুয়াশার ভেতর দিয়ে তিতলিকে দেখে চিনতে পারে না বাপ্পা। কত রাত যে মানুষটির দুই পাশে দুজনে শুয়ে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছে, তার এভাবে আচমকা চলে যাওয়া ওদের দুজনের মাঝে এক অনতিক্রম্য শূন্যতা সৃষ্টি করেছে যেন। বাপ্পাও আর আগের মতো নেই। কবে থেকে? সেই যেদিন সে বাবার সঙ্গে কফিহাউসে গিয়ে কোল্ড কফি পান করল, সেদিনের পর থেকে। ছোটোবেলায় সাতগাঁয় যে— ‘আমি’-টাকে সে ছেড়ে রেখে যেত, যে— ‘আমি’-র জন্য তার মন কেমন করত কলকাতায় বসে, শিশু বয়সে যে— ‘আমি’-র পাদোদক পান করতেন ঠোঁটে শাঁখ সন্দেশ গুঁজে দিতেন শাকম্ভরী দেবী, সেই— ‘আমি’-টা ক্রমশ আবছা হয়ে গিয়ে এ যেন অন্য এক— ‘আমি’, যার এমনকি দেহটাও ভেতরে ভেতরে কেমন যেন অচেনা হয়ে উঠছে। গলার কাছে জন্মদাগটা ফিকে হয়ে আসছে, বগলের নীচে, বুকের বৃত্তে নতুন টনটনে অনুভূতি, নালসো পিঁপড়ে কামড়ানোর মতো ব্যথা, কন্ঠস্বর ভাঙতে শুরু হয়েছে, উরুসন্ধিতে জঙ্ঘায় রোমের উন্মেষ। ইদানীং বাইরে বেরোলে ফুল প্যান্টে পায়ের রোম ঢাকতে চায় বাপ্পা; এদিকে দিন দিন লম্বা হয়ে ওঠায় শিউলিকে প্রায়ই ট্রাউজার্সের নীচের মোড়া অংশের হেম সেলাই খুলে দৈর্ঘ্য বাড়াতে হয়।

পন্ডিচেরিতে যাবার পর তিতলির চেহারাতেও দ্রুত বদল ঘটেছে, বামুনদির ভাষায়— ‘ছেঁটে-কেটে উঠেছে’। একমাথা চুল, ঘন জোড়া ভ্রূর নীচে ডাগর চোখদুটোয় ঔজ্জ্বল্য, ত্বকে সেই পীচ ফলের মতো রোঁয়া হারিয়ে গিয়ে মসৃণ বাদামি হয়েছে, বাপ্পার প্রায় মাথায় মাথায়। এতদিনে বাপ্পার শুঁয়োপোকা সত্যিই বুঝি প্রজাপতি হয়ে উঠেছে।

বদল ঘটেছে রামকানাইয়ের মধ্যেও। নোনা জলহাওয়ায় ওর গায়ের রং অদ্ভুত কালো হয়েছে, দেখে মনে হয় না এ বাড়ির ছেলে। মুখে কথা ফুটেছে, কিন্তু বাংলা কথায় একটা অন্যরকম টান। পন্ডিচেরিতে ও যে ইস্কুলে পড়ে সেখানে তামিল শেখা বাধ্যতামূলক, ওর সহপাঠিরা সকলেই তামিলভাষী। তিতলির সেক্রেড হার্ট কনভেন্টে অবশ্য পড়াশোনাটা হয় ইংরেজি মাধ্যমে, এবং ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বললে জরিমানা দিতে হয়। মাদ্রাজের সেই মার্কিন-ফেরত ডাক্তারের অ্যালার্জির চিকিৎসাতেই হোক কিংবা করমন্ডলের জলহাওয়ায়, তিতলির হাঁপানির অসুখটা সেরে গিয়েছে। বসন্ত ডেপুটেশনের মেয়াদ বাড়িয়ে আপাতত পন্ডিচেরির ইন্সটিটিউটেই ডেপুটি লাইব্রেরিয়ানের পদে থিতু হয়েছে।

ইতিমধ্যে একদিন সাতগাঁয় আসার সময় স্টেশনের গেটে এ.সি. ঘোষাল টি.সি. টিকিট দেখতে চেয়েছিল। বাপ্পার প্যান্টে আজকাল পকেট হয়েছে, মায়ের সঙ্গে বেরোলে ট্রেন ট্রামের টিকিট সে নিজের কাছেই রাখে। শরীর খারাপের পর থেকে শিউলির কিছু তেমন আর মনে থাকে না, প্রায়ই জিনিসপত্র হারায়।

টিকিট হাতে নিয়ে বাপ্পার দিকে তাকিয়ে আপাদমস্তক দেখে ভুরু কুঁচকে ঘোষাল বলল—‘হাফ টিকিট?’

বাপ্পার বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। মনে পড়ল বহু বছর আগের সেই শীতের সকালটা, সেই ক্রমশ নির্জন হয়ে পড়া রেল স্টেশন, আকাশে হঠাৎ মেঘ ছেয়ে এসে কেমন শীত করছিল। স্টেশন মাস্টারের অফিসের ওই লাল ইটের বাড়িটার ভেতরে কোনো জেলখানা যে নেই সেটা ইতিমধ্যে জেনেছে। কিন্তু ঘোষাল যদি ওর জন্মের প্রমাণপত্র দেখতে চায়? ওর কাছে যে কিছুই নেই? সঙ্গে, এমনকি বাড়িতেও, এমন কোনো কাগজ নেই যাতে বাপ্পার নাম কিংবা ওর জন্মের তারিখ লেখা আছে।

কিন্তু ঘোষাল কিছুই দেখতে চাইল না এদিন। কিছুদিন আগে, মায়ের অসুখটা ধরা পড়ার আগে, রবিবার বিকেলের কনে-দেখা আলোয় যেমন শিউলির মুখের দিকে দুৰ্ত্তেয় ব্যাকুল দৃষ্টিতে চেয়েছিল সেভাবেই চেয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত, তারপর হাত নেড়ে ওদের যেতে বলল।

তার আগে টিকিট চাওয়ার পর বাপ্পার হাফ টিকিট দেখে ঘোষালের চোখে যে সন্দেহ ফুটেছিল সেটা স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছিল। তিতলির চাহনিতে সেটা মনে পড়ে গেল বাপ্পার। এবার আর আগের মতো ওর গা শুঁকে কলকাতার গন্ধ খুঁজতে চাইল না তিতলি। গলার কাছে পৈতের মতো জন্মদাগটাও দেখতে চাইল না। সেই জন্মদাগটাই যে হারিয়ে গিয়েছে। সামনের ফাল্গুনে শিউলি ওর গলায় সত্যিকারের পৈতে ঝুলিয়ে দ্বিজত্বের তোড়জোড় করছে।

সরোজার আকস্মিক মৃত্যুতে সেটা পিছিয়ে গেল। এদিকে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে সাতগাঁর যেসব প্রবীণ ব্রাহ্মণেরা এলেন, দুপুরে লুচি আর আলুনি কুমড়োর হুক্কা আহারের কালে বাপ্পাকে পেতলের জগ থেকে মাটির ভাঁড়ে জল পরিবেশনের সময়ে দেখে ওর পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। অবিকল এ. সি. ঘোষাল টি. সি.-র মতো চোখ করে ওর আপাদমস্তক দেখে, ওর নাকের নীচে শ্যামল ছায়া দেখে জানতে চাইলেন উপনয়ন হয়েছে কি না। ভোজন শেষ হলে শিউলির হাত থেকে ব্রাহ্মণের সিধে নেবার সময়ে বললেন—

‘তোর মা অপঘাতে গেল, কালাশৌচ মিটলেই কিন্তু ছেলেটার পৈতে দিয়ে দিস। কুমারী কন্যা বাপের বাড়িতে রজস্বলা হলে যেমন বংশে চোদ্দ পুরুষ পাপের ভাগী হয়, ব্রাহ্মণ সন্তান বয়ঃসন্ধির আগে পৈতে না হলেও তাই!’

অপঘাতে মৃত্যুর জন্য সরোজার শ্রাদ্ধকর্ম তিন দিন পরে হলেও নিয়ম মেনে তের দিনের দিন মৎস্যমুখীর আচার পালন হলো। সেই ভোজের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত ছিল তিতলির কোয়ার্সভিলের ইস্কুলের কয়েকজন বন্ধু।

তিতলি নীচু ক্লাসে পড়ার সময়ে বসস্তমামার হার্লে চেপে যখন ওকে ইস্কুলে পৌঁছে দিতে যেত, তখন ওদের দেখেছে বাপ্পা। সেই মোটাসোটা, গলায় ইলাস্টিক দেওয়া নকল টাই-বাঁধা ছিঁচকাদুনে মেয়েগুলো এই ক’বছরে একেবারে অন্য রকম হয়ে গিয়েছে। তাদের চিকন লম্বা চুল, পরনে হাল ফ্যাশনের পোশাক, লাগাম-আঁটা বুকজোড়া, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। ওদের চোখেও বাপ্পা দেখল সেই বিচিত্র সন্দেহ আর ঔৎসুক্য মেশা চাহনি। ওরা বাপ্পাকে কৌতূহলভরে দেখে, নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলে, নেলপালিশ লাগানো আঙুল ঠোঁটে চেপে বেদম হাসিতে এ-ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে। বাপ্পা ছিটকে সরে যায়।

ইতিমধ্যে ওরা পুতুল নিয়ে খেলার স্তর থেকে উন্নীত হয়েছে। জীবন্ত মানুষের বাচ্চা নিয়ে খেলা করতে শিখেছে। কাজের বাড়িতে সদ্য কোলের শিশু নিয়ে এসেছিল এক জ্ঞাতিবৌ। সেই বাচ্চাটাকে কাড়াকাড়ি করে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগল ওরা। এমনকি তিতলিও।

গোলাপি রবারের তালের মতো ওই অপরিপক্ক মনুষ্যপিন্ডের মধ্যে কী এমন আছে? বাপ্পা ভেবে উঠতে পারে না।