Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১০.৫

১০.৫

‘কস্য বিভাগবন্টনপত্রমিদং কাৰ্য্যঞ্চাগে…’

হুগলির তীরবর্তী সুউচ্চ থামে-ঘেরা বিশাল ইমারতটির সামনে প্রাচীন শিরী গাছের ছায়া। এককালে ফিরিঙ্গি বণিকদের ক্লাব ও সরাইখানা, বর্তমানে ভূমিরাজস্ব দপ্তরের অফিস। সুউচ্চ ছাদের ঘরগুলোয় ডাই করা পুরোনো ধুলোপড়া কাগজ ও ফাইলের ফাকে ফোকরে কেরানির দল। দিনভর মানুষের আনাগোনা চলে। সিঁড়ির আশেপাশে বাগানে গাছের ছায়ায় দেহাতি আধাশহুরে মানুষ, অপেক্ষমাণ, তাদের চোখেমুখে যতটা উৎকণ্ঠা ঠিক ততটাই নির্লিপ্তি দালাল ও দলিল-লেখকদের মুখে। যততত্র করিডোরে থামের গায়ে, সিঁড়ির নীচে, বাগানে গাছের ছায়ায় মাদুর জলচৌকি টুল টেবিল পেতে বসেছে তারা। সর্বক্ষণ ব্যস্ততার আবহ, মৌচাকের মতো সমবেত কন্ঠস্বরের গুঞ্জন। সেই সজীব প্রফুল্লতার অন্তরালে স্পন্দমান জমি ও স্থাবর সম্পত্তিকেন্দ্ৰিক কত যে করুণ জটিল তমসাময় কাহিনি, মি’লেডি।

‘তপশীলে লিখিত প্রপিতামহ ঈশ্বর রাজারাম সার্বভৌম চক্রবর্তী মহাশয়ের স্বত্বদখলি সম্পত্তি … অতীতকালে সপ্তগ্রামের শাসক জন্নতবাসী দরপ খান গাজির সহিত বংশের আদিপুরুষ স্বর্গবাসী রামাচার্যর চুক্তি অনুসারে কাল পরম্পরায় …’

আকাশের নীচে গাছতলায় টাইপরাইটারের খটাখট শব্দ, কেটলি হাতে চা ওয়ালা, পানবিড়িওয়ালা ইতস্তত বিচরণশীল। বেঞ্চিতে বসে এক প্রবীণ, এক নারী ও এক বালক। প্রবীণের পুরুষ্ট সাদা গোঁফ ঠোঁটের দুপাশে ঝুলে এসেছে, নাকের ওপর রুপোলি তারের গোল চশমা, পরনে ধুতি ও খাদির ফতুয়ার বুকের কাছে নস্যির দাগ।

‘তল্লোকাস্তে ঐ সকল সম্পত্তি তস্য পুত্রত্রয় রামানুজ, গঙ্গারাম ও পাগলরাম, এবং রামানুজস্য পুত্র রামশশাঙ্ক, তস্য পুত্র রামপ্রাণ বর্তমানে ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত হইয়া তাহাতে স্বত্ববান ও এজমালি দখলিকার ও উপস্বত্বভোগী …’

নারীটির চোখ দেখে বোঝা যায় প্রবীণেরই কন্যা, যদিও চোখের দুপাশে গভীর ছায়া পড়েছে। এক মাথা ঘন কোঁকড়ানো চুল হলুদ রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। পাশে রোগামত বালকটির পরনে হাফ হাতা নীল সোয়েটার আর ট্রাউজার্সটি গোড়ালির ওপরে উঠেছে।

‘তপশীলে লিখিত সম্পত্তির অংশ, আদিরামবাটির দক্ষিণে সর্বসাধারণের যাত্রাপথ, পূর্বে স্থিত শ্রী শ্রী আদিরামের দেউল, উত্তর ও পশ্চিমে কৌম আম্রকুঞ্জ বেষ্টিত ধরিলে …

‘ভদ্রাসনবাটীর মধ্যস্থিত নাগকেশরবৃক্ষকেন্দ্রিক সাতাশ কাঠা দশ ছটাক ওষধিগুল্মের উদ্যান, যাহা পিতামহ রামানুজস্য ভ্রাতা অকৃতদার ঈশ্বর গঙ্গারাম চক্রবর্তী কর্তৃক রক্ষণাবেক্ষণ হইত, ও বর্তমানে নিম্নস্বাক্ষরকারী শ্রী রামপ্রাণ চক্রবর্তী, পেশায় চিকিৎসক…..’

আকাশি ফুলহাতা জামা আর ঢোলা পাতলুন পরা এক শীর্ণকায় লোক, ওপরের পাটির দুটি দাঁত নেই, একটি স্ট্যাম্প পেপারে টাইপ করা একটি লেখা পড়ে শোনাচ্ছে। সামনে দুটি দাঁতের অভাবে উচ্চারণের সময়— ‘ত’ বর্গের অক্ষরগুলি অস্পষ্ট হয়ে উঠছে, ভাষার দুর্বোধ্য কুয়াশার ভেতর দিয়ে অস্পষ্ট ফুটে উঠছে একখন্ড জমি।

‘স্ব’ইচ্ছায় সজ্ঞানে সরলচিত্তে এই দলিলের প্রকৃতমর্ম অবগত থাকিয়া এই দানপত্রনামা সম্পাদনা করিলাম, যাহাতে স্বীয় কন্যা শ্রীমতী শিউলিরাণী চক্রবর্তী চট্টোপাধ্যায়, স্বামী শ্রীযুক্ত রথীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, আজীবন সম্পূর্ণ নিঃশর্তে উপরোক্ত নাগকেশরবৃক্ষকেন্দ্রিক সাতাশ কাঠা দশ ছটাক ওষধিগুন্মের উদ্যান অধিকার ও বংশপরম্পরায় ভোগদখল করিতে পারে, এবং তাহার অবর্তমানে তস্য পুত্র শ্রীমান বাপ্পাদিত্য…’

চারদিকে ধ্বনির কলরোলের ভেতর উৎকর্ণ হয়ে প্রবীণ ও নারী দলিল- লেখকের পাঠ শুনছে। বালকটি নাঝে মাঝেই মাথা তুলে উঁচু গাছের ডালে কী যেন খুঁজছে। পাঠ শেষ হলে ওরা তিনজনেই টাইপ-করা স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করল— প্রথমে কলম দিয়ে, তারপর স্ট্যাম্প প্যাডের কালি আঙুলে লাগিয়ে কাগজের ওপর ছাপ দিল। ছাপ দেওয়া হয়ে গেলে বালকটি ওর মায়ের দেখাদেখি আঙুলের কালি মুছে নিল নিজের চুলে।

.

বনলতা লিখেছিল: স্বদেশ কী? সে কি কোনো সীমানানির্দিষ্ট ভূমি? ভূমিতে নারীর তো কোনো অধিকার নেই। তাহলে স্বদেশ কি শুধু পুরুষের? নারীর কি কোনো স্বদেশভূমি নেই?

.

অনেককাল পরে ওলন্দাজডাঙার ভূমিরাজস্ব দপ্তরের উঁচু থামে ঘেরা পুরোনো অফিসবাড়িটায় একটি দানপত্র খুঁজতে গিয়ে বাপ্পার মনে আবছা ভেসে উঠবে একটি দিনের স্মৃতি ব্যস্ত মৌচাকের মতো গুঞ্জন আর টাইপরাইটারের শব্দের মাঝে শিরীষ গাছের ছায়ায় বেঞ্চে বসে একটি কাগজ থেকে দুর্বোধ্য ভাষায় পাঠ করে শোনাচ্ছে আকাশি শার্ট পরা একটি লোক, তার সামনের পাটির দুটি দাঁত নেই। মনে পড়বে গাছে পাতার আড়ালে কোথাও একটি অচেনা পাখি ডাকছিল, ধ্বনির কলরোলের মধ্যেও শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু গাছের উঁচু ডালে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাখিটাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল না, ডাকটা ক্রমশ নীচের ডাল থেকে মগডালের দিকে উঠে যাচ্ছিল। মনে পড়বে, কালির দাগ মাথার চুলে মুছে নেবার পরেও আঙুলের ডগায় আবছা নীলচে দাগ, অনেকটা গলার কাছে সেই জন্মদাগের মতো, যা ততদিনে প্রায় মিলিয়ে গিয়েছে।

এরই মধ্যে একবার বসন্ত ও নতুনবউ সাতগাঁয়ে এল কানাইকে নিয়ে। তিতলি এল না। তার কিছুদিন আগে সে কনভেন্টের হোস্টেলে থাকতে শুরু করেছে। একদিন বাপ্পা দেখল, একতলায় ভাড়ারের পাশের ঘরে চৌকিতে বসেছে নতুনবউ, আর ওর মা সেই লাল খেরোর খাতা খুলে বিভিন্ন মানের মুদ্রা আর নোট সাজিয়ে দাদুর ফার্মেসি থেকে আয় ও সংসার খরচের ব্যায়ের হিসেব বুঝিয়ে দিচ্ছে।

ছবিটা মনে গেঁথে গিয়েছিল বাপ্পার। তার সঙ্গে ভূমিরাজস্ব দপ্তরের আবছা স্মৃতির কোনো যোগসূত্র আছে কী না ভাবার চেষ্টা করেনি সে তখন। বড়োদের জগতে অনেক কিছুই ঘটে যাচ্ছে, যার হদিশ তার কাছে ছিল না।

সেইসময় বসন্তর কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কোয়ার্সভিলে ইন্সটিটিউটের শাখায় যে কিউরেটারের পদে সে কর্মরত ছিল, সেই পদটিই বিলুপ্ত হয়েছে। এককালের ফরাসী শাসকদের ব্যবহৃত মিউজিয়ামের সামগ্রী বাক্সবন্দি হয়ে চলে যাচ্ছে প্যারিসে।

পন্ডিচেরিতে সংসার চালানোর খরচ বেশি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তিতলিকে আবাসিক স্কুলে রেখে পড়ানোর ব্যায়। এদিকে দিনকাল দ্রুত বদলাচ্ছে। আদিরামবাটিতে বংশপরম্পরায় যজমানের বাড়ি থেকে আসা সোম্বচ্ছরের চাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্য, মরশুমে গুড় ঘি ইত্যাদির যোগানে ভাটা পড়েছে, বিশেষত মশাইয়ের মৃত্যু এবং দুর্গাপুজো বন্ধ হয়ে যাবার পর। সংসার চলে প্রধানত ফার্মেসির থেকে আয়ে। কিন্তু সরোজার মৃত্যু আর শিউলির কঠিন ব্যাধি সনাক্ত হবার পর বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন রামপ্রাণ, রুগি দেখার সময় কমিয়ে দিয়েছিলেন।

এসবের মধ্যে শিউলি বাপ্পাকে নিয়ে আদিরামবাটিতে দীর্ঘকাল থাকে, প্রায় গৃহকর্ত্রীর ভূমিকায়, সেটা নতুনবউয়ের মনঃপুত হয়নি। এই ব্যাপারে বসন্তর মনোভাব যাই থাক, স্ত্রীর বিরুদ্ধে যাবার মতো মনের জোর তার নেই। বহুকাল আগে বিলেত থেকে আনা ক্যামেরার ছবি দেখে আকন্ঠ মদ্যপান করে সেই যে সেবার ঘরভর্তি লোকের সামনে নতুনবউ ওকে বলেছিল,— ‘পোঁদে নেই চাম, হরে কৃষ্ণ নাম!’

তার পর থেকে বসন্তর কোষ্ঠদীর্ণ বৃহদান্ত্র চিকিৎসক পিতার হাতের মুঠোয় থাকলেও মেজাজমর্জি ছিল স্ত্রীর তর্জনী ও মধ্যমার মাঝে। কোনো বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও ঠোঁটে রা কাড়ে না, কোষ্ঠবদ্ধতায় কোঁৎ পাড়ার মতো মুখে অপ্রতিভ রেখা ফোটে কেবল।

এরই মধ্যে একদিন হেমন্তর বানিয়ে দেওয়া পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ নিয়ে খেলতে খেলতে বাপ্পার সঙ্গে কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে এঁটে উঠতে না পেরে কানাই অন্ধ রাগে চিৎকার করে উঠে থুতু ছিটিয়ে বলল

‘বাঙালের পো? কোত্থেকে উড়ে এসে এখানে জুড়ে বসেছিস! সব কিছু দখল করে নিবি ভেবেছিস?’

এই ঘটনাটা বাপ্পা মাকে জানায়নি। জানালে মা কষ্ট পেত। এমনিতেই মায়ের কষ্টের অভাব ছিল না।