সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১৩.১
১৩.১
পাতলা ঘুমের মধ্যে রিংটোন শুনে বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায়ের প্রথমে মনে হলো ফোনটা বাজছে কলুটোলা লেনে বসার ঘরে, সেই বেতের টিপয়টার ওপর।
সিধুর ফোন। ছটা বাইশ।
‘হাই বাবা, কেমন আছো?’
ওর ওখানে এখন সময়টা হিসেব করে বাপ্পা। আটটা বাজেনি, সন্ধ্যা। সিধু অফিস থেকে ওর অ্যাপার্টমেন্টে ফিরেছে। এখানে জানলার বাইরে ঘোলাটে সূর্যালোক পাশের ফ্ল্যাটবাড়িটার গায়ে পড়েছে। ভোরে-দেখা অস্পষ্ট স্বপ্নের ছোপ লেগেছে সেখানে।
‘কী ব্যাপার, বাবা? কী শুনছি?’ সিধুর কন্ঠস্বরে উদ্বেগ।
‘তোকে কে বলল? আলো?’
‘হুম!’ সিধুর গলায় অভিমান। ‘তুমি তো আমায় বলোনি কিছু।’
আলো, তিতলির মেয়ে, গত মাসে দেশে এসেছিল। ওকে তখন যা জানিয়েছিল বাপ্পাদিত্য সেটাই সিধুকে সংক্ষেপে বলে।
‘তাহলে? কী হবে এবার?’
অল্প কথায় ছেলেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বাপ্পাদিত্য।
‘তোমার স্টেটাসটা এখন তাহলে এগজ্যাক্টলি কী?’
‘তুই চিন্তা করিস না। আমি এখনও দেশের মধ্যে যেখানে ইচ্ছে ঘুরে বেড়াতে পারি, যা ইচ্ছে তাই করতে পারি। তবে খুব সম্ভবত ভোট দিতে পারি না। আর… ওরা ডেকে পাঠালে আমায় হাজিরা দিতে হবে। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এভিডেন্স জোগাড় করতে হবে।’
‘কীসের?’
‘যে আমি এই দেশে জন্মেছি। অন্ততপক্ষে কাট-অফ ডেটের আগে এখানে ছিলাম।’
‘না পারলে?’
সিধুর চড়া গলা শুনে চমকে ওঠে বাপ্পাদিত্য।
‘অনেক কিছুই হতে পারে…’ ঠোঁটের ফাঁকে অসহায় হাসি, সিধু দেখতে পায় না। ‘ঠিক কী কী যে হতে পারে, বিশ্বাস কর আমি সত্যিই জানি না!’
‘হোয়াট দা…!’ ফ-বর্গের শব্দটা গিলে নেয় সিধু, গলা আগের মতোই চড়া। ‘কিন্তু তুমি তো ইন্ডিয়ায় জন্মেছ, বাবা! দ্যাটস আ ফ্যাক্ট!
‘সেটা তুই জানিস, আমি জানি, রাষ্ট্র তো আর জানে না। রাষ্ট্র প্রমাণ চায়।’
‘কিন্তু তোমার কাছে ডকুমেন্টস তো আছে? তোমার ডিগ্রি সার্টিফিকেট, তোমার কলেজের কাগজপত্র, ট্যাক্স রিসিট…— ‘
‘সিধু, সেগুলো কোনোটাই প্রমাণ করে না আমি এই দেশে জন্মেছি। কিংবা কাট-অফ ডেটের আগে থেকে টানা এই দেশে আছি। তোর ঠাকুর্দা রিফিউজি ছিলেন, তার ডকুমেন্টারি এভিডেন্স রয়েছে। আর তুই নিশ্চয়ই জানিস আমার কোনো বার্থ সার্টিফিকেট নেই?’
‘জানি। তুমি সাতগাঁর বাড়িতে জন্মেছিলে। কিন্তু তুমি যে স্কুলগুলোয় ভর্তি হয়েছিলে? সেই যে ইস্কুলের কথা তুমি খুব বলতে? কোন একটা চা বাগানে না কোথায় যেন? তুমি তো কিছুদিন দমদমেও একটা ইস্কুলে পড়েছিলে না?’
‘সেই ইস্কুলটা আর নেই সিধু, উঠে গিয়েছে। হাজার হাজার গভর্নমেন্ট- ফান্ডেড স্কুল উঠে গিয়েছে। তাছাড়া তুই তো জানিস বাবা বদলির চাকরি করতেন। প্রথম ঠিকঠাক ভাবে যে ইস্কুলে আমি ভর্তি হই সেটা বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট। এবং সেটা কাট-অফ ডেটের জাস্ট কয়েকদিন পরে। তার আগে যে কয়েকটা স্কুলে কিছুদিন করে গিয়েছি সেগুলো আদৌ এখনও টিকে আছে কি না আমি জানিনা। থাকলেও আমার নামে কোনো রেকর্ডস পাওয়া যাবে না।
‘আমি ভাবতেই পারছি না তোমার কাছে কোনো ডকুমেন্ট নেই! তুমি সিওর? তোমার সেই ব্ল্যাক বক্স? সেটার কী হলো? সেখানে খুঁজেছ?’
গত আড়াই মাসে তার জীবনে এঁটে-বসা এই জটিল অপ্রত্যাশিত গেরো যতদূর নিজে বুঝেছে ওকে বোঝাতে চেষ্টা করে বাপ্পা, নতুন আইনের চোখে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে চিঠিপত্র জাতীয় ব্যক্তিগত স্মারকের যে কোনো মূল্য নেই সে কথা বলে।
‘ড্যামিট্!’ সিধু বলে ওঠে। ওর কন্ঠস্বরে অস্থির হতাশা অন্য গোলার্ধ থেকে বেতারে বয়ে আসে।
.
একটি পোস্টকার্ড: ইস্ট বেঙ্গলের সিলেট থেকে ২৩/৩ কলুটোলা লেন, কলকাতা, ভারত, ৭০০০২৩ লেখা ঠিকানায় ডাকযোগে আসে জনৈক রথীন চ্যাটার্জির নামে, তার বিয়ের আগে। তার কিছুকালের মধ্যে ইস্ট বেঙ্গলের নতুন নামকরণ হবে ইস্ট পাকিস্তান, তারও ষোল বছর পরে নাম হবে বাংলাদেশ।
বহু বছর পরে সেই পোস্টকার্ড কোনো ব্যক্তির হাতে এসে পড়েছে, এবং সেই বিবাহের একমাত্র জাতকের বিরুদ্ধে সেটি ব্যবহার করেছে সে।
কে?
জানার অধিকার নেই। আইন অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখতে দায়বদ্ধ, অভিযুক্তের দায় সেই অভিযোগ খন্ডন করার।
মি’লেডি, প্রৌঢ়ত্বে এসে বাপ্পাদিত্য চ্যাটার্জি, যে জন্মের পর থেকে একটানা এদেশে বাস করেছে, মাঝে একবার ট্রাভেল ভিসায় আমেরিকায় তার একমাত্র পুত্র সিদ্ধার্থর কাছে গিয়েছে, যে পুত্র একজন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে তার আইনসিদ্ধ বিবাহের জাতক (বর্তমানে বিবাহবিচ্ছিন্ন), যে আজীবন একটি সরকারপোষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছে, যথা সময়ে আয়কর দিয়েছে, বিধিসম্মত শুল্ক দিয়েছে, যার নাম কোনোদিন পুলিশের খাতায় ওঠেনি, যে এগারজন প্রধানমন্ত্রী ও ছয় জন মুখ্যমন্ত্রীর শাসনকাল দেখেছে, এবং প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে, যে তার অতিরিক্ত আয় ব্যাঙ্কে আমানতে এবং সরকারি বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডে সঞ্চয় করেছে জাতীয় আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে, এবং একটি মাত্র সন্তানের জন্ম দিয়ে জনসংখ্যাবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগামী রেখায় রাশ টানার ব্যাপারে তার অবদান রেখেছে, সেই বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায় একদিন ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করল সবকিছু হারিয়ে সে একটি ফাইল নম্বরে রূপান্তরিত হয়েছে– ES/276/39431
কাফকার মেটামরফোসিস গল্পে গ্রেগর সামসা একদিন ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করেছিল সে একটি গুবরে পোকা হয়ে গিয়েছে। মাফ করবেন মি’লেডি, আপনি বলেছেন কোনো সাহিত্য নয়। নো পোয়েট্রি!
.
আটলান্টা থেকে সিধুর ফোন আসার পাঁচ দিন পরে গায়ত্রীর ফোন পেল বাপ্পাদিত্য। নতুন নম্বর, স্ক্রিনে লোকেশান ভেসে উঠল উড়ুপি, কর্ণাটক। গায়ত্রী যে এখন উড়ুপিতে রয়েছে সেটা জানত না বাপ্পা। কী করছে সেখানে? কোনো নতুন প্রোজেক্ট?
‘আমি জানতে পেরেছি তুমি ফেঁসেছ!’ গায়ত্রীর কন্ঠস্বরে না আছে উদ্বেগ না কৌতূহল। ‘এই জট থেকে কীভাবে বেরোবে ভাবছ?’
চিরকালই সরাসরি প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ে গায়ত্রী, সোজা এবং সাপটা। এই গুণটা সিধু ওর মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে। এ ব্যাপারে বাপ্পাদিত্য সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর
সবকিছুতে গড়িমসি, পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়ে দীর্ঘসূত্রিতার সুতোয় ক্রমাগত পাক দিয়ে দিয়ে গুটি বুনে চলা, ফঙ্গবেনে আবেগ আর অনুভূতি মিশিয়ে চলা। দুটি মানুষের মনের দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন গড়ন প্রায় চল্লিশ বছর আগে পরস্পরকে আকর্ষণ করেছিল বায়ুগ্রস্ত রাজধানীর প্রান্তে ছড়ানো খোলামেলা ক্যাম্পাসে, দুজনের দুই ভিন্ন বিভাগের লাল ইঁটের বাড়ির মধ্যবর্তী পরিসরে, বাবলা গাছে ছাওয়া বনাঞ্চলে গঙ্গা ধাবার বাইরে পাথরের ধাপিতে, মেহগনি রঙের বিকেলবেলায়, দিনের পর দিন। কিন্তু এগারোটা বছর এক ছাতের নীচে থাকার পর ওরা একে অপরের এই ভিন্ন মানসিক গড়ন সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণায় উপনীত হয়েছে। সব ব্যাপারে বাপ্পাদিত্যর ঢিলেঢালা মেজাজকে গায়ত্রীর মনে হয়েছে অবাস্তব, অকেজো। অন্যদিকে, গায়ত্রীর এই ধর-তক্তা-মার-পেরেক মানসিক গড়নটা বাপ্পার মনে হয়েছে ভোঁতা আর বিষয়ী। সিধুর বয়স যখন নয়, দুজনে যে যার নিজের পথ ধরল।
‘তোমায় খবরটা কে দিল? সিধু?’
‘আর কে দেবে?
ওর গলায় একছিটে অভিমান ফুটে উঠল কি? বাপ্পাদিত্য ভাবে। গায়ত্রী কি চেয়েছিল কঠিন পরিস্থিতিতে ও নিজে থেকে যোগাযোগ করবে?
এক সেকেন্ড পরে লাইনের ওপ্রান্ত থেকে কাটা কাটা কথা বেজে ওঠে।— ‘সে যেই দিক, ছাড়ো! তুমি তোমার জন্মের প্রমাণপত্র খুঁজে পাওনি, তাই তো?’
‘না। এখনও পাইনি।’
‘কিন্তু তোমার মা তো সাতগাঁয় জন্মেছিলেন। সেটা কি যথেষ্ট নয়?’
‘কিন্তু তার তো কোনো কাগজপত্র নেই, কোনো ডিগ্রি সার্টিফিকেট কিচ্ছু নেই!’ বাপ্পা অধৈর্য হয়ে পড়ে। ‘তুমি তো জানো সেকালে মানুষের কাছে এসবের কী মূল্য ছিল, বিশেষ করে সেটা যদি কোনো মেয়ের হয়। তাছাড়া মায়ের খুব কম বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর কোনো কাগজপত্র মা ও বাড়ি থেকে আনেনি। যদি বা থেকেও থাকে আমি সাতগাঁয় গিয়ে সেসব আর খুঁজতে পারব না।’
‘তোমায় পারতে হবে, বাপ্পা! যদি সেটা করলে তুমি বাঁচতে পার।
সোজাসাপটা গায়ত্রী। পেরেকের মাথায়-হাতুড়ি-ঠোকা গায়ত্রী। অপরজন স্বরচিত কুয়াশায় নিজের সঙ্গে কানামাছি খেলে চলে। কিন্তু বাপ্পা ওকে কী করে বোঝায় এই কুয়াশা থেকে পরিত্রাণ নিজের শরীরের চামড়ার বাইরে বেরিয়ে আসার মতোই অসম্ভব? মাকড়শা কি পারে তার জাল ছেড়ে বাঁচতে? কিংবা শামুক তার খোল ছেড়ে?
লাইনের ওপ্রান্ত থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে গায়ত্রী কিছুটা স্বগতোক্তির স্বরে বলে—
‘কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে এমন কাজ কে করতে পারে?’
কয়েকশো মাইল দূরে লাইনের এপাশে বাপ্পা ওর মুখের অভিব্যক্তি কল্পনা করতে চেষ্টা করে: ঠোঁট কুঞ্চিত, চোখদুটো সরু আর ধারালো, পেন নাইফের মতো অবিকল সেই মুখভঙ্গি, যখন ফ্রিজটায় থেকে থেকে বেয়াড়া শব্দের গূঢ় কারণ অনুসন্ধান করত, কিংবা যখন বাতাসে কিছু একটা পোড়া গন্ধের উৎস খুঁজত, কিংবা শিশু বয়সে যখন সিধু পেটের ব্যাথায় কাঁদত …
‘আমি সত্যিই জানি না, বিশ্বাস করো।’ অকপট স্বীকারোক্তি করে বাপ্পা, অবসন্ন লাগে। ‘এক্ষেত্রে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখাটাই বিধি। এমনকি নির্দিষ্ট করে অভিযোগটা ঠিক কী, কীসের ভিত্তিতে সেটা তৈরি হয়েছে, সেসবও আমার জানার কথা নয়। অনেক দিন ধরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জুতোর সুকতলা ক্ষইয়ে আমি এই পোস্টকার্ডের ব্যাপারটা জেনেছি।’
‘তোমার ক্ষেত্রে যে এটা ঘটবে আমি সত্যিই এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।’
‘যে কোনো কারোর ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে, গায়ত্রী। যতদিন না শিশু জন্মানোর পরে পরেই শপিং মলে প্যাকেটের গায়ে বারকোডের মতো তার চামড়ায় দেগে দেওয়া হয়। মনে করো এটা অনেকটা টিকের দাগের মতো থেকে যাবে, মেশিনে ধরলেই সেকেন্ডের মধ্যে সব ইনফর্মেশন ভেসে উঠবে স্ক্রিনে।’–খ্যাক খ্যাক করে হেসে ওঠে বাপ্পা।
নির্বোধ রসিকতা! গায়ত্রী সেটা উপভোগ করার মেজাজে নেই।
‘একমাত্র যে এই কাজটা করতে পারে সে হল কানাই!’–ওর কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট নির্দ্বিধা।
‘কিন্তু ও কেন এটা করবে? আমায় ফ্রিডম সেন্টারে পাঠিয়ে ওর লাভ কী?’
‘আচ্ছা, তোমার মা মারা যাবার কিছুদিন আগে তোমার দাদু বাড়ির মধ্যে একটুখানি জমির অংশ দানপত্র করে গিয়েছিলেন না?’ গায়ত্রীর কন্ঠস্বর সহসা সজীব হয়।–‘একটা মেডিসিন গার্ডেন, তাই না? তুমি বলেছিলে একবার।’
হ্যাঁ, ওষধিবাগান। সেই বাগানের জমি আর সেই জমির ওপর সব গাছ আর জড়িবুটি। একটা দানপত্র মনে হয় লেখা হয়েছিল, কিন্তু তার খুব ঝাপসা একটা স্মৃতি রয়েছে। পরে সেই স্মৃতিটাকেই সন্দেহ করেছে বাপ্পাদিত্য; বাগান, গাছপালা তো আর অস্থাবর নয় গয়নার বাক্সের মতো। তাছাড়া যতদূর সে জানে, আদিরামবাটির পুরো এলাকাটা এজমালি সম্পত্তি, ফ্যামিলি ট্রাস্টের আওতায়। ওই দানপত্র যদি সত্যিই হয়ে থাকেও তার কোনো আইনি ভিত্তি থাকার কথা নয়। সত্যিই কি জমিটা রেজিস্ট্রি হয়েছিল?
‘কিন্তু ওদের তো বাগান দেখালে হবে না, গায়ত্রী। ওরা কাগজ দেখতে চায়। মাটি কাঠ পাথর পোড়ামাটি এসব কোনো কিছু দেখিয়েই কাজ হবে না। কাগজ দেখাতে হবে, কাগজ! যাকে চীনেরা বলত কাজা, যাতে মুড়ে এককালে জিনসেং- এর শিকড় আসত হাংঝৌ থেকে সাতগাঁর বন্দরে, যাতে লেখা আস্ত কিতাব রুজার মায়ের বংশের প্রথম পুরুষ রামাচার্যকে দেখিয়েছিল দরপ খান গাজি, কাগজ বাগদাতিকোষ, তার ওপরে আঁকা আস্ত সোলার সিস্টেম, চাঁদ তারা জন্নত জাহান্নাম ভাঁজ করে ঘোড়ার পিঠে বটুয়ায় গুঁজে মাইল মাইল মরুভূমি পেরিয়ে এদেশে এসেছিল এক লস্কর-ই-তুরকান!’
অনেকদিন পরে গায়ত্রীর কন্ঠস্বর শুনে, ওর গলায় উদ্বেগের ছোঁয়া পেয়ে বাপ্পাদিত্য উজ্জীবিত। কিন্তু গায়ত্রী তাতে সাড়া দেয় না।
‘কাট দ্য ননসেন্স, বাপ্পা!’
বাপ্পা দমে যায় না, বরং ওর পুরোনো মেজাজটা হারিয়ে যায়নি টের পেয়ে খুশিই হয়। ভাবে–ওহ্, এখন যদি ওর মুখটা একবার দেখতে পেতাম! যদি দেখতে পেতাম ঠোঁটের দুপাশে ধৈর্যচ্যুতি আর উপভোগের রেখা কীভাবে কাটাকুটি খেলছে! ভিডিও কল করতে বলব কি?
‘তোমার দাদু একবার একটা দানপত্র গোছের কিছু করে যান, তাতে নমিনি হিসেবে তোমার নাম ছিল। তুমি আমায় বলেছিলে একবার। সেই রেকর্ডটা কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই আছে। তুমি কি তোমার ব্ল্যাকবক্সটা খুঁজে দেখেছ?’
বাপ্পা আমতা আমতা করে।
‘দানপত্রের ওই ডকুমেন্ট, যাতে তোমার মায়ের নাম আছে, নমিনি হিসেবে তোমার নাম আছে, তোমায় এই মেস্ থেকে উদ্ধার করতে পারে। এবার তুমি ঠিক কর কী করবে। কাগজটা উদ্ধার করার চেষ্টা করবে, নাকি পায়ের ওপর পা তুলে আকাশপাতাল ভেবে চলবে আর মনগড়া কাহিনির জাল বুনবে, যা তোমার চিরকালের স্বভাব! একটা কথা মনে রেখো বাপ্পা, তোমার সিচুয়েশানের সঙ্গে এ দেশে সিধুর স্টেটাসও কিন্তু জড়িয়ে আছে।’
আহহ্! এই কারণে ফোন করেছ আমায়! বাপ্পা চমকে ওঠে। সিধুর কথায়? নাকি মাতৃত্বের সহজাত প্রবৃত্তির বশে? এতক্ষণ গায়ত্রীর কন্ঠস্বরে গড়িয়ে আসা উদ্বেগের রসাস্বাদন করছিল চেটে চেটে, কিন্তু হঠাৎ মুখের ভেতরটা টকে ওঠে।
বাপ্পার আর কিছু বলার থাকে না।
গায়ত্রীরও আর কিছু বলার থাকে না।
আর কথা এগোয় না। ওরা বাক্যালাপ থামায়। আবার কবে কে কাকে ফোন করবে, কত দিন সপ্তাহ মাস এমনকি বছর পরে, সেই ব্যাপারটা অনিশ্চয়তার সুতোয় ঝুলে থাকে। এভাবেই ঝুলিয়ে রেখেছে ওরা এতকাল, এবং এতে দুজনের কারোরই কোনো সমস্যা নেই।
*
‘একমাত্র যে এই কাজটা করতে পারে সে হল কানাই!’–গায়ত্রী কেন ওভাবে বলল? কথাগুলো সারাদিন বাপ্পাদিত্যর মাথার মধ্যে খচ খচ করে।
সাতগাঁয়ে কনৌজিয়া বৈদিক ধারার ঐতিহ্য অনুসরণ করে কোনো বৃত্তি অবলম্বন না করে বিশুদ্ধ পরজীবী হয়ে বেঁচে থাকার চারুশিল্পটি অধিগত করেছে কানাই। বসন্তমামার মৃত্যুর পর সে এখন আদিরামবাটির কর্তা, আদিরামবাটি নামে যেটুকু যা এখনও পড়ে আছে তার কর্তা। কীভাবে ওই পোড়ো হতশ্রী সম্পত্তি যখের ধনের মতো আঁকড়ে পড়ে আছে বাপ্পার কাছে তার খবর আসে বিভিন্ন সূত্র থেকে। বিয়ে-থা করেনি, মায়ের সঙ্গে থাকে। জরায় জর্জরিত নতুনবউ অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার নামের বিচিত্র ব্যাধিতে সারাটা দিন ধরে ২২১ টি ক্ষয়া রংজ্বলা পুতুলের (ইতিমধ্যে ১১৮ টি সম্পূর্ণ ধুলো হয়ে গিয়েছে) দেহত্বক পরিষ্কার করেন, পোশাক বদলান, আলমারির ভেতর তাদের স্থান পরিবর্তন করেন, শীতকালে পশমের জামা পরান। তার অনেকটাই ২৯ জন পোষ্য গৃহবিগ্রহদের নিয়ে বিশুকার ব্যস্ত নিত্যকর্মের মতো, যদিও সম্পূর্ণ সেকিউলার এই আচার। তার কারণ এখানে পুজো-ভোগ-আরতির পাট নেই।
.
শিয়ালকাটার ঝোপে মনুখুড়োর আনা পাথরটা হেমন্ত যেদিন খুঁজে পেল, তার আঠাশ দিন পরে এক কার্তিকের সন্ধ্যায় বিশুকা আকাশপ্রদীপের লগি বাঁধতে ছাদে ওঠে। ততদিনে তার পার্কিন্সনস্ রোগটা আরও বেড়েছে, বাঁ হাতটা কাঁধের গোড়া থেকে আর মাথাটাও কাঁপে। আরও কিছু কিছু সমস্যার কথা ফোন করে বাপ্পাকে বলেছিল। মাঝ রাত্তিরে ঠাকুরবাড়ির বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে মৌমাছির চাকের মতো একটা শব্দ শুনতে পেত, মনে হত বিগ্রহরা অতীন্দ্রিয় স্বরে বাকবিতন্ডা করছেন। সকালে উঠে মন্দির প্রদক্ষিণের সময় কপাল ছোঁয়াতে গিয়ে দেয়ালগুলো অস্বাভাবিক তেতে উঠেছে টের পেত।
পূর্বজদের দ্যুলোকবাসী আত্মারা নেমে আসেন, লগির মাথায় জাহাজি লণ্ঠন জ্বালিয়ে একদিন ছাতের আলশেয় ওঠে বিশুকা। তখন সূর্য অস্ত গিয়েছে কিন্তু আকাশে কার্তিকের আলো, গাঢ় কমলা রঙে ভরে উঠেছে চারদিক। বাঁ হাতে নিয়ন্ত্ৰণ ছিল না, ডান হাতে চিলঘরের দেয়াল ধরে ব্যালান্স করে আলশের ওপর দাঁড়িয়েছিল। হুকে-বাঁধা লগিতে দড়ির গিঁট খুলতে গিয়ে জালের মতো কী যেন পায়ে জড়িয়ে গেল। আলোআঁধারিতে দেখা যায়নি, লগির গা বেয়ে অসংখ্য সূক্ষ্ম তামার তার, নেমে গিয়েছে নীচে দক্ষিণের ঘরের দিকে। ঝুঁকে দেখতে মাথাটা ঘুরে গেল, টাল খেয়ে গিয়ে বাঁ হাত বাড়িয়ে লগিটা ধরতে গিয়ে পারল না। আলশের ওপর থেকে পা পিছলে গেল। পায়ে জড়ানো তার পটাপট করে ছিঁড়ে যেতে শূন্যে ভাসমান হয়ে ধুতিটা ফুলে উঠল ঢাও-এর পালের মতো।
হেমন্ত একবার বলেছিল, মরে-যাওয়া মানুষদের স্বর বাতাসে ভেসে আছে, অঙ্ক কষে সঠিক তরঙ্গদৈর্ঘ্য বের করে ফেলতে পারলে শোনা যায়। তিনতলার আলশে থেকে খসে ভাসতে ভাসতে কথাগুলো মনে পড়ল। মনে পড়ল, ভাঁড়ারে তর্পণের তিলের হাঁড়িতে রাশি রাশি আরশোলার ডিম, মনে পড়ল আকাশপ্রদীপ দেখে আত্মারা আর চলাচল করেন না, এই জনপদ তারা ত্যাগ করেছেন, মনে পড়ল গৃহদেবতা গছিয়ে দিয়ে কতজন দেশান্তরী হয়েছে, শেষ নিশ্বাস ত্যাগের আগে মামামশাইয়ের বুকে কাঁটার মতো ক্রতো-স্মর-কৃতং-স্মর মনে পড়ল, ক্লুনির মঠের ব্রেড বাস্কেটে বনলতার শিশুপুত্রের কথা, অষ্টধাতুর বালগোপালের কথা মনে পড়ল।
.
হাত-কাঁপার বিচিত্র ব্যাধির কথা রামপ্রাণকে জানিয়ে কংখলের আশ্রমের ঠিকানায় চিঠি লিখেছিল বিশুকা। তার উত্তরও এসেছিল। অচেনা জড়ানো হস্তাক্ষর, রামপ্রাণের হয়ে চিঠিটা লিখে দিয়েছে কেউ। হৃষিকেশ থেকে পাঠানো পোস্টকার্ডে যে সিলমোহর পড়েছে, সেই তারিখের ঠিক একুশ দিন পরে সকালের প্রথম ভাটায় সরস্বতীর ঘাটে আবক্ষ জলে নেমে এক আঁজলা তুলে পান করার নির্দেশ রয়েছে। সেটাই ওষুধ। রামঝুলার ওপর থেকে গঙ্গায় ফেলা এক ফোঁটা মাদার টিংচার দ্রবণ হতে হতে জলের বিক্ষোভে তার পোটেন্সি বৃদ্ধি পেতে পেতে একুশ দিন পরে সরস্বতীর ঘাটে নির্দিষ্ট মাত্রায় এসে পৌঁছবে, চিঠিতে লেখা হয়েছিল।
কিন্তু নদীতে নেমে সেই ওষুধ পানের মতো অবস্থা বিশুকার আর রইল না। তিরিশ ফুট উচ্চতা থেকে বাগানে বকফুলের ঝোপে গিয়ে পড়ায় মাথা ফাটেনি, মেরুদন্ড ভেঙে বেঁচে রইল আট দিন। মৃত্যুর আগে অন্তর্জলীর ব্যবস্থা করলেন শিবু চক্কোত্তি। বাপ্পা কলকাতা থেকে গিয়ে দেখল ন্যাড়া চৌকিতে বিছানো অয়েলক্লথে শুয়ে আছে বিশুকা, কোমরে অর্থোপেডিক বেল্ট জড়ানো, পা দুটো ডোবানো হয়েছে নীল প্লাস্টিকের গামলায়।
সেদিনই সকালে ত্রিবেণীর ঘাটের সেবায়েতরা এসে উনত্রিশ দেবদেবীকে নিয়ে গেল। ওখানে ঘাটের সিঁড়িতে পাকা ছাউনিতে শতাধিক উদ্বাস্তু গৃহদেবতার বিগ্রহ থাকে। ত্রিবেণীতে দেশ-দেশান্তর থেকে পুণ্যার্থীরা আসে, রোজ অনেক দান জমা পড়ে। কাঠের বড়ো বারকোশে এক সঙ্গে তিন-চারজনকে চাপিয়ে মাথায় নিয়ে ঘাটে, সেখান থেকে নৌকায় ত্রিবেণী নিয়ে যাবার সময় বিশুকার চৌকিটা তুলে দরজার কাছে আনা হলো। চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছে, স্বয়ংক্রিয় হাত নড়ে যাচ্ছে যেন ট্রেনের অপস্রিয়মাণ জানলা দিয়ে। মাথাটা উঁচু করে তুলে ধরেছিল তিতলি।
তার আগের দিন বেনারস থেকে চলে আসে তিতলি, একা, সাতাশ ঘন্টা তুফান মেলের জেনারেল কম্পার্টমেন্টে চড়ে।
