Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১৩.৪

১৩.৪

প্রশস্ত করিডোরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়েই লোকটাকে চোখে পড়েছিল: রোগা, ক্ষয়াটে চেহারা, মোটা জুলফি, মাথার চুল পাতলা হয়ে সরে গিয়ে মজা নদীর খাতের মতো কপাল চওড়া হয়েছে। পরনে গোল কলার-দেওয়া চেক শার্ট, তার বুকের দুদিকে দুটি পকেট। করিডোরের একপাশে অস্থায়ী চায়ের দোকানের বাইরে একদল মুহুরি আর নোটারি ক্লার্কের মাঝে দাঁড়িয়ে গুলতানি করছে।

চারদিকে মানুষের ব্যস্ত আনাগোনা, সরকারি দপ্তরে যেমন হয় একটি দলের চলাফেরায় ক্লান্ত দিশাহারা ভাব, আরেক দলের হাঁটার ভঙ্গি আত্মবিশ্বাসী, কিংবা যন্ত্রের মতো। খুঁটিয়ে দেখলে বলে দেওয়া যায় কারা পরিষেবা দাতা আর কারা গ্রহীতা। মধ্যবর্তী এক দল, দুই দলে সেতুবন্ধনকারী, অথবা প্রাচীর নির্মাণকারী–যাকে বলে দালাল। এই লোকটিও সেই গোত্রের।

জোয়ারে ভেসে আসা কচুরিপানার মতো ইতিউতি ভেসে বেড়াচ্ছে লোকজন, কোনো ব্যক্তি কিংবা নেমপ্লেট খুঁজছে, ধুলোপড়া জীর্ণ দস্তাবেজের স্তূপে বোঝাই আঁধার করিডোরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, ফাইল বগলে পিওনেরা হেঁটে যাচ্ছে এদিক সেদিক। একদিকে বিশাল হলঘরে মৌচাকের মতো খোপকাটা পার্টিশান, টাইপরাইটারের শব্দ, সেই শব্দ মিশছে বাগানে বড়ো বড়ো শিরীষের ছায়ায় টাইপরাইটারের শব্দে। বাগানে একপাশে আধিকারিকদের গাড়ি পার্কিং-এর স্থান, বাকি অংশে গিজগিজ করছে মানুষ—পিওন, টাইপিস্ট, দলিল লেখক, মুহুরি, পান চা সিগারেট বিক্রেতা। কর্মব্যস্ত মৌচাক যেন।

তৃতীয়বার চোখাচোখি হতে লোকটি বুঝে গেল বাপ্পাদিত্য কোন দলে। এতক্ষণে চায়ের ঠেক থেকে নোটারি ক্লার্কের দল সরে গিয়েছে। হাতের মুঠোয় সিগারেট ধরে–সরকারি অফিসে ধূমপানের নিষেধাজ্ঞায় সম্মানসূচক লুকিয়ে ধরে- টান দিচ্ছিল। শেষাংশ থামে ঘষে নিভিয়ে শার্টের পকেটে চালান করে মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো।

‘আপনি কি কিছু খুঁজছেন?’ নিস্পৃহ গলায় বলল।

‘হ্যাঁ,’ বাপ্পা বলে। ‘জমিজমার পুরোনো রেকর্ড রাখা থাকে যে ডিপার্টমেন্টটা…’

‘সাব-রেজিস্ট্রি সেকশানে যাবেন? করিডোর ধরে সোজা হেঁটে যান, তারপর বাঁদিকে। একটা প্যাসেজ, দরজাটা পার করলেই বাঁদিকে আবার একটা দরজা। ওটাই।’

মানচিত্রটা মাথায় গেঁথে নিতে নিতে এক বালক দুজনার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যেতে লোকটি খপ করে ওর কনুই চেপে ধরে। বালকটির দুই হাতে অনেকগুলো খাবারের বাক্স, তাদের গায়ে তেলের ছোপ।

‘উফ্ ছাড়ো, সন্টুদা,’ ছেলেটা ছদ্মবিরক্তিতে বলে। ‘বাবুরা সেই কখন অর্ডার দিয়েছে!’

সন্টুদা ওপরের বাক্সটি তুলে গন্ধ শোঁকে।

‘হুম, বিরিয়ানি!’ মাথা নেড়ে বলে, তারপর ছেলেটার সঙ্গে খেজুরে গপ্পো জুড়ে দেয়–কে খাওয়াচ্ছে, উপলক্ষ্য কী, ইত্যাদি। ছেলেটা চলে যাবার জন্যে অপেক্ষা করে বাপ্পা।

‘আমি একটি জমির পুরোনো রেকর্ড খুঁজতে এসেছি। কীভাবে পাওয়া যেতে পারে বলতে পারেন?’

এরকম একটা প্রশ্নের প্রত্যাশাতেই সন্টুদা ছিল, মুখ দেখে বোঝা যায়।

‘আইজিআর নম্বর আছে তো?’

‘আসলে এই দানপত্রটা বেশ পুরোনো,’ বাপ্পা বলে। ‘এক বাবা তার মেয়েকে কিছুটা জমি দানপত্র করছেন।’

‘তাহলে রেকর্ড সেকশনে খোঁজ করতে হবে, এই অফিসে এখন সব কাজ কম্পিউটারে হয়,’ সন্টুদা বলে, তারপরে যোগ করে— ‘তবে কত পুরোনো সেটা কোনো ব্যাপার না, জমির নম্বরটা থাকলেই হবে।’

বাপ্পা কিছু বলার আগেই পোর্টিকোয় একটি সাদা অ্যামবাসাডার এসে থামে, জানলার কাচে সবুজ পর্দা টানা। চারদিক থেকে জোড়া জোড়া চোখ ওদিকে ফেরে, ধুসর উর্দি-পরা পিওন গোছের এক বয়স্ক লোক দ্রুত পায়ে দরজা খুলতে নামেন, স্যালুট ও সেলামের মাঝামাঝি কিছু একটা ঠুকে গাড়ির সামনের সিট থেকে একটি বাদামি ব্রিফকেস তুলে নেন।

‘সাইডে আসুন,’ সন্টুদা নীচু স্বরে বলে। ‘সাহেব ঢুকছেন!’

সাহেব বেঁটেখাটো নিরীহ চেহারার পুরুষ; কয়েক গাছি কালো চকচকে চুল টাকের ওপর দিয়ে লেপটে আঁচড়ানো, কুতকুতে চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, এত মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে ফেলে যেন একটু বিব্রত। মাথা নীচু করে দ্রুত, প্রায় ত্রস্ত পায়ে পিওনের পিছু পিছু পর্দা টানা চেম্বারে ঢুকে যান। পর্দার রংটাও গাড়ির জানলার মতোই সবুজ।

‘আসুন আমার সঙ্গে।’

সন্টুদাকে অনুসরণ করে বাপ্পা বাগানে নেমে আসে। গাছের ছায়ায় অসংখ্য টাইপরাইটারের খটাখট শব্দে যেন ভুট্টার খই ফুটছে। টুলে বসে এক দলিল লেখক একটি স্ট্যাম্প পেপার থেকে আরবি ও ফার্সি শব্দে কন্টকিত তৎসম বাংলায় লেখা কিছু পড়ে শোনাচ্ছেন। শ্রোতার জন্য নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসা এক বৃদ্ধ, এক নারী ও এক বালক। বৃদ্ধের পরনে ধুতি-ফতুয়া, গালে দিন কয়েকের না-কামানো দাড়ি, নারীটির পরনে হলদে সুতির শাড়ি, এক মাথা ঘন কোঁকড়ানো চুল, বালক বছর দশেকের। মাথা তুলে গাছের ডালে এক জোড়া কাঠবেড়ালির খেলা দেখছে সে।

বাপ্পার চারপাশটা হঠাৎ বায়ুহীন হয়ে ওঠে, পা সরে না।

সন্টুদা একজন টাইপিস্টের টেবিল থেকে এক টুকরো কাগজ তুলে নেয়, শার্টের পকেট থেকে পেন আর আধপোড়া সিগারেটটা বের করে।

‘দানপত্রের ডিটেলস্ এখানে লিখে দিন। দাতা ও গ্রহীতার নাম, রেজিস্ট্রেশানের তারিখ, আইজিআর নম্বর… ওহ্, নম্বর তো জানা নেই বললেন। কিন্তু আমায় দাগ আর খতিয়ান নম্বর বের করতে হবে, আর পর্চার ডিটেল।’

দাতা ও গ্রহীতার নাম জানা আছে, জমির অবস্থানও, যে বাড়ির চৌহদ্দিতে আছে তার ঠিকানাও। দানপত্রের সালটা মনে আছে, এবং মোটামুটি সময়কালটাও— আম গাছে সবে মুকুল এসেছে, আর বালকটির পরনে ছিল হাফ হাতা নীল সোয়েটার।

কাগজের টুকরোয় চোখ বুলিয়ে সন্টুদার চওড়া কপালে ভাঁজ পড়ে।–‘এত আগের! আপনি তো বলেননি?’

‘এ বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না, তাই না? এইটুকু মাত্র ডিটেল্স থেকে…’

আশ্চর্যজনকভাবেই বেশ একটু নিশ্চিন্তই লাগে বাপ্পার। ট্রাইবুনাল থেকে শমন, ছেলে ও প্রাক্তন স্ত্রীর গুঁতো–জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো যোগ নেই এমন কয়েকটি শক্তির প্রভাবে নিজের অনিচ্ছায় একটা জালে ক্রমশই জড়িয়ে পড়ছে সে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরোতে চায়। গায়ত্রী আবার ফোন করলে কিছু একটা বলে দিলেই হবে।

‘কে বলে খুঁজে পাওয়া যাবে না?’ সন্টুদা ভুরু কোঁচকায়। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মাটিতে ফেলে পায়ে চাপে। ‘মহম্মদ বিন তুঘলক যেদিন টাঁকশাল গড়ল, বাদশাহী ফরমানে পর্তুগিজরা যেদিন বন্দর-হুগলি পত্তন করল, ওলন্দাজডাঙা যেদিন ইংরেজরা কিনে নিল, সব রেকর্ড আছে। ওই বাড়িটায়। কীভাবে খুঁজতে হয় শুধু জানতে হবে।’

সন্টুদা চোখ তুলে সামনে বাড়িটার দিকে নির্দেশ করে। উঁচু জোড়া থাম আর কাঠের ব্লাইন্ডে উপরিভাগ ঘেরা নিওক্ল্যাসিকাল স্থাপত্য। তার ওপরে ফিকে সূর্যালোক এসে পড়েছে। কয়েক সেকেন্ড পরেই তার ভেতরে একটি সরু প্যাসেজে ঢুকে পড়ে বাপ্পা। মাথার ওপর অনেক উঁচুতে স্কাইলাইট, ক্ষীণ ঘোলাটে আলো এসে ঢুকেছে। সারি সারি শেলফে দলিল দস্তাবেজের বান্ডিল হলুদ ধূসর হয়ে ক্রমশ কাগজের মন্ডে ফিরে যাচ্ছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন ধোবিখানায় কাপড়ের স্তূপ। সরু প্যাসেজের বাঁকে প্রায়ান্ধকারে এক খালি গা শর্টস-পরা লোক ইলেক্ট্রিক হিটারে সসপ্যান চাপিয়ে ডিম ভাজছেন, পাশে এক ঘোমটা দেওয়া নারী একটি বড়ো অ্যালুমিনিয়ামের ট্রেতে চায়ের কাপ সাজাচ্ছেন। পায়ের কাছে একটি হলদে- কালো বেড়াল। সন্টুদার পিছু পিছু বাপ্পা পার হয়ে যায় একসারি জানলাবিহীন গুদামের মতো ঘর, ভেতরে ভাঙা চেয়ারটেবিলের স্তূপে ঘন মাকড়শার জাল।

‘দেয়ালে লোহার কড়াগুলো দেখেছেন? এখানে ক্রীতদাসদের বেঁধে রাখা হতো। ওদিকটায় মদের পিপে আর নুনে জারানো মাংসের ভাঁড়ার,’ সন্টুদা না থেমে বলে। ফিক করে হেসে বলে— ‘আর এইটা ছিল সাহেবদের নাচঘর।’

বিশাল হলঘরে কোমর অব্দি উঁচু কাঠের পার্টিশান দিয়ে খোপ কাটা, উঁচু কড়িবরগার ছাত থেকে লম্বা লম্বা লোহার রডের নীচে পাখা ঘুরছে বনবন করে, নীচে কাগজ উড়ছে। ডজন ডজন করণিকের দেহের উপরিভাগ পার্টিশানের ওপর জেগে আছে। তাদের কারোর মুখ খবরের কাগজের আড়ালে ঢাকা, কারোর মাথা ভাজ করা হাতের ওপর স্থির, ঘুমন্ত। হলঘরে তিন দিকের দেয়ালে গ্যালারির মতো আরেকটি তল, রেলিং ঘেরা, লোহার সিঁড়ি উঠেছে। সেখানে শেলফে বোঝাই কাগজপত্রের রাশি ছাত ছুঁয়েছে। ওরা ওই পার্টিশান-দেওয়া মৌচাকের ভেতর দিয়ে কোনাকুনি হেঁটে ঠিক এই রকম আরেকটি হলঘরে গিয়ে ঢোকে। সেখান থেকে বেরিয়ে ঢুকে পড়ে আরেকটি প্যাসেজে। এটিও আগেরটির মতোই— সরু, প্রায়ান্ধকার, ধুলোয় ধূসর।

‘আপনি এখানটায় থাকুন, কোনোদিকে যাবেন না। আমি আসছি।’ বলে সন্টুদা বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যায়।

চারদিকে ধুলো, ওপর থেকে ঝরে পড়ছে ধুলো রঙের আলো। সময় এখানে ফসিল হয়ে আছে। মাথার ওপর ডানা ঝাপটানির শব্দে চমকে ওপরে তাকিয়ে বাপ্পাদিত্য দেখে একজোড়া পায়রা, সিলিঙে লোহার ফ্রেমে সঙ্গমে রত, স্কাইলাইটের ভাঙা শার্সি দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। শূন্য চায়ের কাপে ভরা ট্রে হাতে সেই ঘোমটা দেওয়া মহিলা হেঁটে আসতেই টের পাওয়া যায় এটা আগের প্যাসেজেরই বিস্তার। কানাগলি নয়, যেমনটা সে প্রথমে ভেবেছিল; সমকোণে ভাঁজ হয়ে বিশাল বাড়িটার চারদিক প্রদক্ষিণ করেছে। যেদিক দিয়ে ঢুকেছিল খুব সম্ভব তার বিপরীত দিকে রয়েছে এখন, বাপ্পা অনুমান করে। বাঁকটা ঘুরে উঁকি দিতে টের পায় অনুমান সঠিক, দূরে রান্নার জায়গাটা দেখা যাচ্ছে। শর্টস-পরা লোকটা আর বেড়ালটা নেই। হিটারের ওপর বড়ো অ্যালুমিনিয়ামের মগে কিছু একটা ফুটছে। সেই মহিলা উবু হয়ে বসে বালতির জলে হাত ডুবিয়ে কাপগুলো ধুয়ে তুলছেন। ঘোমটা সরানো, চুলে চুমকি- বসানো ক্লিপ চিকচিক করছে ছায়ার ভেতর।

.

অনন্তকাল অপেক্ষার পর সন্টুদা ফিরল, মুখে বিজয়ীর হাসি। কাগজের টুকরোটা দেখিয়ে বলে—

‘এটা দেবোত্তর এলাকার জমি, নবাবী আমলে শেষ জরিপ হয়। ওই এলাকার সব রেকর্ড আছে কুলিডিপোয়।’

‘সেটা কোথায়?’

‘আসার সময়ে ডানদিকে বাড়িটা দেখলেন? ক্রীতদাসদের জাহাজে চাপিয়ে পাঠানোর আগে ওখানে রাখা হতো। রেকর্ড কিপার আমার নিজের লোক। বের করা যাবে, কিন্তু আপনাকে কিছু ডিটেল জেনে আসতে হবে।

আধো অন্ধকারে পায়রার ডানা ঝাপটানির ভেতর সন্টুদা কাগজের টুকরোটার পেছনে লিখে দেয়। বাপ্পা পার্স খুলে একটি একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিতে অবাক হবার ভান করে হাসে।

এই কাজের জন্য টাকাটা কি বেশি হলো? কম হলো? নোটটা তর্জনি আর বুড়ো আঙুলের মাঝে ঘষছে, যেন কাগজের ঘনত্ব পরখ করছে। বাপ্পা আরও একশো টাকা দেয়।

‘আমার মোবাইল নম্বর লিখে দিয়েছি। আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন ওগুলো যোগাড় করুন।’